জাতীয়নাগরিক মতামতশিরোনাম

শেখ মুজিবের রাজনৈতিক উত্থান

ড. এম নজরুল ইসলাম

মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষাজীবন শেষে শেখ মুজিব যখন কলকাতা ইসলামিয়া কলেজে ভর্তি হন মূলত তখন থেকেই তিনি তৎকালীন রাজনীতি ও রাজনৈতিক আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে জড়িয়ে পড়েন। এই সময়েই তিনি হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর সংস্পর্শে আসেন এবং মুসলিম লীগে যোগদান করেন। শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৪৩ সালে নিখিল বঙ্গ মুসলিম লীগের কাউন্সিলর নির্বাচিত হন। ১৯৪৬ সালে পাকিস্তান ইস্যুর ওপর সারা দেশে অনুষ্ঠিত হয় একটি গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচন। নির্বাচনে তার নিজের জেলা ফরিদপুরের (বর্তমান গোপালগঞ্জ) পূর্ণ দায়িত্ব তার ওপর পড়লেও তিনি খুলনা, বরিশাল, যশোরসহ বিভিন্ন এলাকায় ব্যাপক প্রচারণা চালান। নির্বাচনী ফলাফল পক্ষে আসায় বাংলায় মুসলিম লীগ প্রাদেশিক সরকার গঠনে সমর্থ হয়েছিল এবং এর ফলেই এ অঞ্চল প্রস্তাবিত পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত হয়। এতে শুধু বৃহত্তর রাজনৈতিক লাভই নয়; এই নির্বাচনী সফরে নেমে তার ব্যক্তিগত জীবনেও বেশ সাফল্য অর্জিত হয়েছিল, যা তার পরবর্তী রাজনৈতিক জীবনে উত্তরণে যথেষ্ট সহায়ক হয়েছিল। মুজিববর্ষের উদ্বোধনী দিনে রাসিকের বিভিন্ন কর্মসূচি১৯৪৭ সালের ১৪ আগস্ট পাকিস্তান সৃষ্টির পর পরই নীতি ও আদর্শের সঙ্গে খাপ খাওয়াতে না পেরে শেখ মুজিব মুসলিম লীগের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করেন। ১৯৪৮-এর মার্চ থেকে ১৯৪৯-এর জুলাই পর্যন্ত তিনি অত্যন্ত কর্মব্যস্ত জীবন অতিবাহিত করেন এবং তখনই তিনি তরুণ সম্প্রদায়ের মধ্যে নিজের পরিচিত আরো বিস্তার লাভ করতে সক্ষম হন। এ সময়েই তিনি পুরোপুরি বিরোধী রাজনীতির ধরন আয়ত্ত করেন এবং বৃহত্তম রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের জন্য নিজেকে প্রস্তুত করে তোলেন। মুসলিম লীগের সঙ্গে আদর্শগত মতবিরোধের কারণে মওলানা ভাসানী মুসলিম লীগ থেকে পদত্যাগ করেন এবং শেখ মুজিবসহ আরো কতিপয় বিশিষ্ট রাজনৈতিক নেতার সহযোগিতায় ১৯৪৬ সালে গঠন করেন আওয়ামী মুসলিম লীগ। প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকেই মুসলিম লীগ ছিল একটি উগ্র সাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক দল।
কিন্তু মুসলিম লীগ থেকে বেরিয়ে এসে যখন মওলানা ভাসানীর নেতৃত্বে ‘আওয়ামী মুসলিম লীগ’ গঠিত হলো তখনো দলটি পুরোপুরি সাম্প্রদায়িকতা থেকে মুক্ত হতে পারল না। এতে ভাসানীর সঙ্গে মুজিবের দেখা দেয় আদর্শগত দ্বন্দ্ব। মওলানা ভাসানীর সঙ্গে মুজিবের দ্বন্দ্ব বাধল মূলত দলের নামে ‘মুসলিম’ শব্দটি থাকায়। মুজিবের যুক্তি ছিল এ দ্বারা একটি সাম্প্রদায়িক দল বোঝায় এবং এখানে হিন্দু ও অন্যান্য ধর্মাবলম্বী কর্মীর প্রবেশাধিকার নেই। তার মতে, দলকে ধর্মনিরপেক্ষ ও সার্বজনীন করার জন্য দলের নাম থেকে ‘মুসলিম’ শব্দটি বাদ দেয়া প্রয়োজন। কিন্তু মওলানা ভাসানী এতে রাজি না হওয়ায় শেখ মুজিব তার সঙ্গে সম্পর্কচ্ছেদ করে গঠন করেন আওয়ামী লীগ। পাকিস্তান সৃষ্টির বেশ কিছুদিন পর যখন মুজিব ঢাকায় এসে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আইন বিভাগে ভর্তি হন তখনই তার সক্রিয় সহযোগিতায় ঢাকায় প্রতিষ্ঠিত হয় ‘গণতান্ত্রিক যুবলীগ’। গণতান্ত্রিক যুবলীগ প্রতিষ্ঠার পর পরই প্রভাবশালী ক্ষমতাসীন মুসলিম লীগের বিরুদ্ধে সক্রিয় ও কার্যকরভাবে রুখে দাঁড়ানোর জন্য তিনি গঠন করেন মুসলিম ছাত্র লীগ।
রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহ: বায়ান্ন থেকে পঁয়ষট্টি
১৯৫২ সালের ঐতিহাসিক ভাষা আন্দোলনে শেখ মুজিব প্রত্যক্ষভাবে অংশগ্রহণ করতে পারেননি জেলে ছিলেন বলে। কিন্তু তিনি জেলে বসেও এ আন্দোলনের সঙ্গে একাত্মতা ঘোষণা করেন। তিনি ও মওলানা ভাসানী জেলে থেকেই ১৯৫২ সালের ১৬ থেকে ২৭ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত অনশন ধর্মঘট পালন করেন। পাকিস্তানের অবহেলিত প্রদেশ পূর্ব বাংলায় মুসলিম লীগকে চুয়ান্ন সালের নির্বাচনে পরাজিত করার উদ্দেশ্যে আওয়ামী মুসলিম লীগের সভাপতি মওলানা ভাসানী এবং কৃষক-শ্রমিক পার্টির সভাপতি শেরেবাংলা একে ফজলুল হক একটি যুক্তফ্রন্ট গঠন করেন (৪ ডিসেম্বর, ১৯৫৩)। হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী ছিলেন এর তৃতীয় নেতা। এদিকে গণতন্ত্রী দল, নেজামে ইসলাম পার্টি, কমিউনিস্ট পার্টি ও খেলাফতে রাব্বানী পার্টি এতে যোগদান করেছিল। হক-ভাসানী-সোহরাওয়ার্দীর নেতৃত্বাধীন এ যুক্তফ্রন্টের নির্বাচনী কর্মসূচি হিসেবেই ঘোষিত হয়েছিল ২১ দফা। ক্ষমতা কুক্ষিগত রাখতে ব্যস্ত মুসলিম লীগের দুর্নীতি ও দুঃশাসন এবং স্বায়ত্তশাসনের অধিকারবঞ্চিত পূর্ব বাংলার প্রতি শোষণ, বৈষম্য আর নির্যাতনের প্রেক্ষাপটে উপস্থাপিত ২১ দফা এত অভাবনীয় জনসমর্থন পেয়েছিল যে তা নির্বাচনী ফলাফলের মধ্য দিয়েই বোঝা যায়। ১৯৫৪ সালের যুক্তফ্রন্ট আন্দোলনের সময় থেকেই মূলত শেখ মুজিবুর রহমান শেরেবাংলা একে ফজলুল হক, মওলানা ভাসানী, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী ও আতাউর রহমান খানের সঙ্গে জাতীয় রাজনীতির নেতৃত্ব গ্রহণ করেন। তিনি ১৯৫৪ সালের প্রাদেশিক নির্বাচনে পূর্ব বাংলা আইনসভার সদস্য নির্বাচিত হন। সেই বছরই তিনি পূর্ব বাংলায় একে ফজলুল হকের নেতৃত্বে গঠিত সরকারের সমবায় ও কৃষিঋণ মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্বভার গ্রহণ করেন।
কিছুদিন পর কেন্দ্রীয় সরকার কর্তৃক ফজলুল হক মন্ত্রিসভা বরখাস্ত করা হয় এবং পূর্ব বাংলায় কেন্দ্রের প্রত্যক্ষ শাসন জারি করা হয় । এরপর ১৯৫৬ সালে পূর্ব বাংলায় আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসে এবং শেখ মুজিব এ সরকারের শিল্প-বাণিজ্য ও দুর্নীতি দপ্তরের মন্ত্রী হিসেবে যোগদান করেন। কেন্দ্রীয় সরকারের ষড়যন্ত্রের কারণেই হোক কিংবা যুক্তফ্রন্টের অভ্যন্তরীণ কোন্দলের কারণেই হোক, তিনি অবশ্য পরে অর্থাৎ মাত্র সাত মাস পরই মন্ত্রিসভা থেকে ইস্তফা দেন। এরপর তিনি আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে পূর্ব পাকিস্তানে আওয়ামী লীগের সংগঠন গড়ে তুলতে নিজেকে নিয়োজিত করেন। যুক্তফ্রন্টের অভ্যন্তরীণ কোন্দল এবং