মহানগরশিরোনাম

রাজশাহীতে লবণ নিয়ে লঙ্কাকান্ড, মজুতের অভিযোগে দুই ব্যবসায়ী আটক

নিজস্ব প্রতিবেদক: রাজশাহী নগরের সাহেব বাজারে আজ মঙ্গলবার বিকেলে লবণের বাজারের হঠাৎ করেই অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। এক দোকানে দেড় ঘণ্টায় ১০০ বস্তার বেশি লবণ বিক্রি হয়েছে। লবনের বাজার স্বাভাবিক আছে বললেও ক্রেতারা শুনছেন না। তারা বাজারের একেকটি মুদি দোকানকে মৌচাকের মতো ঘিরে ধরছেন। তবে বাজারের টান দেখে দুএকজন দোকান মালিককে লবণ গুদামে মজুত করতেও দেখা গেছে। এই অভিযোগে ভ্রাম্যমাণ আদালতে দুই ব্যবাসায়ীকে আটক করেছেন। রাজশাহীর বাজারে প্যাকেটজাত প্রতি কেজি লবণের দাম ৩০ টাকা । ক্রেতার ভিড় দেখে কোনো দোকানি কেজিতে ১০ টাকা করে বেশি নেওয়া শুরু করেছেন।
গতকাল বিকেল ৫টার দিকে রাজশাহী নগরের সাহেব বাজার এলাকায় অবস্থিত মুদি দোকান শাহজাহান ব্রাদার্স এর সামনে গিয়ে দেখা যায় প্রায় ২০-৩০ জন ক্রেতা লবণ কেনার জন্য দোকানের সামনে ভিড় করছেন। ক্রেতা সামলাতে হিমশিম খাচ্ছেন তারা। প্যাকেটের গায়ে ৩৫ টাকা লেখা লবণ বাজারে ৩০ টাকা করে বিক্রি হয়। ক্রেতার ভিড় দেখে এই দোকানে বিকেলে ৫ টাকা বাড়িয়ে দেওয়া হয়। পাঁচ মিনিটের মধ্যে তারা আবার কেজিতে ৫ টাকা বাড়িয়ে দিলেন। ৩০ টাকা কেজির লবণ তারা ৪০ টাকায় বিক্রি শুরু করেন। তারপরেও দোকানে ভিড় কমেনি। রাজশাহী বড় মুদি দোকান মোহিনী ট্রেডার্সের সামনে শতাধিক ক্রেতাকে ভিড় করতে দেখা যায়। দোকানে লবণের মূল্যের তালিকা ঝুলিয়ে দেওয়া হয়েছে। প্রতি কেজি লবণ ৩০ টাকা। তারা সেই দামেই বিক্রি করছেন। তবু ক্রেতার ভিড় কমছে না।
আমজাদ হোসেন নামে একজন ক্রেতাকে ৫ কেজি একসাথে লবণ কিনতে দেখা যায়। জানতে চাইলে তিনি বলেন, সবাই বলছে কালকে থেকে লবণের দাম বেড়ে যাবে সেই জন্য কিনে রাখলেন। আজগার নামে আরেকজন বলেন এখানে একটি প্রশিক্ষণের জন্য এসেছেন। তিনি বিকেলে বাজারে বেড়াতে বের হয়েছিলেন। লবণের দাম বেড়ে যাওয়ার গুজব শুনে তিনিও ৮ কেজি লবণ কিনে নিয়েছেন। এছাড়াও কামনুন নামে আরেক জন চাকুরী জীবী ফোন করে বলেন, লবনের নাকি সংকট দেকা দিয়েছে। তাঁকে আস্স্থ করলেও পেঁয়াজরে কথা চিন্তা করে এক সাথে ১০ কেজি লবন কিনে বাড়ি যান। মোহিনী ট্রেডার্স এর এক কর্মচারী জানালেন, তারা মঙ্গলবার বিকেলে দেড় ঘণ্টায় ১০০ বস্তার বেশি লবণ বিক্রি করেছেন। দোকানের অপর একজন কর্মচারী আরও ৫০ বস্তা লবণের ফরমায়েস পাঠালেন। সেখানে দাঁড়িয়ে দেখা যায়, অনবরত গুদাম থেকে লবনের ভ্যান দোকানে আসছে।
নগরের শিরোইল কাঁচা বাজার এলাকার একজন চা দোকানি ১০ কেজি লবন কিনেছেন। ঐ বাজারে গিয়ে দেখা যায়, লবণ কিনতে যারা এসেছেন তাদের প্রায় ৯০ শতাংশই নারী। তারা মুদি দোকানের সামনে হুমড়ি খেয়ে পড়েছেন। খবর পেয়ে রাজশাহীর অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট আবু আসলাম বিকেলে অভিযান চালিয়ে ভ্রাম্যমাণ আদালতে দুই ব্যবাসায়ীকে আটক করেন। বিকেলে এ প্রতিবেদন পাঠানো পর্যন্ত অভিযান চলছিল। আটক দুই ব্যবাসায়ীর নাম মানিক ও আজমল হোসেন। ম্যাজিস্ট্রেট বলেন, বাজারে লবণের কোনো সংকট নেই। এটা এক ধরণের গুজব। তিনি প্রয়োজনের অতিরিক্ত লবণ না কেনার পরামর্শ দেন। কোথাও দাম বেশি চাইলে প্রশাসনকে জানাতে অনুরোধ করেন।
