ট্রাভেল ও ট্যুরিজমশিরোনাম-২সাহিত্য ও সংস্কৃতি

‘কালারিপায়াত্তু’ থেকে ‘Art of Martial’

পার্থ ভৌমিক

 

 

মার্শাল আর্ট মানে হলো চীনের কুংফু-কারাতে। কিন্তু প্রায় দেড় হাজার বছরের পুরনো এই রণকৌশল উদ্ভবের নেপথ্যে ছিলেন একজন ভারতীয় বৌদ্ধ ভিক্ষু এটা জানতেন কি। জানা যায়, পঞ্চম শতাব্দীতে ভারতীয় বৌদ্ধ ভিক্ষু বোধিধর্ম বৌদ্ধ ধর্ম প্রচারের উদ্দেশে চীনে গিয়েছিলেন। হিমালয় অতিক্রম করে ভারত থেকে চীন যাওয়ার পথে তাকে নানা বিপদসঙ্কুল পথ পাড়ি দিতে হয়। বন্যপ্রাণী থেকে শুরু করে দস্যুদেরও তিনি মোকাবিলা করেন। আর এই সব মোকাবিলাই তিনি করেছিলেন খালি হাতে। বোধিধর্মের আত্মরক্ষার এসব কৌশলই পরে চীন ও জাপানে খালি হাতে কুমফু বা কারাতে হয়ে ওঠে।

প্রথমে জানা যাক মার্শাল আর্ট বলতে কি বোঝায়। মার্শাল আর্ট শব্দের অর্থ হচ্ছে ‘Art of Martial’ অর্থাৎ ‘যুদ্ধের শিল্প’। মার্শাল আর্ট বলতে আসলে বোঝায় যুদ্ধের জন্য প্রশিক্ষণ দেয়ার বিভিন্ন পদ্ধতি ও কলাকৌশল। এই পদ্ধতি কখনো কখনো সংহিতাবদ্ধ অর্থাৎ কিছু সূত্রবদ্ধ অথবা কখনো কখনো সূত্রবদ্ধ নয় অর্থাৎ বিক্ষিপ্ত। প্রকৃতপক্ষে এসব বিভিন্ন ধরনের মার্শাল আর্টের উদ্দেশ্য হচ্ছে শারীরিকভাবে প্রতিপক্ষকে পরাজিত করা এবং যেকোনো ধরনের ভয়ভীতির প্রতি রুখে দাঁড়ানো। আবার কিছু কিছু মার্শাল আর্ট আধ্যাত্মিক সাধনা ও ধর্মীয় বিশ্বাসের সাথে যোগবদ্ধ। বোধিধর্মের ইতিহাস ভারতে বৈশিভাগ লোকেরা জানেনই না,এই মহান সন্ন্যাসীর কথা ভারতবর্ষে ভুলে গেছে, কিন্তু মনে রেখেছে জাপান চীন এর অধিবাসীরা, তারা তাকে ভালোবেসে ‘দামু বা ডরুমা মাস্টার’ বলে ডাকেন।ওনার ইতিহাস ভারতে সেই রকম পাওয়া যায়না, চৈনিক শিলালিপি ও সাওলিন টেম্পলের মাধ্যমে জানা যায় যে বৌদ্ধ ধর্মের বিধান অনুযায়ী, বোধিধর্ম ছিলেন অহিংস। তাই চীন যাওয়ার পথে তিনি কোনো অস্ত্রশস্ত্র বহন করেননি। চীনে পৌঁছে স্থানীয় মল্লযুদ্ধের কলাকৌশলগুলো তিনি লক্ষ করলেন। সেই কৌশলের সঙ্গে নিজস্ব কৌশল মিশিয়ে এক ধরনের আত্মরক্ষা র পদ্ধতি আবিষ্কার করেন। এটি একটি ধ্যানের অন্তর্গত গভীর নিঃশ্বাস আর অঙ্গপ্রত্যঙ্গের প্রসারণ বা স্ট্রেসিং। যে ধ্যানের নাম পরবর্তীকালে হয়ে উঠবে কুংফু। মার্শাল আর্টের সঠিক উৎপত্তিস্থল কোথায় এ নিয়ে মতবিরোধ আছে। তবে মার্শাল আর্টের কথা শুনলেই সকলে এশিয়াকে নির্দিষ্ট করতে চায়।মার্শাল আর্ট এর ইতিহাস ভারতে পাওয়া যায় ভারতীয় বৈদিক যুগের প্রায় ৩০০০ বছর পূর্বে। বেদ ছিলো ভারতীয় উপমহাদেশের প্রাচীন গ্রন্থ, যেটি ছিলো নানারকম জ্ঞানের এক বিশাল আধার।তার থেকে জানা যায় ‘কালারিপায়াত্তু’ হচ্ছে ভারতে প্রাচীনতম মার্শাল আর্ট এর একটি।কিংবদন্তী অনুসারে জানা যায়, কালারিপায়াত্তু সৃষ্টি করেছিলেন পরশুরাম। পরশুরাম ছিলেন হিন্দুধর্মের ঈশ্বর বিষ্ণুর ষষ্ঠ অবতার। পরশুরাম পৃথিবী থেকে দুষ্টের দমন আর শিষ্টের পালনের হেতু ২১ বার যুদ্ধে অবতীর্ণ হন এবং অত্যাচারী ক্ষত্রিয় রাজাদের নিধন করেন। মহাভারতের কাহিনী থেকে জানা যায়, তিনি পরবর্তীতে একজন অস্ত্রগুরু হয়েছিলেন। অনেকে মনে করেন, শাওলিন কুংফু কালারিপায়াত্তুর দ্বারা অনুপ্রাণিত, কারণ বোধিধর্মা ছিলেন কালারিপায়াত্তু শিক্ষক, পরে তিনি শাওলিন কুংফুর শিক্ষক হিসেবেও পরিচিত লাভ করেন।

