শিরোনাম-২সাহিত্য ও সংস্কৃতি

রহস্যময় গোলক

সবনাজ মোস্তারী স্মৃতি

খেতে বসে একটা গ্লাস ভেঙ্গে যাওয়ার জন্য আম্মুর কাছে ভীষন ভাবে বকা খেয়েছি। স্কুলে স্যারের কাছেও বকা খেয়েছি। এখনো কোনো বিজ্ঞানের প্রজেক্ট বানাতে পারিনি তাই। ধুর আর ভালোই লাগে না। ইচ্ছে করে সব কিছু ছেড়ে অনেক দুরে কোথাও চলে যায়।যেখানে গেলে আব্বু আম্মু আর দৈত্যের মত জসীম স্যার আমাকে খুজে পাবে না।

প্রত্যেক বার তো বিজ্ঞানের প্রজেক্ট আমি বানাই আর অনেক ভালো মতই বানাই।কিন্তু এবার কি বানাবো বুঝতেই পারছি না। তাই বলে ক্লাসে সবার সামনে এ ভাবে বকবে।আর আম্মুটাও একটা গ্লাস ভেঙ্গেছে তো কি হয়েছে তাই এভাবে বকবে!এমন বকেছে যে মনে হচ্ছে আমি একটা কি এমন মহাভারত অশুদ্ধ করে দিয়েছি।

তাই কারো সাথে আর কথা না বলে ছাদে চলে আসি। আমার যখন অনেক মন খারাপ থাকে তখন আমি ছাদে চলে আমি। ছাদ থেকে রাস্তা দেখতে, গাছপালা দেখতে দেখতে মনটা ভালো হয়ে যায়। অন্যদিনের মত আজকেও তাই করলাম।

একা একা ছাদে দাঁড়িয়ে আছি। হঠাৎ ভীষন শব্দে আকাশ থেকে কিছু একটা মাটিতে পড়লো ,বলে মনে হলো। আমি দাঁড়িয়ে ছিলাম। শব্দের চোট এতটায় বেশি ছিলো যে আমি বসে পড়লাম। কিছুক্ষণ বসে থাকার পর আমার মনে হলো আকাশ থেকে কি পড়লো এটা আমার দেখা দরকার। যায় দেখে আসি।

