নাগরিক মতামতশিরোনাম

যে কারণে ভাষণটি ‘ঐতিহাসিক’

চারদিকে ‘ভাষণের’ কোনো শেষ নেই। কিন্তু সব ভাষণই ঐতিহাসিক নয়। যুগান্তরে এক-আধটা ভাষণই কেবল ‘ঐতিহাসিক’ হয়ে উঠতে পারে। প্রধানত দুধরনের কারণে একটি ভাষণ ঐতিহাসিক হিসেবে পরিগণিত হয়। একটি ভাষণ যখন একাধারে ইতিহাসের ক্রান্তিকালীন মুহূর্তে সমগ্র ইতিবাচক ঐতিহাসিক পটভূমির সারবত্তাকে ধারণ করতে সক্ষম হয় এবং একই সঙ্গে নতুন ইতিহাস রচনার জন্য সেই মুহূর্তের নির্দিষ্ট কর্তব্যকে চিহ্নিত করতে সক্ষম হয়, তখনই সেটি ‘ঐতিহাসিক’ বলে গণ্য হওয়ার জন্য যোগ্য হয়। ‘ঐতিহাসিক’ ভাষণকে সে কারণেই হতে হয়, একই সঙ্গে ইতিহাসের ফসল ও স্রষ্টা দুটোই।

একটি ভাষণকে ঐতিহাসিক হতে হলে একই সঙ্গে তার উপস্থাপনা হতে হয় অনন্যসাধারণ। উভয় দিকের বিবেচনা দ্বারা স্থির হয় যে কোনো একটি ভাষণ ‘ঐতিহাসিক’ কিনা।

ইতিহাসে অনেক ‘ঐতিহাসিক’ ভাষণের খোঁজ পাওয়া যায়। সেসব কোনো কোনো ভাষণের প্রসঙ্গ মহাকাব্যে, নাটকে, উপন্যাসে, সাহিত্যে, সংগীতেও স্থান করে নিয়েছে। ধরা যাক, জুলিয়াস সিজারের অনুগত রোমান সেনাপতি মার্ক এন্থনির ভাষণের কথা। মার্ক এন্থনির অসাধারণ বাগ্মিতার গুণের কথা ইতিহাসেই খুঁজে পাওয়া যায়। সেই প্রামাণ্য তথ্যের ওপর নির্ভর করে ইংরেজ কবি উইলিয়াম শেক্সপিয়ার তার ‘জুলিয়াস সিজার’ নাটকে মার্ক এন্থনির একটি ঐতিহাসিক ভাষণ রচনা করে গেছেন। নাটকের দৃশ্যে ব্রুটাস প্রমুখ বিশ্বাসঘাতকদের ছুরিকাঘাতে সিজারের হত্যাকান্ডের পর, সিজারের ক্ষত-বিক্ষত লাশের পাশে দাঁড়িয়ে রোমের নাগরিকদের উদ্দেশে মার্ক এন্থনিকে সেই ঐতিহাসিক ভাষণটি প্রদান করতে দেখানো হয়েছে। ঘাতকদের বিরুদ্ধে কোনো কটুবাক্য বলা হবে না এবং কেবল সিজারকে শেষ সম্মান জানিয়ে কিছু বলা হবে, এই শর্তে অনুমতি নিয়ে এন্থনি তার ‘ঐতিহাসিক’ এক বক্তৃতায় ঘাতকদের অপপ্রচারে জন্ম নেওয়া সিজারবিরোধী মনোভাবকে সম্পূর্ণ উল্টিয়ে দিয়ে ঘাতকদের বিরুদ্ধে গণক্রোধে পরিণত করতে সক্ষম হন। ঘাতকরা তখন পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়। রোমের ইতিহাসের গতি ভিন্ন মোড় নেয়।

