নাগরিক মতামতশিরোনাম-২

অক্টোবর বিপ্লব ও ৭ নভেম্বরের অভ্যুত্থান

মোহাম্মদ আনোয়ার হোসেন

একশ বছর আগে ১৯১৭ সালে রাশিয়ায় বলশেভিক পার্টির নেতা ভি আই লেনিনের নেতৃত্বে অক্টোবর বিপ্লব এবং ৪২ বছর আগে ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর বাংলাদেশে জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের নেতা কর্নেল আবু তাহের বীর উত্তমের নেতৃত্বে সিপাহী-জনতার অভ্যুত্থানের মিল অমিল নিয়ে কথা বলব। বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ সমাজ বিপ্লব নিয়ে যারা স্বপ্ন দেখেন তারা রুশ বিপ্লবের মডেলে ৭ নভেম্বর অভ্যুত্থান থেকে শিক্ষা নিতে পারেন।
রাশিয়ায় জুলিয়ান ক্যালেন্ডারে ১৯১৭ সালের ২৫ অক্টোবরে সূচিত হয়েছিল বলে পৃথিবীর প্রথম সফল সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবটি ‘অক্টোবর বিপ্লব’ হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে। নতুন গ্রেগোরিয়ান বর্ষপঞ্জী অনুযায়ী তারিখটি পড়ে ১৯১৭ সালের ৭ নভেম্বর। তাই নভেম্বর বিপ্লব হিসেবেও তা পরিচিত। কাকতালীয়ভাবে রাশিয়ার সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব এবং বাংলাদেশে সৈনিক-জনতার অভ্যুত্থান ৭ নভেম্বর তারিখে অনুষ্ঠিত হয়েছিল।
বিভিন্ন যুগে মানবজাতির উপর চেপে বসা শোষণ-বঞ্চনা-বৈষম্যের অবসানের লক্ষ্যে সমাজের নিপীড়িত শ্রেণী বিপ্লবী অভ্যুত্থানে অংশ নিয়েছে। রোমে অভিজাত শ্রেণীর দাস নিপীড়নের বিরুদ্ধে স্পারটাকাসের বিদ্রোহ, ফ্রান্সে সর্বহারা শ্রেণীর প্যারী কমিউন ছাড়াও বাংলাদেশ সহ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে লাঞ্ছিত-বঞ্চিত শ্রেণী লড়াই-সংগ্রাম করেছে। কিন্তু লেনিনের নেতৃত্বে নভেম্বর বিপ্লবের মধ্য দিয়ে পৃথিবীতে প্রথমবারের মতো সর্বহারা শ্রেণীর সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল।
পেট্রোগ্রাড (সেইন্ট পিটার্সবার্গ) শহরে ভ্লাদিমির ইলিচ লেনিনের নেতৃত্বে বলশেভিক পার্টির এই সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবটির সূচনা করেছিল বিপ্লবী শ্রমিক-জনতা এবং সৈনিকেরা। সৈনিকদের অধিকাংশ ছিল রাশিয়ার গরীব কৃষক শ্রেণী থেকে আগত। এক অর্থে তারা ছিল সেনা উর্দি পরা কৃষক। এ ছাড়াও পেট্রোগ্রাডের শ্রমিক-সৈনিক অভ্যুত্থান নাড়া দিয়েছিল সারা রাশিয়াকে। অভ্যুত্থানে রাশিয়ার গরীব কৃষকেরা যোগ দিয়েছিল ব্যাপকভাবে।
অক্টোবর বিপ্লবের সাত মাস আগে মার্চের ৮ তারিখে পেট্রোগ্রাড শহরের রাজপথ প্রকম্পিত করেছিল রুটির দাবীতে ভুখা মানুষেরা। তাদের সমর্থনে এগিয়ে আসে বিপুল সংখ্যক বিপ্লবী কারখানা শ্রমিক। জারের পুলিশের গুলির মুখেও তারা রাজপথ আঁকড়ে থাকে। ১০ মার্চের মধ্যে বিক্ষোভ অভ্যুত্থানে রুপ লাভ করে। পেট্রোগ্রাডের বহু কারখানায় গড়ে ওঠে শ্রমিক সোভিয়েত। এমন সংগঠনের সাথে শ্রমিকেরা পরিচিত। ১২ বছর আগে ১৯০৫ সালের জার-বিরোধী বিপ্লবে এমন সোভিয়েত গড়ে উঠেছিল বহু কারখানায়।
১৯১৭ সালের ১১ মার্চ তারিখে এই বিক্ষোভ দমনে নামানো হয় পেট্রোগ্রাড গ্যারিসনের সেনাদলকে। প্রথম দিকে গুলিও চালায় তারা। কিন্তু বিক্ষোভকারিদের দমাতে পারে না। বরং সৈনিকদের মনোবলে চিড় ধরে। জার দ্বিতীয় নিকোলাস তার রাষ্ট্রীয় ডুমা (পরামর্শ সভা) ভেঙ্গে দেন যা তিনি গঠন করেছিলেন ১৯০৫ সালের বিপ্লবের পর। তাতে কাজ হয় না। সৈনিকেরা যোগ দিতে থাকে অভ্যুত্থানী শ্রমিক-জনতার সাথে।
পরদিন ১২ মার্চ। রোমানভ রাজতন্ত্রের শেষ রক্ষাব্যূহ রাশিয়ার রাজধানী পেট্রোগ্রাড সেনা গ্যারিসনের বিভিন্ন রেজিমেন্টের সৈনিকেরা দলে দলে যোগ দেয় অভ্যুত্থানে। রাতারাতি গড়ে উঠতে থাকে সৈনিক সোভিয়েত। এক দিকে গঠিত হয় অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের। অন্যদিকে উত্থান ঘটে শ্রমিক ও সৈনিক প্রতিনিধিদের নিয়ে পেট্রোগ্রাড সোভিয়েত। সরকারের সাথে চুক্তি হয় পেট্রোগ্রাডের শ্রমিক ও সৈনিক সোভিয়েতের। তাই বলা যায় রুশ রাজতন্ত্রের পতনের পর দুইটি কর্তৃত্বের উদ্ভব ঘটে। পুঁজিপতি বুর্জোয়া শ্রেণী ও সর্বহারা শ্রেণীর কর্তৃত্ব। এই বিশেষ পরিস্থিতি শ্রমিক ও সৈনিক সোভিয়েত নভেম্বর বিপ্লবের বিজয়ী হওয়ার পেছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
১৪ মার্চ পেট্রোগ্রাড সোভিয়েত তার প্রথম ফরমান জারি করে, যাতে বলা হয় সৈনিক এবং নাবিকেরা অন্তর্বর্তী সরকারের শুধুমাত্র ওইসব নির্দেশ মানবে যাতে সায় আছে পেট্রোগ্রাড সোভিয়েতের। ১৫ মার্চ জার দ্বিতীয় নিকোলাস তার ভাই মাইকেলের পক্ষে সিংহাসন ত্যাগ করেন। কিন্তু তিনি দায়িত্ব গ্রহণ করেন না। পতন হয় ৩০০ বছরের পুরনো রোমানভ রাজবংশের।
নতুন পঞ্জিকা অনুসারে ১৯১৭ সালের ১২ মার্চ জার রাজতন্ত্রের পতনের মধ্য দিয়ে রাশিয়ায় বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক বিপ্লব সম্পন্ন হয়। পুরনো জুলিয়ান ক্যালেন্ডারে ২৩ ফেব্রুয়ারি তারিখে সূচনাহয়েছিল বলে এই বিপ্লব ‘ফেব্রুয়ারি বিপ্লব’ হিসেবে অভিহিত করা হয়। ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত অন্তর্বর্তী পুঁজিবাদী কেরেনস্কি সরকার জমিদারী বাজেয়াপ্ত করা ও রাষ্ট্র থেকে চার্চ পৃথক করার বিধান জারি করে। এ ছাড়াও কারাগারে ও নির্বাসনে থাকা সকল রাজনৈতিক নেতা-কর্মীদের প্রতি সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা; সংবাদপত্র ও মত প্রকাশ, সমাবেশ ও ধর্মঘট করার স্বাধীনতা; সার্বজনীন গোপন ভোটের ভিত্তিতে নির্বাচন এবং যুদ্ধরত না থাকা কালে সেনাবাহিনী ও অন্যান্য সংগঠনে রাজনীতি করার অধিকার লাভ ছিল বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক বিপ্লবের সুফল।
