নাগরিক মতামতপাবনাশিরোনাম-২

বিজয়ের হৃদয় বিদারক স্মৃতি

মকবুলা মনজুর শোভা

বিজয় তুমি এসেছো বারে বারে
বুকের পাজর ভেঙে দিয়ে মোরে,
কাঁদতে পরিনা, হাসতে পারিনা
বুকের জ্বালা সইতে পারি না।

এই ছিল মায়ের বিজয়ের আর্তনাদ। ডিসেম্বর মাস আসলে অনেক চাপা কষ্ট অনেক স্মৃতি লোকহর্ষক ব্যথা মনকে উতালা করে দেয়। মা চলে গেছে চিরতরে অথচ মায়ের কষ্টের কথাগুলো মুছে ফেলতে পারি না। ডিসেম্বরের আগমনেই উনার মনের গভীরে ঝড় উঠে যেত। ডিসেম্বর মাস এবং নামটা যেন ক্ষুধার্ত হায়নার মতো উনাকে ছোঁবল দিত। গোটা মাসটা অসুস্থ হয়ে পড়তেন। কিন্তু কেন অমন করতেন, কেউ কি তার কষ্টের ভাগিদার হতে পারতো? বিয়াল্লিস বৎসর তার জীবনের অনেক ধিক্কার নিয়ে কাটাতে হয়েছিল। উনি চলে গেছেন, হয়তো আমাদের সেই কষ্টের দিনগুলো পাড়ি দিতে হবে না। তবে স্মৃতিগুলো তো মুছে ফেলতে পারি না। এই মাস ৩০ লক্ষ জীবনের আত্মত্যাগের মাস। এই মাস আমাদের গর্বের মাস আনন্দর মাস মুক্তির মাস। অনেক কষ্ট যন্ত্রনা নির্যাতন সয়ে বাংলার মানুষ এই দিনটি পেয়েছে। আমরা তার মূল্যায়ন কি এতোটুকু করতে পেরেছি? দেশ স্বাধীন হয়েছে, মুক্ত হয়েছে, অর্থ হয়েছে, তবে শান্তি হারিয় ফেলেছি, ঘুম হারিয়ে ফেলেছি। মানুষের জীবনের নিরাপত্তা হারিয়ে গেছে। দূর্ণীতি ও সন্ত্রাসে ভরে গেছে দেশ। এটাই কি ৩০লক্ষ জীবনের আর ইজ্জতের প্রাপ্য? একাত্তরের সেই নির্যাতন নিপীরন বিধস্ত দেশ যারা দেখেছে, যারা স্বজন হারিয়েছে, হয়তো তারাই বুঝবে এই বিজয়ের মুল্য কত কষ্ট বা যন্ত্রনার। সাতচল্লিশ বৎসর পার হয়ে গেছে তবু স্মৃতিগুলো ভুলতে পারি নাই। শৈশব থেকে বড় হয়েছি রাজনৈতিক পরিবারে। বাবা ছিলেন একজন শিক্ষক মো. মোতাহার হোসেন আদর্শ রাজনীতিবিদ। উনার রাজনীতির কারনে বহু আদর্শবান চাচা এবং বড় ভাইদের মুখ দেখছি। তবে তখন বুঝতাম তনা কিছুই। অনুভূতি ছিল তাই অনেক স্মৃতি অন্তরে ঢাকা পড়ে আছে। মনের আয়নায় ভেসে বেড়ায়। আমার বাবার জ্ঞানের পরিধি সব ক্ষেত্রেই অনেক বেশি ছিল। কোন লোভ নেতৃত্বের লালসা উনার ছিল না। বঙ্গবন্ধুর আদর্শে কিভাবে এদেশ মুক্ত হবে, আমরা একটি স্বাধীন দেশ পাব এটাই ছিল উনার প্রত্যাশা। সে আদর্শ চেতনার কারণে উনার সর্বস্ব হারিয়ে ফেলেছিল একাত্তরের যুদ্ধে। নিজের জীবন বা পরিবারের দিক নজর ছিল না। বাবার আদর্শ চেতনায়, উনার পাঁচ ছেলেই বাবার হাত শক্ত মুঠে ধরেছিল। একইভাবে লেখাপড়া চাকরীর পাশে গড়ে উঠেছিল রাজনীতিতে। তাদের একটাই চেতনা ছিল মাতৃভূমি রক্ষা করার। সর্বশেষে আমার বাবা একাত্তরের স্বাধীনতার যুদ্ধে পাঁচ ছেলেকে মুক্তযুদ্ধে পাঠিয়ে দিয়েছিল। যুদ্ধে বাবার চার ছেলে সহ এক জামাতা প্রাণ দিয়েছিলেন। ভাগ্যক্রমে বড় ছেলে দুই দুবার পাক হানাদারদের হাত থেকে জীবন রক্ষা পেয়েছিলেন। এতো বাড় কষ্ট বা যন্ত্রনা বুকে নিয়ে একাত্তরের ৩০ ডিসেম্বর উনি সাংবাদিকদের বলেছিলেন ‘‘ও ধস ধ চৎড়ঁফ ঋধঃযবৎ ’’ যে ছবিটা সর্বপ্রথম