ছবি ঘরজাতীয়শিরোনাম

মহানায়কের স্বদেশ প্রত্যাবর্তন দিবস আজ

বরেন্দ্রবার্তা ডেস্ক: ১০ জানুয়ারি ১৯৭২। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান পাকিস্তানের কারাগার থেকে মুক্ত হয়ে ফিরে আসেন স্বাধীন বাংলাদেশে। শুরু হয়েছিল বাংলাদেশের এক নতুন অভিযাত্রা। বঙ্গবন্ধু ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণার পর মুক্তিযুদ্ধের নয় মাস তাকে থাকতে হয় পাকিস্তানের কারাগারের নির্জন প্রকোষ্ঠে। এ সময় প্রতিমুহূর্তে মৃত্যুর প্রহর গুনতে হয় মহান নেতাকে। তার আগমনের দিনটি এখনও অনেকের মনে গভীর আনন্দের স্মৃতি হয়ে আছে।
যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশে ১৯৭২ সালে বঙ্গবন্ধুর আগমন বাঙালী জাতির জন্য একটি বড় প্রেরণা হিসাবে কাজ করেছে। দীর্ঘ সংগ্রাম, ত্যাগ-তিতিক্ষা, আন্দোলন ও আত্মত্যাগের মাধ্যমে নয় মাসের মুক্তিযুদ্ধে বিজয় অর্জনের পর বিধ্বস্ত বাংলাদেশকে সামনে এগিয়ে নেয়ার প্রশ্নে বাঙালী যখন বাস্তবতার মুখোমুখি- তখন পাকিস্তানের বন্দীদশা থেকে মুক্তি পেয়ে স্বদেশ প্রত্যাবর্তন করেন সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালী। ২৯০ দিন পাকিস্তানের কারাগারে মৃত্যুযন্ত্রণা শেষে লন্ডন-দিল্লী হয়ে মুক্ত স্বাধীন স্বদেশের মাটিতে ফেরেন।
এর আগে পাকিস্তানের কারাগারে গোপনে বঙ্গবন্ধুকে হত্যার সকল প্রকার আয়োজন সম্পন্ন করেছিলেন পাকিস্তানের সামরিক জান্তা প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান। এ ঘটনা জানিয়ে বঙ্গবন্ধুকে মুক্তির জন্য পাকিস্তানের সামরিক জান্তাকে চাপ দেওয়ার অনুরোধ জানিয়ে ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী ৬৭টি দেশের সরকারপ্রধান ও রাষ্ট্রপ্রধানকে চিঠি দেন। অন্যদিকে তিনি ইউরোপের ৫টি দেশ ও যুক্তরাষ্ট্র সফর করে বিশ্বজনমত বঙ্গবন্ধু ও বাংলাদেশের অনুকূলে আনতে সক্ষম হন। ফলে পাকিস্তানের সামরিক জান্তার পক্ষে বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করা সম্ভব হয়নি।
১৯৭২ সালের ৮ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধু পকিস্তানী কারাগার থেকে মুক্তি পান। একটি পাকিস্তান সামরিক বিমানে খুব গোপনে বঙ্গবন্ধুকে লন্ডনে পাঠিয়ে দেয়া হয়। ঐ বিমানে আরও ছিলেন ড. কামাল হোসেন ও তার পরিবার। লন্ডনে সময় তখন ভোর ৮টা ৩০ মিনিট, ৯ জানুয়ারি ১৯৭২ সাল। স্বদেশে ফেরার জন্য বঙ্গবন্ধু ওঠেন ব্রিটিশ রাজকীয় বিমান বহরের কমেট জেটে। বাংলাদেশে ফেরার পথে বিমানটি দুই ঘণ্টার যাত্রা বিরতি করে দিল্লীতে। ভারতের তৎকালীন রাষ্ট্রপতি ভি ভি গিরি ও প্রধানমন্ত্রী শ্রীমতী ইন্দিরা গান্ধী বঙ্গবন্ধুকে অভ্যর্থনা জানান।