মুজিবের বলিষ্ঠ নেতৃত্বের কারণে অভাবিতভাবে আওয়ামী লীগের শক্তি বৃদ্ধি পেতে থাকে। প্রকৃতপক্ষে তৎকালীন পূর্ব বাংলায় শেখ মুজিবের নেতৃত্বে আওয়ামী লীগই সর্বাপেক্ষা শক্তিশালী দল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। ১৯৫৫ সালে শেখ মুজিব আওয়ামী লীগ থেকে পাকিস্তানের দ্বিতীয় গণপরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন। তিনি গণপরিষদে ‘পূর্ব বাংলা’-এর স্থলে ‘পূর্ব পাকিস্তান’ নামকরণের বিরোধিতা করে ‘বাংলা’ (পাকিস্তান) রাখার দাবি জানান। তিনি বলেন, ‘বাংলার এক ইতিহাস ও ঐতিহ্য রয়েছে এবং বাংলার নাম পরিবর্তন করতে হলে বাংলার জনগণের মতামতের ভিত্তিতেই তা করতে হবে।’
গণপরিষদে শেখ মুজিবুর রহমান পূর্ব বাংলার মানুষের প্রতি পাঞ্জাবি শাসকগোষ্ঠীর অন্যায় ও অত্যাচারের কথা তুলে ধরেন এবং পূর্ব বাংলার জন্য আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসন দাবি করেন। তিনি বলেন, পাকিস্তানকে দুর্বল করার জন্য নয়, বরং শক্তিশালী করার জন্যই স্বায়ত্তশাসন দাবি করা হচ্ছে। তিনি গণপরিষদের বিতর্কে অংশগ্রহণ করে পাকিস্তানের ১৯৫৬ সালের খসড়া সংবিধানের বিরোধিতা করেন। তিনি এ সংবিধানকে ‘অগণতান্ত্রিক ও স্বৈরতান্ত্রিক’ হিসেবে অভিহিত করেন। তিনি বলেন, পাকিস্তানের জনগণ বিশেষত পূর্ব পাকিস্তানের জনগণ কখনো এ সংবিধান মেনে নেবে না। তিনি যুক্তফ্রন্টের ২১ দফা কর্মসূচির ভিত্তিতে সংবিধান প্রণয়নের দাবি জানান। শেখ মুজিব যুক্ত নির্বাচকমণ্ডলীর নীতির ভিত্তিতে জাতীয় ও প্রাদেশিক নির্বাচন অনুষ্ঠানের বিধান গ্রহণেরও দাবি জানান। ৭ অক্টোবর ১৯৫৮ সালে সামরিক শাসন জারি করে জেনারেল আইয়ুব খান পাকিস্তানে গণতন্ত্রের সমাধি রচনা করেন। জেনারেল আইয়ুব খানের সামরিক শাসন জারি হওয়ার পর তৎকালীন পূর্ব বাংলার জনমনে বিক্ষোভ ধূমায়িত হতে থাকে। শেখ মুজিবসহ যুক্তফ্রন্টের সব নেতা সামরিক শাসক চক্রের সঙ্গে কোনো প্রকার আপস করতে সম্মত হননি। সামরিক শাসন প্রবর্তিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে শেখ মুজিব যে আশঙ্কা করেছিলেন তা-ই সত্যে পরিণত হয় মাত্র পাঁচদিনের মধ্যে। তাকে কারাগারে বন্দি করা হয় এবং প্রায় দেড় বছর বন্দিদশায় থাকার পর ১৯৬০-এর জানুয়ারিতে তাকে শর্তসাপেক্ষে মুক্তি দান করা হলেও প্রায় দুই বছর পর (১৯৬২) তাকে আবার জননিরাপত্তা আইনবলে আটক করা হয়। এরই মধ্যে জেনারেল আইয়ুব খান তার ১৬টি আইন প্রণয়ন নীতি এবং ২১টি রাষ্ট্রীয় নীতিসংবলিত সংবিধান ঘোষণা করেন। এ সংবিধানে বলা হয়, রাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট আশি হাজার নির্বাচকমণ্ডলী কর্তৃক গঠিত ইলেকটোরাল কলেজ দ্বারা নির্বাচিত হবেন। সংবিধানের মূল শিরোনামে বলা হয়: ইসলামবিরোধী কোনো আইন প্রবর্তন করা যাবে না এবং সব নাগরিক বাকস্বাধীনতা ও সাংগঠনিক স্বাধীনতা ভোগ করবে বটে, তবে তাদের লক্ষ রাখতে হবে যেন পাকিস্তানের নিরাপত্তা, শৃঙ্খলা, নৈতিকতা, শালীনতা, ন্যায়বিচারভিত্তিক শাসন এবং অন্যান্য রাষ্ট্রের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক কোনো প্রকারে বিঘ্নিত না হয়।
