নাগরিক মতামতশিরোনাম-২

যুক্তরাষ্ট্র কি চীন আক্রমন করবে?

রাগিব আহসান মুন্না

 

অনেকের ধারনা বর্তমান পরিস্থিতিতে ট্রাম্প যে সংকটে হাবুডুবু খাচ্ছে এই অবস্থা চলতে থাকলে নভেম্ববরের নির্বাচনে তার পরাজয় শুধু সময়ের ব্যবধান। আর তাই সে চাইবে হোয়াইট সুপ্রীমেসিকে উসকে দিয়ে কোন নির্মিত ‘জাতীয় শত্রু’র সঙ্গে যুদ্ধে জড়াতে। এক্ষেত্রে অনেকেরই বিবেচনা, দোষারোপের রাজনীতিতে জাতীয় শত্রু হিসেবে চীনের সঙ্গে যুদ্ধের দামামা বাজানো হয়তো কিছুটা সুবিধাজনক। এছাড়া করোনা সংকটে আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে যুক্তরাষ্ট্র যে ইমেজ সংকটে পড়েছে, এই যুদ্ধের মধ্যেদিয়ে তা পুনরুদ্ধার করতে পারবে। কিন্তু আমার ধারণা বাস্তবসম্মত কারণে যুক্তরাষ্ট্র চীনের বিরুদ্ধে সামরিক আভিযান চালাতে পারবে না।
করোনায় আক্রান্ত যুক্তরাষ্ট্র নিদারুণ বিপদে সময় কাটাচ্ছে। সংক্রামণ ও মৃত্যুহারে যুক্তরাষ্ট্র সবার উপরে। কোন ভাবেই নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে না। আবহেলা আর দাম্ভিকতার যে পরিণতি সেটাই মনে হয় প্রতীয়মান হয়ে উঠছে। আর এই অবস্থার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের জনগণ ট্রাম্পকেই দুষছে। করোনা কোন দেশ বা আঞ্চলিক মহামারি নয়,এটা বৈশ্বিক। বিশ্বব্যপি এই মহাবিপদে মার্কিন প্রেসিডেন্টের যে ভুমিকা আমেরিকার জনগন প্রত্যাশা করেছিল সেখানেও ট্রাম্প হতাশ করেছে। কাজেই ট্রাম্প চাইলেই চীনের উপর বোমা বর্ষণের সমর্থন আমেরিকার জনগনের কাছ থেকে পাবে না।
মার্কিন বুদ্ধিজীবী নেয়াম চমস্কি তার সাম্প্রতিক এক সাক্ষাতকারে যুক্তরাষ্ট্রের চলমান অর্থনৈতিক ব্যবস্থাকে ‘পুঁজিবাদের চরমপন্থী সংস্করণ’ বলে উল্লেখ করেছেন। এই সমসাময়িক পুঁজিবাদ বিষয়টিকে বুঝতে হলে ট্রাম্পের বাজেটের দিকে নজর দিতে হবে। ১০ই ফেব্রুয়ারি এই মহামারি যখন খারাপের দিকে যাচ্ছে, ট্রাম্প তখন তার বাজেটের প্রস্তাবনা নিয়ে হাজির হলেন।
তাতে কী ছিল? সরকারের স্বাস্থ্য সংক্রান্ত খাতগুলোতে বরাদ্দ হ্রাস জারি রাখা। ক্ষমতার পুরো মেয়াদকাল জুড়ে তিনি ব্যক্তিপুঁজি-কর্পোরেট ক্ষমতার কাজে আসে না- এমন সকল খাতেই বরাদ্দ কমিয়েছেন। এ সংক্রান্ত যাবতীয় কর্মসূচীকে তিনি ধূলিসাৎ করলেন।
এদিকে রোগ নিয়ন্ত্রণ ও স্বাস্থ্য সংক্রান্ত সবগুলো খাতে বাজেট কমানো হলো। অন্যদিকে জীবাশ্ম জ্বালানি-নির্ভর শিল্পগুলোতে ক্ষতিপূরণ এবং ভর্তুকির পরিমাণও বাড়তে থাকল। চমস্কি বলছেন, যত মানুষকে কাঠামোগত ভাবে সম্ভব হত্যা করার সম্ভব, তার সবটাই তিনি করছেন। তাছাড়া সেনাবাহিনী এবং তার বিখ্যাত দেয়ালের জন্য বরাদ্দতে তিনি উদার।

