শিরোনাম-২সাহিত্য ও সংস্কৃতি

পুরোনো দলিল

শরীফ আহমেদ

ব্রিটিশ ভারত ভেঙে পাকিস্তান হবে সবাই এমনটাই বলছে। আর পাকিস্তান হবে মুসলমানদের দেশ। তাই উচ্চবর্ণের হিন্দুরা প্রভাব ও প্রতিপত্তি খাটিয়ে পাকিস্তানে থাকতে পারলেও নিম্নবর্ণের হিন্দুদের পক্ষে আর সেখানে থাকা সম্ভব নয়। আমাদের গ্রামে তখন বেশ কিছু নিম্নবর্ণের হিন্দু পরিবার ছিলো। ওদের মধ্যে নবকুমাররা অন্যতম। তখন অন্য সব নিম্নবর্ণের হিন্দু পরিবারের মতো নবকুমাররাও ঠিক করলো পাকিস্তান হবার আগেই বসতবাড়ি বিক্রি করে কিশোরগঞ্জ শহরে চলে আসবে তাহলে এখান থেকে কলকাতা যাওয়া সহজ হবে। আর পাকিস্তান হবার পর গ্রাম ছেড়ে গেলে কোনও কিছু নিয়ে যাওয়া যাবে না। এক কাপড়ে প্রাণ হাতে করে পালাতে হবে। আবার পালানোর আগে বা পালাতে গিয়ে প্রাণ যেতেও পারে।
কিন্তু বসত বাড়ি বিক্রি করবে কার কাছে? নারায়ণরাও ছিলো ওদের মতো সে গ্রামের নিম্নবর্ণের আরেকটি হিন্দু পরিবার।নারায়ণরা গ্রামের কুলির বাপের কাছে জমি বিক্রি করেছে তিনমাস আগে। জমির অর্ধেক দাম দিয়ে তাদের কাছ থেকে কাবলা নিয়ে নিয়েছেকুলির বাপ। তারপর এখন নারায়ণদের ভয় দেখাচ্ছে বাকি টাকা চাইলে গ্রামে একদিনও থাকতে দিবে না আর গ্রাম না ছাড়লে প্রাণে মেরে ফেলবে।
নবকুমাররা সাবধান হলো ক্রেতা ঠিক করার ক্ষেত্রে। তারা ঠিক করলো মুসলমানের কাছে জমি বিক্রি করলেও এমন কারও কাছে বিক্রি করতে হবে যেন সে মুসলমান হলেও ভালো মানুষ হয়। এমন ভালো মানুষ কাউকে জমি দিতে হবে যেন নারায়ণদের মতো ঠকতে না হয়। তারা ঠিক করলো অলি ভাইয়ের কাছে জমি বিক্রি করবে। অলি ভাই মানে আমার বড় দাদা মানে আমার দাদাদের সাত ভাইয়ের মধ্যে সবার বড়।
একদিন রাতের আঁধারে নবকুমার আর তার ভাই রাজকুমার বড় দাদার কাছে এলো। অত্যন্ত নিম্নস্বরে দরজায় দাঁড়িয়ে ডাকলো, অলি ভাই, ও অলি ভাই।
বড় দাদা দরজা খোলে বলল, নবকুমার দাদা তোমরা এতো রাইতে? কোনও বিপদ আপদ অইছে না কি?
না ভাই। বিপদ ঠিক না। তোমার সাথে একটু কথা ছিলো। ঘরে আইতাম?
হে হে আইও ঘরে আইও।
নবকুমার আর রাজকুমার ঘরে প্রবেশ করলো। বড় দাদা চৌকির নিচ থেকে পিঁরি বের করে বসতে দিলেন ওদের। দুই ভাই পিঁরিতে বসলো। বড় দাদার ঘর আর সারা বাড়ি জুড়ে সবাই তখন কাঁচা ঘুমের আবর্তে জড় পদার্থ হয়ে আছে। শুধু এই বাড়ি নয় ঘুমাচ্ছে সারা গ্রামের সব বাড়ির সব মানুষ। নবকুমার আর রাজকুমার এখানে আসার সময় অনেক সন্তর্পণে এসেছে। নিজেদের পায়ের শব্দ আর চলন বলন গোপন না করলে মুসলমান বাড়িতে হিন্দুর আগমনের উদ্দেশ্য যে এখন বাড়ি বা জমি বিক্রি সেইসূত্রে সবাই তাদের আসার কারণ জেনে যাবে।
কিছুক্ষণ নীরব থেকে নবকুমার তার কথা শুরু করলো। অনেক কষ্টে নিচু খাদে নামানো কণ্ঠস্বরে ভরসার ছাপ ফুটিয়ে তোলে বললো, অলি ভাই, তুমি আমরার বসতবাড়িডা কিইন্যা রাখ। আমরা মনে হয় আর এই গ্রামে থাকতে পারতাম না।
বড় দাদা বললো, সত্য সত্য চইলা যাইবা নবকুমার দাদা?