ঢাকায় আলোচিত হয়েছিল। (আজ সেই একাত্তরের ছবি প্রকাশিত হলো।) সেই ছবি দেখে ঢাকা মধুবাগের বড় ভাইয়ের বাড়িতে শত শত মানুষের ভীড়। কত জ্ঞানীগুণী, কবি, সাহিত্যিক, রাজনীতিবিদ, সেনা অফিসার, মুক্তিবাহিনী, এবং সাধারণ মানুষ সব মিলিয়ে নানা পেশার মানুষ ছুটে আসতেন, আমার মা বাবাকে দেখবার জন্য মধুবাগের বাসায়। তখন বুঝতে পারি নাই, আমার বাবা কতটা দেশ প্রেমিক, উদার, মহৎ, এবং ত্যাগী ছিলেন। নইলে উনি কিভাবে ঐ মুহুর্তে সাংবাদিকদের কাছে ঐ কথাগুলো ব্যাক্ত করেছিলেন। যা ভাবতেই আমার শরীর এখনও ভারী হয়ে উঠে। আমাদের পরিবারের কষ্টটা হয়তো অনেক পরিবারের থেকে ভিন্ন। নিজেদের দুঃখের দিনগুলোর কথা, আজকের এই বিজয়ের আনন্দের পাশে আমার লেখাটা ভাল লাগবে না জানি, তবুও লিখছি হৃদয়ের গভীরে থাকা পুরনো স্মৃতির পাতা থেকে। ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ ভাইয়েরা সাধুপাড়া নিজ বাড়িতে মোটামুটি ক্যাম্প করেছিলেন। টেলিফোন অফিসের যুদ্ধের পর তারা সকল মুক্তিবাহিনী নিয়ে নানা রকম বুদ্ধি করে, যাহাতে পরবর্তীতে পাক সেনারা পাবনা ঢুকতে না পারে। নগরবাড়ি থেকে পাবনা পর্যন্ত সমস্ত রাস্তায় গাছ কেটে গতিরোধ করেছিল। মুক্তি বাহিনীদের খাওয়া দাওয়া আমাদের বাড়িতেই হতো। পরিস্থিতি খারাপ দেখে আমাদের পরিবারের সবাইকে গ্রামে পাঠিয়ে দেয়। ভাইয়েরা সবাইকে নিয়ে বাড়িতেই থাকতো। কয়েকদিন পরে পাক সেনারা বিশাল শক্তি নিয়ে আসে। যেখানে যা পেয়েছে পুড়িয়ে দিয়েছে, ভেঙে দিয়েছিল প্রতিটি এলাকা, আর সাধারণ মানুষগুলোকে ওরা পাখির মত হত্যা করেছে। সে মূহুতে তাদের মোকাবেলা করা কারো পক্ষেই সম্ভব ছিল না। সবাই পালিয়ে যায়, আমার ভাইয়েরা কিছুদিন গ্রামে লুকিয়ে থাকে, পরে ঢাকা চলে যায়। সেখানে গিয়ে উনারা গেরিলা যুদ্ধে অংশ নেন। উনাদের অনেক বন্ধু সহকর্মি সবাই একত্রে কাজ করতেন। জুন জুলাই মাস থেকেই উনারা অপারেশন শুরু করেন। ১৯৭১ সালের ৬ জুন প্রথম মালিবাগ পেট্রোল পাম্প উড়িয়ে দেন। ১৯৭১ সালের ১৮ জুলাই জি.পি.ও উড়িয়ে দেন। ২৬ জুলাই পুবাইলে ট্রেন উড়িয়ে দেন। এতে দুটি বগি ধ্বংস হয়ে যায়, অনেক সেনারা মারা যায়। এছাড়া খিলগায়ে এ. উ স্কুলে এবং মগবাজার পাওয়ার হাউজ অপারেশন চালিয়েছেন। প্রতিটি অপারেশন করেই উনারা গ্রামে চলে আসতেন। এরপরেও উনারা রাজধানীতে রাজাকার আলবদর যারা ছিল তাদের ভয় দেখিয়ে বেনামীপত্র (চরমপত্র) পাঠাতেন। পাবনায় পাক সেনারা আসার কয়েকদিন পরেই এলকায় কিছু মানুষের সহযোগিতায় আমাদের সাধুপাড়া বাড়িতে, লুট করে নেয় এবং আগুনে পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল সব কিছু। রাজাকার তো পাবনা থেকেই যুদ্ধের শুরুতেই পিছে লেগেছিল। যার দরুন দীর্ঘ্য নয় মাস আমাদের, গ্রামে এবং ঢাকাতে কাটাতে হয়েছিল। ১৯৭১ সালের ০৫ ডিসেম্বর সকালে ভাইদের ৬জন বন্ধু আসে ঢাকার বাসায়। প্রায় ঘন্টা খানেক পরে অঞ্জু রঞ্জু ভাই সহ সবাই একটা অপারেশনে