আমেরিকার গৃহযুদ্ধের একটি বিপজ্জনক ক্রান্তিকালে সেদেশের প্রেসিডেন্ট আব্রাহাম লিংকন গ্যাটিসবার্গ নগরে একটি ‘ঐতিহাসিক’ ভাষণ দেন। সর্বস্ব ত্যাগ করে হলেও দক্ষিণাঞ্চলের বর্ণবাদী-বিচ্ছিন্নবাদীদের অভিযানকে রুখে দিয়ে দেশের অখ-তা ও গণতান্ত্রিক শাসনের মর্মবাণীকে সমুন্নত রাখার জন্য তিনি জনগণের প্রতি আহ্বান জানান। যুদ্ধের গতি ঘুরিয়ে দেওয়ার ক্ষেত্রে এই ভাষণ বিশেষ ভূমিকা রাখে।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সূচনার সময়টাতে ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী উইন্সটন চার্চিল ইউরোপের মূল ভূখন্ডে হিটলারের সৈন্যদের আক্রমণের মুখে কোণঠাসা হয়ে পড়া ব্রিটিশ সৈন্যদের ইংলিশ চ্যানেল অতিক্রম করে পশ্চাদপসরণের কাজে যার যা কিছু আছে, তা দিয়ে সহায়তা করার জন্য ইংরেজ নাগরিকদের প্রতি আবেদন জানিয়ে এক আবেগময় ভাষণ দেন। এই কল্পনাতীত সফল পশ্চাদপসরণের অভিযানে জনগণ সব রকম পথে সহায়তা দিয়ে এক অসাধ্য সাধন করে। অধিকাংশ সৈন্য জীবন নিয়ে পালিয়ে আসতে সক্ষম হয়। হিটলারের হাতে ব্রিটেনের অনিবার্য পতন রোধ করে পরে সোভিয়েত ও আমেরিকাসহ এলাইড শক্তি গড়ে তুলে ফ্যাসিবাদী হিটলার বাহিনীর বিরুদ্ধে পাল্টা প্রতিরোধ যুদ্ধ পরিচালনা করা সম্ভব হয়। চার্চিলের সেই ভাষণটিও ছিল একটি ‘ঐতিহাসিক’ ভাষণ। এ ধরনের আরও ভাষণের কথা উল্লেখ করা যায়। যেমন কিনা ‘আজাদ হিন্দ ফৌজ’ গঠনের পর ভারতবাসীর উদ্দেশ্যে দেয়া নেতাজী সুভাষ বোসের ভাষণ, আমেরিকার রাজধানীর বর্ণবাদ বিরোধী লাখ লাখ মানুষের এক বিশাল র‌্যালিতে মার্টিন লুথার কিং (জুনিয়ারের) দেওয়া তার শেষ ভাষণ ইত্যাদি।

বলা হয়ে থাকে যে, ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ অপরাহে ঢাকার তৎকালীন রেসকোর্স ময়দানে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান যে ১৭ মিনিটের ভাষণটি দিয়েছিলেন, সেটি ছিল একটি ‘ঐতিহাসিক’ ভাষণ। আমার ধারণা, যারা তা বলে থাকেন তাদের মধ্যে অধিকাংশই প্রধানত অন্ধভক্তি ও ভাবাবেগের বশবর্তী হয়ে, কিংবা বঙ্গবন্ধুর প্রতি লোক দেখানো আনুগত্য প্রদর্শনের জন্য একটি কথার-কথা হিসেবে তা বলে থাকেন। ভাষণটিকে ‘ঐতিহাসিক’ আখ্যায়িত করার বস্তুনিষ্ঠ ও দৃঢ়মূল যুক্তি অনুসন্ধানের তেমন একটা চেষ্টা তারা করেন না। অথচ সেটি না করতে পারলে ভাষণটির মাহাত্ম্য ও অসাধারণত্ব অনুধাবন করা যাবে না।

