জাতীয়শিরোনাম

যুদ্ধপরাধী আবদুস সুবহানের মৃত্যু

বরেন্দ্র বার্তা ডেস্ক: জামায়াতের সাবেক নায়েবে আমির আবদুস সুবহানের মৃত্যু ঘটেছে। শুক্রবার দুপর ১টা ৩৩ মিনিটে ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি।
একাত্তরে মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে প্রাণদণ্ডে দণ্ডিত হয়ে দীর্ঘ সাত বছর ধরে সুবহান কারান্তরীণ ছিলেন। সবশেষ তিনি কাশিমপুর কারাগারে বন্দি ছিলেন। সেখানে বাথরুমে পড়ে গিয়ে আহত হন। এর পর আর সুস্থ হয়ে উঠেননি তিনি। গত ২৪ জানুয়ারি আবদুস সুবহানকে কাশিমপুর কারাগার থেকে ঢাকা মেডিকেলে আনা হয়। আজ সেখানে চিকিৎসাধীন তার মৃত্যু হয়।
পাবনা সদর আসনের সাবেক সংসদ সদস্য আবুল বাশার মোহাম্মদ আবদুস সুবহান মিয়া ওরফে আবদুস সুবহান ওরফে মাওলানা সুবহানের জন্ম ১৯৩৬ সালের ১৯ ফেব্রুয়ারি। পাবনার সুজানগর থানার মানিকহাটি ইউনিয়নের তৈলকুণ্ডি গ্রামে তার জন্ম। তার বাবার নাম শেখ নাঈমুদ্দিন, মায়ের নাম নুরানী বেগম।
১৯৫৪ সালে সিরাজগঞ্জ আলিয়া মাদ্রাসা থেকে তিনি কামিল পাস করেন। পরে তিনি পাবনা আলিয়া মাদ্রাসার হেড মাওলানা এবং আরিফপুরের উলট সিনিয়র মাদ্রাসার সুপারিনটেন্ডেন্টের দায়িত্ব পালন করেন।
পাবনা জেলা জামায়াতের কমিটি গঠনের সময় সুবহানকে আমিরের দায়িত্ব দেয়া হয়। পরে তিনি নিখিল পাকিস্তান জামায়াতে ইসলামের কেন্দ্রীয় শুরা সদস্য হন।
১৯৬২ থেকে ৬৫ সাল পর্যন্ত প্রাদেশিক পরিষদের সদস্য ছিলেন সুবহান। ১৯৭০ সালের নির্বাচনে অংশ নিয়ে আওয়ামী লীগের প্রার্থী আমজাদ হোসেনের কাছে তিনি পরাজিত হন।
একাত্তরে শান্তি কমিটি গঠন করা হলে পাবনা জেলা কমিটির সেক্রেটারির দায়িত্ব পান সুবহান। পরে তিনি ভাইস প্রেসিডেন্ট হন।
তার নেতৃত্বেই পাবনা জেলার বিভিন্ন থানায় শান্তি কমিটি, রাজাকার, আলবদর, আলশামস ও মুজাহিদ বাহিনী গঠিত হয়। এসব বাহিনীর সদস্য ও পাকিস্তানি সেনাদের সঙ্গে নিয়ে পাবনার বিভিন্ন গ্রামে ঘুরে মুক্তিযুদ্ধের দিনগুলোতে সুবহান হত্যা, লুটপাট, অপহরণ, নির্যাতনের মতো অপরাধ ঘটান বলে এ মামলার সাক্ষীদের বক্তব্যে উঠে আসে।
একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের শেষ দিকে ইয়াহিয়া সরকারের পতন দেখে জামায়াত নেতা গোলাম আযমের সঙ্গে সুবহানও পাকিস্তানে চলে যান। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর তিনি দেশে ফেরেন এবং পরে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন।
আবদুস সুবহান জামায়াতের শীর্ষস্থানীয় নেতা ছিলেন। দীর্ঘদিন ধরে রাজনীতি করায় সংগঠনে তার প্রভাব ছিল উল্লেখ করার মতো। তিনি দলীয় টিকিটে পাবনা-৫ আসন থেকে পাঁচবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। সবশেষ ২০০১ সালের নির্বাচনে চারদলীয় জোটের মনোনয়ন নিয়ে এমপি নির্বাচিত হন।
২০১৫ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি জামায়াতের এই প্রভাবশালী নেতাকে যুদ্ধাপরাধের দায়ে প্রাণদণ্ড দেন মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারে গঠিত আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল।
প্রসিকিউশনের আনা ৯টি অভিযোগের মধ্যে ছয়টি সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হওয়ায় মৃত্যু না হওয়া পর্যন্ত তাকে ফাঁসির রজ্জুতে ঝুলিয়ে দণ্ড কার্যকর করার আদেশ দেন ট্রাইব্যুনাল-২ এর চেয়ারম্যান বিচারপতি ওবায়দুল হাসান।
সুবহান হলেন জামায়াতের নবম শীর্ষ নেতা, যিনি একাত্তরের যুদ্ধাপরাধের দায়ে দোষী সাব্যস্ত হন।
প্রসিকিউশনের আনা ১ নম্বর অভিযোগে ঈশ্বরদী কেন্দ্রীয় জামে মসজিদ থেকে বের করে ২০ জনকে হত্যা; ৪ নম্বর অভিযোগে সাহাপুর গ্রামে ছয়জনকে হত্যা এবং ৬ নম্বর অভিযোগে সুজানগর থানার ১৫টি গ্রামে কয়েকশ মানুষকে হত্যার দায়ে সুবহানকে দেয়া হয় মৃত্যুদণ্ড।
২ নম্বর অভিযোগে পাকশী ইউনিয়নের যুক্তিতলা গ্রামে পাঁচজনকে হত্যা এবং ৭ নম্বর অভিযোগে সদর থানার ভাড়ারা ও দেবোত্তর গ্রামে অপহরণ ও হত্যার ঘটনায় সংশ্লিষ্টতা প্রমাণিত হওয়ায় তাকে দেয়া হয় আমৃত্যু কারাদণ্ড।
এ ছাড়া ৩ নম্বর অভিযোগে ঈশ্বরদীর অরণখোলা গ্রামে কয়েকজনকে অপহরণ ও আটকে রেখে নির্যাতনের ঘটনায় সংশ্লিষ্টতা প্রমাণিত হওয়ায় সুবহানকে পাঁচ বছরের কারাদণ্ড দেয়া হয়।
প্রসিকিউশন ৫, ৮ ও ৯ নম্বর অভিযোগ প্রমাণ করতে ব্যর্থ হওয়ায় এসব অভিযোগ থেকে সুবহানকে খালাস দেন আদালত।
রায়ের দিন সুবহানকে নির্দোষ দাবি করে তার ছেলে নেছার আহমদ নান্নু বলেছিলেন– রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হয়ে মিথ্যা মামলায় তাকে ফাঁসি দেয়া হয়েছে। বরেন্দ্র বার্তা/অপস

Close