মহানগরশিক্ষাঙ্গন বার্তাশিরোনাম

বিজ্ঞানপ্রেমী অধ্যাপক ড. শিশির ভট্টাচার্য আর নেই

নিজস্ব প্রতিবেদক: রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষক, বিজ্ঞান গবেষক, গণিত শাস্ত্রবিদ ড. শিশির কুমার ভট্টাচার্য আজ সকাল ১০টায় রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে শেষ নি: শাস ত্যাগ করেন। তিনি দীর্ঘদিন ধরে পারকিনসন্স রোগে ভুগছিলেন।

অধ্যাপক ড. শিশির কুমার ভট্টাচার্য ৪০ বছর রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের গণিত বিভাগে শিক্ষকতা করেছেন। লিখেছেন বিজ্ঞানের গুরুত্বপূর্ণ কটি বই। এবার পেয়েছেন বিজ্ঞান সাহিত্যে বাংলা একাডেমি পুরস্কার। ড. শিশির কুমার ভট্টাচার্য রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের গণিত বিভাগ থেকে অবসরে গিয়েছেন ২০০৫ সালে। চাকরিতে প্রবেশ করেছিলেন ১৯৬৫ সালে। টানা ৪০ বছর বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করেছেন।
গণিতের জ্ঞানে মানুষ, মহাবিশ্ব ও মহাজাগতিক বিষয়ের ওপর বই রচনা করছেন। তার মৃত্যুতে বিভিন্ন মহল শোক প্রকাশ করেছেন।

বরিশালে জন্ম অধ্যাপক ড. শিশির কুমার ভট্টাচার্যের। জ্ঞান অন্বেষণে তার সারা জীবনের সাধনা। জীবনের নানা পর্যায়ে থেকেছেন খুলনা, রাজশাহী, ব্রিটেনের লন্ডনসহ নানা স্থানে। ১৯৬১ সালে স্নাতক সম্পন্ন করেছেন বিএল (ব্রজলাল) কলেজ, খুলনায়। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৯৬৩ সালে গণিতে স্নাতকোত্তর। ১৯৮০ সালে কুইন মেরি ইউনিভার্সিটি অব লন্ডন থেকে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেছেন। নামকরা পাবলিক রিসার্চ (জন গবেষণা) বিশ্ববিদ্যালয়। ড. শিশির কুমার ভট্টাচার্যের গবেষণার তত্ত্বাবধায়ক ছিলেন আই. পি উইলিয়াম, এখনো বেঁচে; প্রফেসর ইমিরিটাস, কুইন মেরি বিশ্ববিদ্যালয়। তার পিএইচডি গবেষণার বিষয়– ‘গ্রহ, নক্ষত্রের সৃষ্টি ও বিবর্তন’। ‌জ্যোতির্বিজ্ঞানে গবেষণা করে অনুধাবন করলেন, ‘মহাবিশ্ব সম্পর্কে আমরা যেসব ধারণা পোষণ করি; প্রকৃত মহাবিশ্ব যেকোনো ধারণার চেয়ে অনেক বড়। ফের বললেন, ‘আমরা জানি, আলোর গতিবেগ প্রতি সেকেন্ডে এক লাখ ৮৬ হাজার বর্গমাইল। একে একক হিসেবে ধরে মহাবিশ্বের দৈর্ঘ্য মাপলে ৪৬ বিলিয়ন আলোকবর্ষ হয়। ফলে বোঝা যায় মহাবিশ্ব আসলে আমাদের ধারণার অনেক বাইরে বিশাল ও বিস্তৃস্ত।’ তিনি বিশ্বাস করতেন, মহাবিশ্বের বিশালতা সম্পর্কে মানুষের যদি প্রকৃত উপলব্ধি ও জ্ঞান লাভ ঘটে, তাহলে তার কোনো অন্ধবিশ্বাস থাকবে না। সাধারণের অন্ধবিশ্বাস দূর করতে তিনি মহাবিশ্ব নিয়ে লিখছেন। তার গণিতের বাইরের জগৎ ‘বিজ্ঞান সাহিত্যে’ বিশেষ অবদানে বাংলা একাডেমি ‘মেহের কবীর পুরস্কার’-এ সম্মানিত করেছেন। ২০১৯ সালের ডিসেম্বরের ১৮ তারিখে ঢাকায় আনুষ্ঠানিকভাবে তার হাতে পুরস্কার হাতে তুলে দেওয়া হবে। অনুভূতি জানতে চাইলে অধ্যাপক ড. শিশির কুমার ভট্টাচার্য বলেছিলেন, ‘যে কোনো স্বীকৃতি আনন্দের। আমার মনে হচ্ছে, স্বীকৃতিটি আসলে আমাকে মরণোত্তরই দেওয়া হয়েছে। আজ থেকে দুই বা এক বছর আগেও আমার যে শারীরিক অবস্থা ছিল; তখন যদি মারা যেতাম, পুরস্কারটি মরণোত্তর হতো। সেই অনুভূতি ভোলার নয়। তবে স্বীকৃতি আমার কাজকে ত্বরান্বিত করবে বলে আশা করছি।’

