নাগরিক মতামতশিরোনাম-২

বাজার ব্যাবস্থার বিকেন্দ্রীকরণ: গ্রামীণ অর্থনীতির নতুন সম্ভাবনা

নূরুন্নবী সবুজ

 

গাইবান্ধা জেলার সুন্দরগঞ্জ একটি উপজেলা। এখানে অন্যন্যা এলাকার মত প্রতিদিন বাজারে হাজার হাজার লোক সমাগাম হত। হাটের দিনে সে লোকের সমাগম ছিলো আরো বিস্ময়জনক। নিত্য প্রয়োজনীয় পণ্যের বাইরেরও অনেকে আড্ডা দেবার জন্য চায়ের দোকান বা অন্য কোন সুবিধা জনক স্থানে জমায়েত হত। করোনা পরিস্থিতিতে সামাজিক দূরুত্ব রক্ষা করে চলা নিজের ও নিজের পরিবারের সুরক্ষার জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ হওয়ায় ও প্রশাসন থেকে এই বিষয়ে চাপ থাকায় লোকজন বাজারে তাদের উপস্থিতি কমিয়ে দিয়েছে। বাজার সহ চিরায়াত জীবন পদ্ধতিতে এসেছে বিশেষ পরিবর্তন। এই পরিবর্তন বাংলাদেশের আরো অনেক জেলা উপজেলা বা ইউনিয়নেও লক্ষ্য করা যায়।

পবিত্র রমজান মাসের বাহারী ইফতারির জন্য এক সময় বাজারে বাজারে দোকানে তৈরী করা হত নানা রকম ইফতারের আইটেম। কিন্তু করোনা পরিস্থিতিতে সে কেন্দ্রীকরণের পরিবর্তন লক্ষ্য করা যায়। গ্রামের ‍গুরুত্বপূর্ণ মোড়গুলোতে অস্থায়ী ভিত্তিতে ইফতার সামগ্রী বিক্রি করে কিছু লোকজন। লোকজন বাজারে যাবার চেয়ে এসব অস্থায়ী দোকান থেকে তাদের প্রয়োজনীয় ইফতারের আইটেম সংগ্রহ করে তাদের প্রয়োজনীয় কাজ চালায়।

মাছে ভাতে বাঙ্গালী। হয়ত আগের মত গোলা ভরা ধান আর পুকুর ভরা বা নদী ভরা মাছ আমাদের নেই, হয়ত নেই ইলিশের প্রতুলতা কিন্তু তাই বলে বাঙ্গালীর রুচি অভ্যাসে যে আমূল পরিবর্তন হয়েছে তাও নয়। বাজরে গরুর মাংশের দাম বেশী হওয়ায় ও রুচির কারনেই এখনো মাছের প্রতি বিশেষ টান আছে। করোনা, রমজান ও পারিপার্শ্বিকতার কারণে গ্রামের গুরুত্বপূর্ণ মোড়গুলোতে মাছের অস্থায়ী দোকান লক্ষ্য করা যায়। এসব দোকন থেকে লোকজন আনন্দের সাথে মাছ ক্রয় করে। স্থানীয় মাছ বিক্রেতা এলাকার মাছের চাহিদা সমন্ধে ভালো ধারণা আছে বলে দ্রুত তার ব্যবসার প্রসার করতে পারে।

পরিবহন সমস্যার কারনে পণ্য আনা নেওয়া করার সমস্যা থাকায় স্থানীয় উৎপাদিত পণ্যও স্থানীয় ভাবে বিক্রি করা হয় স্থানীয় বাজারে । অনেক কৃষি পণ্য উৎপাদক খুচরা বিক্রি করে বেশ স্বাচ্ছন্দবোধ করে আবার অনেক পণ্যে উৎপাদন ও সরবরাহ বেড়ে যাওয়ায় দাম কমে গেছে যা কৃষকদের ক্ষতির কারন। স্থানীয় বাজারে অতি প্রয়োজনীয় পণ্যের প্রাপ্তি অপ্রয়োজনে বাইরে যাবার সুযোগ কমিয়ে দিয়েছে। নিয়মিত বাজারের বিকল্প হবার ক্ষুদ্র প্রচেষ্টা চালচ্ছে স্থানীয় বাজার।

স্থানীয় স্টেশনারী বা মনোহরী দোকানেও পূর্বের চেয়ে পণ্য প্রদর্শন ও বিক্রি করার মাত্রায় পার্থক্য দেখা যায়। অনেক দোকান তাদের গতানুগতিক পণ্যের বাইরে এমন কিছু পণ্য রাখছে যা কেনার জন্য একসময় বাজারে না গেলে হতো না। অনেক ক্রেতা বাজারে যাবার ঝামেলা এড়াতে দোকানের এই সুযোগ গুলো সীমিত পরিসরে হলেও গ্রহণ করার চেষ্টা করছে। অনেকে সময় বাচিয়ে কাজে সময় ব্যায় করতে পারছে পর্যাপ্ত।

