গোদাগাড়িশিরোনাম

গোদাগাড়ীতে গরু চুরি রোধে রাত জেগে পাহারায় গ্রামবাসী

মুক্তার হোসেন,গোদাগাড়ী: জহর হোসেনের সম্বল ছিলো দুটি বলদ। কিন্তু ছেলে অসুস্থ বলে তিনি এই বলদ দুটিই বিক্রির সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। দরদাম চলছিলো। একজন ক্রেতা দুটি বলদের দাম ১ লাখ ৮৫ হাজার টাকা দিতেও চেয়েছিলেন। কিন্তু জহর বিক্রি করতে পারেননি। তার আগেই চোরে নিয়ে গেছে বলদ দুটি।
জহরের বাড়ি রাজশাহীর গোদাগাড়ী উপজেলার নিলবোনা গ্রামে। গত ১ মাস পূর্বে রাতে তার বলদ দুটি গোয়াল থেকে চুরি হয়েছে। জহর বলেন, হাল চাষ করেই তার সংসার চলে। কিন্তু হালের বলদ বিক্রি করেই চিকিৎসার জন্য ছেলেকে ভারতে নিয়ে যেতে চেয়েছিলেন। কিন্তু তার আগেই চোর গোয়াল ফাকা করে দিয়েছে। এখন তিনি নিঃশ্ব। ছেলের জীবন নিয়েই তিনি এখন শঙ্কায় আছেন।শুধু জহর একা নন। গোদাগাড়ীর দেওপাড়া ও গোগ্রাম ইউনিয়নের অনেকেরই গরু চুরি হয়েছে সম্প্রতি। এতে কৃষকরা আতঙ্কিত। তাই চুরি ঠেকাতে অন্তত ২০টি গ্রামের মানুষ রাত জেগে নিজেদের গরু পাহারা দিচ্ছেন। দুটি গ্রামের মানুষ তো টর্চ লাইট আর লাঠি নিয়ে সারারাত গ্রামে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। গ্রাম দুটি হলো- খারিজাগাতি মোল্লাপাড়া ও নিমতলা। আর বিয়ানাবোনা, কানাইডাঙ্গা, নীলবোনা, ছয়ঘাঁটি, চাঁপাল, পালপুর, বিড়ইল, দমদমা, আগোলপুর, শ্রীরামপুর, মালিগাছা, ধরমপুর ও কমলাপুরসহ আশপাশের কয়েকটি গ্রামের মানুষ রাতে বাড়িতেই জেগে থাকছেন।
এলাকাবাসী জানান, শীতের শুরু থেকে এসব এলাকায় গরু চোরের উপদ্রব বেড়ে গেছে।ফলে তারা নিজেরাই এখন রাত জেগে পাহারা শুরু করেছেন। নিমতলা ও খারিজাগাতি মোল্লাপাড়া গ্রামের মানুষ পালা করে দল বেধে লাঠি ও টর্চ লাইট নিয়ে গ্রাম পাহারা দিচ্ছেন।গত ১২ জানুয়ারী নিমতলা গ্রামের মুস্তাক আলীর দুইটি এড়ে গরু চুরি হয়। ১০ জানুয়ারি রাতে নাজিরপুর গ্রামের মুক্তিযোদ্ধা লাল মোহাম্মদের বাড়ি থেকে তিনটি গরু চুরি হয়েছে। এর আগে ৩ জানুয়ারি একই গ্রামের বাসিন্দা দেওপাড়া ইউনিয়ন পরিষদের সংরক্ষিত নারী ওয়ার্ডের সদস্য রওশন আরা বেগমের বাড়ি থেকে একটি গাভি চুরি হয়েছে। এছাড়া ১ জানুয়ারি দমদমা গ্রামের নাজিম উদ্দিনের চারটি, ২৬ ডিসেম্বর কামিরপাড়া গ্রামের শাহজাহান আলীর দুটি, ১৫ ডিসেম্বর ছয়ঘাঁটি গ্রামের আলহাজ¦ রায়হান সরকার এর দুইটি, ৫ সেপ্টেম্বর কানাইডাঙ্গা গ্রামের মুক্তিযোদ্ধা আবদুল মতিনের দুটি, একই রাতে ওই গ্রামের মোস্তাক আলীর দুটি এবং ২৮ আগস্ট মানিক মিয়ার একটি গরু চুরি হয়েছে। এগুলোর মধ্যে ১৭ টি দেওপাড়া ইউনিয়ন পরিষধের অধিনস্ত এলাকাই বাকী ৪টি গোগ্রাম এলাকাই । একের পর এক গরু চুরিতে ভীষণ ক্ষুব্ধ হয়ে উঠেছেন গ্রামের মানুষ। গত এক সপ্তাহ ধরে চোর ধরতে রাত জেগে তারা পাহারা দিতে শুরু করেছেন।উপজেলার দেওপাড়া ইউপির খারিজাগাতি মোল্লাপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সামনে একটি দোকানে বসে ছিলেন ৮-১০ জন যুবক। তাদের কাছে টর্চ লাইট,লাঠি ও বাশি নিয়ে গরু চুরি ঠেকাতে পালা করে তারা গ্রাম পাহারা দিচ্ছেন।
