জাতীয়নাগরিক মতামতশিরোনাম-২

সেদিনের মিছিল আর আমাদের রাজু

রুমা মোদক

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণে টি এস সি থেকে শাহবাগের দিকে যেতে পথিক ক্ষনিকের জন্য থমকে যায় একটি স্পর্ধিত ভাস্কর্যের ছায়াতলে, রাজু ভাস্কর্য।
রাজু ক্যাম্পাসের প্রমিথিউস। রাজু পুরাণের পাখি।
রাজুর শহিদ হওয়ার পর কিংবদন্তি হয়ে উঠা বাক্যগুলো কেবল কথার কথা নয়। হৃদয় চিড়ে জেগে ওঠা বেদনা আর অংহকারের উদ্দীপ্ত উর্মিমালা। শব্দ কিংবা বাক্যের ক্ষমতা সামান্যই রাজুর মতো সাহসী তরুণ কে বাঁধে কাব্যে কথায়।
সেদিনের সে ক্যাম্পাস কে চেনা যাবে না আজকের চেহারা দিয়ে। এই একদলীয় আধিপত্যের ক্যাম্পাস তখন ছিলোনা। ছিলো আধিপত্য বিস্তারের লড়াই।
কোমলমতি ছাত্র ছাত্রীদের চোখে অধিকার আদায়ের ধুলো দিয়ে অন্তরালে চলতো নিজেদের স্বার্থ আদায়ের ধূর্ত কুকুরের হাড্ডি কাড়াকাড়ির লড়াই। টেন্ডারের ভাগ বাটোয়ারা,হলের সিটকেন্দ্রিক নোংরামি, ইত্যাদি গুটি কয়েকের হীন ব্যক্তি স্বার্থ সংশ্লিষ্ট লড়াই।
রাইফেল,পিস্তল জাতীয় মরণাস্ত্র ব্যবহার হতো সেইসব যুদ্ধে। প্রায়ই ক্যাম্পাস উত্তপ্ত হয়ে উঠতো তাদের আধিপত্য বিস্তারের যুদ্ধে। এর বলি হতো কখনো নিরীহ তাজা প্রান, কখনো তাদের দলীয় ক্যাডার।
রাজু এর কোনটাই ছিলো না। রাজু ছিলো প্রগতিশীল ছাত্র সংগঠন ছাত্র ইউনিয়নের তুখোড় কর্মী। ঢাবি মৃত্তিকা বিজ্ঞান বিভাগের ছাত্র, শহীদুল্লাহ্ হলের আবাসিক ছাত্র রাজু তখন ছাত্র ইউনিয়ন ঢাবি কমিটির সমাজ কল্যাণ সম্পাদক। ঐক্য শিক্ষা শান্তি প্রগতির মিছিলে উচ্চকিত কন্ঠ।
১৩ই মার্চ ১৯৯২,
সেদিনের বিকেলটা ছিলো অন্য আর দশটি বিকেলের মতোই মোলায়েম আর পড়ন্ত বেলার নরম রোদ মাখানো। প্রতিদিনের মতোই টি এস সি জুড়ে ছিলো উজ্জ্বল তারুণ্যের আড্ডা।
হঠাৎ মধুর কেন্টিন আর টি এস সি দুদিক থেকে শুরু হয় বন্দুক যুদ্ধ দুই আধিপত্য বাদী ছাত্র সংগঠনের। গুলি, পাল্টা গুলি মুহুর্মুহু গুলিতে কেঁপে কেঁপে উঠে পবিত্র শিক্ষাঙ্গনের পবিত্র চত্বর।
ছলকে উঠে রাজুর প্র‍তিবাদী রক্ত। এই হানাহানি গুলাগুলি সন্ত্রাসের রাজত্ব হতে পারে না আমাদের প্রিয় ক্যাম্পাস।
সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে শ্লোগান ধরে রাজু। পিছনে আমরা তাঁর সহযোদ্ধারা। কোনভাবেই আমাদের প্রিয় শিক্ষাঙ্গনকে আমরা সন্ত্রাসীদের অভয়ারণ্য হতে দিতে পারি না।
গুলি অগ্রাহ্য করে রাজুর নেতৃত্বে মিছিল টি এস সি চত্বর ছেড়ে রাজপথে নামে। হঠাৎ একটা গুলি এসে বিদ্ধ হয় রাজুর মাথায়। থেমে যায় রাজুর উচ্চকিত কণ্ঠ। রাজু লুটিয়ে পড়ে রাজপথে। রক্তে ভেসে যায় ডাসের সম্মুখ পথ। তৎক্ষনাৎ তাঁকে নেয়া হয় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। শুরু হয় ওষুধ রক্তের জন্য দৌড়াদৌড়ি। সহযোদ্ধাদের সব চেষ্টা বিফল করে রাজু উড়ে যায় পুরাণের পাখি হয়।
রেখে যায় সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে চিরকালীন প্রতিবাদ।
সেই থেকে রাজু মানে সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে নির্ভীক প্রতিবাদ।রাজু মানে সদা উচ্চকিত প্রগতির সৈনিক।

লেখক : নাট‌্যকার, কথাসাহিত‌্যিক

Close