বুর্জোয়া অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের যুদ্ধমন্ত্রী কেরেনস্কি ‘সোলজার্স চার্টার’ জারি করেছিলেন, যার ফলে সৈনিকেরা সাধারণ নাগরিকদের মত সকল ক্ষেত্রে সম অধিকার লাভ করে যার মধ্যে ছিল সৈনিকদের রাজনীতি করার এবং রাজনৈতিক দলে যোগ দেয়ার অধিকার লাভ। অফিসারদের প্রতি সৈনিকদের স্যালুট দেয়া এবং শারীরিক দণ্ড প্রদানের প্রথা বিলুপ্ত করা হয়।
এসব কারণে বলশেভিক পার্টিসহ অন্যান্য মার্ক্সবাদী বিপ্লবীরা ঐ সরকারকে সমর্থন করে। ‘প্রাভদা’ পত্রিকায় লেনিন যথার্থই রাশিয়াকে সবচেয়ে মুক্ত গণতান্ত্রিক দেশ হিসেবে উল্লেখ করেছিলেন। আর তা দ্রুত সদ্ব্যবহার করে বলশেভিক পার্টি সেনাবাহিনীর মধ্যে রাজনৈতিক আদর্শ প্রচারের কাজে নেমে পড়ে। কার্যত সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরে বলশেভিক পার্টির সংগঠন বিপ্লবের অন্যতম ঘাঁটি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে।
স্বাধীন বাংলাদেশের সূচনালগ্নে পাকিস্তানী ঔপনিবেশিক রাষ্ট্র (পুলিশ, সেনাবাহিনী ও আমলাতন্ত্র) এবং শ্রমিক-কৃষক-সাধারণ মানুষের অধিকার প্রশ্নে কি কি পদক্ষেপ নেয়া হয়েছিল, এই সুযোগে তা আমরা ভেবে দেখতে পারি। পরে যা বিবৃত হয়েছে।
সুইজারল্যান্ডে নির্বাসনে থাকা লেনিন গোপনে রাশিয়ায় প্রত্যাবর্তন করেন ৩ এপ্রিল তারিখে। রচনা করেন ‘এপ্রিল থিসিস’। সময় স্বল্পতার কারণে দলের সাথে আলোচনা এবং অনুমোদন নেওয়ার পূর্বেই লেনিনের একান্ত নিজস্ব মত হিসেবে তা পার্টি পত্রিকা ‘প্রাভদা’য় প্রকাশিত হয়। ১৬ এপ্রিল তারিখে লেনিন শ্রমিক ও সৈনিক সোভিয়েতের সর্ব-রাশিয়া সম্মেলনে প্রথমে বলশেভিক ও পরে বলশেভিক এবং মেনশেভিক যৌথ সভায় এপ্রিল থিসিস উত্থাপন করেন।
এই থিসিসে তিনি বলেন বুর্জোয়াদের প্রতিশ্রুতি বিশ্বাস করে তাদের সমর্থন করার অর্থ হবে প্রলেতারীয় শ্রেণির সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করা। তাই বিপ্লবীদের দাবি তুলতে হবে অবিলম্বে সোভিয়েতের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তরের। পুলিশ, সেনাবাহিনী ও রাষ্ট্র প্রশাসন ভেঙে দিয়ে শ্রমিক শ্রেণির আইন-শৃঙ্খলা ও প্রতিরক্ষা বাহিনী ও প্রশাসন গড়ে তুলতে হবে। শ্রমিক কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে হবে শিল্প-কারখানায়। দরিদ্র ও ভূমিহীন কৃষকদের দখল নিতে হবে ভূস্বামীদের জমি।
রাশিয়ায় নভেম্বর বিপ্লবে লেনিনের ‘এপ্রিল থিসিসে’র গুরুত্ব বিবেচনা করে তার দশ দফার কয়েকটি চুম্বক অংশ তুলে ধরবো। বাংলাদেশে ৭ নভেম্বর সিপাহী অভ্যুত্থান পর্যালোচনাকালে এসব অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক হবে।
লেনিন রাশিয়ার পরিস্থতিতি বিশ্লেষণ করে বলেন, প্রলেতারিয়েতের শ্রেণিচেতনা এবং তাদের সংগঠন যথেষ্ট শক্তিশালী না থাকার কারণে বিপ্লবের প্রথম পর্বে ক্ষমতা তুলে দেওয়া হয়েছে বুর্জোয়াদের হাতে। সে পর্যায় অতিক্রম করে দেশ এগিয়ে যাচ্ছে বিপ্লবের দ্বিতীয় পর্বে, যেখানে ক্ষমতা অবশ্যই প্রলেতারিয়েত এবং গরীব কৃষকদের হাতে যাবে।
পার্লামেন্টারি সরকারের বিরুদ্ধে ডাক দেন লেনিন। বলেন, শ্রমিক-কৃষক-সৈনিকদের মধ্যে গড়ে ওঠা সোভিয়েতগুলো থেকে পার্লামেন্টারি সরকারে ফিরে যাওয়া হবে একটি পশ্চাৎপদক্ষেপ। বরং প্রয়োজন সারা দেশে তৃণমূল থেকে উপর পর্যন্ত শ্রমিক-ক্ষেতমজুর ও কৃষকদের সোভিয়েত প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠা।
পুলিশ, সেনাবাহিনী এবং আমলাতন্ত্রের বিলোপ সাধনের ডাক দেন লেনিন। বলেন, সকল কর্মকর্তাকে নির্বাচিত হতে হবে, তারা সবাই হবেন অপসারণযোগ্য, তাদের কারও বেতন একজন দক্ষ শ্রমিকের গড় বেতন অতিক্রম করতে পারবে না।
ভূমি-বিষয়ক কর্মসূচি প্রণয়নে প্রধান ভূমিকা পালন করবে ক্ষেতমজুর সোভিয়েতগুলো। দেশের সমস্ত ভূমির রাষ্ট্রীয়করণ সম্পন্ন করতে হবে, ভূমির বিলিব্যবস্থা স্থানীয় ক্ষেতমজুরএবং কৃষক সোভিয়েতগুলোর হাতে হস্তান্তর করতে হবে।
এপ্রিল থিসিসের মর্মবাণীর যথার্থতা দ্রুতই স্পষ্ট হয়। উদার গণতন্ত্রের সুযোগ-সুবিধা সঙ্কুচিত হয়ে আসে। বুর্জোয়া অন্তর্বর্তীকালীন সরকার কমিউনিস্ট বিপ্লবীদের বিশেষ করে বলশেভিকদের প্রতি আগ্রাসী হয়ে ওঠে। লেনিনসহ কয়েকজন শীর্ষনেতার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করা হয়। রাশিয়ার সঙ্গে তখন জার্মানির যুদ্ধ চলছে। সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয় লেনিন জার্মানির চর। আত্মগোপনে যেতে বাধ্য হন লেনিন।
এর মধ্যেই (২৬ জুলাই থেকে ৩ আগস্ট) পেট্রোগ্রাডে বলশেভিক পার্টির ষষ্ঠ কংগ্রেস অনুষ্ঠিত হয়। আত্মগোপনে থাকায় লেনিন উপস্থিত থাকতে পারেননি সে কংগ্রেসে। কিন্তু তাঁর এপ্রিল থিসিস, যা তিনি ইতোমধ্যে আরও পরিপূর্ণ করেছেন, তার আলোকে বলশেভিক পার্টি তার রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে এবং সর্বসম্মতিক্রমে লেনিনকে দলের নেতা নির্বাচন করে। উপযুক্ত সময়ে সশস্ত্র গণঅভ্যুত্থানের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয় এই কংগ্রেসে।
