মহানগরশিরোনাম

রাজশাহী নগর আওয়ামী লীগে হাইব্রিড ঠেকাতে একজোট নেতাকর্মীরা

নিজস্ব প্রতিবেদক: রাজশাহী মহানগর আওয়ামী লীগের সম্মেলন পহেলা মার্চ। সম্মেলন উপলক্ষে এরই মধ্যে তোড়জোড় শুরু হয়ে গেছে। এখন পুরোদমে চলছে শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি। তবে এবার সম্মেলনে ঠাঁই পাচ্ছেন না বিতর্কিত ও অনুপ্রবেশকারীরা। তৃণমূলের দাবি, তাদের মতামতের ওপর ভিত্তি করেই হোক মহানগর আওয়ামী লীগের সম্মেলন। তাই মহানগরে পদ পেতে চলছে নেতাদের দৌড়ঝাঁপ। নিজ নিজ শক্তি ও বলয়ে চলছে লবিং-গ্রুপিং। সভাপতি পদে আলোচনায় রয়েছেন বর্তমান সভাপতি এএইচএম. খায়রুজ্জামান লিটন। এছাড়া পদ প্রত্যাশীদের তালিকায় রয়েছেন বজলুর রহমান ও জেলা আওয়ামী লীগের সদ্য বিদায়ী সভাপতি ওমর ফারুক চৌধুরীর নাম।
যদিও তাদের মধ্যে মহানগর আওয়ামী লীগ সভাপতি পদে সিটি মেয়র এএইচএম খায়রুজ্জামান লিটনই রয়েছেন এগিয়ে। এ পদে কোনো পরিবর্তন আসছে না। কেন্দ্রে ঠাঁই না হওয়ায় রাজশাহী মহানগর কমিটিতেই তিনি অধিষ্ঠিত হচ্ছেন। অন্তত এমনটাই দাবি রাজশাহী মহানগর আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের। এখন পর্যন্ত সভাপতি পদে রাজশাহীতে লিটনের বিকল্প কাউকেই দেখছেন না তারা। তবে মহানগর আওয়ামী লীগের সাবেক ভারপ্রাপ্ত সভাপতি বজলুর রহমান সভাপতি পদ পেতে এরই মধ্যে হাই কমান্ডের কাছে দৌড়ঝাঁপ শুরু করেছেন। তদ্বির ও লবিং চালাচ্ছেন। এছাড়া খবর চাউর হয়েছে, রাজশাহী-১ আসনের সংসদ ও রাজশাহী জেলা আওয়ামী লীগের সদ্য বিদায়ী সভাপতি ওমর ফারুক চৌধুরী সভাপতি হতে ইচ্ছে প্রকাশ করেছেন। মেয়র খায়রুজ্জামান লিটন এবং রাজশাহী-১ আসনের সংসদ সদস্য ওমর ফারুক চৌধুরী আপন ফুফাতো মামাতো ভাই।
তবে গত ডিসেম্বরে অনুষ্ঠিত জেলা আওয়ামী লীগের সম্মেলনকে ঘিরে তাদের মধ্যে দূরত্ব সৃষ্টি হয়েছে। কারণ জেলা আওয়ামী লীগের সম্মেলন আয়োজনের সমন্বয়ক ছিলেন লিটন।ওই সময় রাজশাহী জেলা আওয়ামী লীগের সম্মেলন সফল করতে খায়রুজ্জামান লিটনের গঠন করে দেওয়া কমিটির বিরোধিতা করেন জেলা আওয়ামী লীগের তৎকালীন সভাপতি ওমর ফারুক চৌধুরী। তবে দুইজন তাকে সমর্থন দিলেও উপস্থিত অন্য সদস্যরা লিটনের পক্ষে সমর্থন জানান। যে কারণে বিরোধিতা করেও শেষ পর্যন্ত কোনো লাভ হয়নি ফারুক চৌধুরীর।
সম্মেলন উপলক্ষে গত ১৮ নভেম্বর জেলা আওয়ামী লীগের ওই জরুরি সভা অনুষ্ঠিত হয়েছিল। জেলা আওয়ামী লীগের সম্মেলনের সমন্বয়ক হিসেবে দায়িত্বে থাকা নগরের সভাপতি খায়রুজ্জামান লিটন ওই সভা ডেকেছিলেন। জেলা কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত এ সভায় নেতাদের মতামতের ভিত্তিতে তিনিই সম্মেলন প্রস্তুতি কমিটি গঠন করে দেন। এতে আহ্বায়ক হিসেবে দায়িত্ব পেয়েছিলেন জেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সভাপতি মেরাজ উদ্দিন মোল্লা। এর পর অনুষ্ঠিত সম্মেলনে সভাপতি হন সেই মেরাজ উদ্দিন মোল্লা। তাই জেলায় পদ না পেয়ে এবার মহানগরের সভাপতি হওয়ার ইচ্ছা পোষণ করে মহানগরের রাজনীতিতে নতুন মেরুকরণ সৃষ্টি করতে চাইছেন ফারুক চৌধুরী; পর্যবেক্ষণের পর এ কথা জোর দিয়েই বলছেন নেতাকর্মীরা।
এদিকে, তার পরে থাকা বজলুর রহমান শুধু কর্মী বিচ্ছিন্নই নন, তিনি একজন গণবিচ্ছিন্ন নেতাও। বর্তমানে নেতাকর্মীদের সঙ্গে তার কোনো ধরনের যোগাযোগ নেই। তাই কেন্দ্র থেকে তার মতো নেতৃত্বকে চাপিয়ে দেওয়া হলে বিষয়টিকে অঘটন হিসেবেই দেখবেন তৃণমূল নেতাকর্মীরা, যেমনটি ঘটেছে সদ্য সমাপ্ত জেলা আওয়ামী লীগের সম্মেলনে ঘোষিত কমিটির ক্ষেত্রে। অপরদিকে সাধারণ সম্পাদক পদটি নিয়েও বর্তমানে চলছে নানান জল্পনা-কল্পনা। দলের ভেতরে ও বাইরে গুরুত্বপূর্ণ এই সাংগঠনিক পদটি নিয়ে ব্যাপক তোড়জোড় শুরু হয়েছে। এই তালিকায় রয়েছেন- বর্তমান সাধারণ সম্পাদক দলের তরুণ নেতা ডাবলু সরকার। তিনি আবারও এই পদে আসতে চাইছেন।