এছাড়া এই মহামারিতে অভ্যন্তরীণ উৎপাদন ও বাণিজ্য ক্ষেত্রে ব্যপক ক্ষতির মুখে পড়েছে যুক্তরাষ্ট্র। ২০ ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি যক্তরাষ্ট্রের। ইতি মধ্যেই সংকটকালীন বেকার হয়েছে ৭০ লক্ষ। সব মিলে যক্তরাষ্টের বেকারের সংখ্যা ২০ শতাংশের উপরে। অর্থনৈতিক বিপর্যয় ঠেকাতে একদফা ৫০০ বিলিয়ন ডলার প্রণোদনা পাকেজ ঘোষণা করেছে ট্রাম্প প্রশাসন। যা ৩৩ কোটি আমেরিকা বাসীর এক সপ্তাহের আয়ের সমান। সমুদ্রে মধ্যে এক এক বালতি পানি ঢালার সমতুল্য। সুতারং এটা সহজেই অনুমান করা যায় যে, অর্থনৈতিক ভাবে কতটা ভঙ্গুর অবস্থায় মার্কিনরা পতিত হয়েছে। ট্রাম্পের আচরণে মনে হচ্ছে সংকটের গভীরতা সে অনুমান করতে পারেনি। সে শুধু তার নির্বাচন আর বড় আর্থিক প্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তার ভাবনায় বিভোর হয়ে আছে। সেটা যে আমেরিকার জনগণ কিছুটা হলেও বুঝে, তাতে কোন সন্দেহ নেই।
যুক্তরাষ্ট্রের হাসপাতালগুলোকে ব্যবসায়িক কাঠামো অনুসরণ করে চলতে হয়। সে কারণে সেখানে কোনো অতিরিক্ত ধারণক্ষমতা থাকে না। যে কেউ যুক্তরাষ্ট্রের সেরা হাসপাতালগুলোতে গিয়ে এর সত্যতা যাচাই করতে পারেন। এই ব্যবসায়ী কাঠামো গাড়ি প্রস্তুতকরণের ক্ষেত্রে কাজে আসে। তবে এটা স্বাস্থ্যসেবার ক্ষেত্রে উপকারে আসে না।
ডিজাস্টার ক্যাপিটালিজমের লেখল নওমি ক্লেইনের মতে, স্বাস্থ্যসেবার ব্যবসায়িক কাঠামোটিই একে নির্মিত দুর্যোগে পরিণত করে। ক্লেইন বলছেন, ‘ইতিহাস হচ্ছে যুদ্ধ, প্রাকৃতিক বিপর্যয় ও অর্থনৈতিক সঙ্কট এর আঘাত এবং আঘাত পরবর্তী পরিণতির প্রবাহমানতা। ‘দুর্যোগ পুঁজিবাদ’ এই পরিণতিকেই রূপায়িত করা হয়। পূর্বনির্ধারিত, মুক্ত-বাজার ‘সমাধান’ দ্বারা সংকটগুলোর যে ‘সমাধান’ হাজির করা হয় তা বিদ্যমান বৈষম্য ও শোষণকে আরো তীব্র করে তোলে।’

