নাগরিক মতামতশিরোনাম-২

অভিবাসন,মানব পাচার এবং রেমিটেন্স

মতিউর রহমান মিঠু

 

একদিকে দেশে কর্ম সংস্থানের অভাব অন্যদিকে কারিগরি শিক্ষার অভাব ,গ্রামীন এলাকার ক্ষুদ্র, ছোট ও মাঝারি শিল্প বন্ধ হওয়া,পুঁজির অভাবে বেকারদের মাঝে নতুন উদ্যোক্তা তৈরী না হওয়ায় দিশাহারা দেশের বেকার যুব সমাজ। স্বপ্ন ছাড়া মানুষ বাঁচে না,স্বপ্ন দেখা এসব যুবকের স্বপ্ন পূরনের একটি মাধ্যম বিদেশে কর্মসংস্থান। নিজে স্বাবলম্বী হওয়া এবং পরিবারকে আর্থিক ও সামাজিকভাবে প্রতিষ্ঠিত করার লক্ষ্যে পাড়ি জমায় স্বপ্নের বিদেশ।বাংলাদেশের অভিবাসন মূলত দেশীয় কর্মসংস্থানের অভাবেই হয়। এই অভিবাসনকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশে বিশাল এক ফটকাপুঁজির বাজার তৈরী হয়েছে যেখানে রাষ্ট্রও একটি অংশিদার!বর্তমানে সারা পৃথিবীজুড়ে প্রায় ১ কোটি ২০ লক্ষ বাংলাদেশী শ্রমিক অবস্থান করছে। এদের মধ্যে প্রায় ৮ ভাগ নারী অভিবাসী শ্রমিক আছে।এই করোনাকাল এসে অবাক হওয়ার মতো কিছু বিষয় আমাদের সামনে চলে এসেছে! (১)প্রায় ২০ লক্ষ শ্রমিক অবৈধভাবে বিদেশে অবস্থান করছে। (২.) বাংলাদেশ পৃথিবীর প্রথম সারির মানব পাচারকারী দেশ (৩.)এই সময়ে রেমিটেন্স প্রবাহ বেড়েছে অন্যান্য সময়ের চেয়ে!
আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা ( আইএলও)-র মতে সারা পৃথিবীতে প্রায় ২ কোটি ১০ লক্ষ মানুষ বর্তমান যুগে দাসত্বের শিকার। এর মধ্য ৬৮ ভাগ মানুষ শ্রম শোষিত,২২ ভাগ যৌন শোষিত। ১০ ভাগ রাষ্ট্র দ্বারা শোষিত হচ্ছে। তারা আরো জানাচ্ছে এই মূহুর্তে সবচেযে বেশি ঝুকিতে আছে,শিশু শ্রমিক এবং বেআইনি অভিবাসী শ্রমিক।
২০১৫ সালে থাইল্যান্ডের গভীর জঙ্গলে বেশকিছু গনকবর আবিস্কৃত হবার পর সারা পৃথিবীজুড়ে হইচই পড়ে গিয়েছিল।সে সময় বহু বাংলাদেশী নিখোজ হয়। আন্দামান সাগর থেকে সহস্রাধিক বাংলাদেশী উদ্ধার হয়,যারা আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা (আইওএম)-র সহায়তায় দেশে ফিরে আসে।সেই সময়ে মানব পাচারের রুট হিসাবে কক্সবাজারকে বেছে নিয়েছিল মানব পাচারকারীরা। মজার ব্যাপার হচ্ছে থাইল্যান্ডসহ পৃথিবীর বহুদেশে মানব পাচারের বিচার সম্পূর্ন হলেও বাংলাদেশের পাচারকারীদের কেশাগ্র ছোঁয়া যায় নি! শুধু কক্সবাজারে ৬৫০ এর মতো মামলা হয় এখন পর্যন্ত একটিও নিষ্পত্তি হযনি! কোন ধরনের ক্ষতিপূরণ পাইনি এই ক্ষতিগ্রস্ত প্রতারিত অভিবাসন প্রত্যাশিরা।আলাদা ট্রাইবুনাল গঠন করে মানব পাচারের বিচার দ্রুত করার জন্য ২০১২ সালে মানব পাচার আইন তৈরী হলেও সেটা বাস্তবায়ন হয়নি এখনো! অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায় মামলার তদন্তভার দেওয়া হয় জেলা জনশক্তি কর্মসংস্থান অফিসের জরিফ অফিসারকে।