আন্তর্জাতিকনাগরিক মতামতশিরোনাম-২

মানুষ নামের প্রাণীটার কিছু কীর্তিকলাপের কথা

শত্রুঘ্ন অর্পিত

কেরালায় হাতি মারা তো কিছুই না। মানুষ নামের প্রাণীটার কিছু কীর্তিকলাপের কথা বলি। শুনেন।
ইউরোপীয়রা আসার আগে সারা আমেরিকার তৃণভূমি গুলো জুড়ে লাখে লাখে বাইসন ঘুরে বেড়াত। বাইসন মানে আমেরিকান বুনো মহিষ, আমাদের গয়ালের মত। এক একটা ঝাঁকে কয়েক হাজার বাইসন থাকত, এরকম কয়েক শ ঝাঁক। মনের আনন্দে সবুজ ঘাস চিবিয়ে দিননিপাত করত তারা। শিকারী বলতে পুমা/নেকড়ে এরকম কিছু প্রাণী ছিলো। তবে মানুষ নামের দোপেয়ের কাছে তারা কিছুই না।
.
ইউরোপীয়রা যতই রেড ইন্ডিয়ানদের মেরেধরে পূর্ব থেকে পশ্চিমে আগাতে থাকে ততই তাদের মাংসের সংকট বাড়তে থাকে। অতএব চোখ পড়লো বাইসনের ওপর।
.
প্রচুর পরিমাণে চড়ে বেড়ানো শান্তিপূর্ণ বাইসন ছিলো তাই তাদের কাছে ফ্রি মাংস।
টাকা খরচ করে মাংস কিনে কি লাভ? যদি এরকম ফ্রি সার্ভিস পাওয়া যায়?
অতএব, ঝাঁকে ঝাঁকে বাইসন শিকার শুরু হলো। স্পেশালি শিকারের জন্য নানা ক্যালিবারের বুলেট/একনলা দোনলা বাহারী বন্দুকের ব্যবসাও জমজমাট হলো। জাস্ট পঞ্চাশ বছরের মাথায় আমেরিকানরা বাইসন মেরে ধরে খেয়ে কেটেকুটে সংখ্যা লাখ থেকে কয়েকশো তে নামিয়ে আনলো। 🙂
.
আজ আপনি আমেরিকায় যত্রতত্র আর বাইসন দেখবেননা। কিছু ন্যাশনাল পার্কে খুব সাবধানে এদের সংরক্ষণ করা হয়েছে। সংখ্যা হাজারেরও কম। হয়তো অদূর ভবিষ্যতে এরাও বিলুপ্ত হবে।
.
মরিশাসের ডোডো পাখির কথা নিশ্চয়ই আমরা জানি? এ পাখি উড়তে পারতোনা, মাটিতে ডিম পারতো, চলাফেরায়ও ছিলো স্লো। মরিশাসে তাদের ন্যাচারাল শত্রু ছিলোনা। তাই মনের আনন্দে থাকতো।
.
কিন্তু ডাচ নাবিকরা মরিশাস আবিষ্কারের পরপরই ইচ্ছামত পাখি মেরে খাওয়া শুরু করে। নৌযানের পাশ দিয়ে গেলে লাঠি/ডান্ডা দিয়ে মাথায় বাড়ি মেরে ঝাঁকে ঝাঁকে মরা পাখি বস্তা বেঁধে নিয়ে যেত এরা। পথে যাতে আর খাবারের সমস্যা না হয়। এছাড়া নাবিকরা দ্বীপে নেমে বাসা ভাঙা, বাচ্চা চুরি, ডিম খাওয়া থেকে হেন কাজ নেই যা করেনি।
ফলশ্রুতিতে আজ ডোডো পাখি পৃথিবীর বুক থেকে বিলুপ্ত। 🙂
.