করোনা পরিস্থিতি যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ সামাজিক নিরাপত্তাকে উলঙ্গ করে দিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রই একমাত্র দেশ, ‍যারা কিনা ওয়ার্ল্ড হেলথ্ অরগ্যানাইজেশনকে তাদের সংক্রমিত ও মৃত রোগীর তথ্যটাও ঠিকমতো দিতে পারেনি। তারা এখন দোষারোপ করার জন্য মরিয়াভাবে অন্য কাউকে খুঁজছে। চীনকে দোষারোপ করছে, ওয়ার্ল্ড হেলথ্ অরগ্যানাইজেশনকে দোষারোপ করছে। এবং তারা যা করছে তা রীতিমতো অপরাধের পর্যায়ে পড়ে। ওয়ার্ল্ড হেলথ অরগ্যানাইজেশনের বরাদ্দ বন্ধ করে দেওয়ার অর্থ কী হতে পারে? এই সংগঠনটি পুরো বিশ্বব্যাপী বিশেষত দরিদ্র দেশগুলোতে গর্ভবতী মায়েদের স্বাস্থ্য কিংবা ডায়রিয়ায় শিশুমৃত্যুর হার কমানোর মতো বিষয়গুলো নিয়ে কাজ করে। এর সোজাসাপ্টা অর্থ দাঁড়ায়: “ঠিক আছে। চলো প্রচুর মানুষকে হত্যা করি! কারণ তাতে হয়তো আমার নির্বাচনী প্রত্যাশা পূরণ হবে!”

এই পরিস্থতিতে ট্রাম্প সরকার নিজেদের নির্বাচনী বিষয়ের কথা চিন্তা করে যুদ্ধের মতো বড় ধরনের কোন ঝমেলায় জড়িয়ে পড়ে তাইলে করোনা মোকাবেলায় ব্যর্থ হয়ে শুধু ব্যাপক প্রাণহানিই ঘটবে না,আর্থিক সর্বনাশও যুক্তরষ্ট্রের বিশ্বময় ক্ষমতার বিনাশ ঘটাবে। চীনের মতো দেশের সাথে যুদ্ধ বাধালে শুধু দেশের মানুষের সমর্থন থাকলেই চলবে না, নৈতিক শক্তি অর্জনে আন্তঃজার্তিক সমর্থনের গুরুত্ব অপরিসীম। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের মিত্ররা বৈশ্বিক পরিস্থিতি আর নিজেদের অস্থিত্ব নিয়ে এতই ব্যস্ত যে ট্রাম্পের সৃষ্ট নতুন কোন ঝামেলায় জড়াতে চাইবে না। আর সেটা যে, তারা করবে না সাম্প্রতিক ভুমিকাই ট্রাম্প প্রশাসনকে তা বুঝিয়ে দিয়েছে। বৈশ্বিক এই মহামারিতে যখন বিশ্ববাসীকে একজোট হয়ে লড়তে হবে ট্রাম্পের তখন বিভক্তির সুর বিশ্ব নিরাপত্তাকে বিপদগামী করেছে।

