সাহিত্য ও সংস্কৃতি

ভালোবাসার ত্রিশ বছর

সবনাজ মোস্তারী স্মৃতি

 

মায়ের বাড়ির স্টোর রুম গোছাতে গিয়ে নিলাদ্রী দেবির চোখে পড়লো একটা কাঠের ছোট বাক্স।নিলাদ্রী দেবি বাক্সটার মধ্যে একটা নীল রং এর ডাইরি এবং কিছু শুকনো গোলাপ দেখতে পেলো।
মোটা ফ্রেমের কালো চশমাটা হাতের মধ্যমা আঙ্গুল দিয়ে ঠিক করে ধুলা মাখা ডাইরিটা বাক্স থেকে বের করে ধুলো ঝেড়ে হাত বুলিয়ে আলতে করে খুলে দেখলো।
ডাইরির প্রথম পাতায় বড় করে লেখা কালো কালি দিয়ে “নিলু”
তার পরের পাতা উলটিয়ে দেখে লেখাগুলো সব মিশে গেছে। রং এর উপর পানি পড়লে যেমন রংগুলো চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ে ঠিক সেরকম কালো কালির লেখাগুলোও তেমন হয়ে গেছে।
অনেক বছর এভাবে পড়ে থাকার কারনেই এমনটা হয়েছে।
তারিখের দিকে তাকালেই চোখে পড়লো “২১ জানুয়ারি ১৯৯১”
মানে ত্রিশ বছর আগে লিখা এই ডাইরি।
নিলাদ্রী দেবি কাঠের বাক্স আর ডাইরিটা নিয়ে স্টোর রুম থেকে বেরিয়ে বারান্দার মেঝেতে বসলো।
ডাইরিটা পড়া শুরু করল।
নিলাদ্রী দেবির চোখের সামনে যেনো ৩০ বছর আগেকার দিনগুলো ভেসে উঠলো।ভার্সিটির প্রথম ক্লাস ছিলো সেদিন নিলাদ্রীর।খুব বেশি উত্তেজিত ছিলো সে।গার্লস স্কুলে পড়ার পর মহিলা কলেজে পড়েছিলো সে।সব সময় ছেলেদের থেকে দূরে থাকা।
মা সব সময় বলত ভার্সিটিতে গিয়ে মেয়ে মানুষ বাচাল হয়ে যায়।ছেলে মেয়ে সব এক সাথে কি কি করে কে জানে! তুই সব সময় ছেলেদের কাছ থেকে দুরে থাকবি দেবি।
নিলাদ্রীর পুরো নাম “নিলাদ্রী দেবি”। পরিবারের সবাই তাকে দেবি বলেই ডাকত।আর “দেবির” মতই সুন্দর ছিলো নিলাদ্রী দেবি।
মা সব সময় বলত নিহাত তোর বড় দাদার জন্য তকে ভার্সিটিতে ভর্তি করিয়ে দিলাম।তোর বাপতো রাজি ছিলো না। মেয়ে মানুষ শশুর বাড়ি গিয়ে রান্না ঘর সামলাবি, কিসের এত পড়ালেখা করতে হবে বাপু বুঝি না।
নিলাদ্রী দেবি মায়ের কথা শুনে চুপ করে থাকত। বড় দাদার জন্যই তার এত দুর আসা হয়েছে। তা না হলে কবে যে বাবা মায়ে বিয়ে দিয়ে শশুরবাড়ি পাঠিয়ে দিতো তা জানা ছিলো না।
প্রথম দিন দেবিকে তার বড় দাদা নুহাস নিজেই ভার্সিটিতে রেখে এসেছিলো।
দেবি ক্লাস শেষ করে ক্যাফিটোরিয়ায় বসে ছিলো আনমনে। ঠিক সে সময় একটা ছেলে এসে বসে তার পাশের চেয়ারে।
জিজ্ঞেস করে কোন ইয়ার?
দেবি আস্তে করে উওর দেয় ফাস্ট ইয়ার।
ছেলেটি হাসতে হাসতে বলে আমিও ফাস্ট ইয়ার। কোন সাবজেক্ট?
দেবি উওর দেয় বাংলা।
ছেলেটি হাসির জোর বাড়িয়ে বলে আমিও তো।
তোমার নাম কি?
দেবি বলে “নিলাদ্রী দেবি “বাড়িতে সবাই দেবি বলে ডাকে। ছেলেটি মুখ ভেন্চে বলে নামটা সুন্দর কিন্তু আমি তোমাকে নিলাদ্রী বা দেবি কোনোটাই বলে ডাকতে পারবো না। আমি তোমাকে নিলু বলে ডাকবো। তোমার কোনো আপত্তি নাইতো?
দেবি মুচকি হেসে বলে না নেই।আপনার নাম কি?
ছেলেটি বলে এমা তুমি আমাকে আপনি করে বলছো কেনো?তুমি করে বলবা তা না হলে আমার নাম বলব না, বলেই উঠে চলে যায়।
দেবি তাঁকিয়ে থাকে ছেলেটির চলে যাওয়ার দিকে।
পরের দিন দেবি ক্লাসে ঢুকতে যাবে ঠিক সে সময় ডাক শুনতে পাই নিলু!
নিলু ডাক শুনেই পেছনে ঘুরে দেখে গত কালকের ছেলেটি।
নিলু হেসে জিজ্ঞেস করে আপনার নামটাই তো বলেননি এখনো।
