ছবি ঘরনাটোরশিরোনাম

রূপকথার আদর্শ গ্রাম হুলহুলিয়া: পুলিশ লাগেনা সেখানে, স্বাক্ষরতা শতভাগ

ষ্টাফ রির্পোট: নাটোরের সিংড়া উপজেলা চৌগাছা ইউনিয়নের একটি ছোট গ্রাম ‘হুলহুলিয়া’। জনসংখ্যা সাড়ে তিন হাজার। নিজস্ব গণতান্ত্রিক শাসন আর বিচার ব্যবস্থা দিয়ে পরিচালিত হচ্ছে গ্রামটি।
গ্রামটির রয়েছে নিজস্ব সংবিধান— এমনকি উচ্চ ও নিম্ন আদালতও। সকল বিরোধ এর মীমাংসা হয় সেখানেই।
এসএসসি পাস করা বাধ্যতামূলক এখানে। প্রতি ঘরে আছে আধুনিক স্যানিটেশন। নেই বাল্যবিয়ে কিংবা কোনো ধরনের কুসংস্কারও।রূপকথার আদর্শ গ্রাম হুলহুলিয়া: পুলিশ লাগেনা যে গ্রামে, স্বাক্ষরতা শতভাগ
দেশের মোট ৬৮ হাজার গ্রামের মতোই একটি সাধারণ গ্রাম এটি। তবে একটি ব্যতিক্রমী উদ্যোগ গ্রামটিকে করে তুলেছে অনন্য সাধারণ। দেশের মানুষের কাছে হুলহুলিয়া এখন পরিচিত আদর্শ গ্রামের প্রতিচ্ছবি হিসেবে।
আর্থিকভাবে স্বচ্ছল এ গ্রামের বেশিরভাগ বাসিন্দাদের প্রধান পেশা কৃষিকাজ। তবে গ্রামের স্বাক্ষরতার হারও শতভাগ। প্রতিটি বাড়িতেই এক বা একাধিক উচ্চ শিক্ষিত মানুষ রয়েছেন। অনেকেই বর্তমানে দেশ-বিদেশে উচ্চ পর্যায়ে চাকরি করছেন। এমনকি মাধ্যমিক বা উচ্চ মাধ্যমিক পাশ করাদেরও এ গ্রামে অর্ধশিক্ষিত হিসেবে গণ্য করা হয়। শিক্ষার প্রতি হুলহুলিয়ার বাসিন্দাদের এমন আগ্রহ সত্যিই প্রশংসার দাবিদার।
একটি আদর্শ গ্রাম হিসেবে হুলহুলিয়ার সুনাম শুধু নাটোর নয়, সারাদেশেই ছড়িয়ে রয়েছে। নিজস্ব সংবিধান, বিচার ও শাসন ব্যবস্থাই গ্রামটিকে একটি আদর্শ গ্রামে পরিণত করেছে। তাছাড়া এ গ্রামে মারামারি, হানাহানি, বিরোধের ঘটনা খুবই কম। যখন এমন ধরণের ঘটনা ঘটে তখন নিজেদের আদলতেই এর বিচার ও মিমাংসা হয়।
ব্রিটিশ আমল থেকে এ গ্রামে গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থা চালু থাকলেও ১৯৫৭ সাল থেকে নির্বাচনের মাধ্যমে গ্রামের পরিচালনা কমিটি গঠিত হয়ে আসছে। ‘হুলহুলিয়া সামাজিক পরিষদ’ নামের ২৩ সদস্য বিশিষ্ট ওই কমিটিতে একজন চেয়ারম্যান, একজন সহকারী চেয়ারম্যান ও ২১ জন নির্বাহী সদস্য থাকে। প্রতিটি পাড়া থেকে দুইজন করে সদস্য নির্বাচিত হয়। এছাড়া পাঁচজন উপদেষ্টাও থাকে। প্রতি দুই বছর পর পর গ্রামবাসীর প্রত্যক্ষ ভোটের মাধ্যমে এ পরিষদ নির্বাচিত হয়।রূপকথার আদর্শ গ্রাম হুলহুলিয়া: পুলিশ লাগেনা যে গ্রামে, স্বাক্ষরতা শতভাগ
পরিচালনা পরিষদটি গ্রামের আর্থ সামাজিক উন্নয়ন, বিচার ব্যবস্থা ও ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানসহ যাবতীয় কর্মকাণ্ড পরিচালনা করে থাকে। এর জন্য গ্রামের একটি সংবিধানও রয়েছে। যার মাধ্যমে গ্রামের বিচার ও শাসন ব্যবস্থা পরিচালিত হয়। বিভিন্ন কর্মকাণ্ড বাস্তবায়নের জন্য সদস্যদের ওপর দায়িত্ব অর্পণ করা হয়।
এছাড়া গ্রামের হানাহানি, মারামারি, জমি সংক্রান্ত বিরোধসহ বিভিন্ন জটিল বিষয় নিষ্পত্তির জন্য গ্রামে একটি সংসদ ভবন ও আদালত রয়েছে। আদালতে গ্রামের সকল সমস্যা সমাধান করে ওই পরিচালনা পরিষদ। নির্বাচিত সদস্যরই আদালতে বিচারের দায়িত্ব পালন করেন।রূপকথার আদর্শ গ্রাম হুলহুলিয়া: পুলিশ লাগেনা যে গ্রামে, স্বাক্ষরতা শতভাগ
ব্রিটিশ আমল থেকে শুরু হওয়া এ ব্যতিক্রমী উদ্যোগের কারণে গত ২০০ বছরের ইতিহাসে এ গ্রামের কোন মামলা এখন পর্যন্ত আদালতে ওঠেনি। ফলে এই দীর্ঘ সময়ের মধ্যে পুলিশেরও এ গ্রামে আসার প্রয়োজন হয়নি।
‘হুলহুলিয়া’ নাটোর জেলা সদর থেকে ৩৮ কিলোমিটার এবং সিংড়া থানা থেকে ১৩ কিলোমিটার দূরে চলনবিলের মাঝে অবস্থিত। ছোট বড় বিভিন্ন প্রজাতির সবুজ গাছে ঘেরা এ গ্রামের জনসংখ্যা প্রায় তিন হাজার। মোট ১১টি পাড়া নিয়ে গঠিত এ গ্রামে ভোটারের সংখ্যা এক হাজার ৩৫০ জন। গ্রামের মাঝ দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে ‘নিয়ামত খাল’ নামের একটি ছোট নদী, যা এ গ্রামের সৌন্দর্যকে অনেকগুণ বাড়িয়ে তুলেছে। তাছাড়া গ্রামটিতে আরো রয়েছে ছোট-বড় অনেকগুলো পুকুর।
সারাদেশের হানাহানি, মারামারি, বিরোধের মধ্যে হুলহুলিয়া যেনো অন্য এক শান্তির বাংলাদেশ।। বাস্তবতার আলোকে এটি সত্যিই বিষ্ময়কর এক গ্রাম। বরেন্দ্র বার্তা/অপসরূপকথার আদর্শ গ্রাম হুলহুলিয়া: পুলিশ লাগেনা যে গ্রামে, স্বাক্ষরতা শতভাগ

Close