নাগরিক মতামতশিরোনাম-২

আমি রাজনীতি ঘৃণা করি

নূরুন্নবী সবুজ

যে এই শব্দটি বলে এমন গর্ব করে বলে সে যেন পৃথিবীর সবচেয়ে ভালো মানুষ। আর যে শুনে সেও বিশ্বাস করে রাজনীতি ঘৃণা করা একজন মহৎ আর ভালো মানুষের লক্ষণ। রাজনীতি যে খারাপ মানুষের জন্য খারাপ মানুষরা রাজনীতি করে কোন সুস্থ স্বাভাবিক মানুষের পক্ষে যে রাজনীতি করা সম্ভভ না আর সুস্থ স্বাভাবিক মানুষ রাজনীতি করলেও যে একটা সময় অসুস্থ হয়ে যায়; একটি বৃহৎ জনগোষ্ঠী এখনো তা বিশ্বাস করে। দশ চক্রে ভগবান ভূত । আপনি সবার সাথে রাজনীতি নিয়ে আলোচানা তুললে এই কথাটি অবশ্যই কোন না কোন ভাবে শুনতে পারবেন “আমি রাজনীতি ঘৃণা করি।” রাজনীতির প্রতি এই ঘৃণা কি সবার থাকা উচিত? এটি মহত্বের লক্ষণ? এর দ্বারা কি নিরাপত্তা আর ভালো কিছু অর্জন করা সম্ভব? অনেক কিছুই জানা নেই ,জানার আগ্রহ যে আছে এমনটিও নয়। তবুও এই বিষয়টি জানা, বুঝা ও পালন করার সাথে আপনার অস্থিত্ব জড়িত তাই এই সবার আগে জানা ও মানা কর্তব্য।
আজকে ত্রাণ বন্টন নিয়ে সংবাদ মাধ্যমে সংবাদ করা হয়েছে বলে সম্পাদকের নামে মামলা করা হয়েছে। ত্রাণ চুরি করেছে কারা রাজনীতিবীদ। সত্য সংবাদ প্রকাশ করায় প্রকাশ কারীদের বিরুদ্ধে মামলা করেছে কারা রাজনীতিবীদ। এজন্য রাজনীতিবীদ খারাপ। রাজনীতিবীদরা বড় বড় প্রকল্পের টাকা মেরে খাচ্ছে। বিদেশে টাকা জমা করছে। ব্যাংক থেকে টাকা নিয়ে ঋণ খেলাপি হচ্ছে । ব্যাংকে আজ তারল্য সংকট। এই সংকট তৈরী করছে কারা রাজনীতিবীদ। প্রতিনিয়ত গ্যাস আর বিদ্যুতের দাম বেড়ে চলছে। দ্রব্যমূল্যে কাজ করছে বড় সিন্ডিকেট । এরা দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ করে হাজার হাজার কোটি কোটি টাকা মুনাফা করছে আর তৃণমূলে যারা উৎপাদন করছে তাদের বঞ্চিত করছে। এসব কাজ কারা করছে রাজনীতিবীদ বা তাদের ছত্রছায়ায় অন্য কেউ। এসব ঘৃণিত কাজ আপনি জানেন বলেই আপনি রাজনীতি ঘৃণা করেন । আপনার কাছে এর কোন সুফল নেই । আপনি নিজেও রাজনীতি করতে চান না অন্যকেও উৎসাহিত করেন না।
ধর্ষণের মত ঘৃণিত অপরাধ আপনাকে শিহোরিত করে। আপনি মাদকের প্রভাবে যখন আপনার সন্তান বা সন্তানতুল্য কেউ নষ্ট হয়ে যায় তখন কষ্ট পান। আপনাকে ভাবিয়ে তোলে কিশোর গ্যাংয়ের বিস্তার। আপনি নিজে যখন রাস্তা দিয়ে হাটেন তখন পুরো নিরাপত্তা বোধ করতে পারেন না। আবার আপনার সাথে যদি আপনার মেয়ে বা বোন থাকে তাহলে আপনাকে আরো সংকোচে চলতে হয় কখন কে উত্ত্যাক্ত করে। আপনি সমাজের বুকে এমন ছোট কিছু অপরাধ দেখেন