বোধিধর্মা ছিলেন জেন বা zen ধর্মালম্বী বৌদ্ধ সন্ন্যাসীদের ২৮ তম গুরু (জৈন নয় কিন্তু)। বৌদ্ধ ধর্মের জেন সম্প্রদায় দের কথা জানতে হলে আরেকটু পিছনের দিকে যেতে হবে, যেতে হবে গৌতম বুদ্ধের সময়ে।আজ থেকে আড়াই হাজার বছর আগেকার কথা, একদিন ভোরে, হালকা ও নরম রোদ ঝলমলে আবহাওয়ায়, শ্রাবস্তী নগরে ও বুদ্ধ প্রতিদিনকার মত হেঁটে চলেছেন, তারপর তিনি তার শিষ্যদের মাঝে এসে বসলেন । বুদ্ধ তাঁর ঊনপঞ্চাশ বছর ধর্মপ্রচারের পঁচিশ বছরই এই শ্রাবস্তী নগরে ছিলেন, নিশ্চয়ই সেই শহরের মানুষজন কে খুব ভালোবেসে ফেলেছিলেন। বুদ্ধের যত প্রধান সূত্র- বজ্রছেদিকা প্রজ্ঞাপারমিতা সূত্র, প্রজ্ঞাপারমিতা হৃদয়ম সূত্র সব-ই এখানে তৈরি। সেইরকম এক মনোরম সকালে বুদ্ধদেব হেঁটে এসে বসলেন, পা ধুয়ে তাঁর শিষ্যদের দিকে মনোনিবেশ করলেন। তাঁর দিব্যকান্তি, শান্ত, সমাহিত শরীর তার, সেই সময়ের অনেক মনীষী গুরুর ন্যায় দিগম্বর হয়নি তখনো,তারা সুন্দর বস্ত্রাবৃত- ভিক্ষুর সম্বল পীতবস্ত্র পরিধান পরে আছেন। তাদের পাশে ভিক্ষাপাত্র- তাতে ভিক্ষান্ন, ভিক্ষুগণ তাঁকে তিনবার পরিক্রমা করে যে যার জায়গা নিলেন। সকলে তাঁদের বস্ত্র মনোযোগ সহকারে ঠিক করলেন। বুদ্ধের হাতে একটি পদ্মফুল, কিংবা অনেকে বলেন গোলাপের স্তবক একটি।বুদ্ধ সেদিন কোনও কথা বলছিলেন না। সবাই চুপ। সূর্যদেব আকাশ বেয়ে উপরে চড়ছেন। পাখিদের ডাকের ধরন দিনের প্রহরের সাথে বদলে যাচ্ছে ক্রমশ। শিষ্যেরা উৎসুক। হালকা চাঞ্চল্য। তবু নিত্য বুদ্ধের মৌনতা গভীর থেকে গভীরতর হয়ে চলেছে। এরকম আগে কখনও হয়নি। শিষ্যেরা বুদ্ধকে অবিরাম কথা বলে যেতে দেখে অভ্যস্ত। বুদ্ধের অমৃত বাণীর সিঞ্চনেই তো তাঁদের মনের বাঁক সোজা-সরল হয়ে উঠেছে ক্রমশ। অন্তরে তীরের মত বিঁধে গেছে এতদিন তাঁর মুখনিঃসৃত প্রবচন। কিন্তু আজ তিনি চুপ- হিমালয়ের চাইতেও নিশ্চল, নির্বাক।