কেরেনস্কি কর্তৃক সেনাবাহিনীর প্রধান হিসেবে জেনারেল কর্নিলভকে নিয়োগদানের পর থেকে লেনিন ও বলশেভিকদের বিরুদ্ধে সরকারি আক্রমণ আরও তীব্র হয়। নভেম্বর বিপ্লবে কর্নিলভ অধ্যায় সংক্ষিপ্ত কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ। জারের সেনাবাহিনীর জেনারেল কর্নিলভ ছিলেন চরম প্রতিক্রিয়াশীল ও উচ্চাকাঙ্ক্ষী। ফেব্রুয়ারি বিপ্লবে জার দ্বিতীয় নিকোলাসের উচ্ছেদের পর মার্চ মাসে পেট্রোগ্রাড গ্যারিসনের কমান্ডার নিয়োগ করা হয় কর্নিলভকে।
ক্ষমতা পেয়েই তিনি রাজপ্রাসাদে অবস্থানকারী রানী আলেকজান্ড্রা এবং তার ছেলেমেয়েদের গৃহবন্দি করেন, তাদের নিরাপত্তায় নিয়োজিত রাজকীয় গার্ড বাহিনী সরিয়ে দিয়ে ৩০০ জন বিপ্লবী সৈনিককে নিয়োগ করেন কর্নিলভ। একই সঙ্গে কর্নিলভ ঘোষণা করেন,“জার্মান গুপ্তচর লেনিন ও তাঁর সঙ্গী-সাথিদের এখনই নির্মূল করতে হবে। শ্রমিক ও সৈনিক প্রতিনিধিদের সোভিয়েত এখনই ভেঙে দিতে হবে যাতে তাঁরা কখনও একত্রিত হতে না পারে।”
কর্নিলভের এসব প্রতিবিপ্লবী তৎপরতায় পূর্ণ সায় ছিল বুর্জোয়া কেরেনিস্কি সরকারের। এক পর্যায়ে কর্নিলভ খোদ কেরেনস্কি সরকারের বিরুদ্ধে ক্যু-দেতা সংগঠিত করে ক্ষমতা দখলের চেষ্টা করেন। যে কেরেনস্কি সরকারের সঙ্গে বলশেভিকদের ঐক্য ভেঙ্গে পড়েছিল, তা আবার জোড়া লাগে কর্নিলভের বিদ্রোহদমনে। ক্যু-দেতা ব্যর্থ হয় পেট্রোগ্রাড সোভিয়েতের সম্মিলিত প্রতিরোধের মুখে। কর্নিলভকে গ্রেপ্তার করা হয়। পেট্রোগ্রাড গ্যারিসনে কেরেনস্কির সোশ্যালিস্ট রেভেল্যুশনারি পার্টি এবংমেনশেভিকদের সমর্থক সোভিয়েতের শক্তিশালী অবস্থান ছিল।
১৩ সেপ্টেম্বর কর্নিলভের গ্রেপ্তারের দিন মেনশেভিক এবং সোশ্যালিস্ট রেভেল্যুশনারি পার্টি নিয়ন্ত্রিত পেট্রোগ্রাড সোভিয়েতে বলশেভিকদের পক্ষে একটি প্রস্তাব পাশ হয় ও তারা বলশেভিকদের পক্ষে যোগদান করে। পাঁচ দিন পর মস্কো সোভিয়েতও বলশেভিকদের পক্ষে চলে আসে। সারা রাশিয়ার অন্যান্য শহরের সোভিয়েতগুলো ক্রমেই বলশেভিকদের পক্ষালম্বন করে। লেনিন এ সময় লেখেন,
“শ্রমিক ও সৈনিক সোভিয়েতে সংখ্যাধিক্য লাভ করায় বলশেভিকরা ক্ষমতা দখল করতে পারে এবং তা করতে হবে।”
রাশিয়ার দুটো রাজধানী পেট্রোগ্রাড ও মস্কোতে শ্রমিক ও সৈনিক প্রতিনিধিদের সোভিয়েতের অধিকাংশ বলশেভিক পার্টির পক্ষে চলে আসায় অবিলম্বে ক্ষমতা দখলের ডাক দেন লেনিন।
১৯১৭ সালের ২৫শে অক্টোবরের সন্ধ্যায় অরোরা যুদ্ধ্বজাহাজের কামান গর্জে উঠে। রুশ বুর্জোয়া সরকারের শেষ ঘাঁটি উইন্টার প্যালেসের উপর আক্রমণ। পেট্রোগ্রাড সোভিয়েতের জরুরি অধিবেশনে লেনিন বলেন:
“যে শ্রমিক ও কৃষক বিপ্লবের প্রয়োজনীয়তার কথা বলশেভিকরা সর্বদা বলে এসেছে তা ঘটল।”
লাল পেট্রোগ্রাডে একেবারে নিজ চোখে দেখা নভেম্বর বিপ্লবের উপর মার্কিন সাংবাদিক ও সমাজতন্ত্রী জন রিড তাঁর ‘দুনিয়া কাঁপানো দশ দিন’ গ্রন্থে লেখেন:
I stopped Kameniev – a quick moving little man, with a wide, vivacious face set close to his shoulders. Without preface he read in rapid French a copy of the resolution just passed:
The Petrograd Soviet of Workers’ and Soldiers’ Deputies, saluting the victorious Revolution of the Petrograd proletariat and garrison, particularly emphasises the unity, organisation, discipline, and complete cooperation shown by the masses in this rising; rarely has less blood been spilled, and rarely has an insurrection succeeded so well.
The Soviet expresses its firm conviction that the Workers’ and Peasants’ Government which, as the government of the Soviets, will be created by the Revolution, and which will assure the industrial proletariat of the support of the entire mass of poor peasants, will march firmly toward Socialism, the only means by which the country can be spared the miseries and unheard-of horrors of war.
The new Workers’ and Peasants’ Government will propose immediately a just and democratic peace to all the belligerent countries.
It will suppress immediately the great landed property, and transfer the land to the peasants. It will establish workmen’s control over production and distribution of manufactured products, and will set up a general control over the banks, which it will transform into a state monopoly.
The Petrograd Soviet of Workers’ and Soldiers’ Deputies calls upon the workers and the peasants of Russia to support with all their energy and all their devotion the Proletarian Revolution. The Soviet expresses its conviction that the city workers, allies of the poor peasants, will assure complete revolutionary order, indispensable to the victory of Socialism. The Soviet is convinced that the proletariat of the countries of Western Europe will aid us in conducting the cause of Socialism to a real and lasting victory.
“You consider it won then?”