তদন্তের নূন্যতম ধারনা না থাকা এসব অফিসাররা রাজনৈতিকভাবে প্রভাবিত হয়। ফলে হযবরল তদন্ত রিপোর্ট জমা পড়ে আদালতে। আসামী খালাস/স্বাক্ষি নাই ইত্যাদি।মানব পাচারকারীরা খুব সুসংগঠিত,ক্ষমতাশালি,রাজনৈতিক প্রভাবযুক্ত হবার কারণে বরাবর তারা ধরা ছোঁয়ার বাহিরে থেকে যাচ্ছে। এখানে সরকারি উদাসনিতা,দৃঢ পদক্ষেপ গ্রহনের অভাবে বার বার উপেক্ষিত থেকে যাচ্ছে অভিবাসন প্রত্যাশি শ্রমিকরা ন্যায় বিচার প্রাপ্তিতে।
অভিবাসন নিয়ে কাজ করেন এমন অনেক সংস্থা ধারনা করছেন,২০-২৫ ভাগ অভিবাসী শ্রমিক কাজ হারাতে পারে পৃথিবীময় এই করোনাকালে।সেই হিসেবে বাংলাদেশে প্রায় ২৫ লক্ষ অভিবাসী শ্রমিক কাজ হারিয়ে দেশে ফেরত আসতে পারে।
অভিবাসন নিয়ে কাজ করা সংগঠন ব্র্যাকের তথ্য অনুযায়ী, গত ফেব্রুয়ারী-মার্চ মাসে প্রায় ২ লক্ষ অভিবাসী শ্রমিক দেশে ফিরেছেন। চার্টাড ফ্লাইটে ফিরেছেন আরো ১৮ হাজার শ্রমিক। সম্প্রতি সৌদি আরব,কাতার,কুয়েতসহ বিভিন্ন দেশের দূতাবাস থেকে চিঠি দিয়ে সরকারকে জানানো হয় বিপুল সংখ্যক অভিবাসী শ্রমিক কাজ হারাতে পারেন। এ সময় সবচেয়ে বেকায়দায় আছেন বেআইনিভাবে অবস্থানরত শ্রমিকরা। যদিও আন্তর্জাতিক শ্রমবিধিমালায় বলা আছে, ”যে কোন দুর্যোগর্পূণ পরিস্থিতিতে অভিবাসী শ্রমিকরা যে দেশে অবস্থান করবেন সেই দেশকেই দায়িত্ব নিতে হবে”।করোনা ভাইরাসের কারণে কোন গন্তব্য দেশই এই দায়িত্ব নিতে চাচ্ছে না। আবার বাংলাদেশ থেকে যে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ফোরামে সংকটগুলো উপস্থাপন করবে সেই লক্ষনও দেখা যাচ্ছে না।ফলে অভিবাসী শ্রমিকদের ভাগ্য গন্তব্য দেশের উপরই নির্ভর করছে।
রেমিটেন্স বাড়ার কারন কি?
কয়েকদিন আগে লন্ডন থেকে আমাদের অর্থমন্ত্রী মহোদয় প্রবাসী শ্রমিকদের শুভেচ্ছা জানিয়েছেন,কারণ তাঁরা প্রচুর রেমিটেন্স পাঠিয়েছে জুন মাসে।আমরাও আনন্দিত এই খবরে কিন্ত এই সুখ কতদিন থাকে এটাই দেখার বিষয়।
বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসেব মতে এই অর্থ বছরে ১৮ দশমিক ২০ বিলিয়ন ডলার পাঠিয়েছে প্রবাসী শ্রমিকরা,শুধু জুন মাসেই ১৮৩ কোটি ডলার মাসের হিসেবে এটিই সবচেয়ে বেশি। যা গত বারের থেকে প্রায় ১০ ভাগ বেশি।এতেই খুশিতে গদগদ সরকারি মহল,সাথে আমরাও।
অনেক বিশ্লেষকের মতে রেমিটেন্স বেশি আসার কারন হতে পারে-(ক)যেসব প্রবাসী শ্রমিক ভাইয়েরা দুমাস টাকা পাঠাতে পারেনি তারা এই জুন মাসে একবারে বেশি টাকা পাঠিয়েছে।(খ)করোনা পরিস্থিতির জের ধরে অনেক কম্পানি নগদ পয়সা দিয়ে কর্মী ছাটাই করছে।সে কারণে মোটা অংকের টাকা পাঠাচ্ছে অনেক শ্রমিক।(গ) অনেকেই বেশকিছু বছর ধরে প্রবাসে অবস্থান করে কিছু টাকা জমিয়েছিলেন তারা দেশে ফেরার আগে টাকা পাঠিয়ে দিচ্ছে।(ঘ)অনেক বেআইনি শ্রমিক যারা অন্য সময় টাকা পাঠাতে পারত না তারাও এই করোনাকালিন সুযোগে টাকা পাঠাচ্ছে।
