নাগরিক মতামতশিরোনাম-২সম্পাদকীয়-কলাম

হাবিবুজ্জামান চুনি-স্মৃতিতে চির অম্লান

রাগিব আহসান মুন্না

হাবিবুজ্জামান চুনির মৃত্যুর সংবাদে অনেকে ব্যথিত এবং অনেকে শোকে কাতর হয়ে পড়েছেন। অনেকে মেনে নিতে পারেনি এমনতর মৃত্যু। কারণ চুনি একক ছিল না, অনেক তরুণেরর স্বপ্ন দ্রষ্টা ছিলেন। অনেক দুখি মানুষের পথ চলার সাথী হয়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন। অনেক তরুণ অনেক মানুষের আধারের রূপক ছিলেন। রাজশাহী অঞ্চলের মানুষের কাছে চুনিকে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার কোন প্রয়োজন আছে বলে আমি মনে করি না। যাদের ৯০’র ছাত্র গণঅভ্যুত্থানের ইতিহাস জানা আছে, তারা সকলেই জানেন স্বৈরাচারী এরশাদের সামরিক শাসন বিরোধী সংগ্রমের এক অবিস্মরনীয় অধ্যায়ের নাম হাবিবুজ্জামান চুনি।
মৃত্যুর কিছুদিন পূর্বে অসুস্থ হয়ে কানাডার একটি হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য গেলে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ তাকে ভর্তি করে নেয়। প্রথম পর্যায়ে তাঁর শারিরীক অবস্থা কিছুটা সংকটাপন্ন থাকলেও পরের দিকে ক্রমাগত সুস্থ্য হতে থাকে। তার চিকিৎসার সংবাদ আমি পেতে থাকি চুনির সহযোদ্ধা ইমনের ফেসবুকের পাতা থেকে, চুনি সুস্থ্য হয়ে উঠছে। আমাদেরও সংশয় একটু একটু করে দূর হতে থাকে। আমরাও আশার আলো দেখতে থাকি। হঠাৎ যেন সব হিসাব ওলট পালট হয়ে গেলো। চুনি আর নেই- প্রথমে বিশ্বাস হয় না, একে ওকে ফোন করে সংবাদের সত্যতা নিশ্চিত হলে, অবসাদ আর ক্লান্তি ছেয়ে যায় পুরো মনে।

