নাগরিক মতামতমহানগরশিরোনাম-২

নতুন করে যুক্ত হলো ওযুখানা

চরম অযত্ম ও অবহেলায় পড়ে আছে রাজশাহীর ভাষা আন্দোলনের নীরব সাক্ষী ভুবন মোহন পার্ক। রাজশাহী সিটি করপোরেশনের (রাসিক) কাছে ঐতিহাসিক এ পার্কটি রক্ষার দাবি জানিয়েছেন সুশীল সমাজের নেতারা।
শুক্রবার সন্ধ্যায় এই পার্কের ভেতরে গিয়ে দেখা যায়, ভাষা আন্দোলনে অংশগ্রহণকারী ৬৪ জনের নামাঙ্কিত এই স্মৃতিসৌধে জুতা পায়ে একজন বসে আছেন। শুধু তাই নয় স্মৃতিসৌধের বেদীতে বেশ কয়েকজনকে বসে ধূমপান করতে দেখা গেছে। স্মৃতিসৌধের আশেপাশে গাছের পাতা পড়ে নোংরা হয়ে আছে। এছাড়া এই চত্বরের পাশের দোকান নির্মাণের জন্য আনা রড-বালু-সিমেন্টসহ বিভিন্ন পরিত্যক্ত জিনিস পার্কের ভেতর রাখা হয়েছে। পার্কের ভেতর বখাটেদের আড্ডাও লক্ষ্য করা গেছে। এছাড়াও বাজার করতে আসা অনেকেই পার্কে সাইকেল রাখছেন। পার্কের গেটে রয়েছে বেশ কয়েকটি স্যান্ডেলের দোকান, ভেতরে রয়েছে কয়েকটি চায়ের স্টল। শুধু তাই নয়, পার্কের ভেতরে সাধারণ মানুষকে প্রকৃতির ডাকে সাড়া দিতেও দেখা গেছে। পার্কের পূর্ব ও উত্তরের প্রাচীর দলীয় ও বিভিন্ন ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের সাইনবোর্ডে ছেয়ে গেছে।
রাজশাহী সিটি করপোরেশন প্রকাশিত বরেন্দ্র বাতিঘরে ‘ভুবন মোহন পার্ক : ইতিহাসের সাক্ষী’ প্রবন্ধে ড. এম শসশের আলী লিখেছেন, ‘ভুবন মোহন পার্কের ঐতিহ্যিক চেহারা কেমন যেন ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে।’ পার্কটির আশপাশে ব্যবসায়ীরা পসরা সাজিয়ে বসায় পার্কটি সম্পূর্ণরূপে ঢাকা পড়েছে। আর এর কারণে পার্কটি তার রাজনৈতিক গুরুত্ব হারিয়েছে। কারণ এখন সভা-সম্মেলন-মানববন্ধন নগরীর জিরোপয়েন্টে অনুষ্ঠিত হয়। অথচ ১৯৪৮ থেকে ১৯৭০ সাল পর্যন্ত রাজশাহীর সব রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড ভুবন মোহন পার্ককে কেন্দ্র করে আবর্তিত হয়েছিল। ভাষা আন্দোলনের যুগ ১৯৪৮ থেকে ১৯৫৪ সাল ছিল পার্কটির গৌরবদীপ্ত সময়। ভাষা আন্দোলনের সব পরিকল্পনা গোপনে রাজশাহী কলেজে করা হলেও কলেজ এলাকায় প্রকাশ্যে সভা-সমাবেশ নিষিদ্ধ ছিল। তখন ভুবন মোহন পার্ক থেকেই ভাষা আন্দোলনের বার্তা তাৎক্ষণিকভাবে শহরবাসীর কাছে পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হয়েছে। ১৯২০ সালে ভুবন মোহন পার্ক থেকে মিউনিসিপ্যালিটির দফতর রাজশাহী কলেজের একটি কক্ষে সরিয়ে নেওয়া হয়। এরপর ১৯২৩ সালে সোনাদিঘির মোড়ে নবনির্মিত নিজ ভবনে স্থানান্তর করা হয়।
এছাড়াও ১৯৪৮ সালের ২ ফেব্রুয়ারি ভাষা সৈনিক মোহাম্মদ সুলতানের সভাপতিত্বে ভুবন মোহন পার্কে উত্তরবঙ্গের আঞ্চলিক সম্মেলন হয়েছিল। সভায় ভিয়েতনামের সংগ্রামী যুবনেতা মাই থি চাউ অতিথি হিসেবে ভাঙা ভাঙা বাংলায় বক্তব্য দিয়েছিলেন। এই সম্মেলনে বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবি সংবলিত একটি প্রস্তাবও গ্রহীত হয়। এরপর ভুবন মোহন পার্কে অনেক আন্দোলন সংগ্রাম হয়েছে। ১৯৫৩ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি পার্কে শহীদ মিনার তৈরি করে মহান একুশে উদযাপন করা হয়। এই পার্কে ১৯৬৪ সালে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, জাতীয় নেতা এএইচএম কামারুজ্জামানসহ বিভিন্ন নেতারা সমাবেশে বক্তব্য দিয়েছেন। এক সময় ব্যাপক সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও সাহিত্যচর্চার কেন্দ্র হিসেবেও পার্কটির পরিচিতি ছিল।