He lifted his shoulders. “There is much to do. Horribly much. It is just beginning…”
এবারে জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের (জাসদ) রাজনৈতিক সিদ্ধান্তে ও অংশগ্রহণে দলের অন্যতম নেতা কর্নেল আবু তাহের বীর উত্তমের নেতৃত্বে ৭ নভেম্বর সিপাহী-জনতার অভ্যুত্থানের বিষয়ে বলব। তার আগে বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জনের দশ মাসের মাথায় ১৯৭২ সালের ৩১ অক্টোবর সামাজিক বিপ্লব ও শ্রেণিসংগ্রামের ডাক দিয়ে জাসদের আত্মপ্রকাশের প্রেক্ষাপট সংক্ষেপে আলোচনা করবো।
জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আহ্বানে একটি সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছিল। মুক্তিযুদ্ধে বঙ্গবন্ধুর নিজ দল আওয়ামী লীগ নেতৃত্ব দেয়। একই সঙ্গে ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টির মস্কো ও পিকিংপন্থী অংশ এবং বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি ও অন্যান্য বাম প্রগতিশীল দল মুক্তিযুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
বাঙালি জাতীয়তাবাদ ও গণতান্ত্রিক-অসাম্প্রদায়িক চেতনার ধারক আওয়ামী লীগের ছাত্রসংগঠন ছাত্রলীগের অভ্যন্তরে ষাটের দশক থেকেই স্বাধীন সমাজতান্ত্রিক বাংলাদেশ অর্জনের লক্ষ্যে প্রগতিশীল চেতনা ধারণ করে এমন একটি স্রোত ক্রমশ শক্তিশালী হয়ে ওঠে। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের প্রাক্কালে সিরাজুল আলম খানের অঘোষিত নেতৃত্বে ছাত্রলীগের এই ধারাটি মুখ্য ভূমিকায় চলে আসে। এর পেছনে বঙ্গবন্ধুর সায়-সহযোগিতা এবং নির্দেশনা ছিল গুরুত্বপূর্ণ প্রভাবক। মুক্তিযুদ্ধে বঙ্গবন্ধুর শারীরিক অনুপস্থিতিকালে ছাত্রলীগের এই অংশ মুজিব বাহিনী হিসেবে নিজেদের সংগঠিত করে।
মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন নয় মাস বাংলাদেশের প্রথম সরকার এবং পাকিস্তানের কারাগার থেকে বঙ্গবন্ধুর স্বাধীন বাংলায় প্রত্যাবর্তনের পর থেকে তাঁর সরকারের গৃহীত পদক্ষেপসমূহের মধ্য দিয়ে এক অর্থে বলা যায় বাংলাদেশে বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক বিপ্লব সম্পন্ন হয়েছিল। এসব পদক্ষেপের মধ্যে ছিল, দেশের নাম ‘গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ’ রাখা, পাকিস্তানিদের পরিত্যাক্ত কলকারখানা ও ব্যাংক-বীমা জাতীয়করণ, ২৫ বিঘা পর্যন্ত জমির খাজনা মউকুফ, ভূমির সর্বোচ্চ সীমা ১০০ বিঘা নির্ধারণ এবং গণতন্ত্র, জাতীয়তাবাদ, ধর্মনিরপেক্ষতা ও সমাজতন্ত্র-– এই চার মৌলনীতি সম্বলিত সংবিধান রচনা।
রাশিয়ায় ১৯১৭ সালের বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক কেরেনস্কি সরকারের গৃহীত পদক্ষেপের সঙ্গে বাংলাদেশের অনুরূপ পদক্ষেপের মিল খুঁজে পাওয়া যায়। কিন্তু রাষ্ট্রের প্রসঙ্গে এলেই আমরা দেখি চরম অসঙ্গতি। যেখানে জারতন্ত্রের রাষ্ট্র কাঠামোতে ব্যাপক সংস্কার সাধন করে তাকে আধুনিক বুর্জোয়া রাষ্ট্রের রূপ দিতে সচেষ্ট হয়েছিল কেরেনস্কি সরকার, সেখানে স্বাধীন বাংলাদেশে পরিত্যক্ত পাকিস্তানি ঔপনিবেশিক রাষ্ট্র যার বিরুদ্ধে সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধ হয়েছে, ৩০ লক্ষ মানুষ জীবন দিয়েছে তার স্থলে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ধারণ করতে পারে এমন রাষ্ট্র পত্তনের কোনো পদক্ষেপই নেওয়া হয়নি। ঔপনিবেশিক আইন-কানুনের স্থলে স্বাধীন দেশের আইন ও বিচার ব্যবস্থা প্রবর্তনের কোনো উদ্যোগও নেওয়া হয়নি।
মুক্তিযুদ্ধের আগে যে স্বাধীন বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখেছে এদেশের মানুষ, সে স্বপ্ন হাজার গুণ পল্লবিত হয়েছে নয় মাসের মুক্তিযুদ্ধ ও আত্মত্যাগের মধ্য দিয়ে। কিন্তু স্বাধীনতার পর নতুন চেতনায় উজ্জীবিত মানুষ গভীর হতাশায় নিমজ্জিত হয়েছে। খাদ্যাভাব, অভাব-অনটন মানুষকে আশাহত করেনি। সদ্যস্বাধীন দেশে এসব দুঃখ-কষ্ট অতিক্রম করে সামনের দিকে অগ্রসর হতে চেয়েছে মেহনতি মানুষ। কিন্তু পদে পদে তাদের বাধাগ্রস্ত করেছে স্বাধীন বাংলাদেশে পাকিস্তানি রাষ্ট্র। স্বাধীন দেশে মানুষ চেয়েছে রাষ্ট্রপরিচালনার অধিকার। তা তারা পায়নি। এ প্রসঙ্গে মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সেক্টর অধিনায়ক কর্নেল আবু তাহেরের লেখা ‘মুক্তিযোদ্ধারা আবার জয়ী হবে’ প্রবন্ধের কিছু অংশ পাঠ করা যেতে পারে:
“বাংলার দুর্ভাগ্য আইনানুগ উত্তরাধিকারীর বদলে সর্বস্তরের নেতৃত্ব এসেছে তাদেরই হাতে যারা প্রাক-বিপ্লব যুগে ছিলেন ক্ষমতার উৎস। প্রশাসনযন্ত্র সেই পুরনো ব্যক্তিরাই চালান। বাণিজ্য, শিক্ষা, সংস্কৃতির ক্ষেত্রেও তারাই। যে সামরিক অফিসার পাকিস্তানি সৈন্যদের সঙ্গে দাঁড়িয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের নির্মূল করার জন্য ছিলেন সচেষ্ট তিনি আজ আরও উচ্চ পদে সমাসীন। যে পুলিশ অফিসার দেশপ্রেমিক মুক্তিযোদ্ধাদের ধরে সোর্পদ করেছে পাকিস্তানিদের হাতে তিনি আবার মুক্তিযোদ্ধাদের নামে হুলিয়া বের করতে ব্যস্ত। যে আমলারা রাতদিন খেটে তৈরি করেছে রাজাকার বাহিনী তারা মুক্তিযোদ্ধাদেরকে চাকরি দিয়ে দয়া প্রদর্শনের অধিকারী। যে শিক্ষক দেশের ডাকে সাড়া দিতে পারেনি তিনিই আজ তরুণদের শিক্ষা দেওয়ার দায়িত্ব পেয়েছেন।