নিচে নামতেই মানুষ জনের চিৎকার চেচামেচি শুনতে পেলাম।আম্মু চিৎকারও শুনতে পেলাম। আম্মু অযথা একটুতেই চিৎকার করে যা আমার খুব বিরক্ত লাগে। আমি সবার চোখ এড়িয়ে আমাদের বাড়ির পিছনে গেলাম।গিয়ে দেখি অদ্ভুত একটা প্রানী।গায়ের রং সবুজ,তিনটা হাত, কপালে একটা চোখ। আমি ভয় পেয়ে গাছের আড়ালে লুকিয়ে গেলাম। লুকিয়ে লুকিয়ে আমি প্রানীটিকে দেখছিলাম কি করে। প্রানীটি চুপচাপ বসে এদিক ওদিক তাকাচ্ছে। মনে হয় আমাকে দেখে ফেলেছে। তাই আমার দিকে এগিয়ে আসছে।আমি ভয় পেয়ে দৌড় দিতে যাবো আর প্রানীটা আমাকে ধরে নিয়েছে। আমি কাঁপা কাঁপা গলায় বললাম তুমি কে??? তুমি কি এলিয়েন?? আমি শুনেছি এলিয়েন তোমার মত সবুজ আর কপালে চোখ থাকে,তিনটা হাত থাকে! প্রানীটা মাথা নেড়ে বলল হুম আমি এলিয়েন। আমাকে ভয় পেয়ো না। আমি তোমার ক্লাসে বিজ্ঞান প্রজেক্ট বানাতে সাহায্য করবো।তোমাকে আর জসিম স্যারের বকা খেতে হবে না। আমি অবাক হয়ে বললাম আমি যে বিজ্ঞান প্রজেক্টের জন্য জসিম স্যারের কাছে বকা খেয়েছি তুমি জানলে কি করে!!!!! প্রানীটি বলল আমি তোমার ব্রেনের মধ্যে কিছু সময়ের জন্য ডুকে তোমার সব তথ্য জেনে গেছি।তুমি যে আজ দুপুরে খেতে বসে তোমার আম্মুর কাছে গ্লাস ভাঙ্গার জন্য বকা খেয়েছো তাই তোমার অনেক মন খারাপ,আর তাই তুমি ছাদে মন খারাপ করে দাঁড়িয়ে ছিলে। আর তোমার মন খারাপ হলে তুমি ছাদে দাড়িঁয়ে রাস্তা আর গাছ পালা দেখো।তোমার ক্লাসের ট্রানা নামক মেয়েটাকে একদম সহ্য করো না। কারন সে তোমাকে সব সময় কপি করে। আমি হা করে প্রানীটার দিকে তাঁকিয়ে আছি। আমার হা করে তাকিয়ে থাকা দেখে প্রানীটা বলল আমি তোমার মগজের দশ হাজার সাতশ ‘বার কোটি সাতাত্তর লক্ষ চৌত্রিশ হাজার পাঁচশ ছেচল্লিশটা নিউরোন কপি করে আমার মগজে রেখে দিয়েছি।আমি বললাম তুমি আমার মাথার ভেতরের সবগুলো নিউরোন গুনেছ???? প্রানীটা বলল হ্যা। না গুনলে কপি করবো কি ভাবে।আমি খানিকক্ষণ চুপ করে থেকে বললাম কাজটা ঠিক করোনি। আমি আবার বললাম আচ্ছা তোমার নাম কি? তুমি কোন গ্রহ থেকে এসেছো???প্রানীটা বলল আমার নাম ক্লড।আমি সৌরজগতের সব থেকে বড় গ্রহ বৃহস্পতি থেকে এসেছি।এর ব্যাস ১৪১.৫৯কি.মি.।বৃহস্পতির ১৬ টি উপগ্রহ রয়েছে।আমি সেখান থেকেই এসেছি। আমি অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলাম কেমন করে এলে!!!ক্লড বলল তাদের এক ধরনের রকেট আছে। যার মাধ্যমে সৌরজগতের ১১ টি গ্রহের মধ্যে ৬ টা গ্রহে যাওয়া যাবে। পৃথিবী থেকে বৃহস্পতি গ্রহের দুরুত্ব ৫৮৮ মিলিয়োন কিলোমিটারস।তারা বিশ্বব্রহ্মাণ্ড ঘুরে ঘুরে গুরুত্বপূর্ণ প্রানী সংগ্রহ করছে। তাই পৃথিবী নামক গ্রহে এসেছে।পৃথিবী থেকে ক্লড একটা গুরুত্ব পূর্ন প্রানী নিয়ে যাবে। তারা ভেবেছিলো পৃথিবীর সব চেয়ে গুরুত্ব পূর্ন প্রানী মানুষ কিন্তু পৃথিবীতে এসে তারা বুঝতে পারছে তাদের ধারনা ভুল।তাই ক্লডকে পৃথিবী নামক গ্রহ থেকে গুরুত্বপূর্ণ প্রানী খুজতে হবে।