ইতিহাসের বীরপুরুষ ও মহানায়কের কণ্ঠ থেকেই নির্গত হয় ‘ঐতিহাসিক ভাষণ’। কিন্ত সেরূপ কোনো ভাষণ শুধু সেই মহানায়কের একক ইচ্ছাশক্তি ও কৃতিত্বের ফসল বলে গণ্য করা যায় না। তার কিছুটা ভাষণ প্রদানকারীর কৃতিত্ব হলেও একই সঙ্গে তা বহুলাংশেই সমসাময়িক বাস্তব ঘটনাবলি ও পরিস্থিতির ফসল। বিষয়টি সম্পর্কে ক্রিস্টফার কডওয়েলের (তরুণ ব্রিটিশ মার্কসবাদী, যিনি স্পেনের গৃহযুদ্ধে ইন্টারন্যাশনাল ব্রিগেডের একজন সদস্য হিসেবে ফ্যাসিস্ট বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে গিয়ে মাত্র ২৯ বছর বয়সে শহীদ হয়েছিলেন) লেখা ‘এ স্টাডি ইন হিরোইজম’ প্রবন্ধ থেকে একটি অংশ উদ্ধৃত করছি। কডওয়েল লিখেছেন, “ইতিহাসের একজন ‘নায়কের’ পরিচয় কী উপাদানের দ্বারা সৃষ্টি হয়?… শুধু ‘নায়কের’ চারিত্রিক গুণাগুণ দিয়েই তা নির্ধারিত হয় না। পারিপার্শ্বিক ঘটনাবলি ও বাস্তবতাই একজন ‘নায়ককে’ সৃষ্টি করে।… সেই ব্যক্তির ভেতর কিছু থাকতে হবে এ কথা ঠিক, কিন্তু সেই ইতিহাসের ‘নায়করা’ দূরদ্রষ্টার মতো ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে যেতে সক্ষম হন, তারা ইতিহাসের অনুকূলে কাজ করেন এবং এর ফলে এ রকম একটি ধারণা হয় যে, ইতিহাস পক্ষপাতমূলকভাবে তার ইচ্ছার বা খেয়ালের কাছে ধরা দিয়েছে।” [লেখকের অনুবাদ]

৭ মার্চের ভাষণের প্রতি দৃষ্টি দিলে দেখা যায়, এই ভাষণের পটভূমিতে ছিল বাঙালি জাতির জাতীয় সংগ্রামের দীর্ঘ প্রেক্ষাপট। দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা গণসংগ্রামের একটি বহুমাত্রিক প্রবাহ যখন তার শীর্ষ অধ্যায় তথা সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের পর্বে উত্তীর্ণ হওয়ার জন্য পরিপক্ব হয়ে উঠেছিল, ভাষণটি প্রদান করা হয়েছিল সেই সময়টিতে। ৭ মার্চের ভাষণের তাৎক্ষণিক প্রেক্ষাপট ছিল নিম্নোক্ত ধরনেরÑ ’৭০-এর নির্বাচনে পূর্ব পাকিস্তানে আওয়ামী লীগের একচ্ছত্র বিজয় এবং পাকিস্তানের জাতীয় সংসদে তার সংখ্যাগরিষ্ঠ আসন প্রাপ্তি, গণরায় বানচালের জন্য ইয়াহিয়া খান কর্তৃক পার্লামেন্টের অধিবেশন বাতিল ঘোষণা, ১ মার্চ থেকেই ‘স্বাধীনতার’ স্লোগানে রাজপথ প্রকম্পিত হওয়া, কারফিউ ঘোষণা, সেনাবাহিনী কর্তৃক গুলিবর্ষণ, কারফিউ ভেঙে প্রতিরোধ লড়াই অব্যাহত থাকা, সশস্ত্র প্রতিরোধের স্বতঃর্স্ফূত প্রস্তুতি শুরু হয়ে যাওয়া ইত্যাদি।