এমনই এক সময়, এমনই এক অপূর্ব মুহূর্তে শিষ্যদের ভেতর থেকে হেসে উঠলেন কেউ। সবাই চকিত হয়ে চাইলেন সেই ব্যক্তির দিকে। ভিক্ষুটির নাম মহাকাশ্যপ। সেই সময়কার বুদ্ধের বন্দিত শিষ্যদের মধ্যে কেউ নন তিনি। এমনকি বৃহৎ বৌদ্ধ শাস্ত্রেও মাত্র এই একটিবার এসেছে তাঁর নাম। তাঁর এই হাসি মানুষের চৈতন্যের ইতিহাসে সবচেয়ে অপূর্ব ঘটনা। বুদ্ধের করুণা সেদিন বাঁধ মানেনি। তিনি ইশারায় মহাকাশ্যপ কে ডেকে তাঁর হাতে তুলে দিলেন সেই গোলাপের স্তবক। দিয়ে বললেন, ‘আমি তোমাকে সকল সূত্রে সূত্রায়িত করেছি, যা করা যায় তার জন্য তন্ত্রের সাধনার সকল নির্দেশ দিচ্ছি, যা বলা যায় না,যা করার যেখানে উপায় ও প্রয়োজন কিছু নেই, তার সূত্র তোমাকে প্রদান করছি, মানবকল্যাণে যা প্রয়োজন, সে সব আজ মহাকাশ্যপ পেল।’ বৌদ্ধ ইতিহাসে এই রহস্যময় ঘটনাগুলো থেকে জন্ম হয় জেন ধর্মের- বুদ্ধহৃদয়ের সরাসরি দীক্ষা, যা অব্যয়কৃতোপদেশ নামে পরিচিত, সেই রহস্যময় দীক্ষার মাধ্যমে মহাকাশ্যপ হন প্রথম জেন গুরু। এই ঘটনা যা পরবর্তীতে শিষ্যদের স্তব্ধ করেছে, যা তাদের ধ্যান লাগিয়েছে, তা Transmission of the Lamp নামেও খ্যাত। ‘জেন’-শব্দটিই আসে সংস্কৃত ‘ধ্যান’ বা পালি ‘zan’ থেকে, যা চীনে chan(‘চ্যান’) হয়ে অবশেষে জাপানে zen(‘জেন’) নাম নেয়। অদ্ভুত মানুষ ছিলেন এই মহাকাশ্যপ। এক অশ্বত্থ বৃক্ষের নীচে নিশ্চুপ বসে থাকাই ছিল তাঁর সাধন। বুদ্ধ থেকে মহাকাশ্যপ হয়ে এক সরু নদীর মত এই ধারা বইতে থাকে। জনমানস থেকে কিছু দূরে, পাহাড়ি নদীর মত একাকিনী কিন্তু চিত্তাকর্ষতায় ভরপুর। জেন ধর্ম কাঠামোগত দিক দিয়ে মহাযান বৌদ্ধ ধর্মের অন্তর্গত।

