নাগরিক মতামতশিরোনাম-২

সেলিব্রিটিদের ঘরে থাকার বিজ্ঞাপন শ্রমজীবী মানুষের বের হবার আর্তনাদ

মো. শহিদুল ইসলাম

“ঘরের খাবার শেষ হয়েছে অনেক আগে। যেটুকু ত্রাণ পেয়েছি তাও শেষ হয়েছে। এতোটুকু ত্রাণ বা উপহার পেয়ে সারাটি মাস কিভাবে চালানো যায়। ত্রাণ যেটুকু পেয়েছি শেষ হয়েছে।”- কথাগুলো বলছিলেন রাজশাহীর বস্তির শরিফুল মিয়া। সন্তান সন্ততি নিযে বস্তির স্যাত স্যাতে একটি ঝুঁপড়ি ঘরে বসবাস করেন। বর্ষা আসলে ঘরে পানি জমে যায়। আরেকদিকে মশার উপদ্রুপটাও বেড়েছে। তিনি পেশায় একজন রাজমিস্ত্রী। কাজ বন্ধ প্রায় দুমাস থেকে। করোনাবাইরাস মহামারীর লকডাউনের শুরুর প্রথম মাসের দিকে নিজের সঞ্চিত টাকা শেষ হয়েছে। কিছু উপহার সহযোগীতা পেয়েছিলেন। তা দিয়ে আর কতোদিন চালানো যায়। অন্যদিকে কথা হয় বস্তির রিকসা চালক সুমনের সাথে। রাস্তায় মানুষ কম। রোজগার কমে গেছে। বের হলে নানাভাবে কিছু হয়রানিতো আছেই। তবুও বের হতে হয় সংসারে দুজন সন্তান আর স্ত্রীর জন্য। মুখে আহার তুলে দিতে হয়। উপহার সহযোগীতা পেয়েছেন একবার। সেই ১০ কেজি চাল, আর কিছু সবজি আর ডাল। আবার সেগুলো রান্নাকরে খেতেও তো তেল, মরিচ, আদা রসুন মসলা সহ আরো কতোকি লাগে।সেটি দিয়ে আর কতো দিন চলা যায়। আবুলের ছেলে ফিরে এসেছে ঢাকা থেকে। গার্মেন্টসে কাজ করতো। মাসে মাসে ৩ বা ৪ হাজার করে টাকা পাঠাতো। তবুও সেটা দিয়ে কোন মতে চলতো আবুলের সংসার। এখন সেটাও বন্ধ হয়েছে। মুকুল সাইকেল ম্যাকানিক। এখন সেট্ওা বন্ধ। এভাবেই অনেকে কর্মহীন। রিকসা চালক, গাড়ি চালক, রাজমিস্ত্রী, দিনমজুর, ফুটপাতের হাকার, কৃষিশ্রমিক, সাইকেল মেকার, জুতা তৈরীর কারিগড়সহ ছোট ব্যবসায়ী এরকম খেটে খাওয়া মানুষগুলো কর্মহীন হয়ে বেকার বসে আছেন ঘরে। ঘরে খাবার নেই। পকেটে টাকা নেই ঔষধ কেনার। কি দুর্বিসহ অবস্থা। শ্রমজীবী অনেক মানুষ স্বাস্থ্যঝুঁকি নিয়ে কাজে যেতেও ভয় পাচ্ছেন। নিরুপায় হয়ে অনেকে কাজেও যাচ্ছেন, যদিও কাজহীন শহর শুন্য হয়েছে। তাপর আবার কাজও নেই। মাসের পর পর এভাবে আর কতো। এভাবেই সবকিছু বন্ধ থাকায় বেকার হয়ে বসে আছে বাংলাদেশের লাখ লাখ মানুষ। যাদের বেশীর ভাগই দিন এনে দিন খায়। বাংলদেশে পরিস্যংখান ব্যুরোর(বিবিএস) এর  শ্রমশক্তি জরিপ-২০১৭ তথ্যানুযায়ী দেশের ৮৫ শতাংশ কর্মজীবী মানুষ অনানুষ্ঠানিক খাতে কাজ করে। তারা দিন আনে দিন খায়। সরকারের প্রকাশিত