এই পটভূমিতে সর্বত্রই চলছিল উত্তপ্ত সভা, সমাবেশ, মিছিল, স্লোগান, বক্তৃতা ইত্যাদির জোয়ার। চলছিল মিছিলের ওপর গুলিবর্ষণ। একের পর এক লুটিয়ে পড়ছিল গুলিবিদ্ধ শহীদদের লাশ। সেই ক্রান্তিকালীন মুহূর্তে দেশের সব নেতার বক্তব্য ও ভাষণগুলোই ছিল খুব গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু বঙ্গবন্ধু কী বলেন, তার ছিল গুণগতভাবে পৃথক তাৎপর্য ও মূল্য। কারণ তিনি ছিলেন পাকিস্তানের অধিকাংশ নাগরিকের এবং সমগ্র বাঙালি জাতির নির্বাচিত প্রতিনিধিদের আনুষ্ঠানিক নেতা। জনগণের ভোটের রায়ের শক্তিতে জাতির পক্ষে কথা বলার নৈতিক কর্তৃত্ব ছিল বঙ্গবন্ধুরই। এ ধরনের ক্রান্তিকালীন মুহূর্তে অন্যরা কোনো বেহিসেবি কথা বললেও তাতে ঘটনাবলি মৌলিকভাবে এদিক-সেদিক হওয়ার তেমন সম্ভাবনা ছিল না। কিন্তু বঙ্গবন্ধুর মুখের প্রতিটি উচ্চারিত বাক্যের ছিল আলাদা তাৎপর্য ও মূল্য।

৩ মার্চ পল্টন ময়দানের জনসভা থেকে বঙ্গবন্ধু জানিয়েছিলেন, ৬ মার্চের মধ্যে যদি ইয়াহিয়া সরকার দাবি না মেনে নেয় তবে ৭ মার্চ তিনি ভবিষ্যৎ কর্মপন্থা ঘোষণা করবেন। তাই একদিকে সাড়ে সাত কোটি বাঙালি আর অন্যদিকে পাকিস্তানি শাসক এবং একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়, সবাই উদগ্রীব হয়ে অপেক্ষা করছিল এটা দেখতে যে, ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধু কী ঘোষণা দেন।

পরিস্থিতির ডায়লামা ছিল এই যে, সশস্ত্র সংঘাত হয়ে পড়েছিল অনিবার্য। জনগণ স্বাধীনতার পথে এগিয়ে যেতে চাচ্ছিল। কিন্তু সশস্ত্র সংগ্রাম শুরু করার জন্য সবদিকের প্রস্তুতি তখনো সম্পন্ন হয়ে ওঠেনি। পাকিস্তানি কর্তৃপক্ষ এই অপ্রস্তুত অবস্থা থাকতে থাকতেই চূড়ান্ত আঘাত হানার সুযোগ চাচ্ছিল। একতরফা স্বাধীনতা ঘোষণার জন্য চাপ অথবা পরামর্শ কেউ কেউ দিচ্ছিল। এটা দিলে সঙ্গে সঙ্গে প্রচন্ড হিংস্রতায় ‘ক্র্যাক ডাউনের’ আশঙ্কা ছিল। এর ফলে একই সঙ্গে জনতার সংগ্রামকে বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন হিসেবে চিহ্নিত করে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে বিভ্রান্ত করার সুযোগ শত্রুপক্ষ হয়তো পেয়ে যেত। অপরদিকে অনেকে সন্দেহ ছড়াচ্ছিল যে, বঙ্গবন্ধু পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হওয়ার লোভে আপস করে ফেলতে পারেন।

বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণের অসাধারণত্ব হলো, তিনি এই ভাষণের মাধ্যমে পরিস্থিতির সার্বিক জটিলতার মুখে মুক্তিযুদ্ধের পথে এগিয়ে যাওয়ার উপযুক্ত পথ রচনা করতে পেরেছিলেন। একতরফা স্বাধীনতা ঘোষণার পথে না গিয়ে তিনি পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহের গতিমুখ নির্ধারণের আনুষ্ঠানিক দায়ভার পাকিস্তানি শাসকদের ওপর ফেলে দিয়ে পরিস্থিতিকে চূড়ান্তভাবে যাকে বলে ‘পয়েন্ট অব নো রিটার্নের’ দিকে নিয়ে যাওয়ার পথ করে দিয়েছিলেন। পাকিস্তান সরকারকে চারটি আঁটসাঁট শর্ত দিয়ে বলেছিলেন, এগুলো মানা হলে তার পর ‘ভেবে দেখব অ্যাসেমব্লিতে যাব কী যাব না।’ পাকিস্তান সরকারের ওপর দায়ভার স্থানান্তর করা সত্ত্বেও তিনি শেষ সিদ্ধান্ত নেওয়ার বিষয়টি তার নিজের হাতে রেখে দিয়েছিলেন। পাকিস্তানিরা শান্তিপূর্ণভাবে স্বাধীনতার দাবি মেনে নিয়ে ক্ষমতা হস্তান্তরের পথও তিনি এর দ্বারা খোলা রেখেছিলেন।

এসব জটিল ‘ম্যানুভারের’ মধ্যেও এই ভাষণে মুক্তিযুদ্ধের লক্ষ্যে সশস্ত্র সংগ্রামের প্রস্তুতি এগিয়ে নেওয়ার জন্য জনগণের প্রতি বলিষ্ঠ ও সুস্পষ্ট নির্দেশনাও প্রদান করা হয়েছিল। বঙ্গবন্ধু তার ভাষণে ‘ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোলো’, ‘যার যা কিছু আছে তাই দিয়ে শত্রুর মোকাবিলা করো’, ‘তোমাদের আমরা ভাতে মারব, পানিতে মারব’, ‘সর্বত্র সংগ্রাম পরিষদ গড়ে তোলো’, ‘আর যদি একটা গুলি চলে…’, ‘…যদি হুকুম দেবার নাও পারি…’ ইত্যাদি নির্দেশনাবলি উচ্চারণ করেন। তিনি বস্তুত প্রায় সর্বধরনের সরকারি কর্তৃত্ব নিজের হাতে নিয়ে নিয়েছিলেন। অফিস-আদালত চলবে, চলবে না, চললে কীভাবে চলবে, বেতন কবে দেওয়া হবে, রেডিও-টিভি কীভাবে চলবে বেসামরিক রাষ্ট্রযন্ত্রের যাবতীয় কাজ তার নির্দেশেই পরিচালিত হবে বলে তিনি তার ভাষণে জানিয়ে দিয়েছিলেন। ৭ মার্চের ভাষণের মধ্য দিয়ে বঙ্গবন্ধু মুক্তিযুদ্ধের লক্ষ্যে জনগণের আকাক্সক্ষা ও জাতির সার্বিক ঐক্যের প্রতীক হয়ে উঠতে সক্ষম হয়েছিলেন।

মুক্তিযুদ্ধের প্রস্তুতি পর্বের দীর্ঘকালীন রাজনৈতিক সংগ্রামের প্রক্রিয়ার মধ্যে ছিল প্রধানত দুটি মূল ধারা। এক. জাতীয়তাবাদী ধারা, দুই. বামপন্থি ধারা। এই দুই ধারাসহ সব স্রোতধারার সম্মিলন ঘটিয়ে তিনি তার ভাষণে সেই অমোঘ বাণী উচ্চারণ করেছিলেন যে ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম’। ‘স্বাধীনতা’ শব্দটিকে একটু অতিরিক্ত জোর দিয়ে উচ্চারণ করেছিলেন। ফলে জনগণের কাছে এ কথা পরিষ্কার হয়ে গিয়েছিল যে, ‘নেতা’ স্বাধীনতার ডাক দিয়ে দিয়েছেন। প্রস্তুতির কাজ সম্পর্কে নির্দেশনাও দিয়েছেন। ফলে ২৫ মার্চ হানাদার বাহিনীর ‘ক্র্যাক ডাউনের’ পর কী করতে হবে সেজন্য জনগণকে নির্দেশের অপেক্ষা করতে হয়নি। একই সঙ্গে একতরফা স্বাধীনতা ঘোষণার হটকারী পদক্ষেপ গ্রহণ করে সশস্ত্র সংগ্রামের প্রস্তুতি কাজকে ক্ষতিগ্রস্ত করার আত্মঘাতী পদক্ষেপও তিনি পরিহার করেছিলেন। ২৫ মার্চ মধ্যরাতে অপারেশন ‘সার্চলাইট’ অনুসারে হানাদার বাহিনী ‘গণহত্যা’ শুরুর পর সশস্ত্র স্বাধীনতা সংগ্রাম চেতনায় কিছুটা পিছিয়ে থাকা দেশবাসীসহ বিশ্ববাসীর কাছে হটকারী বলে গণ্য না হয়ে ‘স্বাভাবিক’ ‘যুক্তিসঙ্গত’ হিসেবে প্রতিভাত হয়েছিল।

