ছবি ঘরট্রাভেল ও ট্যুরিজমশিরোনাম-২

ঘুরে এলাম মুজিবনগর, শিলাইদহ

পাপন সরকার শুভ্র

বিজয়ের মাসে মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিঘেরা জায়গাগুলোতে ঘুরে রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতার স্বাদ নিতেই পারেন। আর প্রথম পছন্দ হিসেবে বেছে নিতে পারেন বাংলাদেশের প্রথম অস্থায়ী সরকারের রাজধানী- মেহেরপুরের মুজিবনগর।
গত শুক্রবার ২০ ডিসেম্বর ঘুরে এলাম মুজিবনগর থেকে।
মেহেরপুর জেলা শহর থেকে ১৪ কিলোমিটার দূরে ৬৬ একর জায়গা জুড়ে মুজিবনগর কমপ্লেক্স। মুজিবনগরে ঢুকতেই প্রথমে চোখে পড়েছে বঙ্গবন্ধু তোরণ। বঙ্গবন্ধু তোরণ দিয়ে ঢুকেই সাইনবোর্ডে লেখা, বাঁ দিকে মুক্তিযুদ্ধে বাংলাদেশের মানচিত্র আর সোজা স্মৃতিসৌধ। বাঁ দিক দিয়ে গেলাম ‘মুক্তিযুদ্ধে বাংলাদেশের মানচিত্র’ দেখতে সেক্টর-ভিত্তিক গড়ে তোলা হয়েছে এই মানচিত্র।
মানচিত্রের চারপাশে গ্যালারি। গ্যালারির ওপর দিয়ে ঘুরে ঘুরে দেখতে হয়। মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক ১১টি সেক্টরে ভাগ করা ছাড়াও আছে ঐতিহাসিক ঘটনাচিত্র, মানচিত্রে যুদ্ধকালে দেশের চারটি পথ দিয়ে শরণার্থী গমন, হার্ডিঞ্জ ব্রিজ ধ্বংস, আ স ম আবদুর রবের পতাকা উত্তোলন, শালদাহ নদীতে যুদ্ধ, কাদেরিয়া বাহিনীর জাহাজ দখল ও যুদ্ধ, শুভপুর ব্রিজে সম্মুখযুদ্ধ, কামালপুর ও কুষ্টিয়ার মিরপুরের যুদ্ধ, চালনা ও চট্টগ্রাম বন্দর ধ্বংস, পাহাড়তলী ও রাজশাহীর হত্যাযজ্ঞ, জাতীয় শহীদ মিনার ধ্বংস, সচিবালয়ে আক্রমণ, রাজারবাগ পুলিশ লাইনে আক্রমণ, জাতীয় প্রেসক্লাব ধ্বংস, পিলখানা আক্রমণ, রায়েরবাজার বধ্যভূমি ও বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ডের ভাস্কর্য।
মানচিত্রের সামনে আছে বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণ, ২৫ মার্চের কালরাত্রি, অগ্নিসংযোগ, পাকিস্তানি বাহিনীর নারী নির্যাতন, ১৭ এপ্রিল মুজিবনগর সরকারের শপথ অনুষ্ঠান, ১২ আনসার কর্তৃক অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলামকে গার্ড অব অনার এবং সেক্টর বণ্টনসহ অরোরা নিয়াজি ও এ কে খন্দকারের উপস্থিতিতে পাকিস্তানি বাহিনীর আত্মসমর্পণের ভাস্কর্য।
আমরা ঘুরতে গিয়েছিলাম সবাই ছাত্র একই হোস্টেলের প্রায় ৪৫জন। কিছুদিন আগে বড় দাদারা প্ল্যান করলো কোথাও ঘুরতে যাবার যেহেতু ডিসেম্বর মাস সেহেতু মুজিবনগর ঘুরতে যাওয়া হোক। বড় দাদাদের মধ্যে পুলক দা, সোহাগ ভাই, নরোত্তম দা, ছোটভাই স্বরুপ বেশ কষ্ট করেছে। আমরা আগের দিন রাত ৩টায় বাস ছেড়ে শুক্রবার সকাল ৮টায় মুজিবনগর পৌছায়। এরপর সকালের নাম্তা করে নিলাম সবাই। যেহেতু সবাই ছাত্র তাই আমরা খাবার প্যাকেট করে নিয়ে গিয়েছিলাম রাজশাহী থেকে।