২০০৫ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি নতুনভাবে সংস্কার করে রাজশাহীতে ভাষা আন্দোলনে নেতৃত্বদানকারীদের নামাঙ্কিত স্মৃতিসৌধের উদ্বোধন করেন ভাষা সৈনিক অ্যাডভোকেট গোলাম আরিফ টিপু। এজন্য ১৯৯৮ সালে রাজশাহী সিটি করপোরেশন দুই লাখ টাকা ব্যয় করে।
সাইফুল ইসলাম নামে এক ব্যক্তি বলেন, ‘পার্কের বাজে অবস্থার জন্য সিটি করপোরেশন দায়ী। তারা ঠিকমতো দেখাশোনা করে না। বছরের বিশেষ দিনগুলোতে নাম মাত্র একবার পরিষ্কার করা হয়। তারপর সারা বছর আর পাত্তা নাই।’
তিনি আরও বলেন,‘এখানে জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তানদের নামাঙ্কিত স্মৃতিসৌধ রয়েছে। বিষয়টি আমাদের মর্যাদার সঙ্গে দেখতে হবে। এটি একটি গর্বের জায়গা। এখানে কোন রুচিতে মানুষ বাইসাইকলে-মোটরসাইকেলের গ্যারেজ করেছে? এখানে সিগারেট সেবন ছাড়াও শোনা যায়, রাতে নেশাদ্রব্যও সেবন করে মাদকসেবীরা।’
রাজশাহী কলেজের ছাত্র বিজয় বলেন, ‘এই পার্কের বাইসাইকেল ও মোটরসাইকেলের গ্যারেজ তুলে দিতে হবে। সব আর্বজনা পরিষ্কার করে দুই গেটে তালা লাগিয়ে দিতে হবে। এছাড়া পার্কের সামন থেকে স্যান্ডেলের দোকানগুলো তুলে দিতে হবে। বিশেষ দিনগুলোতে শুধু পার্কটি খুলতে হবে। তাহলে পার্কের সেই ঐতিহ্য ফিরে আসবে। এ পার্কটির ঐতিহ্য রক্ষায় গত বছরের ২২ এপ্রিল নগরীতে মানববন্ধন করেছে রাজশাহীর ব্যবসায়ী সমন্বয় পরিষদের নেতারা।’
এ ব্যাপারে রাজশাহী ব্যবসায়ী সমন্বয় পরিষদের সাধারণ সম্পাদক সেকেন্দার আলী বলেন,‘এখানে রাসিকের অবহেলা কাজ করছে। রাস্তার বাইরে থেকে এখন পার্কের ভেতরে দোকান ঢুকে গেছে। এ বিষয়গুলোর জন্য বিভিন্ন দফতরে মানববন্ধন ও স্মারকলিপি জমা দেওয়া হয়েছে । কিন্তু কোনও কাজ হয়নি।
তিনি আরও বলেন,‘রাসিকের সঙ্গে ভুবনমোহন পার্ক দখলের বিষয়ে অনেকবার বসা হয়েছে। তারা বার বার সময়ক্ষেপণ করেছে। তাদের পক্ষ থেকে বলা হয়, আগামী মাসের মধ্যেই অবৈধ স্থাপন উচ্ছেদ করা হবে। কিন্তু পরে আর কিছুই করে না। ’
রাজশাহী রক্ষা সংগ্রাম পরিষদের সাধারণ সম্পাদক জামাত খান বলেন, ‘ঐতিহাসিক স্থাপনা ও জায়গাগুলো সংরক্ষণ করা উচিত। প্রয়োজনে নিরাপত্তা প্রহরী বসনো হোক। ভুবন মোহন পার্ক আমাদের ঐতিহ্য বহন করে আসছে। এটা রক্ষা করা উচিত।’
এ বিষয়ে জানতে চাইলে রাজশাহী সিটি করপোরেশনের প্রধান প্রকৌশলী আশরাফুল হক বলেন, ‘বিভিন্ন কারণে এতদিন দোকানগুলো ওঠানো সম্ভব হয়নি। তবে খুব দ্রুত পার্কের সামনে ও আশেপাশের দোকানগুলো তুলে দেওয়া এবং দুই পাশে গেট লাগানোসহ সব কাজ করা হবে।’

 

Close