লন্ডনে এবং দিল্লী উভয় জায়গাতেই তিনি পেয়েছিলেন বীরোচিত সংবর্ধনা। ৮ জানুয়ারি সকাল ৭টায় বিবিসি’র ওয়ার্ল্ড সার্ভিসে প্রচারিত খবরে বলা হয়’ বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের নেতা শেখ মুজিবুর রহমান বিমানযোগে লন্ডনে আসছেন। কিছুক্ষণের মধ্যেই বিমানটি লন্ডনের হিথরো বিমানবন্দরে অবতরণ করবে।’
প্লেনটি বিমানবন্দরে অবতরণ করার পর নেমে বঙ্গবন্ধু ভিআইপি লাউঞ্জে আসলে তাকে ব্রিটিশ বৈদেশিক দফতরের উপস্থিত কিছু কর্মকর্তা স্বাগত জানান। কিছুক্ষণের মধ্যে সেখানে ব্রিটিশ ফরেন অফিসের দক্ষিণ এশিয়া বিভাগের প্রধান কর্মকর্তা স্যার ইয়ার মাদারল্যান্ড উপস্থিত হয়ে জানান ব্রিটিশ সরকার বঙ্গবন্ধুকে রাষ্ট্রীয় অতিথির মর্যাদা দিয়েছেন। সকাল ৮টার মধ্যেই বঙ্গবন্ধুকে ব্রিটিশ সরকারের সম্মানিত অতিথি হিসেবে লন্ডনের কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত ক্যারিজেস হোটেলে নিয়ে আসা হয়। অল্প সময়ের মধ্যে ব্রিটিশ লেবার পার্টির নেতা (পরে প্রধানমন্ত্রী) হ্যারল্ড উইলসন বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে দেখা করতে এসে বলেন ‘গুড মর্নিং মি. প্রেসিডেন্ট।’
বঙ্গবন্ধুর উপস্থিতির কথা জেনে হাজার হাজার বাঙালী হোটেল ঘিরে ‘জয়বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু’ স্লোগান দিয়ে আকাশ-বাতাস মুখরিত করে। দুপুরের দিকে এক জনাকীর্ণ সাংবাদিক সম্মেলনে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বলেন ‘এক মুহূর্তের জন্য আামি বাংলাদেশের কথা ভুলিনি, আমি জানতাম ওরা আমাকে হত্যা করবে আমি আপনাদের সঙ্গে দেখা করার সুযোগ পাব না, কিন্তু আমার জনগণ মুক্তি অর্জন করবে।’
বঙ্গবন্ধু যখন লন্ডনে পৌঁছেন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী এ্যাডওয়ার্ড হিথ ছিলেন লন্ডনের বাইরে। বঙ্গবন্ধুর পৌঁছানোর কথা শুনে পূর্বনির্ধারিত কর্মসূচী বাতিল করে প্রধানমন্ত্রী হিথ ১০নং ডাউনিং স্ট্রিটে ছুটে আসেন। প্রধানমন্ত্রী হিথ তাকে নজীরবিহীন সম্মান দেখান। ইতিহাস সাক্ষী ঐদিন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী হিথ নিজে তাঁর কার্যালয়ের বাইরে এসে গাড়ির দরজা খুলে দাঁড়িয়ে রইলেন, যতক্ষণ শেখ মুজিব গাড়ি থেকে বেরিয়ে না এলেন।