স্বাভাবিক কারণেই আইয়ুব প্রবর্তিত ১৯৬২ সালের এ সংবিধান শেখ মুজিবের কাছে গণতান্ত্রিক আদর্শের পরিপন্থী মনে হয়। এ সংবিধান বাতিল করার দাবি এবং একটি উপযুক্ত সংবিধান প্রণয়নের জন্য জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটে একটি বিশেষ পরিষদ গঠনের দাবি জানিয়ে পূর্ব পাকিস্তানের যে নয়জন নেতা বিবৃতি দেন শেখ মুজিব ছিলেন তাদের অন্যতম। আইয়ুব খানের স্বৈরশাসনামলে সর্বজনীন ভোটাধিকার এবং প্রত্যক্ষ নির্বাচনের দাবিতে তিনি পূর্ব বাংলার অন্যান্য নেতার সঙ্গে একযোগে কাজ করেন। পাকিস্তানে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের জন্য ১৯৬২ সালে জাতীয় গণতান্ত্রিক ফ্রন্ট নামে আইয়ুববিরোধী যে ঐক্যজোট গঠন করা হয়, শেখ মুজিব ছিলেন এ জোটের অন্যতম নেতা। ১৯৬৩ সালে ফ্রন্টের নেতা হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর মৃত্যুতে শেখ মুজিব কিছুটা ভেঙে পড়েন। কিন্তু বিচলিত না হয়ে তিনি আওয়ামী লীগকে পুনরুজ্জীবিত ও পুনর্গঠিত করার কাজে আত্মনিয়োগ করেন। তিনি সেই সময়েই কার্যত দলের নেতৃত্ব নিজের হাতে তুলে নেন। গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের লক্ষ্যে শেখ মুজিব ১৯৬৪-৬৫ সালে পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট পদে আইয়ুব খানের বিরুদ্ধে সম্মিলিত বিরোধী দলীয় প্রার্থী মিস ফাতেমা জিন্নাহর পক্ষে প্রচার অভিযানে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন। তিনি ছিলেন সম্মিলিত বিরোধী দলের প্রাদেশিক শাখার অন্যতম প্রধান নেতা।
ঐতিহাসিক ছয় দফাভিত্তিক স্বায়ত্তশাসন আন্দোলন
পাকিস্তানের জন্মলগ্ন থেকেই পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী পূর্ব বাংলার সামরিক নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের ব্যাপারে দেখিয়ে আসছিল চরম উদাসীনতা। অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে পূর্ব বাংলা যেভাবে বঞ্চনা ও শোষণের শিকারে পরিণত হয়েছিল তার ফলে বিক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে এ দেশের বুদ্ধিজীবী মহল। শেখ মুজিবও পাকিস্তানের উভয় অংশের অর্থনৈতিক বৈষম্যের চিত্র বিভিন্ন বক্তৃতা-বিবৃতির মাধ্যমে স্পষ্টভাবে তুলে ধরেন। ‘সোনার বাংলা শ্মশান কেন?’—তিনি এ অভিযোগ রাখেন পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর কাছে। এদিকে ১৯৬৫ সালের পাকিস্তান-ভারত যুদ্ধের সময় পূর্ব বাংলার নিরাপত্তাহীনতা প্রকটভাবে ধরা পড়ে। ১৯৬৫ সালের ৬ সেপ্টেম্বর এ যুদ্ধ শুরু হয় এবং তা ১৭ দিন চলে। যুদ্ধে পাকিস্তানের ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ কখনোই প্রকাশ করা হয়নি। যুদ্ধের অবসান ও দুদেশের মধ্যে সম্প্রীতি রক্ষার উদ্দেশ্যে জাতিসংঘের মধ্যস্থতায় দুদেশের মধ্যে প্রতিষ্ঠিত হয় একটি শান্তি চুক্তি। ১৯৬৬ সালের ১০ জানুয়ারি স্বাক্ষরিত এ চুক্তিই হলো ‘তাসখন্দ চুক্তি’। এ চুক্তিবিরোধী সম্মেলন ১৯৬৬ সালের জানুয়ারি মাসে লাহোরে অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে শেখ মুজিবও আমন্ত্রিত হয়েছিলেন। সম্মেলনে যোগদান করলেও তিনি এ চুক্তিবিরোধী কোনো আন্দোলনে অংশগ্রহণ করতে রাজি হননি। অতঃপর তিনি