সাহিত্য ও সংস্কৃতি

একদিনের হাসি

সবনাজ মোস্তারী স্মৃতি

 

চারিদিকে কেমন নিঃসঙ্গতার বাতাস উড়তে শুরু করেছে।বন্ধুরা একের পর এক ম্যাসেজ আর ফোন দিয়ে যাচ্ছে তাদের নিঃসঙ্গতা দূর করার জন্য।
আমি আমার ফোনটা সাইলেন্ট করে রেখে দিয়ে দিব্বি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের পুকুর পাড়ে বসে বই পড়ছি রবিন্দ্রনাথের শেষের কবিতা।এই একটা বই আমি যতবার পড়ি ততবারই কাহিনী ভুলে যায় আর ঠিক ভাবে বুঝতে পারি না।তাই বেশ কয়েকবার বইটা পড়া হলো আমার।
কয়টা বাজে তা দেখার জন্য ফোনটা হাতে নিতেই দেখি ৩২টা মিসকল।দেখে আমার খুব ভালো লাগলো। কারন যারা আমাকে ফোন করেছে এতবার তারা অন্য কোনো সময়ে আমাকে ফোন করে না,তাদের কোনো দরকার ছাড়া। রিসিভ না করাই নিজেকে খুব মূল্যবান মানুষ মনে হচ্ছিলো।এটা খুব বেশি আনন্দ দিচ্ছিলো আমাকে।ফোনের স্ক্রিনে তাকিয়ে দেখি দুপুর ২ টা বেজে ৩০ মিনিট। আমি বই ব্যাগের মধ্যে ঢুকিয়ে বাড়ির উদ্দেশ্যে অটো নিলাম। আকাশে মেঘ করেছে।কোনো রোদ নেই।জানুয়ারি মাসের মাঝামাঝি এই সময়ে সাধারনত বৃষ্টি হবার কথা নয় তবুও কেনো মেঘলা তা জানা নেই আমার।এই রকম আবহাওয়ায় হাঁটতে আমার ভীষণ ভালো লাগে। তাই বর্ণালিতে অটো থেকে নেমে হাঁটতে শুরু করলাম। বর্ণালি থেকে বাইপাশের রাস্তার ফুটপাত ধরে হাটতে আমার ভীষণ ভালো লাগে। সময় পেলেই মাঝে মাঝে হেটে বাড়িতে আসি। বাইপাশ বাস কাউন্টারের কাছে এসে চায়ের দোকান দেখে মনে হলো এ সময় এক কাপ চা খেলে মন্দ হয় না। চায়ের দোকানের বেন্চিতে বসে চা বিক্রেতা মামাকে বললাম লিকার দিয়ে এক কাপ চিনি ছাড়া চা দিতে। দোকানের ছোট্ট বাচ্চাটা আমাকে চা দিয়ে গেলো।
আমি চায়ের কাপে চুমুক দিচ্ছি আর রাস্তার গাড়িঘোড়া যাওয়া আসা দেখছি।ঐতিহ্য চত্ত্বরটা আমার বেশ প্রিয়। আর আজ জায়গাটা বেশ ভালো লাগছে বাস কাউন্টারে আজ তেমন ভিড় নেই।
হঠাৎ আমার পাশে এসে এক বৃদ্ধ মহিলা বসল।আমার দিকে মায়াবী চোখে তাকিয়ে আছে।সাধারন ভাবেই বোঝা যাচ্ছে তিনি একজন ভিক্ষুক।আমি উনার দিকে তাকিয়ে বললাম চা খাবেন খালা?

তিনি উত্তরে বলল চা খাবো না মা। মুরগির মাংস খেতে খুব ইচ্ছা করছে। কিনে দে না একটা মুরগি!
উনার কথা শুনে একটু মন খারাপ হলো আমার। কারন মুরগি কিনার মত টাকা আমার কাছে ছিলো না। তাই উনাকে বললাম খালা আজ আমার কাছে টাকা নাই।বৃদ্ধা ভিক্ষুক আমার মাথায় হাত দিয়ে বলল কাল নিয়ে আসিস,আমি তোর জন্য এখানে অপেক্ষা করবো।
আমি বললাম চেষ্টা করবো।কিন্তু আপনি এখানেই থাকবেন তো???
তিনি বলল আমি এখানেই থাকি। আমি আর কিছু না বলে চায়ে চুমুক দিলাম। তিনি আবার বললেন পরের জন্মে আমি তোর গর্ভে জন্ম নিবো তখন আমাকে খুব ভালোবাসবিতো?লাত্থি ঝাটা মারবিনা?
উনার কথা শুনে আমার বেশ হাসি পেয়েছিলো।আমি বললাম আচ্ছা আপনি পরের জন্মে আমার মেয়ে হয়ে জন্ম নিয়েন আমি আপানাকে খুব ভালোবাসবো,এবার আমার সাথে কি এক কাপ চা খাবেন?
তিনি বলল নারে মা,কাল আমি তোর জন্য অপেক্ষা করবো তুই মুরগির মাংস নিয়ে আসবি আমি তখন পেট ভরে খাবো।
আমি চায়ের বিল মিটিয়ে বললাম আমি তাহলে আজ আসি, ভালো থাকবেন। তিনি আবারো বলল আমি কিন্তু তোর জন্য অপেক্ষা করবো তুই আসবিতো?
আমি হাসি মুখে বললাম আল্লাহ বাঁচিয়ে রাখলে আগামী কাল ঠিক আপনার জন্য মুরগির মাংস নিয়ে আসবো।