ক্লডকে আমি জিজ্ঞেস করলাম তুমি এখন কোথায় যাবে??ক্লড বলল কেনো তোমার সাথে তোমার বাড়ি যাবো। আমি অবাক হয়ে বললাম তুমি কি পাগল আমার বাড়িতে নিয়ে যাবো কেমন করে আম্মু তোমাকে দেখলে ভয়ে অজ্ঞান হয়ে যাবে। ক্লড বলল ঐ নিয়ে তুমি কোনো চিন্তা করো না। তুমি শুধু আমাকে নিয়ে চলো।আর ক্লড বলল আমার সাথে যে তোমার দেখা হয়েছে এটা তুমি কাউকে বলবে না। নইলে অনেক সমস্যা হবে।তোমাদের মানুষ জগতের মানুষ খুব খারাপ। যদি শুনে অন্য গ্রহ থেকে কেউ এসেছে তখন তারা তাদের ধরার জন্য উঠে পরে লাগে।এভাবে বলছো কেনো???আমিও কিন্তু মানুষ।তোমার মত এলিয়েন না। ক্লড বলল আমি জানি এ জন্য আমি যখন আমার গ্রহে ফিরে যাবো তোমার স্মৃতি নষ্ট করে যাবো। আমি অবাক চোকে ক্লডের দিকে তাকালাম। বললাম মানে টা কি। ক্লড বলল ভয় পেয়ো না আমার সাথে যে কুটু সময় কাটাবা শুধু সেইটুকু সময়ের স্মৃতি নষ্ট করবো। আমি বললাম কেমন করে। ক্লড বলল তোমার ব্রেনের ভিতর থেকে সেই কইটা নিউরন সরিয়ে নিবো। আমি আর কিছু না বলে চুপ করে থাকলাম।তার পর ক্লডকে বললাম বাড়ি চলো। ক্লড আর আমি বাড়ি গেলাম এক সাথে। বাড়ির ভেতরে ঢুকতেই দেখি আব্বু আম্মু ডাইনিং এ বসে গল্প করছে।আমাকে দেখে আব্বু বলল কোথায় গেছিলা? আমি বললাম এমনি বাইরে গেছিলাম আব্বু।আব্বু বলল এমন হুটহাট করে না বলে আর বাইরে যাবে না যাও এখন ঘরে যাও। আমি বললাম ঠিক আছে আব্বু।ঘরে এসে দেখি ক্লড বসে আছে।আমি বললাম তুমি কেমন করে এলে। কেউ দেখতে পাইনি তো? ক্লড বলল তুমি যখন তোমার বাবার সাথে কথা বলছিলা তখন এসেছি।আমি বললাম ও আচ্ছা। কিন্তু আম্মু যখন ঘরে আসবে তখন তুমি কি করবে। এ কথা বলতে বলতেই আম্মু দড়জায় নক করল আর চিৎকার করে বলল গ্রানা তুমি আবার দড়জা লাগিয়ে রেখেছো! আমি বললাম এমনি আম্মু।আম্মু আবার বলল দড়জা খুলো। ক্লড আমাকে বলল যাও দড়জা খুলো।আমি দড়জা খুললাম আম্মু বলল কার সাথে কথা বলছিলা? আমি বললাম কই কারো সাথে না। আম্মু ঘর থেকে চলে গেলো। আমি আশ্চর্য হলাম আম্মু ক্লডকে দেখতে পেলো না। আমি যে কথাটা ক্লডকে বলতে যাবো ঠিক সেই মুহূর্তে তোমার এটা জানতে হবে না তুমি বরং একটা কাচের জার,অ্যালকোহল, পানি,ড্রপার আর রান্নার তেল নিয়ে আসো। আমি জিজ্ঞেস করলাম কেনো এগুলো দিয়ে কি করবে?ক্লড বলল তোমার বিজ্ঞানের প্রযেক্ট বানাবো এখন।আমি বললাম কি বানাবে?ক্লড বলল রহস্যময় গলক। আমি বললাম এটা আবার কি? কি ভাবে বানাবে?ক্লড বলল যা যা আনতে বললাম তা তা আগে নিয়ে এসো।আমি বললাম ঠিক আছে তুমি অপেক্ষা করো আমি নিয়ে আসছি। ক্লড যা যা বলেছে আমি নিয়ে আসলাম। এবার ক্লড বললো আমি তোমাকে এখন যা যা করতে বলবো তুমি তাই তাই করবে।আমি বললাম ঠিক আছে।ক্লড বলল প্রথমে কাচের জারে ২/৩ ভাগ অ্যালকোহল দিয়ে ভর্তি করো।এবার খালি অংশের আধাআধি পানি ভর্তি করো। তার পর ড্রপার করে তেল নাও।ওই তেল পানি -অ্যালকোহল মিশ্রণের ভেতরে আস্তে আস্তে ছেড়ে দাও।যদি দেখো তেলের ফোঁটাটি ভেসে উঠছে তাহলে মিশ্রণে আরও কিছু অ্যালকোহল সাবধানে ঢালো,যতক্ষণ না তেলের ফোঁটাটি মিশ্রনের ঠিক মাঝখানে ভাসছে। যদি দেখ তেলের ফোঁটা ডুবে যাচ্ছে তবে সাবধানে পানি ঢালো যাতে ফোঁটাটি মিশ্রণের মাঝখানে আসে। এখন বোতলের ভেতর দেখবে একটা অদ্ভুত গোলক ঠিক মাঝখানে স্থির হয়ে রয়েছে। ক্লড যা যা বলল আমি তাই তাই করলাম। কি আশ্চর্য এত সুন্দর কৌতূহলোদ্দীপক একটা গোলক তৈরী হয়ে গেলো কাচের জারের মধ্যে। জসিম স্যার দেখলে নিশ্চয় অবাক হবে। আমি ক্লডকে জিজ্ঞেস করলাম এমন কেনো হলো? ক্লড বললো পানি অ্যাকোহলের মিশ্রণের ঘনত্ব অ্যালকোহলের চেয়ে বেশি কিন্তু পানির চেয়ে কম।