বোধিধর্মা চীনে পৌঁছানোর পাঁচশ বছর আগেই বৌদ্ধ ধর্ম পৌঁছে গেছিলো চিনে, তবে সম্ভবত কোনও বড় ভারতীয় ব্যক্তির আত্মপ্রকাশ সে দেশে তখনও হয়নি। খ্রিস্টীয় পঞ্চম শতাব্দীর শেষ ভাগ, চিন তখন শাসন করছে ওয়েই রাজবংশ (Northern Wei )। ভারত থেকে সুদূর চিনে বৌদ্ধধর্ম প্রচারে গিয়েছিলেন এক নেপালি মূলের বৌদ্ধ সন্ন্যাসী বুদ্ধভদ্র (৩৫৯-৪২৯ খ্রীঃ, তারিখ নিয়ে মতবিরোধ আছে,কোনো জায়গায় বলা হয়ে তিনি ৪৯৫ খ্রীঃ চিনে আসেন)। চিনের হেনান প্রদেশের এক পাহাড়ি উপত্যকাকে ঘিরে থাকা জঙ্গল, ঝরনা আর অনুচ্চ পর্বতশ্রেণীর অপরূপ নৈসর্গিক দৃশ্য তাঁকে মুগ্ধ করেছিল। লোকালয় থেকে অনেক দূরে পবিত্র ‘সং’ পর্বতশ্রেণির গুহায় তপস্যা করতে শুরু করেছিলেন সন্ন্যাসী বুদ্ধভদ্র।সন্ন্যাসী বুদ্ধভদ্রের শিষ্যত্ব গ্রহণ করেন প্রচুর স্থানীয় মানুষ। বুদ্ধভদ্রকে তাঁরা ডাকতেন ‘ফতুও বাতুও লুও‘ নামে।সেই সময় কার Wei সম্রাটরা বৌদ্ধ বিরোধী ছিলেন, বিশেষ করে প্রথমে যুবরাজ পরে সম্রাট হবার পর তাইওয়ু (Emperor Taiwu of Northern Wei), বৌদ্ধদের প্রতি অত্যাচার শুরু করলেন। সেই সময় বুদ্ধভদ্রের উপাসনা পদ্ধতি অবলম্বন করে চিন দেশে শুরু হয় বৌদ্ধধর্মের ‘চান’ বা ‘জেন’ শাখা। এই মতাবলম্বীরা বিশ্বাস করেন ধ্যান ও আত্মানুসন্ধানের মাধ্যমে বোধি বা নির্বাণ লাভ করা যায়।সন্ন্যাসী বুদ্ধভদ্র ঈশ্বর সাধনার সঙ্গে মানসিক ও শারীরিক শক্তির সাধনার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেছিলেন। মন্দিরটিকে দস্যু ও বিধর্মী রাজার হাত থেকে রক্ষা করার জন্য। তাই তিনি তাঁর দুই প্রধান শিষ্য হুইগুয়ান ও সেংচাউ-এর মাধ্যমে ভারতীয় মার্শাল আর্টের সঙ্গে নিখুঁত ভাবে মিশিয়ে দেন চাইনিজ মার্শাল আর্ট (চিনের পৌরাণিক মতের ভিত্তিতে, জানা যায় যে সম্রাট হুয়াং তি চিওটি (বা গো-তি) নামে একটি প্রাথমিক লড়াই পদ্ধতি ব্যবহার করেছিলেন যা খ্রিস্টপূর্ব 2,674 এর কাছাকাছি ছিল। এটি শুই চিওতে বিকশিত হয়েছিল যা জুডোর মতো এবং এটি কনুই এবং হাঁটুর সাহায্যে একটি দ্রুত আক্রমণ পদ্ধতি।খ্রিস্টপূর্ব 600 দিকে কনফুসিয়াস বলেছিলেন যে প্রতিদিনের জীবনে মার্শাল আর্ট এর ব্যবহার কে উত্সাহ দেওয়া উচিত এবং তাদের সমসাময়িক লাও তজু তাওবাদ নামে একটি ব্যবস্থা প্রণীত হয়েছিল সেখানে ও মার্শাল আর্ট এর ব্যবহার উল্লেখ করেছেন)। দুই দেশের দুই ধারার মার্শাল আর্টের মিলনে তৈরি হয় শাওলিন গং ফু বা শাওলিন উইউশু বা শাওলিন কুয়ান নামে এক অবিশ্বাস্য শৈলীর মার্শাল আর্ট। ‘সং’ পর্বতশ্রেণির নিচে থাকা ‘শাওসি’ জঙ্গলের উত্তর দিকে বিশ্বখ্যাত মনাস্ট্রি তৈরি করেন, বিশ্ব আজ যাকে চেনে শাওলিন টেম্পল নামে।তার মৃত্যুর পর Northern Wei বংশের সম্রাট জিয়াওয়েন (Xiaowen) বৌদ্ধ ধর্মের প্রভাব ও বুদ্ধভদ্রের বাণীর প্রতি আকৃষ্ট হয়ে বৌদ্ধ ধর্ম কে রাজ ধর্মে পরিণত করেন,তিনি প্রচুর মঠ নির্মাণ করেন এবং যত সম্ভব ৪৭৭ খ্রিস্টাব্দে তিনি শাওলিন টেম্পল এর জন্য ভূমি দান করেন এর বিবরণ Continued Biographies of Eminent Monks (645 AD) by Daoxuan তে পাওয়া যায়। The Jiaqing Chongxiu Yitongzhi (1843 খ্রীঃ) বলেন, হেনান প্রদেশে এই বিহারটি Northern Wei সাম্রাাজ্য দ্বারা Taihe era ২০ বছর পূর্তি উপলক্ষ্যে নির্মিত হয়েছিলো ৪৯৫ খ্রিস্টাব্দে। শাওলিন টেম্পলের সুউচ্চ কাষ্ঠনির্মিত প্যাগোডাটিকে ২০০০ সালে World Heritage Site হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে UNESCO। শাওলিন মনাস্ট্রির প্রথম প্রধান বুদ্ধভদ্র কে ধরা হয়ে থাকে, জঙ্গল পরিবেষ্টিত জায়গায় অবস্থিত তাই আজ বৌদ্ধ মন্দির হয়েও শাওলিন টেম্পলের বিশ্বজোড়া খ্যাতি কিন্তু পৃথিবীর সর্ববৃহৎ ও সবচেয়ে ঐতিহ্যশালী মার্শাল আর্ট স্কুল হিসেবে। তবে তিনি মার্শাল আর্ট সব কলা কৌশল তার শিষ্যদের শিখিয়ে যাননি তিনি প্রাথমিক কিছু আত্মরক্ষার পদ্ধতি শিখিয়ে ছিলেন।