১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি বাংলাদেশের চিত্র এ রকম- সকাল থেকেই তেজগাঁও বিমানবন্দরের রাস্তার দু’পাশে দাঁড়িয়ে সারিবদ্ধ মানুষ। বাংলাদেশ বেতার থেকে ধারাবিবরণী দেয়া হচ্ছিল। বিমানবন্দর ও রাস্তার দু’পাশে অপেক্ষমাণ জনতা। অন্যরকম উত্তেজনা সবার চোখেমুখে। বাঙালীর মহান নেতা আসছেন। লাখো মানুষের ভিড় রাজপথজুড়ে। কণ্ঠে ‘জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু।’ অবশেষে অপেক্ষার পালা শেষ। বঙ্গবন্ধু এলেন।
যে দেশ এবং যে স্বাধীনতার জন্য জীবনবাজি রেখেছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, সেই মাটিতে পা দিয়েই আবেগে কেঁদে ফেলেন। বিমানবন্দরে অস্থায়ী সরকারের সদস্য, মুক্তিযোদ্ধা সবাই অশ্রুসজল নয়নে বরণ করেন ইতিহাসের এই বরপুত্রকে।
তেজগাঁও বিমানবন্দরে বঙ্গবন্ধুকে বহনকারী বিমানটি অবতরণ করার পর খোলা গাড়িতে দাঁড়িয়ে জনসমুদ্রের ভেতর দিয়ে রেসকোর্স ময়দানে এসে পৌঁছাতে আড়াই ঘণ্টা সময় লাগে। সেদিনকার রেসকোর্স ময়দান ছিল লোকে লোকারণ্য।
বাঙালী জাতির অবিসংবাদিত নেতা রেসকোর্স ময়দানে প্রায় ১৭ মিনিট জাতির উদ্দেশে গুরুত্বপূর্ণ ভাষণ দেন। যা ছিল জাতির জন্য দিকনির্দেশনা। বাংলাদেশের আদর্শগত ভিত্তি কী হবে, রাষ্ট্র কাঠামো কী ধরনের হবে, পাকিস্তানী বাহিনীর সঙ্গে যারা দালালী ও সহযোগিতা করেছে তাদের কী হবে, বাংলাদেশকে বহির্বিশ্ব স্বীকৃতি দেয়ার জন্য অনুরোধ, মুক্তিবাহিনী, ছাত্র সমাজ, কৃষক, শ্রমিকদের কাজ কী হবে, এসব বিষয়সহ বিভিন্ন দিক নিয়ে নির্দেশনা। তিনি ডাক দিলেন দেশ গড়ার সংগ্রামে। রেসকোর্স ময়দানে উপস্থিত মন্ত্রমুগ্ধ জনতা দু’হাত তুলে সেই সংগ্রামে ঐক্যবদ্ধভাবে ঝাঁপিয়ে পড়ার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন।

নিচে পুরো ভাষণটি তুলে ধরা হলো-

আমি প্রথমে স্মরণ করি আমার বাংলাদেশের ছাত্র, শ্রমিক, কৃষক, বুদ্ধিজীবি জনগণকে, হিন্দু মুসলমানকে যাদের হত্যা করা হয়েছে আমি তাদের আত্মার মঙ্গল কামনা করি।
আমি আপনাদের কাছে দু-এক কথা বলতে চাই। আমার বাংলাদেশ আজ স্বাধীন হয়েছে, আমার জীবনের সাধ আজ পূর্ণ হয়েছে, আমার বাংলার মানুষ আজ মুক্ত হয়েছে। আমি আজ বক্তৃতা করতে পারবো না। বাংলার ছেলেরা, বাংলার মায়েরা, বাংলার কৃষক, বাংলার শ্রমিক, বাংলার বুদ্ধিজীবি যে ভাবে সংগ্রাম করেছে আমি কারাগারে বন্দী ছিলাম, ফাঁসি কাষ্ঠে যাবার জন্য প্রস্তুত ছিলাম কিন্তু আমি জানতাম আমার বাঙালি কে দাবায় রাখতে পারবে না। আমি আমার সেই যেই ভাইয়েরা জীবন দিয়েছে তাদের আমি শ্রদ্ধা নিবেদন করি তাদের আত্মার মাগফেরাত কামনা করি।