অনেকদিন ধরে পারকিনসন বা ‌‘পেনোমনা’ নামের হরমোনের রোগে ভুগছিলেন ড. শিশির কুমার ভট্টাচার্য। দিনের নির্দিষ্ট সময় চলাফেরা করতে পারতেন না। হাত-পা জ্বালাপোড়া করতো, কথা বলতে অসুবিধা হতো। খুব লাজুক ও বিনয়ী মানুষটি নিজের অসুবিধা নিয়ে অস্বস্তিতে ভোগতেন কিন্তু যতটুকু সময় সুস্থ থাকেন, চালিয়ে যেতেন লেখালেখি। আপাদমস্তক একজন শিক্ষক। যখন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্লাস নিতেন, বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনা করতেন; শিক্ষার্থীদের শ্রেণিকক্ষের বাইরেও জ্ঞান অন্বেষণে নানাভাবে উৎসাহী করতেন। গণিতের মতো কাঠখোট্টা বিষয়ও তাদের কাছে মজা করে উপস্থাপন করতেন। ক্লাস শুরুই করতেন হাস্যরসাত্মক আলাপে। ছাত্র-ছাত্রীদের জমে থাকা তথ্যজট ভেঙে জায়গা করে দিতেন গণিতের।

হাসির ছলে সমাধান করতেন ক্যালকুলাস, জিওমেট্রির কঠিন বিষয়। শিক্ষার্থীদের শেখাতে নানা কৌশল ছিল তার। অংক করাতে গিয়ে শিক্ষার্থীদের যেখানে সমস্যা হতে পারে, আগেই বোর্ডের এক কোণে লিখে রাখতেন। শিক্ষার্থীদের আগে সমস্যাটির সমাধান করতেন, পরে তারা এমনিতেই অংক করতে পারতেন। ফলে অনেক নামকরা ছাত্র-ছাত্রী তৈরি হয়েছেন তার। ত

শিক্ষকতা করে থেমে থাকেননি ড. শিশির কুমার ভট্টাচার্য। খেলাধুলার প্রতিও তখন তার প্রচণ্ড ঝোঁক ছিল। দাবা, তাস, ক্রিকেট, ব্যাডমিন্টন খেলেছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের তাস প্রতিযোগিতায় একযুগের বেশি চ্যাম্পিয়ন ছিলেন গণিতের এই অধ্যাপক। সাংস্কৃতিক অঙ্গনেও পরিচিত মুখ তিনি। স্বনন, রবীন্দ্রসংগীত চর্চা সংগঠন, রুডা (রাজশাহী ইউনিভার্সিটি ড্রামাটিক অ্যাসোসিয়েশন)সহ বিশ্ববিদ্যালয় ও শহরের বিভিন্ন সাংস্কৃতিক সংগঠনে কাজ করেছেন সমানতালে। শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতায় বিচারকের দায়িত্বও পালন করেছেন।
এই কীর্তিমান পুরুষটির শুন্যতায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে ক্যাম্পাসে।

বরেন্দ্র বার্তা/অপস

Close