বুদ্ধভদ্রের মহাপ্রয়াণের পর শাওলিন মনাস্ট্রি পরিচালনার দায়িত্ব পান আর এক ভারতীয় বৌদ্ধভিক্ষু বোধিধর্ম বা পুতিডামো। তার চীন আগমন নিয়ে সঠিক তথ্য পাওয়া যায় না, জেন ও শাওলিন পুঁথি থেকে বোধিধর্ম এর ইতিহাস জানা যায়।তাঁর জীবনী সংক্রান্ত তথ্যের প্রাথমিক উত্স হ’ল ইয়াং জুয়ানজি’র লুয়োয়াংয়ের (Yang Xuanzhi’s ) বৌদ্ধ বিহারগুলির রেকর্ড (547খ্রী.),টানলিনের বোধিধর্মার জীবনীর উপর দু’টি বই যা চারটি পাটে বিভক্ত (ষষ্ঠ শতাব্দীর ) সম্পর্কিত গ্রন্থটির লম্বা স্ক্রোল-এ পাওয়া গেছে, Daoxuan’s Continued Biographies of Eminent Monks (645 C.E.), The Anthology of the Patriarchal Hall (952 C.E.) written by two students of Hsüeh-feng I-ts’un, এছাড়া ধর্মগুরু ওসো(Osho) ও সদগুরু(Sadguru) গবেষণা মাধ্যমে বোধিধর্ম এর ইতিহাস তুলে ধরেছেন। বোধিধর্মা জন্মের সাল নিয়ে এবং তিনি কোন সময়ে চিনে গিয়ে ছিলেন তা নিয়েও সঠিক তথ্য নেয়।তার সময়ে চিনে তিন বড় সাম্রাজ্য শাসন ছিলো যথা Liu Song dynasty (420–479 Ad), Liang dynasty (502–557 Ad) and The Northern Wei (386–534 Ad) আছে তবে বিশ্বস্ত মত হল তিনি The Northern Wei বংশের সম্রাট জুয়ানওয়ু (Xuanwu) সময়ে ও Liang dynasty সম্রাট Wu এর আহ্বানে চীন যান। 483 খ্রিস্টাব্দে তার জন্ম(মতান্তরে 470খ্রীঃ),তবে 483 সালটা সঠিক বলে মনে করা হয়। ইনি ছিলেন পল্লব রাজকুমার আর কাঞ্জিপুরম এ তাঁর জন্মস্থান।দক্ষিণ ভারতের মালায়লম রাজা বল্লভ বা সিংভর্মণ এর তৃতীয় সন্তান। অনেক জায়গায় তার মাতা কে ‘প্রজ্ঞাতারা’ বলা হয়ে থাকে কিন্তু তিনি ছিলেন বোধিধর্মা গুরু এটি নিঃসন্দেহ বলা যেতে পারে। বোধিধর্মা আগের নাম ছিলো বোধিতারা।বৌদ্ধ সন্ন্যাসী বুদ্ধভদ্র ছিলেন গৌতম বুদ্ধের বংশের বংশধর আর রানি/গুরু প্রজ্ঞাতারা ছিলেন বুদ্ধভদ্র এর বংশের মহিলা (কেও তাকে বুদ্ধভদ্র নাতনি বলেছেন,তবে এর কোনো সঠিক প্রমান নেয়,তবে তিনি এ বংশের মহিলা ছিলেন এটা সঠিক),তিনি ছিলেন ভারতীয় বৌদ্ধ ধর্মের 27 তম আচার্য্য বা গুরু পরে এই স্থান বোধিধর্মা পেয়েছিলো, প্রজ্ঞাতারা কে ‘Mother of Zen’ বলা হয়,প্রজ্ঞাতর বা প্রজ্ঞা-তারা অর্থ “সর্বোচ্চ জ্ঞান”(Supreme wisdom),”তারার খাঁটি আলো”(Pure Light of Tara”) এবং তিনি তাই ছিলেনও।