আজ প্রায় ৩০ লক্ষ মানুষ কে মেরে ফেলা হয়ে হয়েছে ২য় বিশ্ব যুদ্ধে ১ম বিশ্ব যুদ্ধেও এত মানুষ এত সাধারন জনগণকে মৃত্যু বরণ করে নাই শহীদ হয় নাই যা আমার ৭ কোটির বাংলায় করা হয়েছে। আমি জানতাম না আমি আপনাদের কাছে ফিরে আসবো আমি খালি একটা কথা বলেছিলাম, তোমরা যদি আমাকে মেরে ফেলে দাও কোন আপত্তি নাই মৃত্যুর পরে তোমরা আমার লাশটা আমার বাঙ্গালির কাছে দিয়ে দিও এই একটা অনুরোধ তোমাদের কাছে।
আমি মোবারকবাদ জানাই ভারত বর্ষের প্রধানমন্ত্রী শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধী কে,আমি মোবারকবাদ জানাই ভারতবর্ষের জনগণকে আমি মোবারকবাদ জানাই ভারতবর্ষের সামরিক বাহিনীকে,আমি মোবারকবাদ জানাই রাশিয়াকে জনগণকে,আমি মোবারকবাদ জানাই জার্মানি, ব্রিটিশ, ফ্রান্স সব জায়গার জনগণকে তাদের আমি মোবারকবাদ জানাই যারা আমাকে সমর্থন করেছে।
আমি মোবারকবাদ জানাই আমেরিকার জনসাধারণ কে, মোবারকবাদ জানাই সারা বিশ্বের মজলুম জনগণকে যারা আমার এই মুক্ত সংগ্রাম কে সাহায্য করেছে। আমার বলতে হয় ১ কোটি লোক এই বাংলাদেশ থেকে ঘর বাড়ি ছেড়ে ভারতবর্ষে আশ্রয় নিয়েছিলো ভারতের জনসাধারণ মিসেস ইন্দিরা গান্ধী তাদের আশ্রয় দিয়েছেন তাদের আমি মোবারকবাদ না দিয়ে পারি না। যারা অন্যরা সাহায্য করেছেন তাদেরামার মোবারকবাদ দিতে হয়।
তবে মনে রাখা উচিত বাংলাদেশ স্বাধীন রাষ্ট্র।বাংলাদেশ স্বাধীন থাকবে বাংলাদেশকে কেউ দমাতে পারবে না। বাংলাদেশকে নিয়ে ষড়যন্ত্র করে লাভ নাই। আমি যাবার আগে বলেছিলাম ও বাঙালি এবার তোমাদের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম আমি বলেছিলাম ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোল তোমরা ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তুলে সংগ্রাম করছো আমি আমার সহকর্মীদের মোবারক বাদ জানাই। আমার বহু ভাই বহু কর্মী আমার বহু মা-বোন আজ দুনিয়ায় নাই তাদের আমি দেখবো না।
আমি আজ বাংলার মানুষ কে দেখলাম, বাংলার মাটি কে দেখলাম, বাংলার আকাশ কে দেখলাম বাংলার আবহাওয়া কে অনুভব করলাম। বাংলাকে আমি সালাম জানাই আমার সোনার বাংলা তোমায় আমি বড় ভালোবাসি বোধহয় তার জন্যই আমায় ডেকে নিয়ে এসেছে।
