নাগরিক মতামতশিরোনাম-২

মহামারির স্বাভাবিকীকরণ: বর্বর পুঁজিবাদের মারণ ঘোষণা

রাগিব আহসান মুন্না

 

দেশে করোনার সংক্রমণ বাড়ছেই। এরই মধ্যে সরকারি হিসাবে আক্রান্তের সংখ্যা সোয়া লাখ ছুঁই ছুঁই। মৃতের সংখ্যাও বাড়ছে সমান তালে। এমন একটা পরিস্থিতিতে গত ১৮ জুন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক জনাব আবুল কালাম আজাদ ঘোষণা দিয়েছেন যে, বিশ্ব পরিস্থিতি এবং অভিজ্ঞতা বিচারে বিশ্বে এবং বাংলাদেশে আরো দুই তিন বছর করোনাভাইরাস সংক্রমণ চলবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, ‘এটি দুই থেকে তিন বছর ধরে চলতে পারে, যদিও সংক্রমণের মাত্রা একই হারে নাও থাকতে পারে।”
তার এই বক্তব্যর পরপরই তীব্র প্রতিক্রিয়া হয় জনমনে। একই সঙ্গে মহামারীতে জীবন-মরণ সংকটে থাকা মানুষ আরও বেশি আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে পড়ে। টনক নড়ে খোদ সরকারের উচ্চ মহলে। এর প্রতিক্রিয়ায় আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক-পরিবহণ ও সেতু মন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেছেন, সরকার যখন দিন-রাত পরিশ্রম করে মানুষের মনোবল চাঙ্গা রাখার জন্য নিয়মিত প্রয়াস চালিয়ে যাচ্ছেন। করোনা যোদ্ধাদের প্রতিনিয়ত সাহস দিচ্ছেন। তখন স্বাস্থ্য বিভাগের ঊর্ধ্বতন কোনো কোনো কর্মকর্তার করোনার আয়ুষ্কাল নিয়ে অদূরদর্শী ও কাণ্ডজ্ঞানহীন বক্তব্য জনমনে হতাশা তৈরি করছে’। এরপর স্বাস্থ্য অদিদপ্তরের ডিজি দুঃখ প্রকাশ করেন। কিন্তু তার কথার মূল সুর নড়চড় হয়নি।
আসলেই কি করোনাকাল প্রলম্বিত হবে? জীবনযাত্রা স্বাভাবিক হতে এত সময় লাগবে? এই প্রশ্নটি ঘুরে ফিরে আসছে। করোনা সংক্রমণ রোধ এবং আক্রান্তকে শনাক্ত করা ও চিকিৎসা দেয়া এই মুহুর্তের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। এটাই পারে মহামারির রাশ টেনে ধরতে। কিন্তু সরকার কি তার জন্য প্রস্তুত? সেই জানুয়ারি থেকে আমরা শুনছি, করোনা মোকাবেলায় সব তৈরি আছে। সকল প্রস্তুতি নেয়া হয়েছে। সরকারের মন্ত্রীরা কেউ কেউ দাম্ভিক সুরে বলেছেন, ‘আমরা করোনার চেয়ে শক্তিশালী’। কিন্তু মার্চের গোড়াতেই বোঝা গেল কোন প্রস্তুতির ডঙ্কা বাজছিল এতদিন!