আলোচনা অসমাপ্ত রেখেই সম্মেলন ত্যাগ করেন। শাসনতান্ত্রিক জটিলতা নিরসনের জন্য শেখ মুজিবুর রহমান এই সর্বদলীয় জাতীয় সম্মেলনেই পাকিস্তানের ভবিষ্যৎ সংবিধানের ভিত্তি তথা পূর্ব বাংলার জন্য পূর্ণ আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসনের দাবি হিসেবে ঐতিহাসিক ছয় দফা কর্মসূচি পেশ করেন। তবে সম্মেলনে এ কর্মসূচি গৃহীত হয়নি। শেখ মুজিব তার ছয় দফা দাবির সমর্থনে বলেন, ‘পাকিস্তানের দুই অংশের মধ্যে বৈষম্য ক্রমাগত আশঙ্কাজনকভাবে বেড়ে যাচ্ছে। পূর্ব পাকিস্তানের সামগ্রিক অর্থনীতি আজ ধ্বংসের মুখে এসে দাঁড়িয়েছে। এ ধ্বংসের হাত থেকে আঞ্চলিক অর্থনীতিকে বাঁচানোর জন্য আঞ্চলিক সরকারকে জরুরি ভিত্তিতে কাজ করার এবং অর্থনীতি পরিচালনার ক্ষমতা দিয়ে পূর্ণ আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসন দিতে হবে।’ বাস্তবিক অর্থেই ছয় দফা কর্মসূচি ঘোষিত হওয়ার পর পূর্ব বাংলার জনমনে স্বাধিকার অর্জনের আকাঙ্ক্ষা আরো প্রবল হয়ে ওঠে। শেখ মুজিবের নেতৃত্বে ছয় দফার স্বপক্ষে ধীরে ধীরে জনমত সংগঠিত হতে থাকে এবং ব্যাপকভাবে এর প্রচার পেতে থাকে। ছয় দফাভিত্তিক আন্দোলনের জনপ্রিয়তা বৃদ্ধি পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আইয়ুব সরকার শেখ মুজিব ও তার দলের প্রতি কঠোর দমননীতি গ্রহণ করেন। কারারুদ্ধ করা হয় শেখ মুজিবসহ আওয়ামী লীগের প্রথম সারির প্রায় সব নেতাকে। বাঙালিদের স্বায়ত্তশাসন আন্দোলনকে জনসমক্ষে হেয় প্রতিপন্ন করার এবং শেখ মুজিবকে রাজনৈতিক মঞ্চ থেকে চিরতরে সরিয়ে দেয়ার লক্ষ্যেই আইয়ুব সরকার দেশদ্রোহিতার অভিযোগ এনে মুজিবকে প্রধান আসামি করে ১৯৬৭ সালে দায়ের করে ‘আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা’। মামলায় শেখ মুজিব নিজেকে নির্দোষ বলে দাবি করেন। তিনি পূর্ব পাকিস্তানকে পশ্চিম পাকিস্তান থেকে বিচ্ছিন্ন করার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করেন। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘আমি পাকিস্তান থেকে পূর্ব পাকিস্তানকে বিচ্ছিন্ন করার উদ্দেশ্যে কখনো কিছু করিনি এবং পূর্ব পাকিস্তানকে বিচ্ছিন্ন করার জন্য স্থল, বিমান বা নৌবাহিনীর কোনো কর্মচারী অথবা অন্য কারো সঙ্গে কোনো প্রকার ষড়যন্ত্র করিনি। আমি নির্দোষ ও নিরপরাধ। কথিত ষড়যন্ত্র সম্পর্কে আমি কিছুই জানি না।
‘পূর্ব পাকিস্তানের ন্যায্য দাবি দাবিয়ে রাখার জন্যই মূলত এ মামলা। আমার ওপর নির্যাতন চালানো এবং আমার দলকে হেয় প্রতিপন্ন করার জন্যই আমাকে এ ষড়যন্ত্রমূলক মামলায় জড়িত করা হয়েছে।’
শেখ মুজিবের বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা প্রত্যাহার এবং তার নিঃশর্ত মুক্তির দাবিতে সারা দেশ তখন বিক্ষোভে ফেটে পড়েছে। সরকারের নির্যাতন ও অত্যাচারের মোকাবেলা করার জন্যই এ সময় দেশের আটটি প্রগতিশীল রাজনৈতিক দল ডেমোক্রেটিক অ্যাকশন কমিটি (ডিএসি) নামে গঠন করে একটি রাজনৈতিক ঐক্যজোট। এদিকে জনতার আন্দোলনের সঙ্গে একাত্মতা ঘোষণার জন্য ৪ জানুয়ারি ১৯৬৯ ‘সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ’-এর পক্ষ থেকে পেশ করা হয় ১১ দফা দাবি। ১৯৬৮-৬৯ সালের ব্যাপক গণ-অভ্যুত্থানের মুখে ১৯৬৯ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে অসমাপ্ত অবস্থায় আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা প্রত্যাহার করা হয় এবং শেখ মুজিব ও অন্যান্য আসামিকে মুক্তি দেয়া হয়। প্রকৃতপক্ষে এ মামলার ফলে বাঙালিদের ঐক্যচেতনা ও স্বাধিকারের দাবি আরো শক্তিশালী হয়ে ওঠে, শেখ মুজিবুর রহমান আবির্ভূত হন বাঙালিদের অবিসংবাদিত নেতা হিসেবে।