আমি আশা করি দুনিয়ার সব রাষ্ট্রের কাছে আমার আবেদন আমার রাস্তা নাই আমার ঘাট নাই আমার খাবার নাই আমার জনগণ গৃহহারা সর্বহারা,আমার মানুষ পথের ভিখারী। তোমরা আমার মানুষ কে সাহায্য করো মানবতার খাতিরে তোমাদের কাছে আমি সাহায্য চাই। দুনিয়ার সকল রাষ্ট্র এর কাছে আমি সাহায্য চাই। তোমরা আমার বাংলাদেশকে তোমরা রিকোগনাইজ করো। জাতিসংঘের ত্রাণ দাও দিতে হবে, উপায় নাই দিতে হবে। আমি আমরা হার মানবো না আমরা হার মানতে জানি না। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন-
“সাত কোটি বাঙ্গালির হে মুগ্ধ জননী রেখেছো বাঙালি করে মানুষ করো নাই”
কবিগুরু আজ মিথ্যা কথা প্রমান হয়ে গিয়েছে। আমার বাঙালি আজ মানুষ।আমার বাঙালি আজ দেখিয়ে দিয়েছে দুনিয়ার ইতিহাসে এত লোক আত্মাহুতি, এত লোক জান দেয় নাই। তাই আমি বলি আমায় দাবায় রাখতে পারবা না।
আজ থেকে আমার অনুরোধ আজ থেকে আমার আদেশ আজ থেকে আমার হুকুম ভাই হিসেবে, নেতা হিসেবে নয় প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নয় প্রেসিডেন্ট হিসেবে নয়। আমি তোমাদের ভাই তোমরা আমার ভাই। এ স্বাধীনতা আমার পূর্ণ হবে না যদি বাংলার মানুষ পেট ভরে ভাত না পায়, এ স্বাধীনতা আমার পূর্ণ হবে না যদি বাংলার মা-বোনেরা কাপড় না পায়, এ স্বাধীনতা আমার পূর্ণ হবে না যদি এদেশের যুবক যারা আছে তারা চাকরি না পায়। মুক্তিবাহিনী, ছাত্র সমাজ তোমাদের মোবারকবাদ জানাই তোমরা গেরিলা হয়েছো তোমরা রক্ত দিয়েছো, রক্ত বৃথা যাবে না, রক্ত বৃথা যায় নাই।
একটা কথা একটা কথা আজ থেকে বাংলায় যেন আর চুরি ডাকাতি না হয়। বাংলায় যেন আর লুটতরাজ না হয়। বাংলায় যারা অন্য লোক আছে অন্য দেশের লোক, পশ্চিম পাকিস্তানের লোক বাংলায় কথা বলে না তাদের বলছি তোমরা বাঙালি হয়ে যাও। আর আমি আমার ভাইদের বলছি তাদের উপর হাত তুলো না আমরা মানুষ ,মানুষ ভালোবাসি।
তবে যারা দালালি করছে যারা আমার লোকদের ঘরে ঢুকে হত্যা করছে তাদের বিচার হবে এবং শাস্তি হবে। তাদের বাংলার স্বাধীন সরকারের হাতে ছেড়ে দেন, একজনকেও ক্ষমা করা হবে না। তবে আমি চাই স্বাধীন দেশে স্বাধীন আদালতে বিচার হয়ে এদের শাস্তি হবে। আমি দেখিয়ে দিতে চাই দুনিয়ার কাছে শান্তিপূর্ণ বাঙালি রক্ত দিতে জানে শান্তিপূর্ণ বাঙালি শান্তি বজায় রাখতেও জানে।
আমায় আপনারা পেয়েছেন আমি আসছি। জানতাম না আমার ফাসির হুকুম হয়ে গেছে আমার সেলের পাশে আমার জন্য কবর খোড়া হয়েছিলো। আমি প্রস্তুত হয়েছিলাম, বলেছিলাম আমি বাঙালি আমি মানুষ, আমি মুসলমান একবার মরে ২ বার মরে না। আমি বলেছিলাম আমার মৃত্যু আসে যদি আমি হাসতে হাসতে যাবো আমার বাঙালি জাত কে অপমান করে যাবো না তোমাদের কাছে ক্ষমা চাইবো না।