পরিখ্যান অনুযায়ী যদি হিসেব করা যায় তাহলে ১৮ কোটির বেশী জনগোষ্টীর এই দেশে  লকডাউন অবস্থায় কেমন হতে পারে তা সহজেই অনুমেয়। দীর্ঘ প্রায় দুমাস থেকে লকডাউন চলছে। সবকিছু স্বাভাবিক নেই। অন্যদিকে কিছু সচেতন সেলিব্রিটি মানুষ শুধু বলেই যাচ্ছে ঘরে থাকতে হবে। ঘরে থাকতে হবে। নি:সন্দেহে করোনা মোকাবেলায় তা গুরুত্বপূর্ণ উপদেশ। কিন্তু ঘরে থেকে বিশাল এই শ্রমজীবী মানুষের আহার চিকিৎসার ব্যবস্থা কে করবে। তা কি বলছেন?  শ্রমজীবী থেকে শুরু করে এখন নিম্ন মধ্যবিত্ত এবং কিছু ক্ষেত্রে মধ্যবিত্তরাও বেকায়দায় দিন পার করছেন। জনগণ কেন্দ্রিক পেশাজীবী যেমন ফ্রিলেন্সার পেশা, আইনজীবী, কেরানি, লেখক, সাহিত্য ও সাংস্কুতিককর্মী, কিছু ক্ষেত্রে সাংবাদিকসহ এরকম বিভিন্ন পেশার মানুষগুলোও সংকটে পড়ছে দিনে দিনে। পাকেটের তলানি প্রায় শেষের দিকে।
শ্রমজীবী মানুষ তাই আর ঘরে থাকতে চায় না। পেটের দায়ে রাস্তায় বাহিরে সে আয় রোজগার করতে চায়। পেটে খেলে পিঠে সয়, এমন পরিস্থিতিতেও সে কয়েকটি টাকা রোজগারের জন্য রাস্তায় নেমে আসে নিরুপায় হয়ে। কারন তার ঘরে চাল নেই , ডাল নেই। এগুলো আছে ধনী আর মহাজনদের কাছে। সেগুলো টাকা দিয়ে কিনতে হবে। তাই শ্রমজীবী মানুষ পেটের জ্বালায় টাকা রোজগারে মরিয়া।  বাংলদেশে পরিস্যংখান ব্যুরোর(বিবিএস) এর তথ্য মতে মোট জনগোষ্টীর ২১.৪ শতাংশ বাস করে শহরে আর বাকী ৭৮.৬% গ্রামাঞ্চলে বসবাস করে। আবার এই বৃহৎ গ্রামের মানুষের জীবন জীবীকা চাকরি কিছুটা হলেও শহরকে কেন্দ্র করেই। মহামারী করোনার তান্ডবে শহর অবরদ্ধ। গোটা দেশের জীবন জীবীকার এবং চলার একমাত্র সম্বল এখন বাংলদেশের গ্রাম গুলো। তাই গ্রামে দ্রুতই কৃষিশিল্প সৃষ্টির পরিকল্পনা আর এই কর্মহীন মানুষগুলোকে সেখানে দ্রুততার সহিত পেশার সাথে জড়িত করতে হবে। কারন এভাবে সবল আর সুষ্ঠু দেহের সোনার মানুষগুলো আর কতো বসে থাকবে ঘরে। এভাবে চলতে পারেনা। নিয়ম মেনে , নিয়ম মানাতে বাধ্য করে মানুষগুলো কর্মে ফেরাতে হবে। না হলে আহারে অর্ধাহারে মানুষগুলো আরো রোগাক্রান্ত হবার সম্ভাববনা দেখা দিবে। মানসিক রোগের বাসা বাঁধবে। হয়তো আরো নানা সংকটে পড়েতে পারি আমরা। করোনা প্রতিরোধের সাথে সাথে শ্রমজীবী মানুষের জীবন জীবীকার দিকটিও গুরুত্ব দিতে হবে সমানভাবে। উচ্চবিত্তের সামর্থবানরা দুমাস কেন ? হয়তো এক বছরের বেশী সময়েও ঘরে থাকলে সমস্যা হবে