একটি সংবিধান দিতে পারেন—যে সংবিধান জনগণের একত্রে বসবাসের ভিত্তি হিসেবে পরিগণিত হবে। এ কারণেই আমরা বারবার উল্লেখ করছি, জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের সংবিধান রচনার ক্ষমতার ওপর বাধানিষেধ আরোপ করা উচিত নয়। নীতিগতভাবে আইনি কাঠামোর বিরোধিতা করলেও শেষাবধি শেখ মুজিব ১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেন। তিনি ঘোষণা করেন, আগামী নির্বাচনই হবে শান্তিপূর্ণ উপায়ে বাংলার মানুষের অধিকার অর্জন করার সর্বশেষ সংগ্রাম। স্বাধিকার, স্বায়ত্তশাসন ও আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার অর্জনের স্বার্থে ছয় দফা ও ১১ দফা আদায়ের জন্য আওয়ামী লীগের প্রতিটি প্রার্থীকে ভোট দিয়ে প্রতিটি আসনে জয়যুক্ত করার জন্য তিনি সবার প্রতি আহ্বান জানান।
সত্তর সালের নির্বাচন ও স্বাধীনতা আন্দোলন
১৯৭০ সালের জাতীয় পরিষদ এবং প্রাদেশিক পরিষদ নির্বাচনে শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করে। জাতীয় পরিষদে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠ দল হিসেবে আওয়ামী লীগের বিজয়কে পশ্চিম পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠী এক অশুভ পরিণতির লক্ষণ মনে করে। জাতীয় পরিষদে নিয়মতান্ত্রিক পদ্ধতিতে আওয়ামী লীগের তথা শেখ মুজিবের প্রাধান্য প্রতিষ্ঠিত হোক, এটা পশ্চিম পাকিস্তানের সামরিক জান্তাসহ পাকিস্তান পিপলস পার্টির নেতা জুলফিকার আলী ভুট্টোর কাম্য ছিল না। ভুট্টো ১৯৭১ সালের জানুয়ারি মাসে শেখ মুজিবের সঙ্গে আলোচনায় বসে কেন্দ্রীয় সরকারের ক্ষমতার ভাগ দাবি করেন। কিন্তু শেখ মুজিব ভুট্টোর সঙ্গে ক্ষমতা ভাগাভাগি করে নিতে অস্বীকার করেন। প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া যদিও ঘোষণা করেছিলেন যে সাধারণ নির্বাচনের পর ৩ মার্চ (১৯৭১) জাতীয় পরিষদের অধিবেশন আহ্বান করা হবে, কিন্তু ইয়াহিয়ার অনীহার কারণেই হোক কিংবা সামরিক জান্তা ও জুলফিকার আলী ভুট্টোর ক্ষমতালিপ্সা ও গোপন ষড়যন্ত্রের কারণেই হোক, ইয়াহিয়া খান অকস্মাৎ এক বেতার ভাষণের মাধ্যমে জাতীয় পরিষদের অধিবেশন স্থগিত ঘোষণা করেন। এ ঘোষণার পর পরই পূর্ব বাংলার সর্বত্র স্বতঃস্ফূর্ত বিদ্রোহ শুরু হয়। শেখ মুজিবুর রহমান জনগণের দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত সরকারের বিরুদ্ধে অহিংস অসহযোগ আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার জন্য আহ্বান জানান। ৭ মার্চ রমনার রেসকোর্স ময়দানে এক বিশাল জনসভায় তিনি আবেগরুদ্ধ কণ্ঠে বলেন, ‘আজ বাংলার মানুষ মুক্তি চায়—তারা বাঁচতে চায়। তারা অধিকার পেতে চায়। নির্বাচনে আপনারা ভোট দিয়ে আওয়ামী লীগকে জয়ী করেছিলেন শাসনতন্ত্র রচনা করার জন্য। আশা ছিল জাতীয় পরিষদ বসবে—আমরা শাসনতন্ত্র তৈরি করব এবং এই শাসনতন্ত্রে মানুষ তাদের অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক মুক্তিলাভ করবে।