দেশে প্রথম করোনা রোগী শনাক্ত হয় ৮ মার্চ। এর কদিন আগেই ঢল নামে প্রবাসীদের। বিমানবন্দরে অত্যাধুনিক স্ক্যানারে স্ক্যান করার কথা থাকলেও তা হয়নি। পরে জানা গেল, শাহজালাল বিমানবন্দরে ২ টি মাত্র স্ক্যানার। তাও অকেজো! বিদেশ থেকে আসা প্রবাসীদের প্রথম দিকে আশকোনা হাজীক্যাম্পে নিম্নমানের পরিবেশে কোয়ারেন্টাইন করা হলেও পরে বাসায় গিয়ে কোয়ারেন্টাইনে থাকার পরামর্শ দেয়া হয়। এত গুরুতর একটি বিষয়ে কোন মনিটরিং ও নিয়ন্ত্রণ ছাড়া শুধু পরামর্শ দিয়ে ছেড়ে দেয়া ছিল চরম দায়িত্বজ্ঞানহীনতা। একই সঙ্গে পূর্বপ্রস্তুতি হিসেবে প্রবাসীদের ঢলের অনুমান না থাকা এবং পর্যাপ্ত কোয়ারেন্টাইন সেন্টারের ব্যবস্থা না রাখা ছিল চরম অদক্ষতার বহিঃপ্রকাশ। এরপর প্রথম আক্রান্ত শনাক্তের পরই দেখা গেল হাসপাতালে চিকিৎসকদের জন্য পিপিই নেই। প্রয়োজনীয় এন-৯৫ মাস্ক নেই। চিকিৎসক-নার্স ও কর্মীদের মধ্যে হাহাকার। সাধারণ সর্দি জ্বরের চিকিৎসা পাওয়াও দায়! করোনা শনাক্তের পরীক্ষার কিটও ছিল অপ্রতুল। অথচ সরকারের রোগতত্ত্ব ও রোগ নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তাগণ শুরু থেকেই বলছেন দেশে পর্যাপ্ত কিট রয়েছে। কিন্তু শুরু থেকেই পরীক্ষার কিট না থাকায় কম কম করে পরীক্ষা করা হয়। পরীক্ষা নিয়ে এই রাজনীতির কারণে সরকারের উপর থেকে আস্থা হারাতে থাকে মানুষ।

সংক্রমন ‘কমিউনিটি লেভেলে ট্রান্সমিশনে’ উন্নিত হলে দেশে সাধারণ ছুটি ঘোষণা করা হয়। সরকারি পরিপত্রে তখনও লকডাউন শব্দটি ব্যবহার করা হয়নি। আর লম্বা ছুটি পেয়ে রাজধানী বাসী পাড়ি জমায় গ্রামের বাড়িতে। লকডাউনের মধ্যে হাট-বাজার-সরবরাহ ব্যবস্থা থেকে শুরু করে সামাজিক সহায়তা রাজধানীতে পাওয়া না-পা্ওয়া নিয়ে মানুষের মনে শুরু থেকেই সংশয় ছিল। এসব বিষয়ে সরকারের কোন ধরনের দৃশ্যমান যুৎসই পদক্ষেপ ছিল না। কারখানা খোলার নামে গার্মেন্টস কর্মীদের ডেকে এনে আবার ফেরত পাঠানো হয়। মাইলের পর মাইল হেঁটে আসা এই কর্মীরা চাকরি বাঁচাতে ছুটে এলেও যাবার সময় তাদের সঙ্গী হয় সংক্রমণের বীজ। একইভাবে ঈদের আগে রাজধানী থেকে বের হবার পথগুলো উন্মুক্ত করে দেয়া হয়। পথে ঘাটে ছিল মানুষের ভীড়। ফলে করোনা প্রতিরোধে জনসমাগম ও শারীরিক দূরত্ববিধি একবারেই প্রতিপালিত হয়নি। সবমিলিয়ে একটা হ-য-ব-র-ল পরিস্থিতি।

করোনাকালে লকডাউনে অনানুষ্ঠানিক খাতের বিপুল সংখ্যক শ্রমিক-কর্মচারী বেকার হয়ে পড়ে। রাস্তায় সাহায্যপ্রার্থী লোকের সংখ্যা বাড়তে থাকে। এই অবস্থায় দেশে এক বছরের খাদ্য মজুদ থাকলেও ত্রাণ ছিল অপ্রতুল। অসৎ এবং রাজনীতিকে ব্যবসায় রূপান্তরকারী জনপ্রতিনিধি নামধারী গোষ্ঠী শুরু করে লুটপাট। বিভিন্নস্থানে ত্রাণপ্রার্থীদের হামলা চালিয়ে রক্তাক্ত করা হয়। ক্ষুধার জ্বালায় আত্মহত্যা করে ছোট্টশিশু আফরোজা। সন্তানকে দুধ খাওয়াতে না পেরে মাথার চুল বিক্রি করেন মা। এমন ঘটনা হয়তো আরও আছে।