রওনা দেয়। বাবা মাকে বলে যায় , ৮ তারিখে আমরা ফিরে আসবে। দুঃভাগ্য বসত ৮ ডিসেম্বর ঢাকার অদুরে রূপগঞ্জে পাক আর্মিদের সঙ্গে সম্মুখ যুদ্ধে অঞ্জু রন্জু ভাই তাদের তিনজন বন্ধুসহ নিহত হয়। ১১ডিসেম্বর থেকে সমস্ত ঢাকা কারফিউ ছিল। ঐ অবস্থায় রাতের অন্ধকারে দুই ভাই মুকুল মনজু সহপাঠি যোদ্ধা সহকারে বাসায় আসেন, বাবা মাকে দেখবার উদ্দেশ্যে। এসেই অঞ্জু রঞ্জু ভাইয়ের খোঁজ নেন। উনাদের ৮তারিখে ফেরার কথা ছিল, অথচ না ফেরার কারণে সবার চিন্তা বেড়ে যায়। ১৯৭১ সালের ১২ ডিসেম্বর রবিবার দুপুর ৪টায় পাক সেনারা আমাদের বাসার চারপাশে মেশিনগান সেট করে, এবং আর্মিরা পজিশন নিয়েছিল। ভাইয়েরা বুঝতে পারে নাই উনাদের ধরবার জন্য এতো প্রস্তুতি। বাবা মা সহ সবাই নির্বাক স্তম্ভিত হয়ে যায়। তার মাঝেও ভাইয়েরা অল্পসুরে শান্তনা দিয়েছিল, তোমরা ভয় পেয় না, চারদিকে ইন্ডিয়ান আর্মি ওদের ঘিরে ফেলেছে, তাই ওরা এভাবে পজিশন নিয়ে আছে। কিছুক্ষণ পরে আমাদের সবাইকে দোতলা থেকে নামিয়ে নিচে বাসার সামনে বসায়। পাক আর্মিরা দোতলায় যেয়ে সমস্ত তল্লাশি করে। পাকসেনাদের হাতে অনেক লেখা কাগজ ছিল। সেগুলো পড়ে ভাইদেরকে কাছে ডাকে। ভাইয়েরা কাছে গেলে, সবার নাম জিজ্ঞাসা করে। ভাইয়েরা ছদ্দ নাম বলে, তাতে তারা রেগে যায়। এরপর বড় ভাইয়ের নাম এবং অঞ্জু রঞ্জু কোথায় জিজ্ঞেস করে, ভাইয়েরা বলে তাদের আমরা চিনি না। তখন ভীষণ জোরে ধমক দিয়ে বলে, তোমরা সব মিথ্যা বলছো, আমাদের সঙ্গে চল। দুই ভাই মকুল মঞ্জু ও ভগ্নিপতি সহ দুইজন বন্ধু ছিল। পাঁচজনকে গাড়িতে তুলে নিয়ে আরো অনেক প্রশ্ন করে। উনারা কোন উত্তর না দেওয়াতে সবার চোখ বেঁধে নিয়ে যায়। সেই মূহুর্তে আমরা কেউ বুঝতে পারি নাই, আমার ভাইয়েরা চিরতরে আমাদের ছেড়ে চলে যাবেন। সেই দিন সেই ক্ষণ চলে গেছে, কত ভয়াবহ দিনগুলো। অসহনীয় যন্ত্রনার মাঝে কেটেছে। খুব কষ্ট হয় যখন ভাবি পাকসেনারা কিভাবে জানলো আমার ভাইয়েরা মুক্তিযোদ্ধা ছিল। কিভাবে জানলো ১০ই মধুবাগ বাসায় আমার ভাইয়েরা অবস্থান করছে। কে বা কারা, পাকসেনাদের হাতে ওতোগুলো লিখিত কাগজ তুলে দিয়েছিল? আমার ভাইয়েরা তো কাউকে ক্ষতি করে নাই। তাদের একটাই অপরাধ ছিল, তারা দেশকে ভালবাসতো, এদেশের মুক্তি চেয়েছিল, সুন্দর একটা বাংলাদেশ চেয়েছিল। সব চেয়ে বড় কষ্ট হয়, মাত্র কয়েকটা দিনের ব্যবধানে তাদের চেতনা ত্যাগ আর বিসর্জন দিয়ে যে কাঙ্খিত সপ্ন ছিল , সেই বিজয়ের সফলতা দেখে যেতে পারলো না। শুধু ভাবতাম ভাইয়েরা কখন স্বাধীনতার পতাকা নিয়ে বলবে ‘‘মা’’ আমরা তোমার বুকে ফিরে এসেছি, দেশ আজ সত্যিই জয় হয়েছে। এই প্রত্যাশাটুকু আমাদের দির্ঘ্যদিন কাঁদিয়েছিল। মুত্যুর আগ পর্যন্ত এই ব্যথা আমাদের তাড়িয়ে নিয়ে বেড়াবে।

বিঃ দ্রঃ লেখাটা কোন গল্প বা কল্প কাহিনী নয়। আমাদের পরিবারের জীবন থেকে নেওয়া অবিস্বরণীয় বাস্তুবচিত্র ।

লেখক -মকবুলা মনজুর শোভা, সাধুপাড়া, পাবনা।

Close