পরিকল্পনা বিভাগের যে কর্মীকে শোষণের পরিকল্পনা করা শেখানো হয়েছে বছরের পর বছর ধরে তিনিই এখন সমাজতন্ত্রে উত্তরণের পরিকল্পনা তৈরি করেন। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে যারা পাকিস্তানিদের হয়ে প্রচারণায় মত্ত ছিলেন, ১৬ ডিসেম্বরের পর তারাই ভোল পাল্টিয়ে সংস্কৃতির মধ্যমণি হয়েছেন। অথচ মুক্তিযুদ্ধের পর প্রত্যেক দেশে করা হয়েছে কনসেনট্রেশন ক্যাম্প। মুক্তিযুদ্ধে যারা সাহায্য করেনি তারা স্থান পেয়েছে কনসেনট্রেশন ক্যাম্পে। সেখানে কায়িক পরিশ্রমের মাধ্যমে তাদেরকে আত্মশুদ্ধির সুযোগ দেওয়া হয়েছে, যাতে তারা বিপ্লবী জনতার অংশ হতে পারে।
নিতান্তই পরিতাপের বিষয়, যাদের কনসেনট্রেশন ক্যাম্পে থেকে আত্মশুদ্ধি করার কথা, সকলের অগোচরে তারা সর্বস্তরে নেতৃত্বের আসন দখল করে বসেছে।
আজ ষড়যন্ত্রের প্রচার বিভাগের মাইক্রোফোন হয়ে দাঁড়িয়েছে উচ্চ মধ্যবিত্ত ও ধনিক শ্রেণির সুযোগসন্ধানীরা। এরা চরিত্রগতভাবে দুমুখো, সুবিধাবাদী ও দোদুল্যমান। ২৫ মার্চের আগে এরা স্বাধীনতার বড় মিত্র ছিল। এরা ভেবেছিল অবাঙালি ও পাকিস্তানিরা বিতাড়িত হলে পুঁজির বিকাশ ও চাকরিসহ সর্বক্ষেত্রে তারা সুবিধা পাবে। ২৫ মার্চের পর যখন মুক্তিযুদ্ধের সূচনা হল তখন রাতারাতি তারা হয়ে উঠলেন পাকিস্তান-পছন্দ। পাকসেনাদের পথ দেখানো আর সাহস যোগানো তাদের একান্ত কর্তব্য হয়ে উঠল। স্বাধীনতার পর এরা আবার দেশপ্রেমিক হলেন। আজ জনগণের চরম দুর্যোগের ক্ষণে বিদ্বেষ ও ঘৃণা সৃষ্টির অপচেষ্টা হয়ে দাঁড়িয়েছে তাদের একমাত্র কর্তব্য।”
এমন প্রেক্ষাপটে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তি এক চেতনায় থাকতে পারেনি। স্বাধীনতাপূর্ব সময়ে বঙ্গবন্ধুর তত্ত্বাবধানে ছাত্রলীগের যে প্রগতিশীল অংশ স্বাধীন সমাজতান্ত্রিক বাংলাদেশ অর্জনের লক্ষ্যে কাজ করেছে, তারাই বাংলাদেশে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে একটি ‘বিপ্লবী জাতীয় সরকার’ প্রতিষ্ঠার আহ্বান জানায়। দুর্ভাগ্যজনক সত্য হল, বঙ্গবন্ধু তাদের প্রতি আস্থা স্থাপন না করে ছাত্রলীগের সেই অংশ বেছে নিলেন যারা সমাজতন্ত্র তো নয়ই, এমনকি স্বাধীনতার বদলে আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসন লাভ সঠিক বলে মনে করত।
সামাজিক বিপ্লব ও শ্রেণিসংগ্রামের ডাক দিয়ে জাসদের আত্মপ্রকাশ ঘটেছিল। শুরুতে ছাত্রলীগের ভাঙ্গনের মধ্য দিয়ে এই প্রক্রিয়া শুরু হলেও দ্রুতই শ্রমিক লীগের মূল অংশ এবং গোটাগুটি কৃষক লীগ এই ধারায় যোগ দেয়। মূল আওয়ামী লীগ থেকে খুব সামান্যই জাসদে যোগ দিয়েছিলেন।
জাসদের চোখে সমাজ-বিশ্লেষণের রূপটি সংক্ষেপে বলব। প্রখ্যাত অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক আখলাকুর রহমান যিনি আমেরিকার ম্যাসাচুসেটস ইন্সটিটিউট অফ টেকনোলজি (এমএইটি) থেকে পিএইচডি ডিগ্রি লাভ করেছিলেন, পাকিস্তানের পরিকল্পনা কমিশনে দীর্ঘদিন কাজ করেছেন, তিনি ১৯৭২ সালে ‘বাংলাদেশের কৃষিতে ধনতন্ত্রের প্রবেশ’ শীর্ষক তাঁর গবেষণা প্রবন্ধে দেখান কীভাবে বাংলাদেশের প্রধান অর্থ খাত কৃষিতে বাজার অর্থনীতি বা পুঁজিবাদ মুখ্য হয়ে উঠেছে। তার উপর ভিত্তি করে বাংলাদেশে বিপ্লবের স্তর সমাজতান্ত্রিক বলে তিনি মত দেন।
উল্লেখ করা হয়েছে বাংলাদেশে বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক বিপ্লবের ধাপটি প্রধানত সম্পন্ন হয়েছিল, যদিও সামন্তবাদ এবং ঔপনিবেশিক আমলের নানা অবশেষ সমাজ ও রাষ্ট্রে অবস্থান করছিল। জাসদ গঠন-প্রক্রিয়ায় নিয়োজিত তাত্ত্বিকগণ ড. আখলাকুর রহমানের সমাজ-বিশ্লেষণ ও বিপ্লবের স্তর গ্রহণ করেন। তার ভিত্তিতে একটি শ্রমিক-সৈনিক-কৃষকের গণঅভ্যুত্থানের রণনীতি জাসদ গ্রহণ করে। এক অর্থে, বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে রাশিয়ার নভেম্বর বিপ্লবের মডেল অনুযায়ী পার্টি সংগঠন গড়ে তোলায় মনোনিবেশ করে জাসদ।
দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশ ছাড়া একমাত্র শ্রীলংকায় ‘জনতা বিমুক্তি পেরামুনা’ দলটি এমন অভ্যুত্থানমূলক রণনীতি গ্রহণ করেছিল এবং ১৯৭১ ও ১৯৮৮-৮৯ সালে তার প্রয়োগও ঘটিয়েছিল।
বিপ্লবী গণঅভ্যুত্থানের লক্ষ্য সামনে রেখে জাসদের উদ্যোগে কলকারখানা শ্রমিক, গ্রামের ক্ষেতমজুর এবং গরিব কৃষক, অফিস-আদালতে শ্রমিক-কর্মচারী ও সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরে পার্টি সংগঠন গড়ে তোলার কাজ শুরু হয়। একই সঙ্গে গণসংগঠন হিসেবে জাসদ সমাজতন্ত্রের শ্লোগান বাংলাদেশের বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর কাছে পৌঁছে দেওয়ার জন্য আন্দোলন-সংগ্রামে নামে।
একই লক্ষ্যে জাসদ দলীয় প্রতীক মশাল নিয়ে ১৯৭৩ সালের সংসদ নির্বাচনে অংশ নেয় এবং অধিকাংশ আসনে প্রার্থী দেয়। দ্রুতই সারা বাংলাদেশে একটি বিকল্প রাজনৈতিক দল হিসেবে জাসদ মানুষের মনে জায়গা করে নেয়। কিন্তু রাজনৈতিক আন্দোলন ও সংগঠন পরিচালনায় জাসদ গণতান্ত্রিক বাত্যাবরণ বেশি দিন পায়নি।
১৯৭৪ সালের ২৮ ডিসেম্বর সংবিধানে উল্লিখিত নাগরিকদের বেশ কিছু মৌলিক অধিকার (অনুচ্ছেদ ২৭, ৩১, ৩৩, ৩৫, ৩৬, ৩৭, ৩৮, ৩৯, ৪০, ৪২ এবং ৪৩) অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত করে দেশব্যাপী জরুরি অবস্থা ঘোষণা করা হয়। এরপর ১৯৭৫ সালের ২৫ জানুয়ারি আওয়ামী লীগ, ন্যাপ ও বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টিকে একীভূত করে একদলীয় বাংলাদেশ কৃষক-শ্রমিক আওয়ামী লীগ বা বাকশাল শাসন কায়েম করা হয়।
এমন পরিস্থিতিতে জাসদকে আত্মগোপনে থেকে রাজনৈতিক কার্যক্রম চালাতে হয়। রক্ষীবাহিনীর আক্রমণ মোকাবেলা করতে গড়ে তুলতে হয় বিপ্লবী গণবাহিনী। জরুরি অবস্থা ও বাকশাল শাসন কায়েম হওয়ার কারণে একদিকে যেমন বাকশাল অনেকটাই জনবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে, তেমনি জাসদও উন্মুক্ত রাজনীতি চর্চা না করতে পেরে অনেকাংশে তার গণভিত্তি হারাতে থাকে। এমন অবস্থায় লাভবান হয় ষড়যন্ত্রকারী শক্তি।