খাওয়া শেষে এরপর স্মৃতিসৌধ পরিদর্শনে গেলাম। স্থপতি তানভির করিম নকশা করেন। এই স্মৃতিসৌধ উদীয়মান সূর্যের প্রতিকৃতিতে নির্মিত। গোলাকার স্তম্ভের ওপর মূল বেদিকে কেন্দ্র করে দাঁড়িয়ে আছে ২০ ইঞ্চি পুরু ২৩টি ত্রিকোন দেয়াল যা ২৩বছরের স্মৃতিকে স্মরন করিয়ে দেয়। দেয়ালগুলোর উচ্চতা ৯ থেকে ৪২ ফুট। এগুলো দিয়ে বোঝানো হয়েছে উদীয়মান সূর্যরশ্মি। স্মৃতিসৌধে একটি স্থান সিরামিক ইট দিয়ে চিহ্নিত করা হয়েছে। এখানেই শপথ গ্রহণ করেছিল বাংলাদেশের প্রথম মন্ত্রিপরিষদ। স্মৃতিসৌধের মূল বেদি থেকে বের হওয়ার জন্য রয়েছে ৯টি সিঁড়ি। ৯টি সিঁড়ি ৯ মাস স্বাধীনতাযুদ্ধের প্রতীক।৩০ লাখ শহীদকে স্মরণীয় করে রাখার জন্য স্মৃতিসৌধের মেঝেতে ৩০ লাখ পাথর বসানো হয়েছে। স্মৃতিসৌধের মাধ্যমে দেখানো হয়েছে লাল মঞ্চ, ২৩টি স্তম্ভ, এক লাখ বুদ্ধিজীবীর খুলি, ৩০ লাখ শহীদ, ১১টি সিঁড়ি, বঙ্গোপসাগর, ২১ ফেব্রুয়ারি, রক্তের সাগর এবং ঐক্যবদ্ধ সাড়ে সাত কোটি জনতা।
তারপর গেলাম জাদুঘরে। সেখানে সবাইকে ঢুকতে দেয়া হয়না তবে আমরা ছাত্র রিকুয়েস্ট করার পর ঢুকতে দিলো একটি ঘরে। সেখানে মুক্তিযুদ্ধের সময়ের বিভিন্ন ঘটনার স্থিরচিত্র রয়েছে। এছাড়া সেখানে যুদ্ধে অংশ নেয়া বিভিন্ন নেতৃত্ব প্রদানকারী নেতা, কর্নেল, মেজরের মুখাকৃতি রয়েছে।
এরমধ্যে এখানে পথে চলতে গিয়ে দেখলাম অত্যাধুনিক একটি মোটেল, আধুনিক মসজিদ, পোস্ট অফিস, ডিজিটাল টেলিফোন এক্সচেঞ্জ, প্রশাসনিক ভবন, মুক্তিযুদ্ধ স্মৃতিকেন্দ্র, প্রাথমিক বিদ্যালয়, আনসার ও ভিডিপি অফিস, রেস্ট হাউস ও ব্যারাক, পল্লী বিদ্যুৎ বোর্ড, অফিস ভবন, হেলিপ্যাড, পিকনিক স্পট, গাড়ি পার্কিং, পাবলিক টয়লেট, লন টেনিস কোর্ট। আরো দেখলাম ছয় দফার ভিত্তিতে ছয় ধরনের ছয়টি বিশাল বাহারি গোলাপ বাগান। সবকিছু দেখে মনে হবে মুজিবনগর কমপ্লেক্স ছোট একটি সাজানো গোছানো আধুনিক শহর।
পুরো এলাকা ঘুরে মনে হলো বংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সমস্ত ইতিহাস বুকে ধারণ করে আছে মুজিবনগর।’ স্মৃতিসৌধ থেকে আধা কিলোমিটার দূরে ভারত সীমান্ত দেখতে গেলাম। যদিও গেট পার হয়ে যেতে দেয়া হয়নি। সীমান্তের ওপারে পলাশী আম্রকানন। যেখানে অবিভক্ত বাংলার সূর্য অস্ত গিয়েছিল। আর এপারে সূর্যোদয় হয় বাংলার।