এই ঘনত্ব কমিয়ে বা বাড়িয়ে তুমি তেলের ঘনত্বের খুব কাছাকাছি এনে ফেলেছ। সেই কারনে তেলে ফোঁটা মিশ্রণের মধ্যে ডুবে ভাসতে থাকল। আমি বললাম ধন্যবাদ ক্লড আমাকে এই বিজ্ঞান প্রজেক্টা বানাতে সাহায্য করার জন্য।তুমি কি আরো এমন প্রজেক্ট বানাতে পারো??? ক্লড বলল হুম পারি। আমি ক্লডকে বললাম আমাকে সিখিয়ে দিবে???ক্লড বললো হুম দিবো আমি পৃথিবী থেকে চলে যাবার সময় তোমার ব্রেনের মধ্যে আমার ব্রেনের তিনটা নিউরোন রেখে দিবো তাতেই তুমি অনেক বিজ্ঞান প্রজেক্ট বানাতে পারবে। আমি বললাম তুমি যেয়ো না ক্লড। আমি তোমার কথা কাউকে বলবো না। আমার ঘরে তোমাকে লুকিয়ে রাখব। ক্লড বলল আমি যে কাজের জন্য এসেছি সেটা শেষ করে আমাকে ফিরে যেতে হবে গ্রানা।এটাই আমাদের নিয়ম। ক্লড এবার আমাকে বলল তাকে এখন যেতে হবে পৃথিবী গুরুত্বপূর্ণ প্রানী খুজতে। আমি ক্লডকে বললাম তোমার সাথে আমি যাবো ক্লড। ক্লড আমাকে তার সাথে নিলো।তার আগে ক্লড আমার রূপ ধারন করল।আমি ক্লডকে বললাম তুমি আমার রূপ রাধন করলা কেনো। দুইটা গ্রানা কেমন করে হয়।ক্লড বলল তোমাকে আমি প্রথম দেখেছি পৃথিবীতে এসে তাই তোমার রূপ ধারন করেছি।আমি অবাক হয়ে বললাম অন্য কাউকে দেখলে অন্য কারো রূড ধারন করতে???? ক্লড বলল হুম। আমি জিজ্ঞেস করলাম এতে কোনো সমস্যা হবে নাতো??? ক্লড বলল না। তার পর আমি আর ক্লড এক সাথে বার হলাম পৃথিবীর গুরুত্বপূর্ন প্রানী খুজতে। ক্লড আমার দিকে তাঁকিয়ে বলল দেখছো কত প্রজাতির প্রানী।এর মধ্যে একটা প্রানী আমি নিয়ে যাবো। ক্লড খুটিয়ে খুটিয়ে সব প্রানী দেখতে শুরু করেছে।শুরু হয়েছে ভাইরাস থেকে,প্রকৃতপক্ষে ভাইরাসকে আলাদাভাবে প্রানহীন বলা হয়।এভাবে একে একে ক্লড সব প্রানীকে পর্যবেক্ষণ করতে শুরু করে আমাকে সব প্রানীর জন্য মূল গঠন হচ্ছে ডিএনএ দিয়ে। সব প্রানীর ডিএনএ একই রকম,সবগুলো একই বেস পেয়ার দিয়ে তৈরী।সবচেয়ে সহজ এবং সবচেয়ে জটিল প্রানীটির একই রকম গঠন। আমি ক্লডকে জিজ্ঞেস করলাম তুমি মানুষকে কেনো পৃথিবীর গুরুত্বপূর্ণ প্রানী মনে করছো না??? ক্লড বললো মানুষের বয়স মাত্র দুই মিলিয়ন বছর। মানুষ জানি নিজের ধ্বংস নিজে করে। নিজেদের মধ্যে হানাহানি করে।তাই এদের বুদ্ধিমান মনে হলেও এরা বদ্ধিমান নয় আমার মনে হয়।আমি বললাম হুম ঠিক বলেছো ক্লড। সব কিছু পর্যবেক্ষণ করে ক্লড একটা পিঁপড়াকে নিলো।আমি আবার জিজ্ঞেস এত প্রানী থাকতে তুমি পিঁপড়াকে বেছে নিলে কেনো?? ক্লড বলল আমার মনে হয় পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ প্রানী পিঁপড়া।এরা বহু বছর থেকে বেঁচে আছে এরা সুশৃঙ্খল, পরিশ্রমী এরা নিজের নিজে ধ্বংস করে না। অবশেষে ক্লড একটি পিঁপড়াকে নিয়ে তার নিজ গ্রহে পারি দেয়।ক্লড আমার অনুরোধ রেখেছে।সে চলে যাবার আগে আমার স্মৃতি নিয়ে যায়নি আমার স্মৃতি আমাকে উপহার দিয়ে গেছে এবং বিজ্ঞান প্রজেক্ট বানানোর অনেক বুদ্ধি দিয়ে গেছে। মন খারাপ হলে এখনো ছাদে গিয়ে দাঁড়ায় । মনে মনে ভাবি আবার যদি ভিষন শব্দ করে ক্লড বৃহস্পতি গ্রহ থেকে পৃথিবীতে আসে।আবার যদি আমার ক্লডের সাথে দেখা হয়।ক্লডকে আমি কখনো ভুলবো না।সারা জীবন ক্লডকে আমার মনে থাকবে।

Close