এবং যাবার সময় বলে যাবো জয় বাংলা, স্বাধীন বাংলা, বাঙ্গালি আমার জাতি, বাংলা আমার ভাষা, বাংলার মাটি আমার স্থান।
ভাইয়েরা আমার যথেষ্ট কাজ পরে রয়েছে আমার সকল জনগণকে দরকার যেখানে রাস্তা ভেঙে গিয়েছে নিজেরা রাস্তা করতে শুরু করে দাও। আমি চাই জমিতে যাও ধান বুনো, কর্মচারীদের বলি একজন ও ঘুষ খাবেন না। মনে রাখবেন তখন সুযোগ ছিলো না,আমি অপরাধ ক্ষমা করবো না।
ভাইয়েরা আমার যাওয়ার সময় আমাকে গ্রেফতার করে নিয়ে যায়। তাজউদ্দীন, নজরুলেরা আমাকে ছেড়ে যায়,আমি বলেছিলাম ৭ কোটি বাঙালির সাথে মরতে আমার ডেকো না।আমি আশীর্বাদ করছি ওরা কাঁদছিল আমি বলি তোরা চলে যা আমার আস্তা রইলো আমি এই বাড়িতে মরতে চাই।এটাই হবে বাংলায় জায়গা এখানেই আমি মরতে চাই ওদের কাছে মাথানত করে আমি পারবো না।
ডাঃ কামাল কে নিয়ে ৩ মাস জেরা করছে আমার বিরুদ্ধে সাক্ষী দাও কয়েকজন বাঙালি আমার বিরুদ্ধে সাক্ষী দিয়েছে তাদের আমরা জানি চিনি এবং তাদের বিচার ও হবে। আপনারা বুঝতে পারেন-
“নম নম নম সুন্দরী মম জননী জন্মভুমি গঙ্গার তীর সিন্ধ সুমীর জীবনও জুড়ালে তুমি”
আজ আমি যখন এখানে নামছি আমি আমার চোখের পানি ধরে রাখতে পারি নাই। যে মাটিকে আমি এত ভালোবাসি, যে মানুষ কে আমি এত ভালোবাসি, যে জাত কে আমি এত ভালোবাসি, আমি জানতাম না সে বাংলায় আমি যেতে পারবো কিনা। আজ আমি বাংলায় ফিরে এসেছি বাংলার ভাইয়েদের কাছে, মায়েদের কাছে, বোনদের কাছে। বাংলা আমার স্বাধীন, বাংলাদেশ আজ স্বাধীন।
পশ্চিম পাকিস্তানের ভাইদের বলি তোমরা সুখে থাকো। তোমার সামরিক বাহিনীর লোকেরা যা করেছে আমার মা বোনদের রেপ করেছে, আমার ৩০ লক্ষ লোককে মেরে ফেলে দিয়েছে, যাও সুখে থাকো। তোমাদের সাথে আর না শেষ হয়ে গেছে তোমরা স্বাধীন থাকো, আমিও স্বাধীন থাকি।
তোমাদের সাথে স্বাধীন দেশের নাগরিক হিসেবে বন্ধু হতে পারে তাছাড়া বন্ধু হতে পারেনা। তবে যারা অন্যায় ভাবে অন্যায় করেছে তাদের বিরুদ্ধে যথেষ্ট ব্যবস্থা করা হবে। আপনাদের কাছে আমি ক্ষমা চাই আমি আরেকদিন বক্তৃতা করবো একটু সুস্থ হয়ে লই। আপনারা চেয়ে দেখেন আমি সেই মুজিবর রহমান আর নাই। আমার বাংলার দিকে চেয়ে দেখেন সমান হয়ে গেছে জায়গা, গ্রাম এর পর গ্রাম পুড়ে গেছে এমন কোন পরিবার নাই যার মধ্যে আমার লোককে হত্যা করা হয় নাই।
কতবড় কাপুরুষ যে নিরপরাধ লোক কে এভাবে হত্যা করে এভাবে সামরিক বাহিনীর লোকেরা, আর তারা বলে কি আমরা পাকিস্তানের মুসলমান সামরিক বাহিনী ঘৃণা করা উচিত জানানো উচিত দুনিয়ার মধ্যে ইন্দোনেশিয়ার পরে বাংলাদেশই ২য় মুসলিম দেশ,ভারত ৩য়, পাকিস্তান ৪র্থ।