হ্যাঁ অলি ভাই। তুমি বসত বাড়িডা রাখবা কও?
নবকুমার দাদা, আমি বাড়ি কিনতাম কেমনে, আমার কী টেকা পয়সা আছে? অতোগুলা মানুষের সংসার চালায়া টেকা পয়সা জমে কও?
টেহার চিন্তা পরে অইব আর দাম তোমার বিবেকে যা কয় তাই দিবা। শুধু কথা দেও বাড়ি তুমি রাখবা তাইলেই অইব। টেকার একটা জোগাড় অইব দেইখ্য? আমরা কিশোরগঞ্জ থাকবো। তুমি আস্তে আস্তে টেকা দিয়া দিও।
আইচ্ছা কইতাছ যহন তাইলে আমি ইমানআলীর সাথে পরামর্শ কইরা দেখি কী করন যায়।
তাইলে কথা দিতাছ অলি ভাই?
আইচ্ছা নবকুমার দাদা চিন্তা কইর না। আল্লাহ ভরসা।
ইমানআলী আমার নিজের দাদা। দাদাদের সাত ভাইয়ের মধ্যে আমার দাদা ছিলেন চতুর্থ। বড় দাদা তাদের যৌথ পরিবারের কর্তা হলেও আমার দাদা ছিলেন তার ভাইদের মধ্যে শিক্ষাদীক্ষার দিক দিয়ে সবার চেয়ে এগিয়ে তাই বড় দাদা তার সাথে পরামর্শ না করে কোনও পারিবারিক সিদ্ধান্ত নিতেন না।

তারপর বড়দাদা দাদার সাথে কথা বলে শেষ পর্যন্ত নবকুমারদের বাড়ি কেনার সিদ্ধান্ত নিলো। ঠিক হলো রাজকুমারদের গ্রাম ছেড়ে যাওয়ার দিন।একদিন মধ্যরাতে নবকুমার আর রাজকুমার তাদের পরিবার নিয়ে পিতৃপুুরুষের বসতি আর জন্ম থেকে দেখা চির পরিচিত গ্রাম ছেড়ে চিরকালের জন্য চলে গেলো।
দাদারা দিনটি এমনভাবে ঠিক করেছিলো যেন কুলির বাপ আর তার প্রধান সহযোগিরা সেদিন রাতে গ্রামে না থাকে। তারা থাকলে গ্রামের কোনও হিন্দু পরিবার নিজেদের সব আসবাবপত্র সাথে নিয়ে সুস্থ মন ও সুস্থ দেহে নিরাপদে গ্রাম ছেড়ে যেতে পারতো না। সব কেড়ে নেওয়া হতো তাদের কাছ থেকে। খুব বেশি হলে প্রাণটা নিয়ে যেতে পারতো।
সেরকম কিছু সমস্যা ওদের হয়নি গ্রাম ছেড়ে যেতে। কিছু হারাতে হয়নি। কারণকুলির বাপরা সেদিন ‘ভুষাখান্দা’ গিয়েছিলো নিজেদের জমির ধান কাটতে। আর সারাদিনের কাটা ধান পরের দিন বাড়ি আনার আগে রাতভর পাহারা দেওয়ার জন্য তারা সেখানে থেকে গিয়েছিলো। আর দাদা আর বড়দাদাসহ দাদাদের পাঁচ ভাই আড়ালে লুকিয়ে থেকেছিলো যখন নবকুমাররা বাড়ি ছেড়ে যায়। গ্রামের শেষ সীমা থেকে আরও দুই মাইল দূর পর্যন্ত মেজোদাদা আর ছোটদাদা নবকুমারদের পরিবারদের এগিয়ে দিয়ে এসেছিলো আর নবকুমাররা বাড়ি ছাড়ার সাথে সাথেই দাদা আর লোকমান দাদা ওদের বাড়ির দখল নিয়েছিলো। লোকমান দাদা আর মেজোদাদা পরের দিন থেকে নবকুমার আর নবকুমারদের বাড়িতে স্থায়ীভাবে থাকতে শুরু করেছিলো। দাদাদের কৌশলের কাছে পরাজিত হয়ে রাজকুমারদের বসতবাড়ি হাতাছাড়া হওয়ায়া কুলির বাপ অনেক আফসোস করেছিলো।