এদিকে এই খবর গ্রামে ছড়িয়ে পড়লে ১৪ টাকা কেজির খোলা লবণ ৪০ টাকায় বিক্রি শুরু হয়েছে। রাজশাহীর বিভিন্ন উপজেলায় খবর নিয়ে জানা যায় খোলা লবণ ১৪ টাকা সেখানকার বাজারে বিক্রি হয়। লবণের দাম বাড়ার খবর শুনে গতকাল বিকেলে সেই লবণ ৪০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে জানান সেখান বাসিন্দারা। এছাড়াও প্যাকেট লবণের দাম ১০০ টাকা হাঁকছেন দোকানিরা বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।
এদিকে বিভিন্ন তথ্য সূত্রে জানা গেছে বর্তমানে সাড়ে ৬ লাখ মেট্রিক টনের বেশি ভোজ্য লবণ মজুদ দেশে রয়েছে। এর মধ্যে কক্সবাজার ও চট্টগ্রামের লবণ চাষিদের কাছে ৪ লাখ ৫ হাজার মেট্রিক টন এবং বিভিন্ন লবণ মিলের গুদামে ২ লাখ ৪৫ হাজার মেট্রিক টন লবণ মজুদ রয়েছে। গতকাল শিল্প মন্ত্রণালয় ও বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প কর্পোরেশন (বিসিক) থেকে পাঠানো সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়।
শিল্প মন্ত্রণালয়ের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, একটি স্বার্থান্বেষী মহল লবণের সংকট রয়েছে মর্মে গুজব রটনা করে অধিক মুনাফা লাভের আশায় লবণের দাম অস্থিতিশীল করার অপচেষ্টা চালাচ্ছে বলে প্রতীয়মান হচ্ছে। এ ধরনের গুজবে বিভ্রান্ত না হওয়ার জন্য শিল্প মন্ত্রণালয় সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করেন।
এছাড়া সারাদেশে বিভিন্ন লবণ কোম্পানির ডিলার, পাইকারি ও খুচরা বিক্রেতাদের কাছে পর্যাপ্ত পরিমাণে লবণ মজুদ রয়েছে। পাশাপাশি চলতি নভেম্বর মাস থেকে লবণের উৎপাদন মৌসুম শুরু হয়েছে। এরইমধ্যে কক্সবাজার জেলার কুতুবদিয়া ও মহেশখালী উপজেলায় উৎপাদিত নতুন লবণও বাজারে আসতে শুরু করেছে। দেশে প্রতি মাসে ভোজ্য লবণের চাহিদা কম-বেশি এক লাখ মেট্রিক টন। অন্যদিকে লবণের মজুদ আছে সাড়ে ছয় লাখ মেট্রিক টন। সে হিসাবে লবণের কোনো ধরনের ঘাটতি বা সংকট হওয়ার প্রশ্নই ওঠে না।
বিসিকের পাঠানো সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, লবণ চাষীদের অক্লান্ত পরিশ্রম এবং সরকারের সার্বিক সহায়তার ফলে লবণ উৎপাদনে বাংলাদেশ স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করতে সক্ষম হয়েছে। ২০১৮-১৯ অর্থবছরের লবণ মৌসুমে লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বেশি রেকর্ড পরিমাণ ১৮ দশমিক ২৪ লাখ মেট্রিক টন লবণ উৎপাদিত হয়েছে। চলতি মাসের ১৫ তারিখ পর্যন্ত দেশে লবণের মজুদের পরিমাণ সাড়ে ৬ লাখ মেট্রিক টন। এছাড়াও চলতি ২০১৯-২০ অর্থবছরের লবণ মৌসুমে লবণ চাষিরা লবণ চাষ শুরু করেছে।
বর্তমানে দেশে লবণের কোনো সংকট নেই এবং বর্তমানে সংকট হওয়ার কোনো সম্ভাবনা ও নেই মর্মে ইতিমধ্যে সংশ্লিষ্ট জেলা প্রশাসনকে অবগত করানোর জন্য বিসিকের জেলা কার্যালয়গুলোকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। লবণ সংক্রান্ত তথ্য সংগ্রহ ও পরিবেশনের জন্য বিসিকের প্রধান কার্যালয়ে কন্ট্রোলরুম খোলা হয়েছে। কন্ট্রোল রুমের নম্বর ০২-৯৫৭৩৫০৫। লবণ সংক্রান্ত বিষয়ে তদারকির জন্য শিল্প মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প কর্পোরেশন (বিসিক) প্রধান কার্যালয়ে ইতোমধ্যে একটি কন্ট্রোল রুম খোলা হয়েছে। এর নম্বর ০২-৯৫৭৩৫০৫ (ল্যান্ড ফোন), ০১৭১৫-২২৩৯৪৯ (সেল ফোন)। লবণ সংক্রান্ত যেকোনো তথ্যের প্রয়োজনে কন্ট্রোল রুমের সঙ্গে যোগাযোগের জন্য অনুরোধ করা হয়। বরেন্দ্র বার্তা/ফকবা/অপস

Close