ছবি ঘরনওগাঁশিরোনাম

না উড়ার আগেই না ফেরার দেশে

 

সাব্বির আহমেদ, নিয়ামতপুর, (নওগাঁ): আকাশে পাখি উড়ার দৃশ্য কার না ভালো লাগে! পাখি প্রেমীদের জন্য নিশ্চয়ই তা ভালো লাগার আবার প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষাই পাখিদের অবদান যে অতুলনীয় তা বলার আর অপেক্ষা থাকে না। কিন্তু পাখি আকাশে উড়ার আগেই যদি চলে আসে মৃত্যু তা নিশ্চয়ই পাখি প্রেমীদের জন্য কষ্টকর। আর পাখিদের জন্য বা মা পাখিদের জন্য বা তাদের পরিবারের জন্য?

পাখিরা গাছের ডালে বাসা তৈরি করে, তা যে খুব সহজ তা কিন্তু নয়, বিভিন্ন স্থান থেকে খড়কুটো সংগ্রহ করে, সময় ও যত্ন নিয়ে বাসা তৈরি করে তারপর সেখানে ডিম দেয়, অতঃপর বাচ্চা ফুঁটে। এখানেই শেষ নয়, মা পাখিটি তার বাচ্চাদের প্রতিদিন খাবার খাওয়াই সেই খাবার তাদের সংগ্রহ করতে হয়। আস্তে আস্তে পাখির বাচ্চারা বড় হয়। এক সময় তারা আকাশে উড়তে সক্ষম হয়।

কিন্তু এমন যদি ঘটে, পাখি বাসা তৈরি করলো, বাসাতে ডিমও দিলো কিন্তু মা পাখিটি বাচ্চাদের মুখ দেখতে পেলো না। আবার, পাখি বাসা তৈরি করলো, ডিম দিলো, বাচ্চাও ফুঁটলো কিন্তু সেই ছোট বাচ্চাগুলো আকাশে উড়ার আগেই চলে যেতে হলো না ফেরার দেশে। মুক্ত আকাশে দৈনিক বিচরণ তাদের আর হয়ে উঠলো না। গাছে গাছে ডানা ঝাপটানোর আনন্দ ও ঝাঁক বেঁধে ঘুরে বেড়ানোর বৈচিত্র্যময় জীবন তাদের আর হলো না। বাচ্চা পাখিদের সেই মৃত্যুতে, মা পাখিদের কষ্ট যোগে নীরব চেয়ে থাকা ছাড়া কিছু যেন করার থাকে না।

বলছি, নওগাঁ জেলার নিয়ামতপুর থানার ৬ নং পাঁড়ইল ইউনিয়নের সেফায়েতপুর গ্রামের পাশাপাশি দুইটি তেঁতুল গাছে দীর্ঘদিন ধরে বসবাস করে আসা বক, কক ও পানিকৌড়দের কিছু নীরব কষ্টের না বলা কথা। এবার একটু খোলাসা করে বলি।

এক সময় সেফায়েতপুর পাশাপাশি দুইটি তেঁতুল গাছে বক, কক ও পানিকৌড় গুলো মৌসুম ভিত্তিক থাকতো, এক মৌসুমে আসতো অন্য মৌসুমে চলে যেতে কিন্তু গেলো বছর থেকে তারা এখানেই স্থায়ী ভাবে থাকতে শুরু করেছে।

বক, কক ও পানিকৌড় গুলো খাদ্য সংগ্রহে দূর দূরান্ত যায়। নদী, নালা, খাল, বিল, পুকুর থেকে মাছ শিকার করে নিয়ে এসে বাচ্চাদের মুখে তুলে খাওয়াই। কিন্তু এই খাওয়ানোরও সময় বাঁধে কিছু বিপত্তি তা না হয় একটু পরেই বলি।

আশে পাশে খোঁজ নিয়ে ও বিভিন্ন গ্রাম সূত্রে জানা যায়, শুধুমাত্র এই সেফায়েতপুর গ্রামে নয় এক সময় অন্যান্য গ্রামের বড় বড় গাছে বক, কক পাখিদের উপস্থিতি বেশ ছিলো। কিন্তু গাছ মালিকদের অমানবিকতার কারনে অর্থাৎ বন্ধুক দিয়ে বক শিকার, বাচ্চা পাখিদের গাছের বাসা থেকে নামিয়ে রান্না করে খাওয়ার ধুম এবং অন্যান্য কারনে বক ও ককেরা পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়। কিন্তু সেফায়েতপুরে পাশাপাশি এই দুইটি তেঁতুল গাছে বক, কক এখনও বসবাস করছে। হয়তো শিকারীদের ভয় থেকে মুক্তি ও স্থানীয়দের পাখির প্রতি ভালোবাসার জন্যই এখনও তারা নিরাপদে বসবাস করছে।