১৯৭৫ সালের ২৬ মার্চ সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের জনসভায় বঙ্গবন্ধু বাকশাল ব্যবস্থার যে লক্ষ্য ও রূপরেখা উপস্থাপন করেছিলেন, তা বাস্তবায়িত হতে পারলে ব্রিটিশ ও পাকিস্তানি ঔপনিবেশিক শাসনের ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশে বিদ্যমান রাষ্ট্রের স্থলে স্বাধীন দেশের উপযোগী বিকল্প রাজনৈতিক শাসন গড়ে উঠতে পারত।
আমরা স্মরণ করব, স্বাধীনতালাভের অব্যবহিত পরেই তেমন একটি ব্যবস্থা কায়েমের দাবি করেছিলেন মুক্তিযুদ্ধে সবচেয়ে অগ্রগামী ও বঙ্গবন্ধুর আস্থাভাজন তরুণ নেতৃত্ব। কয়েক শত বছরে গেড়ে বসা ঔপনিবেশিক শাসনের কঠিন নিগড় ভেঙে দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের উপযোগী রাষ্ট্রব্যবস্থা কায়েমের যথার্থ সময় ছিল তখন। কারণ মুক্তিযুদ্ধে জয়ী জনগণের স্বপ্ন, আকাঙ্ক্ষা ও সাহস তখন ছিল আকাশচুম্বী। সশরীরে না থাকলেও বঙ্গবন্ধুর নামেই মুক্তিযুদ্ধ করেছে মানুষ, অকাতরে জীবন দিয়েছে তাঁর নাম উচ্চারণ করেই। একমাত্র বঙ্গবন্ধুর পক্ষেই সম্ভব ছিল পাকিস্তান রাষ্ট্রযন্ত্রটি গুঁড়িয়ে দিয়ে মুক্তিযুদ্ধে জেগে ওঠা বিপুল শক্তি দিয়ে নতুন রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে তোলা– তার সেনাবাহিনী ও প্রশাসন ব্যবস্থা গড়ে তোলা।
কিন্তু সময়ের কাজ সময়ে না করার ফলে একদিকে সাধারণ মানুষ হতাশাগ্রস্ত হয়েছে, অন্যদিকে মুক্তিযুদ্ধের পরাজিত শক্তি বিদ্যমান রাষ্ট্রের সেনাবাহিনী, আমলাতন্ত্র, বিচার ব্যবস্থাসহ সমাজের গুরুত্বপূর্ণ সকল শাখায় নিজেদের সংগঠিত করেছে, ষড়যন্ত্র করেছে। মুক্তিযুদ্ধের অগ্রগামী অংশ যারা সেই ষাটের দশক থেকে বঙ্গবন্ধুর বিশ্বস্ত সহচর হিসেবে স্বাধীনতা ও মুক্তিসংগ্রাম ফলবতী করতে নিরবচ্ছিন্নভাবে কাজ করে গেছেন, স্বাধীনতার পরপর বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে বিপ্লবী জাতীয় সরকারের সঠিক দাবিটি উত্থাপন করেছেন– জাসদ গঠন করে তাদেরই নেমে পড়তে হয় বঙ্গবন্ধুবিরোধী অবস্থানে।
অবশ্য যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশে সিরাজুল আলম খানের দিকনির্দেশনায় মুক্তিযুদ্ধের পরীক্ষিত শক্তির এত দ্রুত বঙ্গবন্ধুবিরোধী অবস্থান গ্রহণ সময়ের বিচারে সঠিক ছিল কিনা তা নিয়েও সঙ্গত প্রশ্ন আছে। তবে জাসদ নামে আবির্ভূত মুক্তিযুদ্ধের তারুণ্যমণ্ডিত রাজনৈতিক শক্তিকে একটি কার্যকর বিরোধী দল হিসেবে গড়ে উঠতে দিলে রাজনৈতিক শূন্যতায় নিমজ্জিত হত না বাংলাদেশ। ষড়যন্ত্রকারীরা শূন্যস্থান পূরণে সমর্থ হত না।
১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট খোদ আওয়ামী লীগ এবং রাষ্ট্রযন্ত্রের সকল শাখা বিশেষ করে সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরে সংগঠিত ষড়যন্ত্রকারীরা সপরিবারে বঙ্গবন্ধু ও তাঁর ঘনিষ্ঠ আত্মীয়-পরিজনদের নির্মমভাবে হত্যা করে। বঙ্গবন্ধুর অত্যন্ত বিশ্বস্ত খোন্দকার মোশতাক ষড়যন্ত্রের মূল হোতা হলেও আওয়ামী লীগের অনেক কেন্দ্রীয় নেতা খুনি মোশতাকের সঙ্গে হাত মিলিয়েছিলেন। ব্যতিক্রম ছিলেন চার জাতীয় নেতা যাদের কারাগারে বন্দি অবস্থায় নিহত হতে হয়েছিল মোশতাকের নির্দেশে তার ঘাতক বাহিনীর হাতে।
স্মর্তব্য, জাসদের কেউ মোশতাকের সঙ্গে হাত মেলায়নি, বরং তার বিরুদ্ধে রাজনৈতিক অবস্থান নেওয়ার কারণে কঠিন নিপীড়নের সম্মুখীন হন।
জাতির জনকের নারকীয় হত্যাকাণ্ডে এক গভীর বেদনায় জাতি মুহ্যমান হয়েছিল। কিন্তু এর বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক কোনো প্রতিরোধ রচনা করতে পারেনি আওয়ামী লীগ বা তার সহযোগী সংগঠনগুলো। এতে স্পষ্ট বোঝা যায়, স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্বদানকারী দলটি রাজনৈতিক আদর্শের জায়গায় কেমন অন্তসারশূন্য হয়ে পড়েছিল। বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ড এবং মুক্তিযুদ্ধবিরোধী শক্তির উত্থানের ক্ষেত্র প্রস্তুত করেছে জাসদ ও কর্নেল তাহের-– আওয়ামী লীগ ও তাদের সমর্থক সুশীল সমাজের এমন অভিমত দেওয়ার পূর্বে স্বাধীনতালাভের ঊষালগ্ন থেকে আওয়ামী লীগের আপন অবস্থান ও সে কারণে গণবিচ্ছিন্নতা বিষয়ে তাদের ভাবা উচিৎ।
এবার বাংলাদেশে ৭ নভেম্বর সিপাহী-জনতার অভ্যুত্থান ও রাশিয়ার ৭ নভেম্বর শ্রমিক-সৈনিকদের অভ্যুত্থানের সঙ্গে তার তুলনামূলক চিত্রটি তুলে ধরার চেষ্টা করব।
গণঅভ্যুত্থানমুলক রণনীতি বাস্তবায়নের লক্ষ্য নিয়ে জাসদ সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরে বিপ্লবী সৈনিক সংস্থা গড়ে তোলার উদ্যোগ নেয়। আমরা দেখেছি, রাশিয়ায় ১৯১৭ সালে জারতন্ত্রের পতনের পর সেনা গ্যারিসনসমূহের অভ্যন্তরে সৈনিকেরা রাজনীতি চর্চা এবং তাদের প্রতিনিধি নির্বাচন করে সৈনিক সোভিয়েত গড়ে তোলার অধিকার পেয়েছিল। কিন্তু বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে তাদের সে অধিকার ছিল না। এমন অধিকার দিলে সেনা-শৃঙ্খলা বিঘ্নিত হবে, এমনটাই প্রচলিত ধারণা ছিল।
বাস্তবে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে সিপাহী নয়, সেনা-অফিসাররা একের পর এক ক্যু-দেতা এবং শৃঙ্খলাভঙ্গের ঘটনা ঘটিয়েছে। তারা সপরিবারে জাতির জনকের হত্যাকাণ্ডসহ পরবর্তীতে আরও হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে। এসব রাষ্ট্রবিরোধী কাজে সাধারণ সিপাহীদের তারা কামানের খোরাক হিসেবে ব্যবহার করেছে। রাশিয়ায় যেখানে বলশেভিক ও অন্যান্য বিপ্লবী রাজনৈতিক দল আইনি কাঠামোর ভেতরে থেকেই সৈনিক সোভিয়েত গড়ে তুলতে পেরেছে, সেখানে জাসদকে কাজ করতে হয়েছে গোপনে।