তাঁর মৃত্যুতে অনেকেই শোক জানাবেন, অনেকেই বেদনায় কাতর হবেন। আনুষ্ঠানিক ভাবে তাঁর স্মৃতির প্রতি সম্মান জানানো হবে। তবে আমি আনুষ্ঠিকতার প্রচলিত নিয়মের মধ্যে দিয়েই তাকে সম্মান জানানোর চৌহদ্দিতে আটকে থাকতে চাই না। তারুণ্যের সবটুকু উচ্ছাস দিয়ে যে সমাজচিত্র তিনি এঁকেছিলেন সেই অধরা কাজের পরিসমাপ্তি বিন্দুকে ছুঁতে চাই। তাকে হারানোর শোককে রূপ দিতে চাই শক্তিতে।
এগুলোই ভাবতে ভাবতে ফিরে গেছি ৯০’র দশকে, একদল তরুণের গগনবিদারী নিনাদ। রাজপথ কাঁপিয়ে চলা আন্দোলনের মানব জোয়ার, বুক ভরা স্বপ্ন। প্রতিদিন মিছিল শেষে আলোচনা, সন্ধ্যায় এক সাথে বিবিসির বাংলা অনুষ্ঠান আর সংবাদ শোনা, রাতে মশাল মিছিল ,গণকপাড়ার মোড়ে অনেক রাত পর্যন্ত চলে আলোচনা। সোনামাখা সেই দিন গুলির স্মৃতির পাতা পাতা উল্টালে কত যে নাম আসে যাদের দৃঢ় প্রত্যয় রাজপথে জন্ম নিয়েছিল হাজার তরুণ্যে বিদ্রোহের তুফান। মিছিল থেকে হারিয়েছি আমরা জামিল আকতার রতনকে, ছাত্র মৈত্রীর সালাউদ্দিন বেবি (পরে সিপিবি নেতা) মারা গেছেন এক দশক পূর্বে, বিজয় লগ্নে ঘাতকের বুলেট ছিনিয়ে নিয়েছে দুলালের প্রাণ।
চুনি ছাত্র ইউনিয়নের নেতা ছিলেন। তিনি নীল পতাকার আসিয়ান পছন্দ করেছিলেন। নীল আকাশের মতোই ছিল তাঁর চরিত্রের বৈশিষ্ট্য। চুনি ছিলেন একটু অন্যরকম। নেতৃত্বের বৈশিষ্ট্যতা যেন সঙ্গে করেই পৃথিবীতে এসেছিলেন। তাইতো আমার বেশ ছোট হয়েও আমার অনেক ভুল সে ধরিয়ে দিত প্রায় সময়। সম্মান ভক্তিতে যেমন নুন্যতম কৃপণতা ছিল না, একই ভাবে ছিল না তার নীতির সাথে কোন রকমের আপস। পৃথিবীতে কোন কিছু অজেয় থাকবে সেটা মানা তো অনেক দূরের কথা, চুনি ভাবতেও পারতো না। সে ছিল এক অকুতোভয় যোদ্ধা। মিছিলে পুলিশ বেরিকেড দিলে চূনি অবলীলায় তা ভেঙ্গেছে অনেকবার। হাতে হাত রেখেই আমরা স্লোগান দিতাম। চুনি বলতো প্রতিপক্ষের বেরিকেড না ভাঙ্গতে পারলে জনগণ বিজয় লক্ষ্যে পৌঁছাবে কীভাবে মুন্না ভাই?
একবার আমি গোদাগাড়ী কলেজে আমার সংগঠনের এক ঘরোয়া মিটিং-এ গেছি। মিটিং শেষ করে কলেজ প্রাঙ্গণে মাঠের মাঝখানে কর্মীদের নিয়ে কথা বলছি। এমন সময় দেখলাম দূরে কেউ একজন দাঁড়িয়ে তর্জনী উচিয়ে বক্তব্য দিচ্ছে। সেখানে গিয়ে ঘটনাটা জানার জন্য কৌতুহল হলে-কাছে গিয়ে দেখি চুনি একা দাঁড়িয়ে স্থানীয় ছাত্রদের গণমূখী শিক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে কথা বলছে অতি সাধারণ ভাষাতে। তাঁর কথা বলা শেষ হলে সে আমাকে দেখতে পেয়ে আমার কাছে এসে জিজ্ঞেস করে ভাই আপনি কখন এসেছেন? বলাম সকালে, তুমি? সেও সকালে আসার কথাই বলল, সাথে সাথে এও বলল এই কলেজে ছাত্র ইউনিয়ানের কর্মী নেই তাই এসেছি। আমি তাঁর মনবলে অভিভূত হয়ে ভাবলাম চুনি মরুভূমিতেও বৃক্ষ রোপন করতে পারবেন। পরে একই সাথেই শহরের পথ ধরলাম।
তার পরে কত ইতিহাস, সেগুলি এখন শুধুই অতীত। আমরা যারা চুনি শুন্যতায় কাতর তাদের কাছে প্রশ্ন আমার, চুনির দেখা যে স্বপ্ন নিজেদের উদ্বুদ্ধ করেছিলাম সেই যাত্রা পথে আমরা কতদূর এগিয়েছে?
এই অন্তহীন যাত্রা পথে চুনি নিশ্চয় সংগ্রামী মানুষের প্রেরণা হয়ে থাকবে। আমরা যখন রাজপথের মিছিলে স্লোগান তুলবো, তোমাকে অবশ্যই খুঁজবো মিছিলের সামনের কাতারে। কবির কবিতার একটি চরণ তুলে ধরে তোমাকে সম্মান নিবেদিত করতে চাই।

‘‘এনেছিলে সাথে করে মৃত্যুহীন প্রাণ’’
তোমার স্মৃতির প্রতি হাজারো লাল সালাম।

Close