শিরোনাম-২স্বাস্থ্য বার্তা

আম (পর্ব-১)

রতন চৌধুরী

 

ছোটবেলায় আম নিয়ে মজার কাহিনী নাই এমন মানুষ পাওয়া বড় দায়। দুপুরে না ঘুমিয়ে গাছ থেকে আম পেরে তা ঝিনুকের খোলস এর পৃষ্ঠদেশ পাকা জায়গায় কিংবা সিমেন্টের শক্ত সানে ঘেঁষে ধারালো করে তা দিয়ে আমের চামড়া ছিলে আম খাওয়া কিংবা আমের আচার খেতে গিয়ে কাঁচের পাত্র ভেঙে ফেলা কিংবা আম পারতে গিয়ে ঢিল ছুঁড়ে অন্য সহপাঠীর মাথা কেটে যাওয়া কিংবা কাঁচা আমের কষে শরীর ও মুখে ঘা বা ক্ষত হওয়া ছিল নিত্য ঘটনা। তাই আমের মৌসুম এলেই ছোটবেলায় ফিরে যাই আমরা।

হাল সময়ে আমরা কম বেশি সকলেই কাঁচা আমের জুস খেয়ে তৃপ্ত হই। কে কত সুস্বাদু জুস তৈরী করে ফেইসবুকে তার টিপস্ দিবে মৌসুমে তার প্রতিযোগিতাও কম দেখা যায় না। কাঁচা মিঠা আম হলে তো কথাই নাই, একটু লবণ ও শুকনা মরিচের গুঁড়া হলেই হলো। এছাড়াও আম দিয়ে ডাল রান্না বা আম কাসুন্দি’র কথা নাই বা বললাম। চাঁপাইনবাবগঞ্জের আমচূড় নিয়ে কত মজার কথাই (চুটকি) না আমরা জানি।

যা হোক, আম (ইংরেজি- Mango), ভারতীয় উপমহাদেশের এক সুস্বাদু ফল। কাঁচা অবস্থায় রং সবুজ এবং পাকা অবস্থায় হলুদ, লাল, কমলা রং হয়ে থাকে। আম ভারতের জাতীয় ফল হিসাবে পরিচিত। বাংলাদেশ এবং ভারতে যে প্রজাতির আম চাষ হয় তার বৈজ্ঞানিক নাম Mangifera indica। এটি Anacardiaceae পরিবারের সদস্য। পৃথিবীতে অনেক প্রজাতির আম আছে। আমের বিভিন্ন জাত আছে, যেমন ফজলি, ল্যাংড়া, গোপালভোগ, খিরসাপাত, অরুনা, আম্রপালি, মল্লিকা, আশ্বিনা, সুন্দরী, সুবর্নরেখা, মিশ্রিদানা, নিলাম্বরী, কালীভোগ, কাঁচামিঠা, আলফানসো, বারোমাসি, তোতাপূরী, কারাবাউ, বাবুই ঝাঁকি, গোপাল খাস, রাণী পছন্দ, সূর্যপূরী, পাহুতান, ত্রিফলা, হাড়িভাঙ্গা, ছাতাপরা, গুঠলি, লখনা, বৃন্দাবনী, বোম্বাই, আদাইরা, কেন্ট, কলাবতী, দুধস্বর, মিশ্রিভোগ, পদ্মমধু, সিঁদুরী ইত্যাদি ইত্যাদি। এছাড়াও আম গবেষণা ইনস্টিটিউট কর্তৃক বেশ কিছু উন্নত জাতের আমের দেখা পাওয়া যায়। আমের মুকুল বের হয় ডালের ডগা থেকে, মুকুল থেকে শুরু করে আম পাকা পর্যন্ত প্রায় ৩-৬ মাস সময় লাগে। আম গাছকে বাংলাদেশের জাতীয় গাছের প্রতীক হিসেবে নেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশের রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলায় আম এর চাষ বেশি পরিমাণে হয়ে থাকে। আমকে বলা হয় ‘ফলের রাজা’।

ভারতীয় উপমহাদেশে আম কয়েক হাজার বছর ধরে চাষাবাদ চলছে, পূর্ব এশিয়াতে আমের প্রচলন হয় খ্রিস্টপূর্ব ৫ম-৪র্থ শতাব্দী থেকে এবং চাষাবাদ শুরু হয় আরো পরে খ্রিষ্টাব্দ ১০ম শতাব্দী দিকে। ভারতীয় উপমহাদেশ এবং পূর্ব এশিয়ার কিছু দেশের পর পৃথিবীর অন্য যেসব দেশে ভারতীয় উপমহাদেশের মত জলবায়ু রয়েছে, যেমন: ব্রাজিল, ওয়েস্ট ইন্ডিজ বা মেক্সিকোতে আরো অনেক পরে আমের প্রচলন ও উৎপাদন শুরু হয়। মরোক্কোর পর্যটক ইবনে বতুতা ১৪ শতকে আমের বর্ণনা লিপিবদ্ধ করেন।