আমরা মুসলমান, মুসলমান মা বোনদের রেপ করে। আমার রাষ্ট্রে হবে সমাজতন্ত্র ব্যবস্থা। এই বাংলাদেশে হবে গণতন্ত্র এই বাংলাদেশে হবে ধর্ম নিরপেক্ষ রাষ্ট্র। যারা জানতে চান আমি বলে দিবার চাই আসার সময় দিল্লিতে শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধীর সাথে কথা হয়েছে আমি আপনাদের বলতে পারি তাকে জানি আমি তাকে আমি শ্রদ্ধা করি সে পন্ডিত নেহেরুর কন্যা সে মতিলাল নেহেরুর ছেলের মেয়ে। তারা রাজনীতি করেছে ত্যাগ করেছে তারা আজকে ভারতের প্রধানমন্ত্রী হয়েছে যেদিন আমি বলবো সেদিন ভারতের সৈন্য বাংলার মাটি ছেড়ে চলে যাবে এবং তিনি আস্তে আস্তে কিছু সরিয়ে নিচ্ছেন।
যে সাহায্য তিনি করেছেন আমি আমার ৭ কোটি বাঙালির পক্ষ থেকে তাকে, তার সরকার কে ভারতের জনগণকে শ্রদ্ধা অন্তরের অন্তঃস্থল থেকে মোবারকবাদ জানাই।
ব্যক্তিগতভাবে এমন কোন রাষ্ট্র প্রধান নাই যার কাছে তিনি আপিল করেন নাই শেখ মুজিব কে ছেড়ে দিতে। তিনি নিজে ব্যক্তিগত ভাবে দুনিয়ার সকল রাষ্ট্রে কাছে বলেছেন তোমরা ইয়াইয়া খান কে বল শেখ মুজিব কে ছেড়ে দিতে একটা রাজনৈতিক সমাধান করতে। ১কোটি লোক নিজের মাতৃভূমি ছেড়ে অন্য দেশে চলে গেছে? এমন অনেক দেশ আছে যেখানে লোক সংখ্যা ১০ লাখ, ১৫ লাখ, ২০ লাখ, ৩০ লাখ, ৪০ লাখ, ৫০ লাখ। শতকরা ৬০ ভাগ দেশে লোকসংখ্যা ১ কোটির কম আর আমার বাংলা থেকে ১ কোটি লোক মাতৃভূমির মায়া ত্যাগ করে ভারতে স্থান নিয়েছিলো কত অসুস্থ হয়ে মারা গেছে, কত না খেয়ে কষ্ট পেয়েছে, কত ঘর বাড়ি জ্বালিয়ে দিয়েছে এই পাষাণদের দল।
ক্ষমা করো আমার ভাইয়েরা ক্ষমা করো আজ আমার কারো বিরুদ্ধে প্রতিহিংসা নাই একটা মানুষকে তোমরা কিছু বলো না অন্যায় যে করেছে তাকে সাজা দিবো আইন নিজের হাতে তুলে নিও না। মুক্তিবাহিনীর ছেলেরা তোমরা আমার সালাম গ্রহন করো, ছাত্রসমাজ তোমরা আমার সালাম গ্রহন করো, শ্রমিকসমাজ তোমরা আমার সালাম গ্রহন করো, বাংলার হতভাগ্য হিন্দু-মুসলমান আমার সালাম গ্রহন করো।
আর আমার কর্মচারী পুলিশ, ইপিআর যাদের উপর মেশিনগান চালিয়ে দেয়া হয়েছে, যারা মা বোন ত্যাগ করে পালিয়ে গিয়েছে তার স্ত্রীদের ধরে কুর্মিটোলা নিয়ে যাওয়া হয়েছে তোমাদের আমি সালাম জানাই, তোমাদেরকে আমি শ্রদ্ধা জানাই।
