আন্তর্জাতিকছবি ঘরশিরোনাম

ইরানের ‘কঠোর প্রতিশোধ’ নেয়া শুরু

মার্কিন ঘাঁটিতে এক ঘণ্টার ব্যবধানে দ্বিতীয় হামলা ইরানের
অল ইজ ওয়েল : ইরানের হামলার পর ট্রাম্পের টুইট
সোলেইমানি হত্যার জবাব দেয়ার পক্ষে তুরস্ক
ইসরায়েল আমিরাতে হামলার হুমকি ইরানের
মধ্যপ্রাচ্যে বিমান চলাচলে যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা
তেলের দাম ৪.৫ শতাংশ বৃদ্ধি
সোলেইমানি হত্যা, কতটুকু সুবিধা পাবেন ট্রাম্প

আন্তর্জাতিক ডেস্ক: ইরাকে মার্কিন সামরিক ঘাঁটিতে প্রথম হামলার এক ঘণ্টা পর দ্বিতীয় ধাপে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালানো হয়েছে বলে জানিয়েছে ইরান। বুধবার দেশটির আধা-সরকারি সংবাদ সংস্থা তাসনিম নিউজ অ্যাজেন্সি এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানিয়েছে।
এতে বলা হয়েছে, ইরাকে মার্কিন সামিরক ঘাঁটিতে দ্বিতীয় ধাপে হামলা শুরু করেছে ইরান। তাসনিম নিউজ অ্যাজেন্সি বলছে, প্রথম হামলা চালানোর এক ঘণ্টা পর ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনী দ্বিতীয় দফায় হামলা চালিয়েছে।
ফরাসি বার্তাসংস্থা এএফপি বলছে, বুধবার সকালের দিকে ইরাকে মার্কিন সামরিক ঘাঁটিতে এক ডজনের বেশি ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করেছে ইরান। দেশটির বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর অভিজাত শাখা কুদস ফোর্সের প্রধান জেনারেল কাসেম সোলেইমানি হত্যাকাণ্ডের পর থেকে কঠোর প্রতিশোধের হুমকির মাঝে এই হামলা চালিয়েছে তেহরান।
পেন্টাগন বলছে, ইরাকে মার্কিন সামরিক ও মিত্র বাহিনীর ওপর এক ডজনের বেশি ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে ইরান। হামলার প্রাথমিক ক্ষয়ক্ষতির তথ্য মূল্যায়ন করা হচ্ছে।
পেন্টাগনের এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, এটা পরিষ্কার যে এসব ক্ষেপণাস্ত্র ইরান থেকে ছোড়া হয়েছে। ইরাকে আল-আসাদ ও ইরবিল সামরিক ঘাঁটিতে ইরানি ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাত হেনেছে। তবে হামলায় মার্কিন কোনো হতাহতের ঘটনা ঘটেছে কি-না তা জানা যায়নি।
হামলার ভিডিও প্রকাশ করেছে মার্কিন গণমাধ্যম সিএনএন।
ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনের খবরে বলা হয়েছে, জেনারেল কাসেম সোলেইমানি হত্যার প্রতিশোধ হিসেবে মার্কিন সামরিক ঘাঁটিতে হামলা চালানো হয়েছে। প্রতিশোধমূলক এই হামলার পরে যুক্তরাষ্ট্র কোনো ধরনের হামলা চালানোর চেষ্টা করলে তাদের সামরিক ঘাঁটিগুলো আরও ভয়াবহভাবে গুঁড়িয়ে দেয়া হবে বলে সতর্ক করে দিয়েছে ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনী।
গত ৩ জানুয়ারি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নির্দেশে ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর বিদেশি সশস্ত্র শাখা কুদস ফোর্সের প্রধান জেনারেল কাসেম সোলেইমানিকে ড্রোন হামলা চালিয়ে হত্যা করা হয়। ইরানি শীর্ষ এই সেনা জেনারেল হত্যাকাণ্ড ঘিরে মধ্যপ্রাচ্যে বাজছে যুদ্ধের দামামা। এর মাঝেই বুধবার ইরাকে মার্কিন সামরিক ঘাঁটি আক্রান্ত হলো।
অল ইজ ওয়েল : ইরানের হামলার পর ট্রাম্পের টুইট
ইরাকে মার্কিন দুটি সামরিক ঘাঁটিতে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলার পর দেশটির প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম টুইটারে এক বার্তা দিয়েছেন। টুইট বার্তার শুরুতে তিনি বলেছেন, সবকিছু ঠিক আছে। এতদূর, ভালো!