‘কিন্তু ২৩ বছরের ইতিহাস বাংলার মানুষের মুমূর্ষু আর্তনাদের ইতিহাস, রক্তদানের করুণ ইতিহাস, নির্যাতিত মানুষের কান্নার ইতিহাস।…আমি বলতে চাই, আজ থেকে কোট-কাচারি, হাইকোর্ট, সুপ্রিম কোর্ট, অফিস, আদালত, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসমূহ অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ থাকবে। কোনো কর্মচারী অফিসে যাবেন না—এ আমার নির্দেশ।…আমার অনুরোধ, প্রত্যেক গ্রামে, মহল্লায়, ইউনিয়নে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে সংগ্রাম কমিটি গড়ে তুলুন। হাতে যা আছে তাই নিয়ে প্রস্তুত থাকুন। মনে রাখবেন রক্ত যখন দিয়েছি, আরো দেব, এ দেশের মানুষকে মুক্ত করে ছাড়ব ইনশা আল্লাহ। এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।’ ইয়াহিয়া খান একদিকে জাতীয় পরিষদের অধিবেশন আহ্বানের ব্যাপারে শেখ মুজিবসহ অন্যান্য নেতাদের সঙ্গে আলোচনা চালাতে থাকেন। অপরদিকে পূর্ব বাংলায় পাকিস্তানি সৈন্যবাহিনী শক্তি বৃদ্ধি করতে থাকে। শেখ মুজিবের সঙ্গে আনুষ্ঠানিকভাবে আলোচনা না ভেঙে ২৫ মার্চ তিনি গোপনে ঢাকা ত্যাগ করেন এবং এর আগে পাকিস্তানি সৈন্যবাহিনীকে পূর্ব বাংলার অপ্রস্তুত ও নিরস্ত্র জনগণের ওপর লেলিয়ে দিয়ে যান। মুজিবকে গ্রেফতার করে নিয়ে যাওয়া হয় পাকিস্তানে। ২৬ মার্চ শেখ মুজিবুর রহমানের নামে চট্টগ্রামের কালুরঘাট স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করা হয় এবং পাকিস্তানি সেনাবাহিনীকে প্রতিহত করার জন্য সব বাঙালির প্রতি আহ্বান জানানো হয়। পরবর্তী দিন মেজর জিয়াউর রহমান (পরবর্তী সময়ে রাষ্ট্রপতি) কর্তৃক আরো আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করা হয়। ১৯৭১ সালের ১০ এপ্রিল মুজিবনগরে জারীকৃত বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণাপত্র আদেশবলে শেখ মুজিবুর রহমানকে বাংলাদেশ সরকারের রাষ্ট্রপতি করা হয়। তবে তার অনুপস্থিতিতে উপরাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করেন। মুজিবনগর সরকার শেখ মুজিবের নামেই বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম পরিচালনা করে। একটানা দীর্ঘ নয় মাস যুদ্ধের মধ্য দিয়ে বাঙালি মুক্তিযোদ্ধা ও ভারতীয় সেনাবাহিনীর সম্মিলিত আক্রমণের মুখে অবশেষে পাকিস্তানি দখলদার বাহিনী বিপর্যস্ত অবস্থায় ১৬ ডিসেম্বর ১৯৭১ সালে পরাজয় বরণ করে নিতে বাধ্য হয়। পৃথিবীর বুকে জন্ম নেয় স্বাধীন ও সার্বভৌম একটি দেশ—বাংলাদেশ।
উপসংহার: শেখ মুজিবের গৌরবময় উথান