নবকুমাররা কিশোরগঞ্জ শহরে পৌঁছে আমাদের পাশের গ্রামের একটি লোক যে কিনা সপ্তাহে একদিন কিশোরগঞ্জ শহরে যায় ব্যবসার কাজে তাকে দিয়ে খবর পাঠিয়েছিলো অন্তত অর্ধেক টাকা জোগাড় হলে বাড়ির অর্ধেক অংশ দাদাদের নামে রেজিস্ট্রি করে দেওয়ার জন্য কিশোরগঞ্জের রেজিস্ট্রি অফিসে কথা বলে একটা তারিখ নির্ধারণ করবে। সেইতারিখ অনুযায়ী দাদারা নগদ টাকা নিয়ে আসলে সেদিনই রেজিস্ট্রি দলিল লিখে দিবে আর টাকা নিয়ে নবকুমারর কলকাতায় চলে যাবে সেদিনই। সেখানে তারা একটি জমি কিনবার কথাবার্তা চালাচ্ছে। এখানকার বসতবাড়ি বিক্রির টাকা দিয়ে কলকাতার জমির দাম দিবে।
নবকুমারদের বাড়ির মূল্য নির্ধারিত হলো সাড়ে সাতশ টাকা। এর মধ্যে প্রথম দফায় তিনশ টাকা জোগাড় করতে পেরেছিলো দাদারা। সংসারে জমানো টাকা ছিলো মাত্র সত্তুর টাকা। বাকি টাকা জোগাড় হয়েছিলো বিভিন্নভাবে। আমার দাদা তার অবস্থাশালী শ্বশুরবাড়ি থেকে বসতকেনার জন্য দেড়শ টাকা পেয়েছিলেন। বড়দাদি তার বাপের বাড়ি থেকে পঞ্চাশ টাকা ধার হিসেবে এনেছিলেন কারণ তার পরিবার তেমন অবস্থাসম্পন্ন ছিলো না। মেজোদাদি তার স্বর্ণালঙ্কার বিক্রি করে তিরিশ টাকা পেয়েছিলেন। এই হলো মোট দুইশত তিরিশ টাকা যা সত্তুর টাকার সাথে মিলিয়ে লোহার সিন্দুকে তালা দিয়ে রাখা হয়েছিলো। নবকুমারকে লোক মারফত খবর দেওয়া হলো যে অর্ধেক টাকা জোগাড় হয়েছে। বলা হলো জমি যেহেতু করিমগঞ্জ উপজেলার মধ্যে আর করিমগঞ্জ যেহেতু নতুন রেজিস্ট্রি অফিস চালু হয়েছে তাই করিমগঞ্জে রেজিস্ট্রি হলে ভালো হয়। নবকুমাররা অবশ্য রাজিও হয়েছিলো তাতে কিন্তু করিমগঞ্জ রেজিস্ট্রি অফিসে তখন বিশেষ কারণে একমাসের জন্য জমি রেজিস্ট্রি বন্ধ ছিলো আর নগদ টাকা বেশিদিন সিন্দুকে রাখা নিরাপদ নয় বলে এই সময়ের মধ্যেই দাদাদের বিকল্প হিসেবে কিশোরগঞ্জেই বাড়ির অর্ধেকাংশ রেজিস্ট্রি করতে হয়েছিলো। তার তিন মাস পরে নতুন ধান বিক্রি করে বাকি টাকা জোগাড় হলে বাড়ির বাকি অংশ রেজিস্ট্রি করার দিন ঠিক হলো। কিন্তু করিমগঞ্জের রেজিস্ট্রি অফিসের লোকরা পরামর্শ দিলো যে, অর্ধেক বাড়ি করিমগঞ্জ উপজেলা রেজিস্ট্রি করলে আগের অর্ধেকাংশের দলিল কিশোরগঞ্জ থেকে বদলি করে করিমগঞ্জের রেজিস্ট্রি অফিসে নিয়ে আসা সহজ হবে। এতে ভবিষ্যতে বাড়ি বিক্রি করলে আর কষ্ট করে কিশোরগঞ্জে যেতে হবে না। আর আগামী ছয় মাসের মধ্যে করিমগঞ্জের বাড়ি বা জমি কিশোরগঞ্জ রেজিস্ট্রি অফিসে রেজিস্ট্রি করা বন্ধ হয়ে যাবে তাই তখন সেখানে গিয়ে করিমগঞ্জের জমি বিক্রি করা আর ততোটা সহজ থাকবে না। তাই অবশেষে বাড়ির শেষ অর্ধেকাংশ দাদারা করিমগঞ্জেই রেজিস্ট্রি করেছিলো। কিন্তু আগের অর্ধেকাংশের দলিল আর কিশোরগঞ্জ থেকে আনা হয়নি। দুই দলিল দুই জায়গায় রয়ে গেলো।