ক্ষেপণাস্ত্র হামলার পর নীরবতা ভেঙে টুইটে ট্রাম্প বলেছেন, সবকিছু ঠিক আছে! ইরাকে অবস্থিত দুটি সামরিক ঘাঁটিতে ইরান থেকে ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করা হয়েছে। এখন ক্ষয়ক্ষতি এবং হতাহতের তথ্য মূল্যায়ন করা হচ্ছে। যা হয়েছে, ভালো হয়েছে! আমাদের কাছে সবচেয়ে ক্ষমতাধর এবং সুসজ্জিত সামরিক বাহিনী রয়েছে। বিশ্বের যেকোনও স্থানে তারা রয়েছে।
বুধবার যুক্তরাষ্ট্রের স্থানীয় সময় সকালের দিকে তিনি ইরানের এই হামলার ব্যাপারে আনুষ্ঠানিক বিবৃতি দেবেন বলে টুইটে জানিয়েছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প।
সোলেইমানি হত্যার জবাব দেয়ার পক্ষে তুরস্ক
ইরানের জেনারেল সোলেইমানি হত্যার জবাব দেয়ার পক্ষে মত প্রকাশ করেছে তুরস্ক। দেশটির প্রেসিডেন্ট রজব তাইয়্যেব এরদোগান সিএনএন টার্ককে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, ‘তুরস্ক জেনারেল সোলেইমানি হত্যাকাণ্ডের বিষয়টিকে উদ্বেগের সঙ্গে পর্যবেক্ষণ করছে। তবে আমি মনে করি, যেকোনো দেশের উচ্চ পর্যায়ের কমান্ডারকে হত্যার ঘটনাকে বিনা জবাবে ছেড়ে দেয়া ঠিক হবে না,।’
তিনি বলেন, সোলেইমানি হত্যার বিষয়টি তাদের পরিকল্পিত ছিল। আমরা খবরটি শুনে হতবাক হয়ে যাই। আমি ট্রাম্পকে ইরানের সঙ্গে উত্তেজনা না বাড়ানোর জন্য পরামর্শ দিয়েছিলাম।
এর আগে ইরানের প্রেসিডেন্ট হাসান রুহানিকে ফোন করে কাসেম সোলেইমানি হত্যার ঘটনায় শোক ও সমবেদনা প্রকাশ করেন তুর্কি প্রেসিডেন্ট এরদোগান।
ইসরায়েল আমিরাতে হামলার হুমকি ইরানের
ইরাকে দুটি মার্কিন সামরিক ঘাঁটিতে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালানোর পর দুবাই এবং ইসরায়েলে বোমা হামলার হুমকি দিয়েছে ইরান। তেহরান বলছে, যুক্তরাষ্ট্র যদি ক্ষেপণাস্ত্র হামলার প্রতিশোধ নেয় তাহলে দুবাই এবং ইসরায়েলে হামলা চালানো হবে।
ক্ষেপণাস্ত্র হামলার প্রতিশোধ নেয়ার চেষ্টা করা হলে ওই অঞ্চলে মার্কিন মিত্ররা আক্রান্ত হবে বলে হুমকি দিয়েছে ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনী। ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা আইআরএনএ বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর এক বিবৃতি প্রকাশ করেছে।
এতে বলা হয়েছে, এই অঞ্চলে যারা তাদের ঘাঁটিগুলো মার্কিন সন্ত্রাসী বাহিনীকে ব্যবহারের জন্য দিয়েছে আমরা তাদের সবাইকে সতর্ক করছি যে, ইরানের বিরুদ্ধে যেকোনও ভূখণ্ড থেকে কোনও ধরনের আগ্রাসন চালানো হলে তারা তেহরানের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হবে।