তবে বৈদেশিক মুদ্রার রির্জাভ বাড়ার ক্ষেত্রে রেমিটেন্স’র পাশাপাশি বিশ্ব ব্যাংক,আইএমএফ,এডিবি’র লোন সহায়তার বড় ভূমিকা আছে।তাছাড়া আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম কম থাকায় আমদানি খরচ কম এ কারণেও রির্জাভ বেড়েছে বলে মনে হচ্ছে।
অভিবাসী শ্রমিকদের বাঁচাতে হবে-
(ক)-সারা পৃথিবীজুড়ে শতশত বাংলাদেশী অভিবাসী শ্রমিক মারা গেছে করোনা ভাইরাস আক্রান্ত হয়ে।এদের প্রত্যেকের পরিবারকে কর্মজীবন বেতনের সমমূল্যের ক্ষতিপুরন দিতে হবে।তাঁদের পরিবারের প্রত্যেক ছেলে-মেয়ে’র লেখা-পড়ার দায়িত্ব রাষ্ট্রকেই নিতে হবে।
(খ)কাজ হারিয়ে ফেরত আসা শ্রমিকদের সরকারিভাবে পুনঃবাসনের ব্যবস্থা করতে হবে।এক্ষেত্রে প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংক থেকে বিনা সুদে লোন দিয়ে কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা।
(গ)এদের মধ্য যারা দক্ষ শ্রমিক ফেরত আসবে তাদেরকে অর্থনৈতিক জোনগুলোতে কাজের ব্যবস্থা করতে হবে।বিদেশি শ্রমিক আমদানি না করে দেশি শ্রমিকদের সুযোগ দিতে হবে।
(ঘ) আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার সাথে যুক্ত সংগঠন( আইওএম,আইএলও)-র সাথে বর্তমান সংকট মোকাবেলায় নিজেদের দাবি উপস্থাপন করা এবং গন্তব্য দেশের সাথে দেনদরবারে যুক্ত করা।
(ঙ)বিদেশ ফেরত নারী অভিবাসী শ্রমিকদের এককালিন অর্থ প্রদান করে কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা।
প্রবাসী শ্রমিকদের হয়রানি বন্ধকরা এবং বিদেশে কর্মরত অবস্থায় নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব রাষ্ট্রকেই নিতে হবে। প্রতিটি প্রবাসী শ্রমিকের ডাটাবেজ তৈরী করে তথ্য সংরক্ষন করতে হবে। কোন দেশে কতগুলো শ্রমিক অবস্থান করছে জাতীয়ভাবে তার তথ্য সংরক্ষন করতে হবে। ফ্রি ভিসা বা চাকুরির নামে বিদেশে পাচারকৃত ভিকটিমকে দেশে ফেরত আনা,আইনগত ব্যবস্থা,নিরাপত্তা,চিকিৎসা, মনো-সামাজিক পুনর্বাসন, ক্ষতিপূরন ও অর্থসহায়তার ব্যবস্থা রাষ্ট্রকেই করতে হবে। পাশাপাশি প্রতারনাকারীদের বিরুদ্ধে প্রচলিত আইনে, মানবপাচারকারী এবং এজেন্সিগুলোকে মানবপাচার প্রতিরোধ আইনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে। সকলের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় পারে অনিরাপদ অভিবাসন রুখে দিতে।

লেখক: সমাজ কর্মী

Close