পৃথিবীর প্রায় সমস্ত উষ্ণ প্রধান জলবায়ুর অঞ্চল গুলিতে আমের চাষাবাদ হয়। এর মধ্যে অর্ধেকের কাছাকাছি আম উৎপাদন হয় শুধুমাত্র ভারতেই। এর পর অন্যান্য যেসব দেশ আম উৎপাদন করে তার মধ্যে আছে চীন, বাংলাদেশ, পাকিস্তান, অস্ট্রেলিয়া, উত্তর-দক্ষিণ ও মধ্য আমেরিকা, দক্ষিণ-পশ্চিম ও মধ্য আফ্রিকা প্রভৃতি। আম খুব উপকারী ফল।

বাংলাদেশে চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা আমের জন্য বিখ্যাত। “কানসাট আম বাজার” বাংলাদেশ তথা এশিয়া মহাদেশের সবচেয়ে বৃহৎ আম বাজার হিসেবে পরিচিত। মকিমপুর, চককির্ত্তী, লসিপুর, জালিবাগান, খানাবাগান সহ বিশেষ কিছু জায়গায় অত্যান্ত সুস্বাদু এবং চাহিদা সম্পূর্ণ আম পাওয়া যায়।

কাঁচা আমের পুষ্টিগুণ ও উপকারিতা-

শরীরের ওজন কমাতে:
পাকা আমের চেয়ে কাঁচা আমে চিনি কম থাকে বলে এটি দেহে খুব কম ক্যালরি সরবরাহ করে থাকে। তাছাড়া এটি শরীরে জমে থাকা অতিরিক্ত ক্যালরি পুড়াতেও সাহায্য করে। তাই যারা ওজন কমাতে বা শরীরের বাড়তি ক্যালরি খরচ করতে চান, তাঁদের জন্য কাঁচা আম একটি আদর্শ ফল।

লিভারের সমস্যা দূর করতে:
কাঁচা আম খেলে পিত্ত থলির এসিড ও পিত্ত রস বৃদ্ধি পায়। এর ফলে যকৃতের স্বাস্থ্য ভালো হয় এবং অন্ত্রের ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণ দূর হয়। তাই লিভারের রোগ নিরাময়ের একটি প্রাকৃতিক উপায় হচ্ছে কাঁচা আম।

ভিটামি ‘সি’ এর অভাব পূরণে:
কাঁচা আমে প্রচুর ভিটামিন ‘সি’ থাকে যা রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায় এবং শরীরের ক্যালসিয়ামের প্রয়োজনীয়তা পূরণে সাহায্য করে, ফলে হাড় হয় শক্তিশালী। তাছাড়া ভিটামিন ‘সি’ শরীরকে ইনফ্লামেশনের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে সাহায্য করে, নতুন রক্ত কণিকা সৃষ্টিতে সাহায্য করে, আয়রনের শোষণে এবং রক্তপাতের প্রবণতা প্রতিরোধে সাহায্য করে।

গ্যাসের সমস্যা দূর করতে:
খাদ্যাভ্যাসের জন্য বেশিরভাগ মানুষই পেটে গ্যাসের সমস্যায় ভুগে থাকেন। কাঁচা আমে গ্যালিক অ্যাসিড থাকার কারণে তা হজম প্রক্রিয়াকে গতিশীল করে৷ তাই কাঁচা আম খেলে এসিডিটির সমস্যা থেকে মুক্তি পাওয়া যায় খুব দ্রুত।

মাড়ির রক্ত পড়া ও স্কার্ভিরোধ করতে:
কাঁচা আম খেলে শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ে। এতে শরীরের জন্য প্রয়োজনীয় ভিটামিন ‘সি’ থাকে যা স্কার্ভি ও মাড়ির রক্ত পড়া কমায়। তাছাড়া নি:শ্বাসের দুর্গন্ধ ও দাঁতের ক্ষয় রোধেও সহায়তা করে কাঁচা আম।

ঘামাচি প্রতিরোধ করতে:
ঘামাচি গ্রীষ্মকালের সবচেয়ে অস্বস্তিকর ব্যাপার। কাঁচা আমের পুষ্টি উপাদান ঘামাচির বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে। তাছাড়া কাঁচা আমে এমন কিছু উপাদান রয়েছে, যা সানস্ট্রোক হতে বাধা দেয়।

ঘাম কমাতে:
কাঁচা আমের জুস খেয়ে ঘামের মাত্রা কমানো যায়। শরীরে অতিরিক্ত ঘামের ফলে সোডিয়াম ক্লোরাইড এবং আয়রন কমতে শুরু করে। এই প্রক্রিয়াকে প্রতিরোধ করে কাঁচা আম।

এছাড়াও কাঁচা আমে প্রচুর আয়রন থাকায় রক্তস্বল্পতা সমস্যা সমাধানে এটি বেশ উপকারী। এবং কাঁচা আমে থাকা আলফা ক্যারোটিন ও বিটা ক্যারোটিনের মত ফ্লাভনয়েড দৃষ্টিশক্তি ভালো রাখে ও দৃষ্টিশক্তির উন্নতি ঘটায়।

সতর্কতা:
অতিরিক্ত কাঁচা আম খাওয়ার ক্ষেত্রে সতর্ক থাকতে হবে। অতিরিক্ত পরিমাণে কাঁচা আম খেলে ডায়রিয়া হওয়ার আশঙ্কা থাকে৷ তাছাড়া কাঁচা আমের কষ মুখে লাগলে সংক্রমণ হতে পারে। তাই এ ব্যাপারে সাবধানতা অবলম্বন করাটাও জরুরী।

তথ্যসূত্র ও ছবি: নেট।

Close