সিংহ একসময় আফ্রিকা থেকে এশিয়া হয়ে আমাদের ভারতবর্ষ পর্যন্ত বিস্তৃত ছিলো। অথচ আজ আপনি আফ্রিকার কালাহারি/সাভানাহ তৃণাঞ্চলের মত কিছু জায়গা ছাড়া আর সিংহ পাবেননা। ভারতেও কেবল গির অঞ্চলে কিছু সিংহ টিকে আছে। তাহলে এই বিপুল সংখ্যক সিংহ গেলো কোথায়?
.
আফ্রিকার উত্তরভাগ থেকে শুরু করে পারস্য হয়ে পাকিস্তান পর্যন্ত সব সিংহ বিলুপ্ত হয়ে গেছে সেপিয়েন্সদের বিষাক্ত থাবায়। রোমানরা মজার জন্য সিংহ শিকার করত, ধরে এনে লড়াই করাত। গ্রীক রোমান উপকথায় সিংহের প্রচুর কাহিনী আছে। বোঝাই যায় সেখানে বিস্তৃত ছিলো সিংহরা। আজ তারা বিলুপ্ত।
একই ভাগ্য ঘটেছে পারস্যের বারবারিয়ান সিংহের বেলায়ও। সর্বশেষ দেখা গেছে গত শতাব্দীর শুরুতে। এরপর আর কোনো বারবারিক সিংহ বেঁচে নেই বলেই ধারণা।
.
ভারতবর্ষে মুঘল আমল এমনকি ব্রিটিশ আমলের শুরুতেও পর্যাপ্ত পরিমাণ বাঘ, চিতা, সম্বর, গন্ডার ছিলো। ব্রিটিশদের রাইফেলের পাল্লায় পড়ে বাঘ এখন দশবিশ হাজার থেকে বড়জোর পাঁচশোতে এসে দাঁড়িয়েছে।
.
ব্রিটিশ সাহেবরা আর দেশী জমিদার রাজারা এক এক শিকার অভিযানে এক একবারে পাঁচ ছয়টা বাঘের চামড়া নিয়ে তবেই ঘরে ফিরতেন। চিতা মুঘল আমলেও ছিলো। শোনা যায় আকবরের সংগ্রহে কয়েকশো শুধু চিতাই ছিলো। আজ চিতা আপনি আফ্রিকা ছাড়া কোথাও পাবেননা। উপমহাদেশ থেকে সম্পূর্ণ বিলুপ্ত।
.
সম্বর হরিণও প্রায় হারিয়ে গেছে তাদের শিংয়ের কারণে। আর গন্ডারের ইতিহাস তো জানিই। আসাম ছাড়া সমগ্র ভূভারতে কোনো গন্ডার নেই।
.
অস্ট্রেলিয়ার তাসমানিয়ান ডেভিলের কথা কে না জানে। ছোট শিয়াল টাইপের প্রাণী, সাপ পাখি খেয়ে বেঁচে থাকত। শিকারের নেশায় অজিরা ইচ্ছামত রাইফেল চালিয়েছে এই অসহায় প্রাণীর ওপর। আজ এই ডোরাকাটা সুন্দর প্রাণীটি সমগ্র পৃথিবী থেকে বিলুপ্ত। একটা তাসমানিয়ান ডেভিল সম্ভবত বেঁচে ছিলো চিড়িয়াখানায়, গত শতাব্দী তে সেও মারা গেছে।
শুধু অল্প কিছু টিকে আছে তাসমানিয়ার প্রত্যন্ত এক রিজার্ভ এরিয়ায়।
.
আমেরিকার কীর্তিগাঁথা কিন্তু আরো বিশাল। সমগ্র উত্তর আমেরিকা থেকে রাশিয়ার শীতল বনাঞ্চলে বাস করতো আরো একটি প্রাণী, তার নাম বীভার। ইঁদুরের মত অনেকটা, আকারে আরেকটু বড়। খুব ভালো ইন্জিনিয়ার এই বীভার। নদীর জলে বাঁধ দিয়ে তার নীচে ঘর বানিয়ে থাকে এরা। খুবই নিরীহ। ❤