ইরানের অপর এক রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন চ্যানেলের খবরেও সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাই ও ইসরায়েলের হাইফায় হামলা চালানোর হুমকি দেয়া হয়েছে। প্রেস টিভির এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত ৩ জানুয়ারি কুদস ফোর্সের প্রধান জেনারেল কাসেম সোলেইমানি হত্যার প্রতিশোধে বিপ্লবী গার্ড বাহিনী ওই হামলা চালিয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্যে বিমান চলাচলে যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা
মধ্যপ্রাচ্যে বিমান চলাচলে নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে যুক্তরাষ্ট্র। ফেডারেল এভিয়েশন অ্যাডমিন্সট্রেশন (এফএএ) মঙ্গলবার এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, ইরাক, ইরান এবং উপসাগরীয় অঞ্চলের আকাশসীমায় বেসামরিক বিমান চলাচলে নিষেধাজ্ঞা আনা হয়েছে। খবর সিএনএন।
মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে বলে জানিয়েছে এফএএ। এক বিবৃতিতে জানানো বলা হয়েছে, আমরা আমাদের নিরাপত্তা অংশীদারদের সঙ্গে যোগাযোগ অব্যাহত রেখেছি এবং এ বিষয়ে মার্কিন বিমান সংস্থা এবং বিদেশি বেসামরিক বিমান চলাচল সংস্থা গুলোকে তথ্য জানানো হচ্ছে।
তেলের দাম ৪.৫ শতাংশ বৃদ্ধি
ইরাকে মার্কিন সামরিক ঘাঁটিতে এক ঘণ্টার ব্যবধানে দু’বার হামলার ঘটনাকে কেন্দ্র করে বিশ্ববাজারে তেলের দাম বেড়ে গেছে।
অপরিশোধিত তেলের দাম এশিয়ার বাজারে অন্তত ৪ দশমিক ৫ শতাংশ বেড়ে প্রতি ব্যারেল তেল ৬৫ দশমিক ৬৫ ডলারে বিক্রি হচ্ছে।
মধ্যপ্রাচ্যের চলমান পরিস্থিতিতে তেলের সরবরাহ মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হতে পারে বলে উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়েছে। এছাড়া বিশ্ববাজারে স্বর্ণের দাম এবং জাপানি মুদ্রার দামও দ্রুত গতিতে বেড়ে গেছে।
একই সময়ে আন্তর্জাতিক বাজারে শেয়ার সূচকের মারাত্মক দরপতন ঘটেছে। জাপানের বেঞ্চমার্ক নিকির শেয়ার সূচকের পতন ঘটেছে ২২৫ পয়েন্ট যা শতকরা ২.৫ ভাগেরও বেশি। পশ্চিমা দেশগুলোতেও একই অবস্থা।

সোলেইমানি হত্যা, কতটুকু সুবিধা পাবেন ট্রাম্প
ইরানি জেনারেল কাশেম সোলেইমানি হত্যার প্রতিশোধ হিসেবে ইরাকে মার্কিন সামরিক ঘাঁটিতে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে ইরান। যুক্তরাষ্ট্র এবং ইরানের মধ্যে উত্তেজনা বাড়ছে। বিষয়টির দীর্ঘমেয়াদী বা যুদ্ধের দিকে যাবে কি না তা পরবর্তী কর্মকাণ্ডের ওপর নির্ভর করছে। তবে সোলেইমানি হত্যার বিষয়টি মার্কিন নির্বাচনে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠতে পারে, বিশ্ব মহলে এমনটাই ধারণা করা হচ্ছে।
বলা হচ্ছে, স্বল্পমেয়াদে এর কিছু সম্ভাব্য প্রভাব পড়তে পারে ডেমোক্র্যাট এবং রিপাবলিক প্রাইমারি প্রেসিডেন্ট বাছাই পর্বে, যা মাত্র একমাসের মাথায় শুরু হতে যাচ্ছে। এ বছর নভেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে।
একজন যুদ্ধকালীন প্রেসিডেন্ট?