বাসায় আসার পর আম্মুকে সব বললাম। আম্মু একটু ভয় পেয়েছিলো। আমাকে বললেছিলো মাথায় হাত দিতে দিয়েছিলে কেনো।আজ কালকার যুগ ভালো না। যদি কোনো কালা জাদু করে। আমি একটু রেগে আম্মুকে বলেছিলাম কি সব বলছো বলতো?
একজন বৃদ্ধ ভিক্ষুক আমার কাছে কিছু খেতে চেয়েছে তাতে এত ভয় পাবার কি আছে?
আম্মু আমাকে জড়িয়ে ধরে বলল পাগলি মেয়ে আমার সব সময় মানুষের কথা ভাবে। আচ্ছা কাল তুমি উনাকে মুরগির মাংস আর সাথে কিছু টাকা দিয়ে এসো।

পরের দিন ঠিক দুপুর ২:৩০ টার দিক আমি বাইপাশ বাস কাউন্টারের সামনে চায়ের দোকানে গেলাম।
বৃদ্ধ ভিক্ষুককে আশেপাশে কোথাও দেখতে না পেয়ে একটু মন খারাপ হলো।আমি এক কাপ চা দিতে বললাম চা বিক্রেতাকে।আবারো ছোট বাচ্চাটা চা দিয়ে গেলো। আমার ব্যাগে একটা ক্যাটবেরি ছিলো বাচ্চাটার হাতে দিয়ে বললাম, এটা তোমার জন্য।

চা শেষ করে আমি বাড়ি যাবার জন্য উঠে দাড়িয়েছি ঠিক সে সময় গত কালের বৃদ্ধভিক্ষুক আমার সামনে দাড়িয়ে হাসছে।
উনার মুখ দেখে বুঝা যাচ্ছে তিনি এক আনন্দের হাসি হাসছে।যেনো অনেক বড় কিছু জয় করেছেন তিনি।
আমি বললাম আপনার জন্য মুরগির মাংস আর ভাত নিয়ে এসেছি। তারপর হাতে থাকা কাগজের ব্যাগটা উনার হাতে ধরিয়ে দিলাম।তিনি বলল তুই বস মা, আমি তোর সামনে খাবো।আমি বসলাম বেন্চিতে তিনিও বসলেন। খুব তৃপ্তি সহকারে খাওয়া শেষ করে তিনি আমার কাঁধে হাত রেখে কাঁদতে কাঁদতে বললেন তুই অনেক বড় হবিরে মা। পরের জন্মে তোর মেয়ে হয়েই জন্ম নিবো,দেখিস।
আমি উনার কথা শুনে হাসলাম।তিনিও কাঁদতে কাঁদতে হেসে বললেন ভালো থাকিস। উনার হাসি দেখে আমার সেদিন খুব আনন্দ হচ্ছিলো। বার বার মনে হচ্ছিলো একদিন হলেও তো আমার জন্য কেউ পেট ভরে খাবার খেয়ে হাসতে পেরেছে।
আমি বৃদ্ধ মহিলার চলে যাওয়া দিকে তাকিয়ে ছিলাম। সোজা হয়ে হাটতে পারছিলো না। কুঁজো হয়ে লাঠিতে ভর করে তিনি রাস্তার ওপারে চলে গেলেন।তারপর ভিড়ের মাঝে হারিয়ে গেলেন।
এই দিনটা ছিলো আমার অন্যতম ভালো লাগার দিন। যখনি আমার মন খারাপ হয় তখনি আমি এই দিনটার কথা ভাবি, আর ভাবি আমার জন্য একদিন হলেও এক বৃদ্ধ মহিলা হেসেছিলো।

Close