এরপর দুপুর দেড়টায় বাস ছেড়ে গেলাম শিলাইদহ রবীন্দ্রনাথ কুঠিবাড়ি। সেখানে ৩টায় নেমে প্রথমেই সবাই দুপুরের খাবার খেলাম। টিকিট কেটে ভেতরে ঢুকলাম। কুঠিবাড়িটি তিন তলা। রং লাল। নির্মাণ করেছিলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের পিতা মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ১৮৯১ সাল থেকে ১৯০১ সাল পর্যন্ত বিভিন্ন সময়ে এই কুঠিবাড়িতে অবস্থান করেছেন। এখানে অবস্থানকালে তিনি অনেক বিখ্যাত কবিতা, ছোট গল্প লিখেছেন। কথা ও কাহিনী, চিত্রা, চৈতালী ইত্যাদি তিনি এ বাড়িতে বসেই লিখেছেন। এ বাড়িতে বসেই তিনি তার বিখ্যাত কাব্যগ্রন্থ গীতাঞ্জলি ইংরেজীতে অনুবাদ করা শুরু করেছিলেন। জাদুঘরে রয়েছে রবীন্দ্রনাথের বিভিন্ন বয়সের অনেক প্রতিকৃতি । তাছাড়া আছে তাকে বহনকারী ছোট ও বড় আকারের ২টি পাল্কি। তার ব্যবহৃত চেয়ার, টেবিল, ওয়ারড্রব, খাট ইত্যাদি। এ বাড়িটি মোট ১১ একর জায়গার ঠিক মাঝখানে অবস্থিত। এখানে বছরের বিভিন্ন সময়ে উৎসবের আয়োজন করা হয়। কুঠিবাড়ি পরিদর্শনে এসেছেন অনেকেই। বেশিরভাগ তরুণ-তরুণী। আগ্রহভরে দেখছেন বিভিন্ন প্রদর্শনী। কুঠি বাড়ি পরিদর্শন শেষে বের হতেই গেটে পেলাম কুষ্টিয়ার বিখ্যাত কুলফি মালাই। খুবই সুস্বাদু। এরপর সাড়ে ৫টায় বের হয়ে গেলাম ছেঁউড়িয়ায় লালন আখড়ায়। ঢাকা-কুষ্টিয়া মহাসড়কের ডান দিকের সরু রাস্তা চলে গেছে লালনের সমাধির দিকে। একেবারেই পল্লী গ্রাম। নিস্তব্ধ,কোলাহলহীন। এরই মাঝখানে লালনের সমাধি সৌধ। সমাধি সৌধের অভ্যন্তরে মহাত্মা ফকির লালন সাঁই ও তার পালক মাতা মতিজান ফকিরানীর কবর। লালন সাঁই ১৮৯০ সালের ১৭ অক্টোবর ১১৬ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেন। প্রথমে তার শিষ্যরা লালনের মরদেহ তার ঘরের কাছে মাটিতে ঢেকে রাখেন। পরবর্তীতে মোহিনী মিলের মালিকের মায়ের সহযোগিতায় সমাধিটি পাকা করা হয়। আরও পরে পাকিস্তান আমলে লোকগীতি সংগ্রাহক মুহাম্মদ মনসুর উদ্দীনের প্রস্তাবে গড়ে উঠে ‘লালন লোক সাহিত্য কেন্দ্র’ এবং নির্মাণ করা হয় সুরম্য বর্তমান সমাধি সৌধ। লালন কমপ্লেক্সে আছে লালন একাডেমি, জাদুঘর ও লালন সঙ্গীত বিদ্যালয়। সঙ্গীত বিদ্যালয় অনেক বিখ্যাত শিল্পীর জন্ম দিয়েছে। এরাই সারা জনপদে ছড়িয়ে দিচ্ছেন মরমী সাধক লালন সাঁইয়ের অমর সৃষ্টি- ‘খাঁচার ভিতর অচিন পাখি/কেমনে আসে যায়/ ধরতে পারলে মনোবেড়ি/দিতাম তাহার পায়’ অথবা ‘আমি একদিনও না দেখিলাম তারে/আমার বাড়ির কাছে আরশিনগর/সেথা এক পড়শি বসত করে।’ এ রকম অজস্র গান। লালন একাডেমির উদ্যোগে এখানে প্রতিবছর কার্তিক মাসে লালন তিরোধান দিবস উপলক্ষে লালন উৎসব আয়োজন করা হয়। মেলায় হাজার হাজার লোক জমায়েত হয়। জানা যায় কালিগঙ্গা নদীর তীরেই অসুস্থ লালনকে পান তার পালক মা। রবীন্দ্রনাথের বজরায়ও যেতেন লালন সাঁই।
এখানে কিনলাম কুষ্টিয়ার বিখ্যাত তিলের খাজা। এছাড়া কুঠিবাড়ি ও মুজিবনগরে কিছু পছন্দসই জিনিস কিনেছিলাম। এরপর সন্ধ্যা সাড়ে ৭টায় ছেঁউড়িয়ার লালন আখড়া থেকে রাজশাহীর উদ্দেশ্যে বাস ছেড়ে সাড়ে ১১টটায় পৌছালাম।

পাপন সরকার শুভ্র

Close