ইতি মধ্যে আমেরিকার অনেকগুলি কোম্পানি আর্থিক নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে। অনেকে আবার তাদের চোখ ঘুরিয়েছে চীনের দিকে। তাতে ট্রাম্পের কম্পন শুরু হয়েছে, সে বলতে শুরু করেছে আমেরিকার কোম্পানি চীনের বাজারে বিনিয়োগ করলে তা অর্থনৈতিক নিরাপত্তাকে বিপন্ন করে তুলবে। যুদ্ধের জন্য নৈতিক শক্তির দরকার হয়, যা একবারেই ট্রাম্পের নেই।
চীনের স্বপোষিত রাষ্ট্রীয় পুঁজিবাদী মডেল নিয়ে বহু সমালোচনা আছে। কিন্তু এটাই তার রক্ষা কবজ,আর সেই পথেই তারা খুব বিচক্ষণতার সাথে এগিয়ে যাচ্ছে। তাদের বিদ্যমান নীতি অর্থনৈতিক অগ্রগতি নতুন নতুন ব্যবসার ক্ষেত্র আর বাজারের উদ্ভাবন। এই নীতিই তাদের শান্তির কৌশল নিতে তারা বাধ্য। কারণ শান্তিপূর্ণ পৃথিবীই তাদের নিরাপদ বাণিজ্যের নিশ্চয়তা বিধান করবে। তাদের এই কৌশলী ভূমিকা বিশ্বের অনেক দেশ ও জনগণের কাছে সমাদৃত হয়েছে। যা তাদের মনোবলকে আরো বাড়িয়ে দেবে। বিশ্ব সাস্থ্য সংস্থার সমর্থন চীনাদের একটি বড় বিজয় এবং বিশ্ব রাজনীতিতে যে সমীকরণ চলছে তাতে এখুনি যুক্তরাষ্ট্র ও ট্রাম্পকে পিছনের দিকে ঠেলে দিয়েছে।
চীন খুব বিচক্ষনতার সাথে ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থতি পর্যবেক্ষণ করেছে, এই ক্ষেত্রে তাদের রক্ষনশীল মনোভাব ও রাজনৈতিক দক্ষতা দিয়ে নিজেদের অবস্থানকে আরো শক্ত করতে চায়। ইতিমধ্যেই তারা রাজনীতির সমীকরণে এগিয়ে গেছে। তাদের বিরুদ্ধে উঠে আসা অভিযোগ দক্ষতার সাথে সমাধান দিয়েছে। প্রথমত আমেরিকা অভিযোগ তোলে যে চীন তথ্য গোপন করছে,এবং তাদের আক্রান্ত ও মৃতের সংখ্যা গোপন করছে ও কম দেখাচ্ছে। চীন এই দাবিতে বিচলিত না হয়ে যে সব ক্ষেত্রে পরিচ্ছন্নতার অভাব ছিল সে গুলি পরিষ্কার করেছে ও যতটুকু ভুল ছিল তা অকপটে স্বীকার করেছে। যা বিশ্ববাসীর চিনের প্রতি আস্থা বাড়িয়েছে এবং ভরসা তৈরি করেছে।
এরপর ট্রাম্প অভিযোগ তুলে যে উহানের গবেষণাগার থেকে কোভিড-১৯ মানবদেহে ছড়িয়েছে। এই অভিযোগের প্রেক্ষিতে দাবি উঠে তদন্ত করতে দিতে হবে। প্রথম দিকে চীন জোরালো নেতিবাচক মনোভাব প্রকাশ করলেও অভিযোগ খন্ডন করতে তদন্তে সম্মতি জানায় এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তত্তবধানে এই তদন্ত পরিচালনার জন্য আহবান জানায়। ট্রাম্প এই অভিযোগের যে আগুন জালাতে চেয়েছিল চীন তাতে এক বালতি পানি ঢেলে দেয়। ট্রাম্প এখন করোনা মৃত্যু ছোবল আর চীনের বাণিজ্যিক আগ্রযাত্রা কোনটাই সামাল দিয়ে উঠতে পারছে না। এই পরিস্থতিতে সে যদি যুদ্ধের মতো নতুন এক বিপদকে নিজের ঘরে টেনে আনে তাইলে নিজেই একঘরে হয়ে পড়বে। বিশ্ব শাসনের যে মসনদে দাপটের সাথে বসে আছে সেই আসনটা যে হুড়মুড় করে ভেঙ্গে পরবে সে এবং তার বুদ্ধিদাতারা সকলেই সেটা ভালোভাবে জানে।
কারণ জলন্ত বৈশ্বিকের এই বাস্তবাতায় সকলেই অস্তিতের সবকটাকে সামাল দিতে মরন প্রান যুদ্ধে লিপ্ত। কেউই বেড়ার আগুনকে তার ঘরের চালে লাগাতে চাইবে না।
লেখক: সাবেক রাকসু ভিপি, সাধারন সম্পাদক , বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি, রাজশাহী

Close