এ কথা অস্বীকার করার উপায় নেই যে একজন মানুষ হিসেবে শেখ মুজিবের মধ্যে ছিল দুর্বলতা, ছিল স্ববিরোধিতা। স্বাধীনতা-উত্তর শেখ মুজিব অব্যাহতভাবে জাতীয় স্বার্থ সংরক্ষণের প্রত্যয় সামনে রেখে একের পর এক কর্মসূচি ও প্রতিশ্রুতি দিয়ে গেছেন। কিন্তু কাজ করেছেন একজন বুর্জোয়া উদারপন্থী গণতন্ত্রী হিসেবে এবং তার ধারণা সর্বদাই গণতান্ত্রিক কাঠামোকে ঘিরে আবর্তিত হয়েছে। অবশ্য পরবর্তীকালে গণজোয়ারের বেগ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তিনি সমাজতান্ত্রিক দর্শনের দিকে ঝুঁকে পড়েছেন এবং একজন সোস্যাল ডেমোক্র্যাট হিসেবে নিজেকে প্রতিপন্ন করেছেন। জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের চূড়ান্ত মুহূর্তগুলোতে তিনি নবীন যুবকদের প্রভাবে অধিকাংশ সময়ে প্রভাবিত হয়েছেন। সংস্কারমুখী এসব জাতীয়তাবাদী যুবশক্তির ধারণার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে চলতে গিয়ে তাকে পদে পদে সংকটের সম্মুখীন হতে হয়েছে। তার আচরণে ও অভ্যাসে পরিলক্ষিত হয় যে তিনি সংঘাতের পরিবর্তে আলোচনার টেবিলে বসে সমস্যা সমাধানের প্রক্রিয়াকে অধিকতর শ্রেয় বলে মনে করতেন। যাহোক, শেখ মুজিবের জীবন ও কর্মের প্রথম পর্যায়ের প্রতিটি মুহূর্ত ছিল বিজয় গৌরবে উদ্ভাসিত। ক্ষেত্রবিশেষে পথবিচ্যুত হয়ে তিনি প্রচলিত ধারার পরিপন্থী কাজ করলেও শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত আপস করেননি এবং উপর্যুপরি সংগ্রামের মধ্য দিয়ে জনগণের নায়কের ভূমিকাই পালন করেছেন। কিন্তু তার শাসনামলের দ্বিতীয় অংশ পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যায় যে ক্ষমতার শীর্ষে আরোহণ করার অব্যবহিত পরমুহূর্ত থেকেই তার পতনের প্রক্রিয়া শুরু হয়ে গিয়েছিল। যাহোক, দেশে সংস্কারমুখী পরিবর্তন সাধনের সর্বশেষ প্রচেষ্টায় গোটা জাতির বিরোধিতার মুখে ব্যর্থতা ও ভ্রান্তির পরিচয় দিলেও এ কথা নিঃসন্দেহে সত্য যে স্বদেশে প্রত্যাবর্তন করে ভগ্নদশা থেকে জাতিকে সফলতার শীর্ষে নিয়ে যেতে শেখ মুজিবের প্রচেষ্টার কোনো অন্ত ছিল না।
কারাবন্দি অবস্থায় পাকিস্তানি সামরিক জান্তার হাতে নিহত হলে তিনি বাঙালি জনমনে অমর হয়ে থাকতেন এবং বাঙালির হূদয়ে তার ভাবমূর্তি থেকে যেত অবিনশ্বর। তিনি বিবেচিত হতেন ইতিহাসের অন্যতম শহীদ হিসেবে। তবে সেক্ষেত্রে বোধ হয় বাংলাদেশের জনগণের দুঃখ-দুর্দশা আরো সকরুণ পরিণতির শিকার হতো, হয়তো বাংলাদেশে অনেকগুলো সরকার এক সঙ্গে বিরাজ করত। ঢাকায় প্রতিষ্ঠিত সরকারের আরো ঘন ঘন পরিবর্তন ঘটত, বয়ে যেত আরো অনেক রক্তগঙ্গা, হয়তো ভারতীয় সেনাবাহিনী চিরদিনের জন্য আসন পেতে বসত বাংলাদেশের মাটিতে কিন্তু মুজিবের প্রত্যাবর্তন এবং তার পরবর্তী ভূমিকা সম্ভাব্য এ ধ্বংসের হাত থেকে বাংলাদেশকে রক্ষা করেছে। বাংলাদেশে প্রত্যাবর্তন করে আশু দুর্যোগের ঘনঘটা অপসারণের পর যদি তিনি অবসর নিতেন, তাহলে হয়তো মুজিব তার ভাবমূর্তি অনেক উচ্চাসনে প্রতিষ্ঠিত করতে পারতেন। কিন্তু উন্নয়নশীল বিশ্বের ছকে বাঁধা রাজনীতির অনুসরণে ব্যাপক জনপ্রিয়তার মোহ শেখ মুজিব এড়াতে পারেননি এবং রাষ্ট্রশাসনে কঠোর বাস্তবতার মুখোমুখি হয়ে তিনি প্রকারান্তরে নিজের ভাবমূর্তি বিনষ্ট করেছিলেন। অমরতার দ্বারপ্রান্তে এসেও তিনি তার আস্বাদ গ্রহণ করতে পারেননি। তবে এ কথা সত্য যে তার মৃত্যু ছিল মহিমান্বিত। অত্যন্ত দুঃখবহ ও করুণ মৃত্যু বরণ করতে হলেও তিনি উপহার দিয়ে গেছেন স্বাধীন ও সার্বভৌম বাংলাদেশ।

ড. এম নজরুল ইসলাম: মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক গবেষক

Close