তার সহজ সমাধান করা সম্ভব কিন্তু নানা কারনে আপনি তা পারেন না। আপনার ইচ্ছা করে মন খুলে প্রতিবাদের কথা শোনাতে আর প্রতিবাদ করতে ইচ্ছে করে সমাজের অন্যায় আর অবিচারের বিরুদ্ধে আঘাত হানতে। কিন্তু আপনি রাজনীতি ঘৃণা করেন, আপনি মনে করেন রাজনীতি খারাপ মানুষের কর্ম তাই নিজের মনের ক্ষোভ পুষে নিজের মাথার চুল ছিড়তে থাকেন।
বাংলাদেশ অর্থ পাচারে ২য় অবস্থানে বিষয়টি আপনাকে নিশ্চয়ই আনন্দ দেয় না বরং রক্ত গরম করে দেয় ।আপনার মনে প্রশ্ন উঠে গণতন্ত্রের গণ কোথায়। আপনি রাস্তার কাজের দুই মাসের মধ্যেই তার ভেঙ্গে যাওয়া নিয়ে চায়ের আড্ডায় , বন্ধু বান্ধব বা পাড়া-প্রতিবেশীর মাঝে কড়া সমালোচনা করতে পারেন। নিজেকে দেশপ্রেমিক হিসেবে প্রকাশ করার জন্য আপনি সরকারকে কোন প্রশ্ন ছাড়াই কর দেন সেটি বলতে পারেন কিন্তু যখন আপনি রেজিস্ট্রি অফিসে জমি রেজিস্ট্রি বা অন্য কোন প্রয়োজনীয় কাজে যান তখন সেখানকার পরিবেশ আপনার মনে প্রশ্ন তোলে দেশে বৈধ প্রক্রিয়ায় বৈধ কাজ করার উপায় কি নাই? বৈধ কাজও কি অবৈধ উপায়ে করতে হবে?
মেডিকেলের সেবার মান নিয়ে প্রশ্ন যে কারো উঠতে পারে আবার প্রাইভেট ক্লিনিকের খরচ নিয়েও । ঔষুধ কিনতে গিয়ে দাম করাটা সভ্য মানুষের কাজ বলে হয়ত মনে করে না বা তার সঠিক মূল্য যাচাই বাচাই নিয়েও কারো কোন প্রশ্ন কোনদিন উঠেনি । কিন্তু যখন আপনি বিভিন্ন সময় ভ্রাম্যমান আদালতের মাধ্যমে বিভিন্ন ঔষুধের দোকানে জরিমানা করতে দেখেন তখন আপনার মনে নানা প্রশ্ন আর সন্দেহ তৈরী হয়।
চারিদিকে নানা সমস্যা । ব্যাবসায়ীরা সিন্ডিকেটের মাধ্যমে দ্রব্যের দাম বাড়াতে পারে আবার কমাতেও পারে। বাজারে প্রতি দোকানে দোকানে চাদাবাজি বা গণ পরিবহনে নানা স্থানে স্থানীয় দ্বারা টাকা আদায় যেমন দ্রব্যের মূল্য বৃদ্ধি করে তেমনি সমাজের শৃঙ্খলা নষ্ট করে। আপনার চাওয়া থাক বা না থাক যখন বিদ্যুতের মূল্য বাড়ে তখন আপনাকে শুধু বিদ্যুতের জন্য অতিরিক্ত টাকাই দিতে হয় না বরং আরো অন্যান্য পণ্যের দাম তখন বেড়ে যায় তার মূল্যও পরিশোধ করতে হয়।
সমাজে এমন আরো নানা সমস্যা আপনার জীবনকে বিষিয়ে তুলছে। আপনি অনেক সময় সমাজ আর দেশ থেকে পালাতে চান কিন্তু আপনার সে সামর্থ্য নাই বলে আপনি তা পারেন না। আপনি মনে করেন রাজনীতি খারাপ মানুষের আর এর কোন দিনে পরিবর্তন হবে না।আপনি তাই তা পরিবর্তনের চেষ্টাও করে না। নিজেকে ভাগ্যের হাতে ছেড়ে দিয়ে আপনি নিজের সহ অন্যের স্বাভাবিক জীবন যাপনকে অনিশ্চিত করে দিচ্ছেন। আপনার অনেক কিছু করার আর জানার ইচ্ছা কিন্তু তার কোনটাই পরিবর্তন করতে পারছেন না।