কিন্তু প্রতি বছর প্রাকৃতিক কিছু ঘটনার শিকার হতে হয়। এই বছরেও প্রাকৃতিক কিছু ঘটনার শিকার হয়েছেন তারা। গেলো বৈশাখ, জ্যৈষ্ঠ মাসে ঝড়বৃষ্টির কারনে অসংখ্য ডিম পড়ে নষ্ট হয় এবং বাচ্চা পাখিরা বাসা থেকে গাছের নিচে পড়ে মৃত্যু ঘটে। আবার বাসা বড় না হওয়ার জন্য পাখিদের খাদ্য খাওয়ানোর সময় অনেক পাখি নিচে পড়ে যায়, গাছ অনেক উচু হওয়ায় তাদের আর বাসাতে দেয়া সম্ভব হয় না। এছাড়াও বিভিন্ন সময়ে বাচ্চাগুলো অসতর্কতা জনিত কারনে বাসা থেকে পড়ে যায়। বাসা থেকে বর্তমানেও বাচ্চা পড়ে মৃত্যু হচ্ছে। গাছ থেকে পড়ে বাচ্চাদের মৃত্যু এই বছরেরই ঘটনা নয়। এটা প্রতি বছর ঘটে আসছে।

বর্তমান বছরের হিসাব বলছে গেলো বৈশাখ থেকে শ্রাবণ(বর্তমান) মাস পর্যন্ত বিভিন্ন ঝড় বৃষ্টিতে প্রায় ১০০ টির বেশী ডিম পড়ে নষ্ট হয়েছে। এছাড়াও বাচ্চা খাদ্য খাওয়ানোর সময় সহ পাখির বাসা ছোট হওয়ার জন্য বাসা থেকে পড়ে এবং ঝড় বৃষ্টি সহ বিভিন্নভাবে প্রায় ২০০ টির বেশী বাচ্চা গাছ থেকে পড়ে মৃত্যু হয়েছে। অংকের সংখ্যা আরও বেশী হতে পারে এবং বর্তমানেও ডিম নষ্ট ও মৃত্যু যোগ হচ্ছে । প্রতিবেদন লেখার সময় সরেজমিনে দেখা যায় ১১ টির মতো পাখি মরে আছে, কিছু ১০ থেকে ১২ টি ডিম ভেঙে পড়ে আছে এবং একটি সাদা জীবিত বকের বাচ্চাও গাছের নিচে ঘোরাঘুরি করছে। অনেক পাখি পচে গিয়ে দূর্গন্ধ আসছে। পড়ে আছে বক দের শিকার করা পুঁঠি, শাটি সহ বিভিন্ন জাতের মাছ সে গুলো থেকেও দূর্গন্ধ আসছে। আবার পাখিদের মলের দূর্গন্ধ তো রয়েছে। বৃষ্টি হলে দূর্গন্ধ আরও বেশী হয়। দূর্গন্ধের ভোগান্তি পোহাতে হয় স্থানীয়দের। তবুও তারা নিরাপদে ও শান্তিতে থাকুক স্থানীয়দের মন্তব্য। কিন্তু যেভাবে পাখির বাচ্চাদের মৃত্যু হচ্ছে তা রোধ করা গেলে পাখিদের আনাগোনা ও প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষাই বিশেষ অবদান রাখা সম্ভব হবে।

উল্লেখ্য, এখানে বক, বক ও পানিকৌড় সহ মোট পাখি রয়েছে পাঁচ শতাধিকেরও বেশি। বর্তমান ছোট বড় সব মিলে পাখির বাসা রয়েছে ১১০ টির বেশী । এছাড়াও বক, কক ও পানিকৌড় সহ শতাধিক বাদুর রয়েছে। তবে বর্তমানে গাছ দুটিতে অসংখ্য পাখির জন্য পর্যন্ত জাইগা না থাকায় পাশের আম গাছ সহ বাঁশ ঝাড়েও পাখি এবং বাদুর থাকছে। ভবিষ্যতে পাখিদের সংখ্যা বৃদ্ধি ও পাখিদের গাছ থেকে পড়ে মৃত্যু রোধে কৃতিম বাসা বা অন্য কোন ব্যবস্থা করলে তাদের সুফল মিলবে কতটুকু এবং বাস্তবায়নে বাস্তব সম্ভাবনাইবা কতটুকু তা এখন প্রশ্ন।

বরেন্দ্র বার্তা/অপস

Close