ব্যর্থতার ইতিহাস দীর্ঘ। কিন্তু কেন এই ব্যর্থতা? এই ব্যার্থতার পেছনে কাজ করে যে শাসন প্রণালী তার নাম নয়া উদারবাদ। নয়া উদারবাদ ক্রমাগত সামাজিক সুরক্ষা খাতকে সংকুচিত করে ঘটায় পণ্যায়ন। আবার একই সঙ্গে উন্নয়নের গালভরা বুলিতে নিশ্চিত করে পুঁজি ও পণ্যের অবারিত প্রবাহ। জাতিসংঘ-বিশ্বব্যাংক-আইমএফ-এডিবি-এনজিও এমন নানাবিধ প্রতিষ্ঠান মিলে ঠিক করে এর ব্যবস্থাপত্র। আর তার উপাঙ্গ হিসেবে কাজ করে দেশীয় লুটেরা শাসকগোষ্ঠী। বর্তমান সরকারের উন্নয়নের বিপুল প্রচার-প্রচারণা সত্ত্বেও পুরো ব্যবস্থার গলদটা একবারে উদাম হয়ে গেছে।
ইউরোপ আমেরিকার চেয়ে বেশি খরচে বড়বড় সেতু-রাস্তাঘাট নির্মাণ, উচ্চদামে পরিবেশ বিধ্বংসী কয়লা বিদ্যুৎ, পরমানু বিদ্যুৎকেন্দ্র ছাড়াও নানা প্রকল্পর চটক দেখানো হলেও দেশের বাস্তব চিত্র হল রোগ পরীক্ষার জন্য দেশে উন্নতমানের পরীক্ষাগারের অভাব। করোনার এই দুঃসময়ে জানা গেল ৪৬ জেলায় কোন আইসিইউ নেই। অক্সিজেন সিলিন্ডার আর ভেন্টিলেটরের অভাব প্রকট। আর সরকার যুক্তি দিচ্ছে সংকট সবখানেই, যুক্তরাষ্ট্রেও মানুষ ভেন্টিলেটর পাচ্ছে না। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রে কোন একটি কাউন্টিতে ১টিও আইসিইউ নেই, এমন কথা কি সরকার হলফ করে বলতে পারে? পর্দা কিনতে, মেডিকেল সরঞ্জাম কিনতে কাঁড়ি কাঁড়ি টাকার দুর্নীতি করার পরও বহাল তবিয়েতে থাকা, নিলর্জ্জতা প্রমাণ করে? এমন দায়সারা কথা কে বলতে পারে? আসলে উন্নত/অনুন্নত নয়, মূল বিষয়টি হল উন্নয়ন মডেল। যেসব দেশ ধনিক গোষ্ঠিী বা লুটেরা উন্নয়নের চুয়ে পড়া নীতির ধারক। বাংলাদেশ নয়া উদারবাদের চুঁয়ে পড়া নীতি গ্রহণ করেছে। তাই বেনিয়ারা উদরপূর্তির পরে যে উচ্ছিষ্ট থাকে তা-ই জনগণের প্রাপ্য হয়। ভিয়েতনামের মতো দেশ এই পথে হাঁটেনি। আর তাই খুব সংক্রিয়ভাবেই তারা নিয়ন্ত্রণ করেছে মহামারীকে। কিউবা পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে চিকিৎসা সহায়তা পাঠাচ্ছে। কিন্তু অন্ধ হলে প্রলয় বন্ধ থাকে না-প্রলয় চলছেই। এই প্রলয়েও থেমে নেই দুর্নীতি আর অবৈধ মুনাফাখোরির মচ্ছব।
সম্প্রতি প্রকাশিত টিআইবির প্রতিবেদনে উঠে এসেছে সেই চিত্র। টিআইবি বলছে, করোনা মোকাবিলায় সরকারের গৃহীত পদক্ষেপে আমলা, ব্যবসায়ী ও রাজনৈতিক ব্যক্তিদের ত্রিমুখী আঁতাতের মাধ্যমে দুর্নীতি হয়েছে। এন-৯৫ মাস্কসহ সুরক্ষাসামগ্রী ক্রয়ের ক্ষেত্রে ব্যাপক দুর্নীতি হয়েছে। ক্রয়ের নীতিমালা বাস্তবায়িত হয়নি। উপরন্তু ৫ থেকে ১০ শতাংশ বেশি হারে ক্রয়মূল্য প্রস্তাব করা হয়েছে। এন-৯৫ মাস্ক কেলেঙ্কারির তদন্ত প্রতিবেদনও প্রকাশ করা হয়নি। পিসিআর মেশিন ক্রয়েও ছিল নয় ছয়। সরকার ঘোষিত প্রণোদনা সরাসরি ঢুকেছে ব্যবসায়ীদের পকেটে। প্রণোদনা পেয়েও বিপুল সংখ্যক লোককে ছাঁটাইয়ের পরিকল্পনা করছে তারা। কোভিড চিকিৎসাতেও সরকার নির্ধারিত বেসরকারি হাসপাতালে আসছে ভুতুড়ে বিল। সরকারি দলের এক সাংসদের হাসপাতালে এমন দুর্নীতির খবর প্রমাণসহ বেশকয়েকবার প্রকাশিত হলেও সরকার নির্বিকার। যেন দুর্নীতির লাইসেন্স নিলামে বিক্রি করা হয়েছে। টিআইবির প্রমাণসহ গবেষণা প্রত্যাখান করে সরকার দুর্নীতিকে আরও বাহবা দিয়েছে।