নামকরণ করেছিলেন তাঁর ধর্ম মাস্টার পুনমিত্রা (Punyamitra)। চীনা এবং জাপানি জেন ​​ইতিহাসে প্রজ্ঞাতারা কে একজন পুরুষ বলে উল্লেখ করে, তবে এর যথেষ্ট প্রমাণ রয়েছে যে প্রজ্ঞাতারা আসলে একজন মহিলা ছিলেন, দক্ষিণ ভারতের এক মহান মহাযান যোগিনী।তার পরিচয় পাওয়া তাতে জানা যায় যে, হুনরা যখন ৫ ম শতাব্দীতে উত্তর ভারতে আক্রমণ করে তখন ঐ রকম এক বিশৃঙ্খলা থেকে বাঁচতে প্রজ্ঞাতারার বাবা তাকে নিয়ে আরও দক্ষিণে চলে গিয়েছিল।পরে দক্ষিণ ভারতের পল্লব রাজা সিংভর্মণ তাকে তাঁর রাজধানী কাঞ্চিপুরমে শিক্ষকতার জন্য আমন্ত্রণ করেছিলেন। রাজা সিংভারমনের কনিষ্ঠ পুত্র বোধিতারা তার ছাত্র হয়েছিলেন এবং পরে বোধিধর্ম নামে সন্ন্যাসী হন। প্রজ্ঞাতারা মৃত্যু হলে,তার পর বোধিধর্মকে ভারত ছেড়ে চীনে বৌদ্ধ ধর্মের প্রচারে এ যাওয়ার পরামর্শ দিয়েছিলেন তিনি এবং তাই 67 বছর বয়সে প্রজ্ঞাতারা মৃত্যু হলে,তার সুযোগ্য শিষ্য বোধিধর্ম শিক্ষকের মৃত্যুর কিছু পরে চীন এবং অবশেষে শাওলিন ভ্রমণ করেছিলেন। এটি লিপিবদ্ধ আছে যে চিনে বোধিধর্মার চার শিষ্য উত্তরাধিকারীর মধ্যে একজন নুন জঙ্গচি (Nun Zongchi) ছিলেন, তিনি সম্ভবত Liang dynasty সম্রাটের মেয়ে হতে পারেন। জঙ্গচি সম্পর্কে আমরা খুব কমই জানি এবং এটি কীভাবে সম্ভব হয়েছিল যে একজন মহিলা বোধিধর্মের শিষ্য ও শাওলিনে পড়াশোনা করেছিলেন। এই ‘প্রজ্ঞাতারা’ গল্পটি থেকে কমপক্ষে এটা আমরা জানতে পারি যে কেনো বোধিধর্মা মহিলাদের শিক্ষা দেওয়ার ব্যাপারে কোনো আপত্তি করেনি! একজন মহিলা হিসাবে প্রজ্ঞাতারা এই গল্পটি এসেছে The newsletter of Sakyadhita, the international association of Buddhist women, by the Rev. Master Koten Benson of the Lions Gate Buddhist Priory in British Columbia থেকে.