ছেলেটি আবার বলে আগে তুমি করে বলো তারপর বলব।নিলু হাসে তারপর ক্লাসে ঢুকে বসে পড়ে।ছেলেটিও নিলুর পাশেই বসে।লজ্জার ঘোমটা ভেঙ্গে এবার নিলু বলে “তুমি কিন্তু এখনো তোমার নাম বললে না”!
ছেলেটি মুচকি হাসি দিয়ে নিলুর দিকে তাকিয়ে বলে বর্ষন ইসলাম।তুমি আমাকে বর্ষন বলে ডাকতে পারো।
নিলু একটু অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল তুমি মুসলিম???বর্ষন মাথা ঝাকিয়ে বলে হ্যা, কেনো মুসলিম হলে আমার সাথে কথা বলা যাবে না নাকি!
নিলু বলে এমা না না তেমনটা বলিনি আমি এমনিতেই জিজ্ঞেস করলাম।
এভাবেই বর্ষন আর নিলুর বন্ধুত্বটা শুরু হয়।আস্তে আস্তে খুব ভালো বন্ধু হয় তারা দুজনে।কিন্তু ঐ যে কবি বলেন একটা ছেলে আর একটা মেয়ে কখনো ভালো বন্ধু হতে পারে না।তাদের দুজনের কারো মাঝে প্রেম নামের অনুভুতি জেগে উঠে। বর্ষন আর নিলুর মধ্যে সেই প্রেমটাই দেখা দিয়েছিলো।যা রুপ দিয়েছিলো গভীর ভালোবাসায়।
দুজনের দিনগুলো বেশ যাচ্ছিলো ভালোবাসা আর খুনশুটির মধ্য দিয়ে। আর এ ভালোবাসার মোহে দুজনে ভুলে গিয়েছিলো তাদের দুজনের ধর্ম আলাদা।নিলুর ইসলাম ধর্ম গ্রহন করতে কোনো আপত্তি না থাকলেও পরিবার, সমাজের ছিলো ঘোর আপত্তি।
দেখতে দেখতে সুন্দর ভাবে দুটো বছর কেটে গেলোও ঝড়ো হাওয়া বইতে শুরু করেছিলো তাদের মাঝে।কারন নিলুর বাড়িতে নিলুর বিয়ের কথাবার্তা চলছিলো।
নিলু বিয়েতে রাজি ছিলো না যার কারনে নিলুর বাবা নিলুর গায়ে হাতও তুলে।
তারপর যখন বাবা জানতে পারে তাদের মেয়ের এক মুসলিম ছেলের সাথে সম্পর্ক আছে তখন আর কিছু না শুনে বিয়ের দিন ঠিক করেই ফেলে। নিলুর কোনো রকমে বর্ষনের সাথে যোগাযোগ করে ঠিক করে তারা দুজন দুরে কোথাও পালিয়ে যাবে, যেখানে তাদের দুজনকে কেউ চিনবে না জানবে না। দুজনে নতুন করে জীবন শুরু করবে।
কিন্তু তা হয়নি ভাগ্যক্রমে নিলুর বাবা এবং বড় ভাই সবটা জেনে যায়।
নিলুর আর বর্ষনের সাথে যাওয়া হয় না।বাধ্য হয়ে বউ সেজে বসতে হয় বিয়ের পিরিতে এক অপরিচিত মানুষের সাথে।
সাতপাকে বাধা হয় অন্য এক মানুষের সাথে। ভালোবাসার মানুষ আর দেখা সব স্বপ্ন বিষর্জন দিতে হয়েছিলো আগুনের এই সাতপাকে বাধা আর সিঁথির সিদুরের কাছে।
তারপর চলে যেতে হয়েছিলো বাপের বাড়ি ছেড়ে নতুন এক পরিবারে।
সেদিন বর্ষনকে মুছে দিতে হয়েছিলো মনের কোন থেকে বাবার সম্মান বাঁচাতে।হিন্দু মেয়ে হয়ে মুসলিম ছেলেকে ভালোবেসে বিয়ে করলে তো বাবার আর সম্মান থাকতো না সমাজে। একঘোরে করে দিত সবাই।
সিঁথির লাল সিদুরে সেদিন বর্ষন নামটা ঢাকা পড়ে গিয়েছিলো।তার পর থেকে নিলু নামটাই ডাকেনি কেউ আর। বর্ষনের সাথেও দেখা হয়নি কখনো।
কেমন আছে, কোথায় আছে কে জানে। তারও তো বয়স হয়েছে,হয়তো সংসার হয়েছে। সেও আমার মত সংসার ছেলে মেয়ে নিয়ে ব্যস্ত।
সময়ের সাথে সাথে অতিত ধূসর হয়ে গেলেও মনের গভীরের এক কোনে বর্ষনের জন্য লুকানো ভালোবাসা রয়ে গেছে।আর এ ভালোবাসা ঠিক শুকনো গোলাপের মত আজীবন রয়ে যাবে।দেবি সব সময় ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করে এ জীবনে তো তারা এক হতে পারেনি,পরের জন্মে যেনো তারা এক হয়ে জন্ম নিতে পারে।

Close