না। তারাতো উৎপাদন করেন না। তাদের বেশীরভাগই শুধূ কৌশলী ভোক্তা মাত্র। তাঁরা শ্রমিকের ঘামের পবিত্র জলকে ক্ষনে ক্ষনে বিক্রি করেই আজ বড় বড় মহাজন আর ধনী সেজেছেন। হয়েছেন তথাকথিত সেলিব্রিটি। ঘরে থাকলে শ্রমিকের জীবনশক্তি নি:শেষ হয়ে যাবে। তাদের জীবীকার ব্যবস্থা করতে হবে, নয়তো ঘরে খাবার পৌঁছে দিতে হবে। দেশের পরিস্যংখান অনুযয়ী যে ধনীর তালিকা করা হয়েছে, তাঁদের সঞ্চিত অর্থের অংশগুলো শ্রমজীবী মানুষের খাদ্য চিকিৎসার জন্য ব্যায় করা হোক। সরকারের একার পক্ষে এই মাহামারীর সময়ে খাদ্য, ঔষধ এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় যোগান দেয়া সম্ভব নাও হতে পারে। তাই সরকারকেই এই উদ্যোগ নিতে হবে। খাদ্য স্বয়ংসম্পূর্ণ বাংলাদেশে খাদ্যের সংকট নেই। সংকট পড়েছে খাদ্য বিতরণ ও সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনায়। প্রচুর পরিমান খাদ্য এখানো অনেকের কাছে আছে। সেগুলো বিলি বন্ঠনের ব্যবস্থা করুক সরকার। ঘরে ঘরে তল্লাসি চালাতে হবে সরকারকে। মহামারী এই সংকটকালে কোন ধরনের মজুদ চলবেনা। বেশী দামের আশায় যারা খাদ্য বা নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য মজুদ করেছে তাদের চিহ্নিত করতে হবে। তথাকথিত লোক দেখানো মোবাইল কোর্ট আর বিচ্ছিন্ন কিছু অভিযান কওে এর সমাধান হবেনা। এর জন্য প্রয়োজন সরকারের কেন্দ্র পর্যায়ের কৌশলী ও সুষ্ঠু পরিকল্পনা। মাঠ পর্যায়ের প্রশাসন সেটি বাস্তবায়ন করবে কঠোরভাবে। তানা হলে ঘরে থাকার উপদেশ আর বিজ্ঞাপন আমাদের কোন কাজেই আসবেনা। মানুষ খেতে না পেলে পেটের জ্বালায় ঘর থেকে বের হবেই। কয়েকটি টাকার আশায় তিনি বের হবেনই। কারণ এই কটি টাকার মধ্যে তাঁর জীবন জড়িয়ে আছে, তার সংসার জড়িয়ে আছে। করোনাভাইরাস প্রতিরোধে নিয়ম মানতে হবে, মানাতে বাধ্য করতে হবে। এই নিয়মের মধ্যে দিয়েই শ্রমজীবী মানুষের সার্বিক খাদ্যের এবং নিত্য প্রয়োজনীয় চাহিদার সবধরনের যোগান দিতে হবে। সারাটি বছর  যে শ্রমিক ঘাম আর শ্রমে মহাজন আর তথাকথিত মালিকপক্ষের শিল্প কলকারখানায়, মাঠে-ঘাটে, গুদামে পণ্য উৎপাদন ও রিজাভ করাসহ ব্যাংক হাজার হাজার কোটি টাকা জমাতে প্রত্যক্ষ সহায়তা করলো, সেই  হিস্যা টুকু শ্রমজীবী মানুষেকে দিবেননা এই নিদেন কালে ? সত্যিকারের মালিক তখনই হবেন, যখন আপনি সত্যিকারের মানবিক হবেন।
লেখক: উন্নয়ন কর্মী ও গবেষক
Close