পরবর্তী অংশ পরে পর্বে……

(অনেক দিনের ইচ্ছে ছিলো বোধিধর্ম কে নিয়ে লেখার কিন্তু হয়ে উঠছিল না, কেননা ওনাকে নিয়ে বাংলাতে বা অন্য কোনো ভারতীয় ভাষায় সেরকম কোন ঐতিহাসিক লেখা নেই, যা আছে তা বেশি ভাগ ইংরেজি ও চাইনিজ ভাষায়, তাও ক্যালেন্ডারে গরমিল, কোথাও তার সঠিক জন্ম মৃত্যু তারিখ উল্লেখ তো নেই,এমনকি তার বংশ পরিচয় সঠিক পাওয়া যায় না, তিনি কবে কখন চিনে গিয়েছিলেন তার সঠিক বিবরণী বিভিন্ন ঐতিহাসিক লেখাতে বিভিন্ন রকম আছে, তাই এত কিছু সঠিকভাবে মেলানো সময় সাপেক্ষ ব্যাপার, ভগবানের ধন্যবাদ এই লক ডাউন এর সময় সময়ের অভাব অনেকটাই পূরণ হয়েছে তাই লেখাটা লিখতে পেরেছি। সব তথ্য যে সঠিক সেটি আমি বলছি না, যেসব ঐতিহাসিক ব‌ই বা সূত্র এর মাধ্যমে আমি এই পোস্টটি লিখেছি সেগুলি তথ্যসূত্র এবং লেখার মধ্যে উল্লেখ করে দিয়েছি,সব reference উল্লেখ করা যাবেনা তাহলে ওর জন্য আলাদা পোস্ট করতে বিশেষ বিশেষ কিছু তথ্যসূত্র উল্লেখ করেছি, আমার কোন লেখাতে এত বেশি করে খেটে বা গবেষণা করে লিখতে হয় নি, লেখা আমার নিজস্ব এজন্য ভুল ক্রটি মাফ করবেন..)

তথ্যসূত্র:- https://en.m.wikipedia.org/wiki/Bodhidharma

https://www.onmarkproductions.com/html/daruma.shtml
https://en.m.wikipedia.org/wiki/Chan_Buddhism
http://www.shaolintemplemi.org/bodhidharma-the-first-patriarch-of-ch’an-buddhism.html

Transcending Movement and Stillness – The Life of Bodhidharma

Bodhidharma (Founder of Zen Buddhism and Shaolin Kung Fu)

The Story of Bodhidharma

https://quangduc.com/a28137/bodhidharma-483-540-ad

Biographies of Eminent Monks (645 AD) by Daoxuan

The newsletter of Sakyadhita, the international association of Buddhist women, by the Rev. Master Koten Benson of the Lions Gate Buddhist Priory in British Columbia