এখন রাত গভীর হয়নি বলে দোকানে বসে আড্ডা দিছেন। রাত গভীর হলে তারা লাঠি হাতে ঘুরে বেড়াবেন। গত এক সপ্তাহ ধরে তাদের এমন পাহারা চলছে বলেও জানান তারা।গ্রামের বাসিন্দা মোসলেম আলী বলেন, এলাকাটি প্রেমতলী পুলিশ তদন্ত কেন্দ্রের আওতায়। গরু চুরির বিষয়ে তদন্ত কেন্দ্র এবং থানায় গেলে অভিযোগ নেয়া হয় না। পুলিশ বলে, তদন্ত কেন্দ্রে একটামাত্র গাড়ি। সেটা দিয়ে চারটি ইউনিয়নে টহল দেয়া সম্ভব না। তাই তারা নিজেরাই পাহারা দিচ্ছেন। আরেক বাসিন্দা সুমন হোসেন বলেন, পুলিশ একটা চোরকেও ধরতে পারেনি। সমাবেশে পুলিশ এলে বলব- আমাদের গরু তো চোরেই নিয়ে যাচ্ছে। তার চেয়ে বরং আপনারাই নিয়ে যান।
চুরি ঠেকাতে এলাকাবাসীর সাথে ১৮ জানুয়ারী শনিবার বিকালে খারিজাগাতি মোল্লাপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় মাঠে পুলিশের সঙ্গে গ্রামবাসীর এই সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। দেওপাড়া ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) এর আয়োজনে। সভাপতিত্বে করেন ইউপি চেয়ারম্যান আখতারুজ্জামান। সভায় উপস্থিত ছিলেন জেলা পুলিশের সহকারি পুলিশ সুপার ভারপ্রাপ্ত (গোদাগাড়ী সার্কেল) আবদুর রাজ্জাক ও গোদাগাড়ী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) খাইরুল ইসলাম আরও উপস্থিত দেওপাড়া ইউনিয় পরিষদের ইউপি সদস্য আসাদুল হক সহ সকল ইউপি সদস্য।
তাদের কাছে এলাকাবাসী তাদের গরুর নিরাপত্তা নিশ্চিতের দাবি জানান। সমাবেশে অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন ওয়ার্কার্স পার্টির জেলার সভাপতি রফিকুল ইসলাম পিয়ারুল। তিনি জানান, একের পর এক গরু চুরিতে গ্রামবাসী ক্ষিপ্ত। তারা গ্রাম পাহারা দিচ্ছেন। চোর ধরা পড়লে তারা যেন আইন নিজের হাতে তুলে না নেন তার জন্য সভার আয়োজন করা হয়। পুলিশের পক্ষ থেকে এলাকায় টহল বৃদ্ধির প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়েছে।গোদাগাড়ী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) খাইরুল ইসলাম বলেন, নিমতলা ও খারিজাগাতি মোল্লাপাড়া গ্রামে প্রচুর গরু আছে। অনেকের গরু গোয়ালে রাখার জায়গা না থাকার কারণে বাড়ির সামনেই খোলা জায়গায় রাখেন। তাই চুরি হতে পারে ওসি আরো বলেন, আপনাদের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে যেন গরু চুরি ঠেকাতে পারি সেই চেষ্টা করব। আমরা চাই আগের মতো আপনারা বাইরে গরু রেখে নিশ্চিন্তে ঘরে ঘুমাতে পারেন। আমি কথা দিচ্ছি, অধিক রাতে আর কোনো পুলিশ সাদা পোশাকে এই এলাকায় আসবে না। তিনি বলেন, গ্রামবাসীর রাতের পাহারা চলবে। আপনি গরু চোর ধরে আমাকে ফোন করবেন। আমি নিজে এখানে চলে আসব। তিনি তার ফোন নম্বর দিয়ে দেন। বলেন, সবাই মিলেই গরু চুরি ঠেকাবো। বরেন্দ্র বার্তা/অপস

Close