নতুন করে গড়ে উঠবে এই বাংলা,বাংলার মানুষ হাসবে বাংলার মানুষ খেলবে বাংলার মানুষ মুক্ত হয়ে বাস করবে বাংলার মানুষ পেট ভরে ভাত খাবে এই আমার সাধনা এই আমার জীবনের কাম্য আমি যেন এই কথা চিন্তা করেই মরতে পারি এই আশীর্বাদ এই দোয়া আপনার আমাকে করবেন। এই কথা বলে আপনাদের কাছে থেকে বিদায় নিবার চাই। আমার সহকর্মী দের আমি ধন্যবাদ জানাই যাদের আমি যে কথা বলে গিয়েছিলাম তারা সকলে একজন একজন করে প্রমাণ করে দিয়ে গেছে মুজিব ভাই বলে গিয়েছে তোমরা সংগ্রাম করো, তোমরা স্বাধীন করো, তোমরা জান দাও বাংলার মানুষ কে মুক্ত করো।
আমার কথা চিন্তা করো না আমি চললাম যদি ফিরে আসি আমি জানি আমি ফিরে আসতে পারবো না আজ আল্লাহ আছে তাইআজ আমি আপনাদের কাছে ফিরে এসেছি। তোমাদের আমি মোবারকবাদ জানাই আমি জানি কি কষ্ট তোমরা করছো। আমি কারাগারে ছিলাম ৯ মাস আমাকে কাগজ দেয়া হয় নাই। এ কথা সত্য আসার সময় ভুট্টো আমায় বললেন শেখ সাব দেখেন ২ অংশের কোন একটা বাঁধন রাখা যায় নাকি আমি বললাম আমি বলতে পারি না আমি বলতে পারবো না আমি কোথায় আছি বলেত পারি না আমি বাংলায় গিয়ে বলবো আজ বলছি ভুট্টো সাহেব সুখে থাকো বাঁধন ছিঁড়ে গেছে আর না। তুমি যদি কোন বিশেষ শক্তির সাথে গোপন করে আমার বাংলার স্বাধীনতা হরণ করতে চাও মনে রেখ দলের নেতৃত্ব দিবে শেখ মুজিবুর রহমান মরে যাব স্বাধীনতা হারাতে দিবো না।
ভাইয়েরা আমার, আমার ৪ লক্ষ বাঙালি আছে পাকিস্তানে আমি অনুরোধ করবো তবে একটা জিনিস আমি বলতে চাই ইন্টারন্যাশনাল ফোরামে জাতিসংঘের মাধ্যমে অথবা ওয়ার্ল্ড জুরির পক্ষ থেকে ১টা ইনকোয়ারি হতে হবে কি পাশবিক অত্যাচার কিভাবে হত্যা করা হয়েছে আমার লোকেদের এ সত্য দুনিয়ার মানুষকে জানতে হবে। আমি দাবী করবো বাংলাদেশ জাতিসংঘ কে বাংলাদেশ কে আসন দাও এবং ইনকোয়ারি করো। ভাইয়েরা আমার যদি কেউ চেষ্টা করেন ভুল করবেন আমি জানি ষড়যন্ত্র শেষ হয় নাই সাবধান বাঙালিরা ষড়যন্ত্র শেষ হয় নাই।
একদিন বলেছিলাম ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তুলো,একদিন বলেছিলাম যার যা কিছু আছে তা নিয়ে যুদ্ধ করো,বলেছিলাম এ সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম এ জায়গায় ৭ মার্চ। আজ বলছি তোমরা ঠিক থাকো একতাবদ্ধ থাকো,কারো কথা শুনো না।
ইনশাল্লাহ স্বাধীন যখন হয়েছি স্বাধীন থাকবো একজন মানুষ এই বাংলাদেশে বেঁচে থাকতে এই সংগ্রাম চলবে। আজ আমি আর বক্তৃতা করতে পারছি না একটু সুস্থ হলে আবার বক্তৃতা করবো। আপনারা আমাকে মাফ করে দেন আপনারা আমাকে দোয়া করেন আপনারা আমার সাথে সকলে একটা মুনাজাত করেন। বরেন্দ্র বার্তা/অপস

Close