বিশ্ব ১ম বিশ্বযুদ্ধ ও তার ভয়াবহ দিক দেখেও ২য় বিশ্বযুদ্ধ আটকাতে পারে নি। ক্ষমতা যখন অধিকার শোষণ করে তখন যুদ্ধ না হলেও যুদ্ধ পরিস্থিতি তৈরী হয়। ১২১৫ সালের যে ম্যাগনাকার্টা তা এমনি এমনি আসেনি। শ্রমিকদের ৮ ঘন্টা কর্ম ঘন্টা বা নিগ্রোদের অধিকার আদায়ের পিছনে জড়িয়ে আছে অনেক ত্যাগ। ক্ষমতাকে শোষণ না করে সেবকের পর্যায়ে নিয়ে যেতে নিজের ভিতর কিছু ত্যাগ আর সাহসের পরিচায় দিতে হবে।
আমরা বিট্রিশদের শাসনের নামে শোষণ থেকে মুক্ত হয়েছি প্রায় ২’শ বছর পর। এই দু’শ বছরের শোষণের বিরুদ্ধে নানা সময় একভাবে বা সংগঠিত ভাবে নানা আন্দোলন আর বিদ্রোহ হয়েছে। আমরা পাকিস্তানের শোষন ও বঞ্চনার স্বিকার হয়েছি প্রায় ২৪ বছর। কিছু হবে না ভেবে কিছু না করলে তার খারাপ ফল পেতেই হবে। আর খারাপ কিছু হলেও ভালো কিছুর জন্য লড়লে তা অবশ্যই ভালো ফল আনবে। ১৮৫৭ সালের সিপাহী বিদ্রোহ, ১৮৬০ সালের নীল বিদ্রোহ বা ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন এর সাফল্য আপনি ক্ষুদ্র দৃষ্টিতে দেখলে পাবেন না কিন্তু সামগ্রিক ভাবে যদি দেখেন তাহলে ১৯৭১ তার ফসল।
আমি রাজনীতি ঘৃণা করি এই বাক্যটি গর্বের নয়।এটি চরম বোকমী, নির্বুদ্দিতার আর আহামক্কির প্রকাশ। রাজনীতি সম্মান ভালোবাসা আর আস্থার নাম। রাজনীতি মানুষকে মানুষ হিসেবে সমাজকে সাম্য করে গড়ে তোলার এক নাম। এর মাধ্যমে সকল শোষন বঞ্চনা আর অসাম্য দূর হবে। রাজনীতি সকলের সেবা নিশ্চিত করবে। কেউ রাজনীতিকে ঘৃণা করতে পারে না।
আপনি রাজনীতিকে ঘৃণা করলেন মানে কোন মেয়ের ধর্ষণের পর তার ন্যায় বিচার নিশ্চিতে বাধা দিলেন, যে ছেলে বা মেয়ে পড়াশুনা করে দেশের সেবা করবে তাকে বানিয়ে রাখবেন বেকার, দেশ থেকে মাদক আর অপরাধ দূর করতে চাইবেন কিন্তু তা বাড়তেই থাকবে। যখন শ্রম আর মজুরীতে পার্থ্যক্য তখন সেটি আপনার রাজনীতি ঘৃণা করার ফসল। দেশে চিকিৎসক, চিকিৎসা কেন্দ্র বা আইন আদালতের যে অপর্যাপ্ততা তা রাজনীতির সৃষ্টি। রাজনীতির প্রতি ঘৃণা আপনাকে অন্ধের পর্যায়ে নিয়ে গেছে আর তাই আপনি আপনার বোকামীর দোষ না দিয়ে অন্য কিছুর উপর দোষ চাপিয়ে দেন । এটি আপনাকে ভালো কিছু অবশ্যই দিবে না।