প্রথাগতভাবে যখন যুক্তরাষ্ট্রের কোনো প্রেসিডেন্ট বড় ধরনের পররাষ্ট্রনীতির সংকটে থাকেন, তখন সে জনসমর্থনের দিক থেকে অন্তত কিছুদিনের জন্য কিছুটা সুবিধা এনে দেয়। ‘পতাকার চারদিকে দাঁড়াও’ মনোভাব ১৯৯১ সালে মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের সময় প্রেসিডেন্ট জর্জ এইচডব্লিউ বুশের জন্য সহায়ক হয়েছিল। নাইন ইলেভেন বোমা হামলা এবং আফগানিস্তানে বোমা হামলার পর প্রেসিডেন্ট বুশের জনপ্রিয়তা রেকর্ড ছুঁয়েছিল।
তবে ২০১১ সালে লিবিয়ায় বিমান হামলার পরে বারাক ওবামার জনপ্রিয়তার পারদে কোনো পরিবর্তন হয়নি। যখন রাসায়নিক অস্ত্র ব্যবহারের কারণে ডোনাল্ড ট্রাম্প সিরিয়ায় মিসাইল আক্রমণ করেন, তখন তার জনপ্রিয়তার পারদ সামান্য উঠেছিল। যদিও তার প্রেসিডেন্সির পুরো সময়টা জুড়ে তার জনপ্রিয়তা প্রায় একই রকম দেখা গেছে।
এদিকে সোলেইমানি হত্যার পর প্রথম জরিপে দেখা গেছে, যেভাবে ডোনাল্ড ট্রাম্প পরিস্থিতি সামলাচ্ছেন, তা নিয়ে জনমনে দ্বিমত তৈরি হয়েছে। এছাড়া ট্রাম্পের অন্যান্য যেসব কর্মকাণ্ড রয়েছে সেখানেও এক রকম দ্বিমত রয়েছে। জনসংখ্যার একটি অংশ তার পদক্ষেপকে সমর্থন করেছেন। আবার আরেকটি অংশ উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন যে, প্রেসিডেন্ট সতর্কতার সঙ্গে পরিকল্পনা করে পদক্ষেপ নিচ্ছেন না।
রিপাবলিকান সমর্থন
এ ক্ষেত্রে অবশ্য ডোনাল্ড ট্রাম্প তার দলের সমর্থকদের কাছ থেকে সমর্থন পাবেন- যেটা তিনি সবসময়ে তার বিতর্কিত বা আলোচিত সব পদক্ষেপেই পেয়েছেন। হাফিংটন পোস্টের জরিপে দেখা গেছে, ৮৩ শতাংশ রিপাবলিকান ওই ড্রোন হামলাকে সমর্থন করছেন।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে যারা সোলেইমানি হামলার জের নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন, তাদের বিপক্ষে একপ্রকার জবাব দেয়া হচ্ছে সমর্থকদের পক্ষ থেকে ‘তোমার ক্ষতির জন্য দুঃখিত।’ মধ্যপ্রাচ্যের এ নাটকের ফলে ডোনাল্ড ট্রাম্পের ইমপিচমেন্ট ঘটনাবলী থেকে জাতীয় নজর অন্যদিকে সরে গেছে এবং সিনেটে শুনানি বিলম্বিত হচ্ছে। সোমবার সকালে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের বেশ কয়েকটি টুইটেও সে বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে।
এদিকে কাশেম সোলেইমানিকে হত্যা নিয়ে হাফিংটন পোস্টের জরিপে বেশ কয়েকটি সুসংবাদ বেরিয়ে এসেছে রিপাবলিকান পদপ্রার্থী জো বাইডেনের জন্য, যেখানে ৬২ শতাংশ ডেমোক্র্যাটিক সমর্থক বলেছেন যে, ইরান প্রসঙ্গে তারা জো বাইডেনকে বিশ্বাস করেন। ফলে তিনি স্যান্ডার্স এবং ওয়ারেনের চেয়ে বেশ এগিয়ে রয়েছেন। তাদের ক্ষেত্রে এ হার ছিল ৪৭ শতাংশ। বরেন্দ্র বার্তা/অপস

Close