কর্নেল তাহের বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে তাঁর স্বল্পকালীন চাকুরিকালে প্রথমে সেনা সদর দপ্তরে অ্যাডজ্যুটেন্ট জেনারেল ও পরে কুমিল্লা সেনানিবাসে ৪৪ ব্রিগেডের অধিনায়ক হিসেবে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর মতো ব্যারাক আর্মির স্থলে উৎপাদনশীল গণবাহিনীর আদলে সেনাবাহিনী গড়ে তোলায় আত্মনিয়োগ করেন। এ কাজে তিনি অন্যান্য শীর্ষ সেনানায়কদের সহযোগিতা পাননি।
গভীর পরিতাপের কথা, যেখানে বঙ্গবন্ধু নিজেই গণবিচ্ছিন্ন পাকিস্তান সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে দীর্ঘ সংগ্রাম করেছেন, নিজের জীবন বিপন্ন হয়েছে এমন সেনাবাহিনীর হাতে, সেখানে যুদ্ধাহত তাহের যিনি বঙ্গবন্ধুকে সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরে ষড়যন্ত্র সম্পর্কে সাবধান করেছেন, তাঁকে আস্থায় না নিয়ে ষড়যন্ত্রকারী চাটুকারদের শীর্ষ পদে বহাল রেখেছেন বঙ্গবন্ধু।
এখন জানা গেছে এরা সবাই বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের ষড়যন্ত্র সম্পর্কে অবহিত থাকলেও তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেননি। মুক্তিযুদ্ধবিরোধী ষড়যন্ত্র থেকে দেশকে রক্ষা করা এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বাস্তবায়নের আইনি অধিকার না থাকায় জাসদ ও তাহেরকে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে তথাকথিত ‘বেআইনি’ পন্থায় বিপ্লব সাধনের পথে এগিয়ে যেতে হয়। এ ক্ষেত্রে লেনিনের বলশেভিক পার্টি যত সহজে ও ব্যাপকভাবে সৈনিক সোভিয়েত গড়ে তুলতে পেরেছিল, বাংলাদেশে জাসদের পক্ষে তা সম্ভব হয়নি। জাসদের ধারণায় ছিল ১৯৭৬ সালের মাঝামাঝি সময়ে গণঅভ্যুত্থানের মাহেন্দ্রক্ষণটি উপস্থিত হবে।
বাস্তবে তার প্রায় এক বছর আগে বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের মধ্য দিয়ে সময়ের আগে অভ্যুত্থান সংগঠনের বিশাল দায়িত্ব জাসদের কাঁধে এসে পড়ে। আমরা দেখেছি রাশিয়ায় জেনারেল কর্নিলভের ক্যু-দেতা পরাস্থ করার পরে পেট্রোগ্রাড ও মস্কো সেনা হেডকোয়ার্টারে সৈনিক প্রতিনিধি সোভিয়েতে বলশেভিক সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জিত হয়। একই সঙ্গে রুটি, জমি ও শান্তি অর্জনের জন্য অন্তর্বর্তীকালীন বুর্জোয়া সরকারের হাত থেকে সোভিয়েতের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তরের বলশেভিক দাবি বিপুল জনপ্রিয়তা লাভ করে এবং স্বতস্ফূর্তভাবে সারা রাশিয়ায় সোভিয়েত গড়ে উঠে। এমন প্রেক্ষাপটে বলশেভিক অভ্যুত্থান সংগঠিত হয় ও তা জয়লাভ করে।
বিপ্লবের পূর্বশর্ত হচ্ছে শ্রমিক শ্রেণির সুসংগঠিত অগ্রবর্তী রাজনৈতিক দল। রাশিয়ায় সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব সংগঠনের জন্য লেনিনের নেতৃত্বে বলশেভিক পার্টি তেমন অগ্রবর্তী দল হিসেবে অবস্থান করছিল। ১৯০৫ সালে জারতন্ত্রের বিরুদ্ধে সূচিত বিপ্লব যা পরাজিত হয়েছিল তাকে ভবিষ্যৎ সমাজ বিপ্লবের ড্রেস রিহার্সেল হিসেবে উল্লেখ করেছিলেন লেনিন। ১২ বছর ধরে এই বিপ্লব থেকে শিক্ষা নিয়ে রাজনৈতিক ও সাংগঠনিকভাবে প্রস্তুতি নিয়েছিল বলশেভিক পার্টি।
বাংলাদেশে যেখানে তেমন পার্টির ভ্রুণই সৃষ্টি হয়নি সেখানে মতের অমিল সত্ত্বেও বাংলাদেশে এত তড়িঘড়ি বঙ্গবন্ধুর সরাসরি বিরুদ্ধাচরণে গিয়ে জাসদের আত্মপ্রকাশ না ঘটিয়ে তাঁর সঙ্গে অবস্থান করেই আদর্শগত লড়াই চালিয়ে যাওয়া হয়তো রাজনৈতিক প্রজ্ঞা ও বিবেচনাপ্রসূত সিদ্ধান্ত হত। সিরাজুল আলম খান এ ক্ষেত্রে হয়তো ভুলই করেছেন। তবে সে সময়কার মুক্তিযুদ্ধ-ফেরত তরুণ বিপ্লবীদের চেতনা ও আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন হয়তো ঘতেছিল তার মধ্য দিয়ে।
বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ রাষ্ট্রটি একটি তরল অবস্থায় পতিত হয়েছিল। রাষ্ট্রের শক্তিশালী স্তম্ভ সেনাবাহিনীতে ক্যু পাল্টা-ক্যুর ফলে বুর্জোয়া শ্রেণি বিশৃঙ্খল ও বিপর্যস্ত অবস্থায় পতিত হয়। ৩ নভেম্বর ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফের নেতৃত্বে ক্যু-দেতা সৈনিকদের বিভিন্ন অংশকে মুখোমুখি অবস্থানে দাড় করিয়ে দেয়। তারা বিদ্রোহী হয়ে ওঠে। বিপ্লবী সৈনিক সংস্থা জাসদের সঙ্গে যোগাযোগ করে। যে অভ্যুত্থানের কথা এতদিন তারা শুনে এসেছে তা দ্বারে কড়া নাড়ছে, এমনটাই মনে করে তারা। গণঅভ্যুত্থানে জাসদের কাছে নেতৃত্ব চায় তারা। এমন পরিস্থতিতে বিপ্লবী পার্টির তড়িৎ এবং যথার্থ রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ ছিল জরুরি। দেশে জরুরি অবস্থা, অধিকাংশ নেতা-কর্মী কারাগারে, সাংগঠনিক যোগাযোগ দুর্বল।
এমন অবস্থায়ও ঢাকায় অবস্থানকারী সিরাজুল আলম খান, কর্নেল তাহের, হাসানুল হক ইনু, ড. আখলাকুর রহমান ও অন্যান্য শীর্ষ নেতৃবৃন্দ ৪ নভেম্বর থেকে ৬ নভেম্বর সন্ধ্যা পর্যন্ত একের পর এক সভা ও পরিস্থতির পর্যালোচনা করেন। শেষ পর্যন্ত ৭ নভেম্বর রাতে কর্নেল তাহেরের নেতৃত্বে সিপাহী-জনতার অভ্যুত্থানের রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। যদিও প্রথমে স্থির হয়েছিল সেনাবাহিনীতে প্রাসাদ ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে ৯ নভেম্বর জাসদের আহবানে হরতাল পালিত হবে। তাকে কেন্দ্র করে রাস্তায় থাকবে শ্রমিক-ছাত্র-জনতা। তার সঙ্গে সমন্বয় করে অভ্যুত্থানের যথার্থ ক্ষণটি নির্ধারণ করা হবে। কিন্তু তার আগেই ঢাকা ক্যান্টনমেন্টে সাধারণ সিপাহীদের মধ্যে বিস্ফোরন্মুখ অবস্থা সৃষ্টি হওয়ায় অভ্যুত্থানের তারিখটি এগিয়ে ৭ নভেম্বর স্থির হয়।
