মহানগরশিরোনাম-২

তামাক কোম্পানিতে সরকারের শেয়ার প্রত্যাহারের জোর দাবি রাজশাহীবাসীর

নিজস্ব প্রতিবেদক: প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২০৪০ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে ধূমপানমুক্ত দেশ হিসেবে গড়ার পরিকল্পনার কথা বলেছেন। ইতোমধ্যেই তিনি পরিকল্পনা অনুযায়ী তামাক নিয়ন্ত্রণে বেশ কিছু উদ্যোগও নিয়েছেন। কিন্তু সরকারের বিভিন্ন দপ্তরের হাতে একটি বহুজাতিক তামাক কোম্পানির ৯ দশমিক ৪৮ শতাংশ শেয়ার রয়েছে। এটি অব্যাহত থাকলে প্রধানমন্ত্রীর ধূমপানমুক্ত দেশ গড়ার স্বপ্ন পূরণে বাধার সৃষ্টি হবে বলে মনে করছেন রাজশাহীর বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ। তারা বাংলাদেশে তামাকের উৎপাদন বন্ধসহ তামাকের বহুজাতিক কোম্পানির ব্যবসায় সরকারের শেয়ার প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছেন।
‘তামাক কোম্পানির হস্তক্ষেপ সূচক বাংলাদেশ ২০১৯’ এর আলোকে ‘ফ্রেমওয়ার্ক কনভেনশন অন টোব্যাকো কন্ট্রোল-এফসিটিসি’ আর্টিকেল ৫.৩ বাস্তবায়ন প্রতিবেদন অনুযায়ী- এবার বাংলাদেশের স্কোর ৭৭, যা গতবার ছিল ৭৮। এক ধাপ এগোলেও তা সন্তোষজনক নয়। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, বিশ্বের ৩৩টি দেশের মধ্যে যে ৩টি দেশে তামাক কোম্পানির হস্তক্ষেপ সবচেয়ে বেশি, বাংলাদেশ তার মধ্যে একটি। বাংলাদেশের চেয়ে খারাপ অবস্থানে রয়েছে মাত্র জাপান ও জর্ডান।
আর এই হস্তক্ষেপের মূল কারণ হলো- তামাক কোম্পানিতে সরকারের শেয়ার এবং তামাক কোম্পানির পরিচালনা পর্ষদে সরকারের উচ্চপদস্থ কয়েকজনের অবস্থান। তামাক কোম্পানিতে সরকারের অংশীদারিত্বের সুযোগে কোম্পানিগুলোর জন্য তামাক নিয়ন্ত্রণের পদক্ষেপে হস্তক্ষেপ করা সহজ হয়েছে। এতে জনস্বাস্থ্য ক্ষতির মুখে পড়ছে। এক জরীপ অনুযায়ী, দেশে তামাকজনিত রোগে বছরে ১ লাখ ৬১ হাজার মানুষের অকাল মৃত্যু হচ্ছে। তামাক ব্যবহারজনিত মৃত্যু ও অসুস্থতায় বছরে ৩০ হাজার ৫৬০ কোটি টাকার আর্থিক ক্ষতি হয়, যা তামাকখাত থেকে অর্জিত রাজস্ব আয়ের চেয়ে অনেক বেশি। সরকার বিভিন্ন ইস্যূর পাশাপাশি তামাক ইস্যূটিকে অধিক গুরুত্ব দিয়ে দেশের লাখ লাখ মানুষের অকাল মৃত্যু রোধ এবং কোটি কোটি টাকার আর্থিক ক্ষতি লাঘবে কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করুক- এমনটাই দাবি রাজশাহীর বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের মাস্টারের শিক্ষার্থী আব্দুর রাজ্জাক শিশির বলেন, ‘২০৪০ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে তামাকমুক্ত ঘোষণা করতে চাইলে অবশ্যই তামাক কোম্পানিতে সরকারের যে শেয়ার রয়েছে সেটি দ্রæততম সময়ের মধ্যে প্রত্যাহার করে নেয়া উচিত। পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে তামাকের চাষ হয় সেটি আইন করে বন্ধ করতে হবে।’