৭ মার্চের ভাষণে বঙ্গবন্ধুর বক্তৃতার প্রকাশভঙ্গি ছিল অসাধারণ। এটা কোনো বাক্যবাগীশতা ধরনের ভাষণ ছিল না। ১৭ মিনিটের ভাষণটি ছিল বাহুল্যবর্জিত, শব্দচয়নে ও বাক্যের বাঁধনে ছিল সহজবোধ্য, ঘরের আপন লোকের বাচনভঙ্গি দ্বারা ছিল অলঙ্কৃত, প্রবহমান ঝরনার মতো ছিল সাবলীল। কণ্ঠস্বরে ছিল স্বতঃস্ফূর্ত মডুলেশন আগাগোড়াই বজ্রনিনাদের আওয়াজ ও প্রয়োজনমতো জ্বালাময়ী। ভাষণের বিষয়বস্তু ও উপস্থাপনের ফর্মের সঙ্গে বডি ল্যাঙ্গুয়েজ ছিল সম্পূর্ণ সামঞ্জস্যপূর্ণ। সব মিলিয়ে সেটি ছিল ইতিহাসের এক মাহেন্দ্রক্ষণের ‘ঐতিহাসিক’ এক ভাষণ।

ক্রিস্টফার কডওয়েলের লেখা থেকে আবার উদ্ধৃতি দিয়ে শেষ করছি। তিনি লিখেছেন, “নিজের কর্মের যৌক্তিকতার স্বাক্ষর দেখে যাওয়ার আগেই কোনো ‘নায়কের’ মৃত্যু ঘটতে পারে। কিন্তু তার মৃত্যুর পরও তার শিক্ষা ও সূচিত ধারা বেঁচে থাকে। তিনি যে উদ্দেশ্য নিয়ে সংগ্রাম করেছিলেন, তা তার মৃত্যুকে অতিক্রম করে টিকে থাকে। আর, ‘বর্তমানে’ অতিক্রম করে যা টিকে থাকে, সেটাই সিঃসন্দেহে ‘ভবিষ্যৎ’।”

একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত বিজয়ের প্রায় সবটাই এখন ছিনতাই হয়ে গেছে। দেশ এখন উল্টোপথে চলছে। স্বাধীনতার ভিত্তিমূল পুনঃপ্রতিষ্ঠা করার কঠিন চ্যালেঞ্জ এখন একটি প্রধান কর্তব্য। ‘ভিশন-মুক্তিযুদ্ধ ৭১’ বাস্তবায়ন করার লক্ষ্য নিয়ে মুক্তিযুদ্ধের অসমাপ্ত অধ্যায়ের কাজ সম্পন্ন করার জন্য গণসংগ্রামের নবোত্থান ঘটাতে হবে। বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণের প্রাসঙ্গিকতা তাই আজও অতীত হয়নি। ভবিষ্যতের সেই সংগ্রামের পথে এই ভাষণ সজীব প্রেরণা দিয়ে যাবে।

লেখক: মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম, সভাপতি, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি)।

Close