সাহিত্য ও সংস্কৃতি

মেয়ে

সবনাজ মোস্তারী স্মৃতি

সব সময় বন্ধুদের কাছে শুনে এসেছি নিকোটিনের ধোঁয়ার সাথে সাথে মনের ভিতরের সব কষ্ট বেরিয়ে আসে!
সেদিন আমিও খুব করে চেয়েছিলাম আমার ভিতরের যন্ত্রনাগুলোও ধোঁয়ার সাথে বেরিয়ে আসুক।
খুব করে ভাবতাম একদিন আমিও মদের নেশায় মাতাল হবো, মাতলামি করবো। ইচ্ছা মত চিৎকার করবো।লোকে দেখলে বলবে মেয়েটা মাতাল তার কাছে গিয়ে লাভ নেই।
মনে হয়েছিলো মেয়ে হয়েছি তাতে কি সমস্ত বাধা নিয়ম ভেঙ্গে আমিও আমার প্রিয় মানুষটার হাত শক্ত করে ধরে টেনে নিয়ে এসে সবার সামনে চিৎকার করে বলব তুমি আমার, শুধুই আমার। আর কারো হতে দিবো না তোমাকে।
কিন্তু তেমনটা করলে আমি সমাজের বাইরে চলে যাবো। আমার পরিচয় হবে অসভ্য মেয়ে হিসেবে।
রাস্তায় হাটার সময় মানুষে আঙুল তুলে বলবে দেখ দেখ মেয়েটা খুব খারাপ। সভ্যতা বলে কিছু নেই।
কেউ কেউ বাজারের মেয়েও বলে বসে থাকতে পারে!
তাতে হয়তো আমার কিছু যায় আসবে না। যায় আসবে আমার মা বাবা ভাই বোন এদের।কারন শুধু আমারর দিকে সমাজ আঙুল তুলবে না, তাদের দিকেও তুলবে।
অথচ যদি এমন একজন থাকত যাকে অনায়াসে আমার মনের সমস্ত কথা বলা যেতো, তাকে জড়িয়ে ধরে ইচ্ছে মত কাঁদা যেতো।যাকে সব কিছু বলে দেবার পর আফসোস করতে হতো না কেনো এ কথাটা ওকে বললাম।তবে এ সব কিছুই হতো না।
হ্যা এমনি একজনকে সব সময় খুজে চলেছি। যার কাছে ইচ্ছে হলে বলা যাবে কবিতা শুনবে?
জানি আমি কবিতা লিখতে পারি না তবুও সেই ছোট ছোট লাইনগুলো লিখে যখন শোনাবো সে বলবে এত ভালোবাসো কেমন করে আমাকে যার জন্য কবিতা লিখতে পারছো।
আমি খুজে চলেছি সব সময়। যে বলবে না আমাকে কখনো তোমার ঠোঁট সুন্দর, তোমার চোখ সুন্দর, তোমার কমর সুন্দর ইত্যাদি ইত্যাদি।
সে শুধু মাঝে মাঝে বলবে তোমাকে ছাড়া আমার এক মূহুর্ত ভালো লাগে না।
একদিন আমি বন্ধুদের সাথে হাটতে হাটতে বলেছিলাম একদিন মদ খাওয়াবি? যে মদে মাতাল হওয়া যায়!আমিও পায়ের উপর পা তুলে হাতে সিগারেট নিয়ে চিকেন দিয়ে মদ খাবো।
সেদিন ওরা হাসতে হাসতে বলেছিলো ভুলে যাস না দেবি তুই মেয়ে।
আমি সেদিন চিৎকার করে বলেছিলাম মেয়ে হলেই কি সব কিছু মুখ বুঝে সহ্য করতে হবে?মেয়ে বলে কি আমার কোনো সখ আল্লাদ নেই!কষ্ট নেই, আমার বুকের মধ্যে কোনো যন্ত্রনা পোষা নেই?
তারা শুধু আমার দিকে চেয়ে ছিলো।
আমি আর কিছু বলতে পারিনি। বাড়ি ফিরে এসে চিলেকোঠার ঘরে বসে খুব কেঁদেছিলাম।
সেদিন কেনো কেঁদেছিলাম আমার জানা ছিলো না।
না, কারো জন্য কাঁদিনি। কারো জন্য কাঁদার মত মানুষ আমার জীবনে কখনো আসেনি।
আমি কাউকে হঠাৎ করে ফোন দিয়ে বলতে পারিনি আমার ভীষণ মন খারাপ। তোমাকে দেখার রোগ হয়েছে। বা কেউ আমাকে বলেনি। কেউ বলেনি একটু বারান্দায় আসবে তোমাকে দেখতে ইচ্ছে করছে। কেউ কখনো একটা উপন্যাসের বই হাতে করে এনে বলেনি দেবি তোমার জন্য বইটা। তুমি তো আমার বই পাগলি। কোনো বর্ষায় কদম বা কৃষ্ণচূড়া ফুল হাতে করে এনে বলেনি তোমার জন্য।
অসংখ্য স্বপ্ন শুধু দিনের আলো আর রাতের আধারে শেষ হয়ে গেছে। অথচ আমি মুখ ফুটে কাউকে বলতে পারিনি।
সমস্ত নিয়ম ভেঙ্গে আমি খাঁচার ভেতর থেকে মুক্ত হতে পারিনি।হতে পারিনি কারো প্রিয় বন্ধু, কারো প্রিয় মানুষ, কারো প্রিয় মেয়ে বা কারো প্রিয় বোন।
ডাইরির পাতাগুলো একটা একটা করে শেষ হতে থাকে। আবার নতুন ডাইরি খোলা হয়, লেখা হয় মনের সমস্ত না বলা কথা।
প্রতিটা পাতার ভাজে লেখা হয় মেয়ে তুমি অসভ্য।তোমার খেয়াল খুশি মত চললেই তুমি অসভ্য।তোমার কোনো স্বাধীনতা নেই। কারন তুমি মেয়ে।

Close