স্থানীয় বাজার ব্যাবস্থায় অনেক পণ্যের দাম নিয়ে ক্রেতা বিক্রেতার অসন্তোষ লক্ষ্য করা গেলেও তার সুবিধা কম নয়। দ্রব্যমূল্যের উদ্ধগতি বা খাদ্যে ভেজাল মানুষের বিশেষ অসন্তুষ্টির কারণ হয়ে আছে দীর্ঘদন। কৃষকরাও তাদের উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্য মূল্য বা বাজারজাতকরণ সমস্যা নিয়ে ভুগছিলো। স্থানীয় চাহিদা বা দেশীয় চাহিদার মাপকাটি নির্ধারণ করা বেশ কষ্টকর হয়ে যাচ্ছিল। করোনার এই জটিল পরিস্থিতিতে মানুষ তার চাহিদাকে সীমিত করার চেষ্টার মাধ্যমে যতটুকু পারছে তাদের রুচি অভ্যাস আর আচরণে পরিবর্তন করার চেষ্টা করছে। যদিও একবার তা আশা জাগায় আর একবার তা নিরাশ করে। তারপরেও এই পরিবর্তগুলো ইতিবাচক ও স্থায়ী কোন পরিবর্তনের ইঙ্গিত করে কি না বা ইতিবাচক করা যায় কিনা তা অবশ্যই চিন্তায় রাখা যায ও অবশ্যই রাখা উচিত।

বিনিময় প্রথায় অত্যাবশকীয় বস্তুগুলো প্রাধান্য পেত। প্রয়োজনই জীবনকে প্রয়োজনীয় করে তুলে। কিছুদিন আগেও গ্রামীণ মানুষের চাহিদা ছিলো সীমিত। এখন মোবাইল সেট, টিভি, ফ্রিজ, মটরসাইকেল বা অন্যান্য বিলাস বহুল দ্রব্যও কোন না কোন ভাবে মানুষ তার প্রয়োজনের তালিকায় বুঝে না বুঝে যুক্ত করে ফেলেছিলো যা সামাজিক সম্পর্ক ও শৃঙ্খলায বিশেষ প্রভাব রেখে চলছিলো। বিলাসবহুল দ্রব্যগুলো প্রয়োজনীয় দ্রব্যের তালিকায় ‍যুক্ত করায় বাজার ব্যবস্থায় বিশেষ মাত্রা এসছিলো। এই গন্ডিতে বিশেষ পরিবর্তন আমরা পাই।চাহিদা ও করোনা বা বাজার ব্যাবস্থার বিকেন্দ্রীকরণ শুধুমাত্র মানুষকে মানুষকে উচ্চাবিলাসী থেকেই নয় অর্থনীতির নতুন গতিপথ নির্ধারনেও নতুন ধারণা দেয়।

মানুষ এখন তাদের প্রয়োজনকেই প্রয়োজনীয় করে তুলে জীবন সাজানোর চেষ্টা করছে। কৃষি ও কৃষি পণ্যের গুরুত্ব বুঝেতে শুরু করেছে। শ্রম ও শ্রমিকের যে গুরুত্ব তা হচ্ছে স্পষ্ট। বিলাসিতা ও বিবেক স্পষ্ট হতে শুরু করছে। জীবনের চাহিদা কমিয়েও যে নিজেদের সুখি করা যায় এ বোধ তাদের ভিতর জন্ম নিচ্ছে ধীরে ধীরে। ইতিবাচক পরিবর্তনের সাথে কিছু নেতিবাচক পরিবর্তন অবশ্যই আছে। সেটা ভিন্ন আলোচনা । তবে বাজার ব্যবস্থার বিকেন্দ্রীকরণ যে শিক্ষা গ্রামীণ অর্থনীতিতে দিচ্ছে তার ফল ইতিবাচক বা নেতিবাচক যে কোনটিই হতে পারে যা নির্ভর করে ব্যাবস্থা গ্রহণ ও সামগ্রিক সুচিন্তার উপর ।

বাজার ব্যবস্থার বিকেন্দ্রীকরণ বিশেষ কিছু করতে ও করাতে শিখায়। এই শিক্ষা আমরা কাজে লাগাতে পারি ও কাজে লাগানোর জন্য পরিকল্পনা নিতে পারি।

১. গ্রামীণ অর্থনীতিই খাদ্য মন্দা ও দূর্ভিক্ষ দূর করতে পারে।

২. আমদানী নয় নিজস্ব পণ্য বাজারজাত ও সংরক্ষণের সহজ সমাধান বাজার ব্যবস্থার পরিবর্তন সাধন করা।

৩. বিলাস বহুল দ্রব্য মানুষের দক্ষতা ও সৃজনশীলতার বাধা, প্রয়োজনই মানুষের জীবনকে প্রয়োজনীয় করে তুলে।

৪. শিক্ষা খাতে পরিবর্তন ছাড়া সেবার মান উন্নত করা সম্ভব না।

৫. ব্যাক্তি বা প্রতিষ্ঠানের সাহায্য নয় বরং নিজের শ্রম ও তার বাস্তব উপযোগীতাই সব পরিবর্তন করতে পারে।

৬. উৎপাদন, উৎপাদনযন্ত্র, উৎপাদক, শ্রম ও শ্রমিকের বিকেন্দ্রীকরণ অর্থনীতির মোড় ঘোরাতে যতেষ্ট।

৭. বাজার চাহিদা তৈরী করে নয় প্রয়োজন ও প্রাপ্তি দিয়েও তৈরী করা যায়।

৮. রাষ্ট্রের ব্যয়ভার কমানো ও নাগরিক সুবিধা উন্নতির সাথে বাজার ব্যবস্থার গুরুত্ব আছে।

চিন্তার শুরু ও পরিকল্পনার বাস্তবায়ন বাস্তব এমন কিছু অবস্থান তৈরী করে যা হয়ত অলৈলিক মনে হয়। লৈকিককে অলৈকিক করাও কর্ম ও নিষ্ঠার ফল। বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সমস্যার সমাধানে ও নাগরিক সুবিধা নিশ্চিত করতে বাজার ব্যবস্থার বিকেন্দ্রীকরণ ও তার শিক্ষা পরবর্তী বড় সমস্যার সহজ সমাধান দিতে পারবে।

লেখক: আইন বিশ্লেষক ও কলামিষ্ট।

Close