শিরোনাম-২সাহিত্য ও সংস্কৃতি

করোনা রোদন

রাগিব আহসান মুন্না

গতকাল খুব ভোরে ফোনটা বেজে উঠলে ঘুম ভেঙ্গে যায়। ঘড়িতে তখন ভোর ৫টা। এতো ভোরে ফোন বেজে ওঠায় কেমন যেন একটা অজানা ভয় ভর করলো পুরোদেহ মনে। উদ্বেগ আর উৎকণ্ঠা অস্থিরতা অনুভব করতে লাগলাম।
আমরা সাধারণত এই ভোরকে কাক ডাকা ভোর বলে থাকি। বাসার সাথে লেগে থাকা কাঁঠাল গাছের ডালে বসে দুটো কাক একটানা কা কা করা ডেকে চলেছে। যেন অশুভ সংবাদ আগে থেকেই তাদের জানা। দুরু দুরু হৃদয়ে ফোনটা তুলে কানে নিলে অপর প্রান্ত থেকে রাকিব ভাইয়ের কন্ঠস্বর ভেসে আসলো। আমাদের খুব আপনজন তৌফিক ভাই এ পৃথিবী ছেড়ে চির দিনের জন্য বিদায় নিয়েছেন। রাত্রী ২-৩০ মিনিট তিনি মারা গেছেন। তৌফিক ভাই অসুস্থ্য ছিলেন বেশ কিছু দিন থেকে। তৌফিক ভাই সাকিব ট্রান্সপোর্টের মালিক। অসুস্থ্য অবস্থায় আমি তাঁর সাথে মোবাইল ফোনে কথা বলেছি, কথা বলার সময় তিনি বারবার কাশি দিচ্ছিলেন এবং শ্বাস নিতে তাঁর কষ্ট হচ্ছিল। আমি জিজ্ঞেস করলাম তিনি করোনার পরীক্ষা করিয়েছেন কি না? তখন তিনি হবিগঞ্জে। বললেন, এখানে টেষ্টের তেমন ব্যবস্থা নেই, ঢাকায় গিয়ে করবো। তারপর ঢাকায় আসার পথে তিনি গুরুত্বর অসুস্থ্য হয়ে পড়লে তাকে গুলশানের একটি ক্লিনিকে নেওয়া হয় এবং আই.সি.ইউতে তার চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হয় । পরে তিনি কিছুটা সুস্থবোধ করলে করোনার টেষ্ট করানো হয়। কিন্তু টেষ্টের ফলাফল জানার পূর্বেই তিনি মারা যান।
সংবাদটা শুনে আমি বাক রুদ্ধ হয়ে পড়ি। রাকিব ভাই বলতে থাকেন, মুন্নাভাই আপনি শুনেছেন, আমি শুধু জী বলে ফোনটা কেটে দিলাম। সুর্য তখনও উঠেনি। বারান্দায় দাঁড়িয়ে পুব আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকি। বেদনার্ত মনে দেখা দেয় একরাশ প্রশ্ন। মানুষের সীমাবদ্ধতা মানুষের অক্ষমতা আর মানুষের অসহায়ত্ব আমাকে নিথর করে দেয়। মৃত্যু ধ্রুব সত্য কিন্তু মৃত্যু যে বিভীষিকা হতে পারে, মৃত্যু যে আতংক হতে পারে তা গভীর ভাবে অনুভব করছিলাম।
দাঁড়িয়ে থেকে ভাবতে থাকি, অরো অনেক স্বজনেরই মৃত্যু সংবাদ হয়তো শুনতে হবে। কোন একদিন হয়তো আমাকে এই সংবাদে সামিল হতে হবে। মৃত্যু সবার জন্যই একদিন আসবে! তারপরও জীবন থেমে থাকবে না। যে অন্ধকার নেমে এসেছে তা একদিন দূর হবে। হয়তো পুঁজি ক্ষমতা আর মুনাফার নিষ্ঠুরতা দূর করে মানুষ একদিন মানবিক পৃথিবী গড়ে তুলবে। জীবনের তাগিদেই মানুষ তার নিজ ঠিকানা খুঁজে নিবে।
এসব কিছু ভাবতে ভাবতে আকাশের দিকে তাকিয়ে দেখি পূবালি আকাশ রাঙ্গিয়ে রক্ত লাল সূর্যটা যেন সেই সোনালি দিনের বারতা নিয়ে উদিত হয়েছে। তার ছটা এসে পড়লো পৃথিবীর গায়ে।

Close