কিন্তু দূর্ভাগ্যবশত বীভারের চামড়াটা অনেক মোলায়েম ও দামী হওয়ায় মানুষ লাখে লাখে বীভার ধরে মেরে শেষ করেছে। এখন বীভার খুঁজে পেতে হলে মাইক্রোস্কোপ লাগে- এই হল অবস্থা!
.
চামড়ার কারণে দূর্ভাগ্য হয়েছে চিতাবাঘ নেকড়ে জাগুয়ারের মত মাংসশাসীদের, কিংবা আলপাকা লামা ওকাপির মত তৃণভোজীদের বা মার্টিন মিংক ফেরেট স্টোটের মত সর্বভূকদের। আসলে হোমো স্যাপিয়েনসরা রেহাই দেয়নি কাউকে।
.
চমৎকার লাল শিয়াল আজ ইউরোপ থেকে বিলুপ্তপ্রায়।
জাপানের কোস্টে ভয়ে আসেনা তিমিরা।
সাউথ ইস্ট এশিয়ানদের মাংস আর চামড়ার লোভে পড়ে অজগর লোপ পাবার জোগাড়।
চোরা শিকারীরা আইভরি ট্রেডের লোভে হাতির সংখ্যা ১০% এ নিয়ে এসেছে আফ্রিকায়।
ভারতের কোস্টগুলোতে মা কচ্ছপদের ডিম পাড়তে আসার প্রবণতা কমছে দিনকেদিন। 🙂
আচ্ছা শুধু ওদের কথা বলছি কেনো?
.
সুন্দরবনে চিত্রা হরিণের মাংস এখনও কেজিপ্রতি হাজার দরে বিক্রি হয়।
সিলেটে ভাল্লুক দেখলে গ্রামভর্তি লোক ঢিল ছুড়তে ছুড়তে পাহাড় থেকে গড়িয়ে ফেলে দেয়।
মদনটাক পাখির মাথায় লাঠির বাড়ি দিয়ে আহত করে গ্রামে শোডাউন করে লোকে।
বানর ফল খেয়ে ফেলে এই অযুহাতে বিষ খাইয়ে মেরে ফেলা হয় গোটা একটা পরিবারকে, দুধের বাচ্চাসহ।
ঘূর্ণিঝড়ে গাছ থেকে পানকৌড়ি পড়ে গেলে লোকে ধরে নিয়ে রাতারাতি কেটেকুটে চুলায় বসিয়ে দেয়।
এছাড়া প্রতিনিয়ত বাঘডাশা/শেয়াল/গন্ধগোকুল/খরগোশ শিকার তো আছেই।
.
কক্সবাজারে খেলতে আসা ডলফিনদের লাশ কিভাবে একের পর এক কূলে ভেসে এসেছে মনে আছে?
কিংবা প্রতিদিন রাস্তায় কুকুর বিড়াল দেখলেই ঢিল ছুঁড়ে মাথা ফাটিয়ে দেয়ার অহরহ ঘটনাগুলো? 🙂


.
কেরালায় আজ যা ঘটলো, তাতে হোমো সেপিয়েন্স নামক জাতিটার প্রতি ঘৃণা আরেকটু বাড়লো, আর কিছু না। এসব গা সহা হয়ে গেছে। এক অবুঝ মা কে তার গর্ভের সন্তানসহ অসহ্য যন্ত্রণা দিয়ে মেরে ফেলা – এই বীভৎসতাও আজ গা সহা হয়ে গেছে।
.
অতএব আজ থেকে যদি কেউ বলে পৃথিবীর সবচে হিংস্র প্রাণী হায়না, বা সবচেয়ে ভয়ানক শিকারী সিংহ- তবে সোজা ওর মুখটা ধরে আশপাশের হোমো সেপিয়েন্সদের দিকে ফিরিয়ে দিবেন।
.
এদের হিংস্রতার কাছে বাঘসিংহ চুনোপুঁটি….

Close