মহামারি নয়, এই বর্বর পুঁজিবাদী ব্যবস্থা মানুষের শ্বাস নেয়ার অধিকারটুকু রাখেনি। একবারে গণহত্যা করতে যেন উদ্যত সে। মহামারী মোকাবেলায় পুরোপুরি ব্যর্থ এই ব্যবস্থা যত প্রবল হবে করোনাকাল ততো প্রলম্বিত হবে। আর লুটপাটকারীদের জন্য আরো উন্মুক্ত হবে কোভিড বাণিজ্যর পথ।

শুরু করেছিলাম স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের কথা দিয়ে। করোনাকাল বিনা শর্তে প্রলম্বিত হবে এমন কোন ঘোষণা বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থা দেয়নি। এটা নির্ভর করে মোকাবেলার ধরণ ও সক্ষমতা তৈরির উপর। কিন্তু বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার নির্দেশনা বা শর্তের উপর আলোকপাত না করে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক কেন বল্লেন, করোনা ২/৩ বছর থাকবে? এর কারণ সরকার এখন হার্ড ইমিউনিটির পথে হাঁটতে চায়। হার্ড ইমিউনিটি হল এমন একটা নীতি যেখানে ধরে ধীরে সংক্রমণ ঘটতে দেয়া হয় এবং একইসঙ্গে স্বাস্থ্যব্যবস্থার উপর যেন চাপ না পড়ে খেয়াল রাখা হয়। অতঃপর একটি জনগোষ্ঠীর ৬০/৭০ শতাংশ মানুষ আক্রান্ত হলে একটা রোগপ্রতিরোধী অবস্থা তৈরি হয়ে যায়। ফলে আর মহামারি বাড়তে পারে না।
এই নীতির অনুসারী হয়ে সরকার লকডাউন খুলে দিয়েছে। বাজার-বাণিজ্য-অর্থনীতি সচল রাখার চ্যালেঞ্জ তার সামনে। কেন এই চ্যালেঞ্জ? কেননা বিদ্যমান পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় মানুষকে রক্ষার জন্য তার হাতে কোন সুরক্ষা ব্যবস্থা নেই। আর তাই সরাসরি হার্ড ইমিউনিটির কথা না বলে করোনাকাল প্রলম্বিত হবার ঘোষণা দিয়েছেন স্বাস্থ্য অধিপ্তরের মহাপরিচালক। একটা মহামারীকে স্বাভাবিকীকরণ করার তথা জনজীবনকে এতে অভ্যস্ত করে তোলার নসিহতই করেছেন তিনি। একটি নিখুঁত গণহত্যার চেয়ে এটা কি আলাদা কিছু?

লেখক: সাবেক রাকসু ভিপি, সাধারণ সম্পাদক বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি, রাজশাহী।

Close