তাহেরের নেতৃত্বে অভ্যুত্থানের মূল লক্ষ্যসমূহ অর্জিত হয়েছিল। তবে বন্দি জিয়াউর রহমানকে মুক্ত করতে পারলেও তাকে ক্যান্টনমেন্টের বাইরে তাহেরের কাছে নিয়ে আসতে ব্যর্থ হয় দায়িত্বপ্রাপ্ত সিপাহী ইউনিটটি। মুক্ত জিয়ার বাকচাতুর্যে বিভ্রান্ত হয়েছিল সিপাহীরা। এই ত্রুটি অভ্যুত্থানে বিশাল বিপর্যয়ের কারণ হয়ে দেখা দিয়েছিল। ক্যান্টনমেন্টে মুক্ত জিয়া দ্রুত দক্ষিনপন্থী সেনা-অফিসারদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে সমর্থ হন।
দ্বিতীয় মহাবিপর্যয়টি ছিল পরিকল্পনা অনুযায়ী জাসদের পক্ষ থেকে ঢাকার রাস্তায় সংগঠিত শ্রমিক ও ছাত্রদের সমাবেশ ঘটাতে ব্যর্থতা। বিপ্লবী সৈনিক সংস্থার অভ্যুত্থানী সিপাহীরা অস্ত্রসহ সেনানিবাস ছেড়ে এলেও অস্ত্রসজ্জিত করার মতো শ্রমিক ও ছাত্রদের তারা পায়নি। তাই সিপাহী-জনতার অভ্যুত্থান হয়ে উঠতে পারেনি ৭ নভেম্বর অভ্যুত্থান। অভ্যুত্থানী সিপাহীদের দায়িত্বপ্রাপ্ত একটি দল ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের ফটক খুলে দিলেও কয়েক হাজার রাজবন্দি নেতার সিদ্ধান্তহীনতায় কারাগার থেকে বেরিয়ে আসেনি। বেতারে অভ্যুত্থানের ঘোষণা প্রচার করতে পারলেও তা যে জাসদের সিদ্ধান্তে কর্নেল তাহেরের নেতৃত্বে সূচিত হয়েছে তা-ও প্রচারিত হয়নি। জনগণ থকে যায় অন্ধকারে।
এসবই ছিল জাসদ নেতৃত্বের গুরুতর ভুল। অভ্যুত্থান বা বিপ্লব ছেলেখেলা নয়। একবার সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর তা বাস্তবায়নে দোদুল্যমানতা কী ভয়াবহ বিপর্যয় ডেকে আনে তাই দেখা গেছে ৭ নভেম্বরের অভ্যুত্থানে। জিয়াউর রহমান কর্তৃক অভ্যুত্থানের নেতা তাহের ও অসংখ্য সিপাহীর ফাঁসি এবং জাসদের শীর্ষনেতাদের দীর্ঘমেয়াদী সাজা প্রদানের মধ্য দিয়ে প্রতিবিপ্লবী জিয়াউর রহমান ক্ষমতা পাকাপোক্ত করেন। বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধবিরোধী স্বৈরশাসকদের দীর্ঘমেয়াদী শাসনে নিপতিত হয়।
জাসদের উদ্ভব, রণনীতি, আন্দোলন-সংগঠন এবং ৭ নভেম্বর অভ্যুত্থান পরিকল্পনা ও তার প্রয়োগ ইত্যাদি পর্যালোচনা করে যে সকল ভুলের কারণে বাংলাদেশে ৭ নভেম্বর অভ্যুত্থান জয়ী হতে পারেনি আমার বিবেচনায় তার সারসংক্ষেপ এবারে তুলে ধরব।
সমাজবিপ্লবের মাধ্যমে বাংলাদেশে একটি সাম্য ও ন্যায়ভিত্তিক সমাজ গড়ার ক্ষেত্রে জাসদ মস্কো বা পিকিংপন্থা নয়, বরং বাংলাদেশের ‘বাস্তব অবস্থার বাস্তব বিশ্লেষণকে’ মার্কসবাদের যথার্থ প্রয়োগ বলে বিবেচনা করেছে। এই রাজনৈতিক বিবেচনা ছিল জাসদের মৌলিক শক্তি।
সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব সাধনের জন্য প্রয়োজন মার্কসবাদী চিন্তায় সুসজ্জিত শ্রমিক শ্রেণির অগ্রবর্তী পার্টি। জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল সে ধরনের পার্টি ছিল না। কিন্তু আন্দোলন-সংগ্রামের মধ্য দিয়ে এই গণভিত্তিক দলের অভ্যন্তরে একটি বিপ্লবী পার্টি গড়ে তোলার চিন্তা ছিল জাসদ নেতৃত্বের। সে লক্ষ্যে মার্কস-অ্যাঙ্গেলস-লেনিন-মাওসেতুংএর মৌলিক রচনা ছাড়াও বাংলাদেশসহ বিদেশি সাহিত্য পাঠের জন্য পার্টির বিভিন্ন স্তরে পাঠচক্র ও পার্টি সেল গড়ে তোলার প্রক্রিয়া শুরু করা হয়। দলের তাত্ত্বিক মুখপত্র হিসেবে ‘সাম্যবাদ’ ও আন্দোলন-সংগ্রামের খবর প্রচারের জন্য ‘লড়াই’ বের করা হয়। ‘দৈনিক গণকণ্ঠ’ ছিল জাসদের নিজস্ব দৈনিক। এ সবই ছিল ইতিবাচক ও বিপ্লবী। কিন্তু উন্মুক্ত রাজনীতির সুযোগ একে একে বন্ধ হয়ে যাওয়ায় জাসদের বিপ্লবী পার্টি গঠনের কাজ খুবই সীমিত হয়ে পড়ে।সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব সাধনের জন্য প্রয়োজন মার্কসবাদী চিন্তায় সুসজ্জিত শ্রমিক শ্রেণির অগ্রবর্তী পার্টি
দুটো ক্ষেত্রে জাসদ বড় ভুল করেছে। সময়ের আগে রাজনৈতিক দল হিসেবে আত্মপ্রকাশ এবং সময়ের আগে গণঅভ্যুত্থান করতে যাওয়া। যখন অভ্যুত্থান সংগঠনের বিশাল দায়িত্ব সময়ের আগেই জাসদের স্কন্ধে অর্পিত হয়, তখন তা পালনে এক অর্থে জাসদ অপারগ হয়। বিপ্লবী গণঅভ্যুত্থান একটি বিশাল কর্মযজ্ঞ। মুষ্টিবদ্ধ পাঁচটি আঙুল সমন্বিতভাবে খুলতে ও বন্ধ করতে হয় এ সময়। জাসদ তা করতে পারেনি।
বিপ্লবের মূল চালিকাশক্তি রাজনীতি সচেতন শ্রমিক ও ক্ষেতমজুর-গরিব কৃষকদের ব্যাপক বিস্তৃত সংগঠন। শিক্ষিত মধ্যবিত্ত শ্রেণির মধ্যে জাসদের ভালো অবস্থান থাকলেও শ্রমিক-কৃষক-মেহনতি জনতার মধ্যে শক্তিশালী সংগঠন গড়ে তুলতে পারেনি জাসদ। ৭ নভেম্বরের অভ্যুত্থানে তা প্রকটভাবে ধরা পড়ে।
অভ্যুত্থান পরিকল্পনায় শত্রু-মিত্র চিহ্নিত করতে হয় সঠিকভাবে। কাছের ও দূরের মিত্রদের সঙ্গে ঐক্যের বিবেচনাটি রাখতে হয়। ক্রমাগত সমন্বয় সাধন করতে হয় সে ঐক্যে। এ কাজে জাসদ পারঙ্গমতা প্রদর্শন করতে পারেনি।
বিপ্লবী গণঅভ্যুত্থযা গোপন বিষয় নয়, তাকে জনগণের সামনে ব্যাপকভাবে উন্মুক্ত করতে হয়, জনগণকে সম্পৃক্ত করতে হয়। ৭ নভেম্বরে জাসদ জনগণ, এমনকি দলকেও অভ্যুত্থানের সঙ্গে সম্পৃক্ত করতে পারেনি।
প্রতিবিপ্লবের কাছে ৭ নভেম্বর সিপাহী-জনতার অভ্যুত্থানের পরাজয়ের মৌলিক কারণগুলো আমার একান্ত নিজস্ব বিবেচনা। এসবের দায়ভাগ সম্মিলিতভাবে আমাদের সকলের যারা মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী বাংলাদেশে সমাজবদলের দুরুহ লড়াইয়ে অবতীর্ণ হয়েছিলাম। নতুন প্রজন্ম আমাদের ভুলগুলো থেকে শিক্ষা নিয়ে বর্তমান বাস্তবতায় তাদের বিপ্লবী করণীয় নিজেরাই নির্ধারণ করবে এই আস্থা ও বিশ্বাস স্থাপন করছি অক্টোবর সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের শতবর্ষপূর্তিতে।

Close