আপনাকে মাশুল দিতে হচ্ছে , আপনার পূর্ব পুরুষরাও মাশুল দিয়েছে আর ভবিষ্যতে যারা আসবে তাদেরও মাশুল দিতে হবে এই রাজনীতি ঘৃণার কারনে । প্রত্যেকটা নাগরিককে বুঝতে হবে রাজনীতি কি কেন কিভাবে তাহলে দেখবেন পুরো সমাজ ব্যাবস্থার যে ঘুণ তা নিমিষে দূর হয়ে যাবে। ঢাকামুখী বেকার জনগণের ঢল বা কোন ভিআইপি তকমা দিয়ে নাগরিকের জীবন হরণ, বাজেট বরাদ্দ তৃণ মূলে আসতে আসতে তার সিংহ ভাগ শেষ হয়ে যাওয়া সব বন্ধ করা সম্ভব। রাজনীতিকে ঘৃণা করা বন্ধ করে তাকে ভালোবাসেন রাজনৈতিক কর্মকান্ডে অংশগ্রহণ করেন চোখের সামনে আপনার পুকুরের মাছ আর কেউ চুরি করতে পারবে না।
সংবিধানের বিধান বা রাষ্ট্রের দর্শন যদি আপনি না জানেন তাহলে আপনার ভেতর যে চেতনা কাজ করবে তা ভালো ফল দিবে না দিতে পারে না। আপনি দেশের সর্বোচ্চ ডিগ্রী নেবার পরও বিশ্ববিদ্যালয় কি ও কেন জানেন না তাহলে রাজনীতির সুখকর আর কল্যাণকর দিক কিভাবে জানবেন।আজ দেশের শিক্ষিত যুবক সম্প্রদায়ও যদি রাজনৈতিক জ্ঞান ধারন করে তাহলেও দেশের কাঠামো পরিবর্তন সম্ভব। ঝুড়ির তলা যদি না থাকে তাহলে তাতে যাই রাখা হোক না কেন থাকবে না। জনগণ রাজনীতিকে ভালোবসলে ও রাজনৈতিক কর্মকান্ডে অংশগ্রহণ করলে অবশ্যই এমন ইতিবাচক কিছু হবে যার জন্য আমাদের হাজার হাজার বছরের অপেক্ষা।
সার্কাসে একটি বাচ্চা হাতিকে বেধে রাখা হয় ছোট খুটির সাথে । হাতির বাচ্চাটি অনেক চেষ্টা করে সেই বাধন থেকে মুক্ত হতে । ছোট তাই শক্তি কম হওয়ায় তার পক্ষে সম্ভব হয় না সেই বাধন থেকে মুক্ত হওয়া । হাতি একসময় বড় হয় তার শক্তি বৃদ্ধি পায় কিন্তু তার বাচ্চা কালের যে চর্চা তাই প্রতিবন্ধক হয়ে থাকে। বড় হাতিটি আর শিকল ভাঙ্গার চেষ্টা করে না তাই তাকে বন্দী থাকতেই হয় ।বড় হাতিটি জানেই না তার শক্তি আর সামর্থ্য কি। সে চাইলেই শিকলকে ভাঙ্গতে পারে এটি তার সামর্থ্যের ভিতর কিন্তু জানার বাইরে।
জনগণ সাংবিধানিক ভাবে দেশের মালিক হয়েও তার জানে না তাদের রাজনৈতিক অবস্থান। বাংলাদেশে এখন শুধু শিক্ষিত জনগোষ্ঠীই যদি তাদের রাজনৈতিক দ্বায়িত্ব পালন করে তাহলে দেশের দশের ভাগ্য পরিবর্তন হতেই হবে। কেরালা ভারতের একটি অঙ্গরাজ্য যদি তার নাগরিকের সকল ধরণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করেতে পারে তবে আমরাও পারবো ।এর জন্য দেশের মালিক হিসেবে আপনি মাঠ নামেন রাজনীতিকে ভালোবাসেন ও আপনার ক্ষমতার প্রয়োগ ঘটান দেখবেন খুব ছোট শিকল আপনার কিছু করতেই পারবে না। আপনার মনের শিকল ভাঙ্গাই এখন প্রধান কাজ। আপানি রাজনীতির মাধ্যমে খারাপভাবে স্বিকার না হয়ে রাজনীতিকে আপনার আমার সকলের মঙ্গলজনক করতে রাজনীতি জানুন,বুঝুন ও রাজনৈতিক কাজে অংশগ্রহণ করুন।

লেখক: নূরুন্নবী সবুজ, আইন বিশ্লেষক ও কলামিষ্ট।

Close