দলীয় সূত্রগুলো বলছে, গত ছয় বছরে মহানগর, থানা ও ওয়ার্ড কমিটিগুলোতে ডাবলু সরকার নিজস্ব একটি বলয় তৈরি করে ফেলেছেন। দিন কিংবা রাত, একেবারে সাধারণ কর্মীরা ডাকলেও তাৎক্ষণিকভাবে সাড়া দেন ডাবলু সরকার। ছুটে যান, সবার বিপদ-আপদে পাশে দাঁড়ান। তাই তাকে ছাড়া কাউকে ভাবছেন না সাধারণ কর্মীরা। তার বাইরে মহানগর সাধারণ সম্পাদকের দৌড়ে রয়েছেন- বর্তমান কমিটির যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক নাইমুল হুদা রানা ও মোস্তাক হোসেন, রাবি ছাত্রলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক আহসানুল হক পিন্টু, রাজশাহী কলেজ ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি হাবিবুর রহমান বাবু। এছাড়া সিটি কর্পোরেশনের প্যানেল মেয়র-১ সরিফুল ইসলাম বাবু ও সাবেক ছাত্রলীগ নেতা জুবায়ের রুবনের নামও রয়েছে দলীয় কর্মীদের আলোচনায়।
তবে পদপ্রত্যাশীদের দাবি তৃণমূলের রাজনীতি থেকে উঠে আসাদেরই নেতৃত্বে আনা উচিত। প্রায় ছয় বছর পর রাজশাহীতে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে মহানগরের সম্মেলন। তাই তৃণমূলের প্রত্যাশা তাদের মতামতের প্রতিফলন ঘটুক। কেন্দ্র থেকে চাপিয়ে দিয়ে নয়, তাদের প্রত্যক্ষ মতামতের ভিত্তিতেই হোক আগামী দিনের কমিটি। মহানগরীর ২১নং ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ইসমাঈল হোসেন বলেন, ‘দীর্ঘ সময় ঘুরে সম্মেলন এলে তৃণমূলেরও একটা আশা থাকে যে এবার হয়তো তাদের মতামতের মূল্যায়ন হবে। নিজেদের পছন্দ মতো নেতা নির্বাচন করতে পারবে। কিন্তু অনেক সময়ই তা হয় না। এতে তৃণমূলের কর্মীরা উপেক্ষিত হয়। তাই তাদের প্রত্যাশা, এবার মহানগরের শীর্ষ নেতা নির্বাচন করার ক্ষেত্রে তাদের মতামত নেওয়া হবে। তারাই নির্বাচিত করবেন আগামী দিনের নেতা।’
মহানগরীর বোয়ালিয়া থানা (পূর্ব) আওয়ামী লীগের সভাপতি আতিকুর রহমান কালু বলেন, ‘তৃণমূলের ভোটে সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হলে নেতা নির্বাচনে তাদের অনেক কিছু করার থাকে। কিন্তু কেন্দ্রের সিদ্ধান্তে সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হলে আর তাদের কিছু করার থাকে না।’ এবার তেমনটি হবে না এমনটাই প্রত্যাশা তার। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় (রাবি) ছাত্রলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক আহসানুল হক পিন্টু বলেন, ‘সকলের কাছে গ্রহণযোগ্যতা সৃষ্টি করে এবার রাজশাহী মহানগর আওয়ামী লীগের সম্মেলনে চাঁদাবাজ সন্ত্রাসী দুর্নীতিবাজ ও দখলবাজ মুক্ত কমিটি করতে হবে। কোনো অনুপ্রবেশকারী বা হাইব্রিড নেতাকে পদ দেওয়া যাবে না।’
রাজশাহী কলেজ ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি ও মহানগর কমিটির সাবেক প্রচার সম্পাদক হাবিবুর রহমান বাবু বলেন, ‘৯৬-এর পর থেকে আওয়ামী লীগ অনেক বেশি সুসংগঠিত হয়েছে। তবে দলের মধ্যে অনেক অনুপ্রবেশকারী রয়েছেন। আওয়ামী লীগ ধারাবাহিকভাবে ক্ষমতায় থাকার কারণে দলে অনেক হাইব্রিড নেতাও তৈরি হয়েছে। এমন হাইব্রিড নেতা মহানগরের আগামী কমিটিতে প্রত্যাশা করি না। আর দিলে মানবোও না।’
রাজশাহী মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি ও সিটি মেয়র এএইচএম খায়রুজ্জামান লিটন বলেন, ‘বিভিন্ন সময় বিভিন্ন স্বার্থ নিয়ে যারা দলে অনুপ্রবেশ করেছে এবং চিহ্নিত হয়েছে, তাদেরকে কোনোভাবেই মূল কমিটিতে বা কোনো স্তরেই নেওয়ার সুযোগ নেই। সবকিছু ঠিক থাকলে তৃণমূল নেতাকর্মীদের মতামতের ভিত্তিতেই এবার নেতা নির্বাচন হবে বলে আশা করছি।’ তিনি আরো বলেন, ‘আগামী পয়লা মার্চ রাজশাহী মহানগর আওয়ামী লীগের সম্মেলন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকীর শুভ উদ্বোধনও একই মাসে হবে। দুইটি বিষয়কে মাথায় রেখেই এই মহানগরীকে সাজিয়ে তোলা হবে। দেখার মতো একটি সম্মেলন হবে। শান্তির শহর রাজশাহীতে শান্তি ও সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশে সম্মেলন এবং পরবর্তীতে মুজিববর্ষ উদ্যাপন হবে বলে আশা করছি।’