দাদাদের সাত ভাইয়ের মধ্যে কেউ আজ আর বেঁচে নেই। দশ বছর আগে ছোট দাদা মারা যাবার পর সাত বছর হলো লোকমান দাদা মারা গেলেন সবার শেষে। এর মধ্য দিয়ে দাদাদের যুগ শেষ হয়ে গিয়েছিলো।
আমার বাবা আর কাকাদের যুগ শুরু হবার পরে নবকুমাররদের কাছ থেকেকেনা বসতবাড়ির দলিলেরও আজ অবধি আর কোনও খোঁজ নেই।
আমার দাদার ঘরে একটা লোহার সিন্দুক ছিলো যার মধ্যে মূল্যবান স্বর্ণালঙ্কার, নগদ টাকা ও দলিলপত্র থাকতো। আমার বয়স যখন সাত বছর তখন একবার সিঁদ কেটে ঘরে চোর ঢুকেছিলো আর লোহার সিন্দুকের তালা কেটেছিলো। তখন হয়তো অলঙ্কার ও টাকার সাথে দলিলপত্রও চুরি হয়ে থাকতে পারে।
আজ থেকে পঁচিশ বছর আগে আমার দাদা ইমান আলী মারা যাবার পরে আমার দাদির হাতে সংসারের নিয়ন্ত্রণ এলো যদিও তার সে যোগ্যতা আছে বলে আমার দাদা কোনওদিন স্বীকার করেননি। গ্রামের সবার চেয়ে শিক্ষা, যোগ্যতা ও বিচক্ষণতায় সেরা মানুষ হলেও আমার বাবাকে সংসারের নিয়ন্ত্রণ থেকে বঞ্চিত করে আমার অর্বাচীন ছোট চাচা ও মেজো ফুফাকে নিয়ে আমার দাদি সংসারটাকে যাচ্ছেতাইভাবে পরিচালনা করতে লাগলেন। তার বিভিন্ন রকম বিচার বিবেচনাহীন নয়ছয় কান্ডের মধ্যে একটা ছিলো পুরোনো লোহার সিন্দুকটি সের দরে বিক্রি করে দেওয়া। আমার ধারণা হচ্ছে সিন্দুক বিক্রি করার সময় সিন্দুকের ভেতরের সবকিছু তিনি বের করে রাখেননি কারণ এতো দামি আর পারিবারিক ঐতিহ্যের সিন্দুক যে মহিলাসের দরে বিক্রি করে দিতে পারে সিন্দুকের ভেতরে যে সিন্দুকের চেয়ে দামি কিছু থাকতে পারে তা তার পক্ষে বোঝা সম্ভব নয়। সিন্দুকের সাথে সম্ভবত বাড়ি ও জমির দলিলসহ খাজনা বা সরকারি অনেক গুরুত্ব¡পূর্ণ কাগজপত্রও আমার দাদি বাড়িছাড়া করেছেন বলে মনে হচ্ছে। তাই এখন বাড়ি বা জমি খারিজ করার জন্য যখন দলিলপত্রের প্রয়োজন হচ্ছে তখন রেজিস্ট্রি অফিস থেকে সেগুলোর নকল তোলা ছাড়া কোনও উপায় নেই। আর সেটা তুলতে হলে নিশ্চিতভাবে জানতে হবে রেজিস্ট্রি কোথায় হয়েছিলো কিশোরগঞ্জে বা করিমগঞ্জে।
বড়দাদার বড় ছেলে হচ্ছে আছির কাকা। তাকে আমরা বড়কাকা বলে ডাকতাম। তিনিও আজ বেঁচে নেই। পাঁচ বছর আগে আছির কাকা মারা যাবার আগে তাকে আমার বাবা জিজ্ঞেস করেছিলো নবকুমারদের বাড়ির দলিলের ব্যাপারে। তিনি বেশ জোর দিয়ে বললেন যে দলীল তিনি স্বচক্ষে বেশ কয়েকবার দেখেছিলেন আর দলিলটা নিশ্চিতভাবে করিমগঞ্জ রেজিস্ট্রি অফিসের ছিলো।

Close