Bodhidharma Retold – A Journey from Sailum to Shaolin,Author:Acharya Babu T. Raghu

Broughton, Jeffrey L. (1999), The Bodhidharma Anthology: The Earliest Records of Zen, Berkeley: University of California Press

Bodhidharma. A collection of stories from Chinese literature

The Shambhala Dictionary of Buddhism and Zen (1991) Shambhala

The Zen Teaching of Bodhidharma: A Bilingual Edition

Early Chinese Zen Reexamined: A Supplement to Zen Buddhism: A History

জাপানের ধর্মীয় বৈচিত্র্য (পর্ব- ৪),লেখক- প্রবীর বিকাশ সরকার

Bodhidharma Buddhist Monk Who Invented Martial Arts, Hindi Article

Tantra-sutra- (discourse-56) -osho

https://en.m.wikipedia.org/wiki/Dazu_Huike
http://www.thezensite.com/ZenEssays/Philosophical/Bodhidharma_as_Paradigm.html

বৌদ্ধধর্মের ইতিহাস – উইকিপিডিয়া https://bn.m.wikipedia.org/wiki/%E0%A6%AC%E0%A7%8C%E0%A6%A6%E0%A7%8D%E0%A6%A7%E0%A6%A7%E0%A6%B0%E0%A7%8D%E0%A6%AE%E0%A7%87%E0%A6%B0_%E0%A6%87%E0%A6%A4%E0%A6%BF%E0%A6%B9%E0%A6%BE%E0%A6%B8

শাওলিন টেম্পল: যেখানে ‘যোদ্ধা’ সন্ন্যাসীদের রক্তে বয় ধর্ম আর কুংফু


http://archaeologyexcavations.blogspot.com/2012/01/bodhidharma-death-true-history.html?m=1
https://en.m.wikipedia.org/wiki/Chinese_Buddhism

https://defenceforumindia.com/threads/prajnatara-mother-of-zen.46748/

“Prajnatara: Mother of Zen?” ~ A Line of Dharma Women

http://mesosyn.com/hb6.html

https://en.m.wikipedia.org/wiki/Daoxuan

https://www.ancient.eu/article/975/zen-buddhism-in-ancient-korea/

https://www.himanshugrewal.com/bodhidharma-history-story-hindi.html&usg=AOvVaw2fDfGRdLrB0HoVg49oi-hB

https://roar.media/hindi/main/history/bodhidharma-buddhist-monk-who-invented-martial-arts/

https://www.shaolinrecovery.com/pages/discover-shaolin-medicine

http://en.chinaculture.org/focus/2013-06/04/content_461822.htm

https://muse.jhu.edu/article/708161

https://en.m.wikipedia.org/wiki/Zen

https://en.m.wikipedia.org/wiki/Mah%C4%81k%C4%81%C5%9Byapa

https://en.m.wikipedia.org/wiki/La%E1%B9%85k%C4%81vat%C4%81ra_S%C5%ABtra

https://koan2.in/%E0%A6%85%E0%A6%AD%E0%A6%BF%E0%A6%B7%E0%A7%87%E0%A6%95-%E0%A6%B0%E0%A6%BE%E0%A7%9F-1

http://www.chinabuddhismencyclopedia.com/en/index.php/Buddhabhadra&usg=AOvVaw3JF6FVOoB73jntHBvCgGGa

https://en.m.wikipedia.org/wiki/Shaolin_Monastery

https://en.m.wikipedia.org/wiki/Liang_dynasty

https://en.m.wikipedia.org/wiki/Northern_Wei

https://roar.media/bangla/main/history/history-of-martial-art-origin-of-martial-art-and-oldest-martial-arts/

https://en.m.wikipedia.org/wiki/Buddhist_legends_about_Emperor_Wu_of_Liang

https://isha.sadhguru.org/in/hi/wisdom/article/ek-bodh-katha-bodhdharma-ki

ছবি: Google search এবং তথ্যসূত্র থেকে সংগৃহীত

Close