এই অবস্থায় রাজশাহী মহানগর সম্মেলনকে ঘিরে নেতাকর্মীদের মাঝে উদ্দীপনা থাকলেও সম্ভাব্য নেতৃত্ব নিয়ে এক ধরনের শঙ্কাও ভর করেছে তাদের মনে। নেতাকর্মীদের মতামত উপেক্ষা করে দুর্বল নেতৃত্ব চাপিয়ে দেওয়া হলে রাজশাহীতে আওয়ামী লীগ আবারও নব্বই দশকের মতো নেতাসর্বস্ব সংগঠনে পরিণত হবে। হতাশায় সংগঠন থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়বেন নেতাকর্মীরা। তাই তৃণমূল নেতাকর্মীরা চাচ্ছেন- কর্মীবান্ধব নেতৃত্ব। যারা কর্মীদের বিপদে-আপদে পাশে থাকবেন।
নতুন কমিটিতে শীর্ষ পদ পেতে এবং নেতাকর্মীদের নজরে আসতে এরই মধ্যে সম্ভাব্য প্রার্থীরা নানান কৌশলে মাঠে নেমে পড়েছেন। পদপ্রত্যাশীরা তৃণমূলের সমর্থন পেতে ঘুরছেন ওয়ার্ডে ওয়ার্ডে। এদিকে, সম্মেলন উপলক্ষে মঙ্গলবার (১১ ফেব্রুয়ারি) রাতে রাজশাহী মহানগর আওয়ামী লীগ সভাপতি ও সিটি মেয়র এএইচএম খায়রুজ্জামান লিটনের সভাপতিত্বে কুমারপাড়ায় দলীয় কার্যালয়ে কার্যনির্বাহী কমিটির এক সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভা পরিচালনা করেন নগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ডাবলু সরকার।
সভায় আগামী পয়লা মার্চ সম্মেলন সফল করতে নয়টি উপ-কমিটি গঠন করা হয়। মাদ্রাসা মাঠে সম্মেলনের স্থান নির্ধারণ করা হয়। এর আগে সর্বশেষ রাজশাহী মহানগর আওয়ামী লীগের সম্মেলন হয় ২০১৪ সালের ২৫ অক্টোবর। ওই কাউন্সিলে এএইচএম খায়রুজ্জামান লিটন ও ডাবলু সরকার সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। বর্তমানে মহানগর আওয়ামী লীগের পাঁচটি সাংগঠনিক থানা ও ৩৭টি ওয়ার্ড কমিটি আছে। ২০১৪ সালের কাউন্সিলর দিয়েই এবারের মহানগরের কাউন্সিল করার সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হয়েছে। সেই হিসাবে এবার কাউন্সিল হবে ৩৯৫ জন পুরোনো কাউন্সিলর দিয়েই। বরেন্দ্র বার্তা/ফকবা/অপস

 

Close