আইনজীবী নাজিম উদ্দিন বলেন, ‘তামাক কোম্পানিতে সরকারের শেয়ার তো রয়েছে সেটি একটি দিক। তাছাড়া সরকারের তামাক নিয়ন্ত্রণের জন্য একটি আইন রয়েছে সেই আইনটি বাস্তবায়নেও সরকারি উদ্যোগ অপ্রতুল। তামাক কোম্পানিতে সরকারি শেয়ার প্রত্যাহারের পাশাপাশি তামাক নিয়ন্ত্রণ আইন বাস্তবায়নে সরকারকে গুরুত্ব দেয়া উচিত।’
রাজশাহী রক্ষা সংগ্রাম পরিষদের সাধারণ সম্পাদক জামাত খান বলেন, ‘তামাক কোম্পানিতে সরকারের শেয়ার থাকলে সরকার দেশকে কীভাবে তামাকমুক্ত করবে। তামাক নিয়ন্ত্রণ আইনে রয়েছে- পাবলিক প্লেসে ধূমপান করা যাবে না। কিন্তু সেটি দেদারছে চলছে। সরকারি কর্মকর্তা যারা এই তামাক নিয়ন্ত্রণ নিয়ে কাজ করছে তাদেরও কোনো উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে না। সবকিছু মিলেই আমরা কাছে মনে হচ্ছে এটি সরকারের ‘অনলি ফর আইওয়াশ’। তাই সরকার যদি সত্যিকার অর্থে তামাক নিয়ন্ত্রণ করতে চায় তাহলে দ্রæততম সময়ের মধ্যে তামাক কোম্পানিতে থাকা শেয়ার প্রত্যাহার করে নিক।’
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের সহকারি অধ্যাপক মামুন আব্দুল কাইউম বলেন, ‘অনেক ক্ষেত্রে আমাদের টার্গেট থাকে কিন্তু টার্গেট অনুযায়ী এগুতে পারি না। প্রধানমন্ত্রী ২০৪০ সালের কথা বলেছেন ২০৫০ সালেও যদি দেশ তামাকমুক্ত হয়, তারপরও আল্টিমেটলি আমাদের চাওয়া যেন পূরণ হয়। সরকার যেমন আইটি সেক্টরকে এখন খুব বেশি প্রাইয়োরিটি দিচ্ছে। তামাক নিয়ন্ত্রণেও যদি এমন প্রাধান্য দেয় তাহলে প্রধানমন্ত্রীর পরিকল্পনা বাস্তবায়নে সহজ হবে।’
উন্নয়ন ও মানবাধিকার সংস্থা ‘এ্যাসোসিয়েশন ফর কম্যুনিটি ডেভেলপমেন্ট-এসিডি’র তামাক নিয়ন্ত্রণ প্রকল্পের প্রোগ্রাম ম্যানেজার মো. শাহীনুর রহমান বলেন, ‘সরকার ইচ্ছা করলেই সবই সম্ভব। সরকারের তামাক খাতে রাজস্ব আয় হয় প্রায় ২২ হাজার কোটি টাকা। কিন্তু তামাক ব্যবহারজনিত অসুস্থতায় বছরে ব্যয় হয় প্রায় ৩০ হাজার কোটি টাকা। তামাকের কারণে একদিকে বছরে প্রায় ১ লাখ ৬১ মানুষের অকাল মৃত্যু হচ্ছে অন্যদিকে আবার বছরে এই খাতে দেশের প্রায় ৮ হাজার কোটি টাকার আর্থিক ক্ষতি হচ্ছে। তাই একটি তামাক কোম্পানিতে সরকারের যে শেয়ার রয়েছে সেটি প্রত্যাহারের পাশাপাশি বাংলাদেশকে ধূমপানমুক্ত একটি দেশ গড়ার প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নিবে এমনটাই আমাদের প্রত্যাশা।’বরেন্দ্র বার্তা/আহোশি/অপস

Close