নাগরিক মতামতশিরোনাম-২

পরোক্ষ ধূমপানেও বাড়ে করোনার ঝুঁকি : জনস্বাস্থ্য রক্ষায় প্রয়োজন কঠোর আইন

ডা. আহমাদ খাইরুল আবরার

 

শতবর্ষ পরে বিশ্বজোড়া এক মহামারীর কবলে পড়ে সারা পৃথিবী আজ এক চরম বিপর্যয়ের মুখোমুখি। সার্স করোনা ভাইরাস-২ এর দাপটে এতদিনের অর্জিত সামাজিক অর্থনৈতিক অবস্থা এখন হুমকির মুখে। অসংক্রামক ব্যাধির দাপটে ভুলতে বসা সংক্রামক রোগ নাড়া দিয়েছে বিশ্বের তাবৎ স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের চিন্তা ভাবনাকেও। সীমিত সামর্থ্য আর অভিজ্ঞতার অভাবে বাংলাদেশেও বিপর্যয়ের চোখরাঙানি প্রকট হয়ে উঠেছে, তা শুধুমাত্র সরকারের বলিষ্ঠ নেতৃত্ব উতরানো দুঃসাধ্য; প্রয়োজন ব্যক্তিপর্যায়ে সবার সচেতনতা ও আন্তরিক সদিচ্ছা।
গেল বছরের ডিসেম্বরে চীনের উহান প্রদেশ থেকে উত্পন্ন করোনা গোত্রীয় ভাইরাসটি মানুষের শ্বাসতন্ত্রে সংক্রমিত হয়ে প্রদাহের সৃষ্টি করে। সামান্য গলাব্যাথা-জ্বর থেকে শুরু করে ফুসফুসের তীব্র প্রদাহ পর্যন্ত হয়ে থাকে এই সংক্রমণে। কোভিড-১৯ নামে আখ্যায়িত এই রোগে আক্রান্ত অধিকাংশ মানুষই নিজে নিজেই সুস্থ্য হয়ে গেলেও একটি উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মানুষের জন্য দরকার হয় নিবিড় পর্যবেক্ষণ সেবার, অনেকেরই লাগে কৃত্রিম শ্বাসযন্ত্রের সাহায্য। এই রোগে আক্রান্ত হবার পর গুরুতর সংক্রমণের শিকার হওয়ার বা মৃত্যুর উচ্চ ঝুঁকির মুখে রয়েছে বয়োজ্যেষ্ঠরা এবং যাদের অন্য কোন দীর্ঘমেয়াদী অসুখ আছে তারা। শ্বাসকষ্ট, হৃদরোগ, ডায়াবেটিস, ক্যান্সার বা অন্য কারণে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম থাকলে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এই ভাইরাসের বিরুদ্ধে অসম লড়াই এ হেরে যেতে হচ্ছে। করোনা ভাইরাসের সাথে এই লড়াইয়ে আরো বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে তামাক ব্যবহারকারীরা।
তামাক বিভিন্নভাবে কোভিড-১৯ এ আক্রান্ত হওয়ার এবং আক্রান্ত হওয়ার পর গুরুতর অসুস্থ হওয়ার সম্ভাবনা অনেক বাড়িয়ে দেয়। এখনো পর্যন্ত গবেষণায় প্রাপ্ত ফলাফলে দেখা গেছে সার্স করোনা ভাইরাসে আক্রান্তদের মাঝে গুরুতর সংক্রমণের শিকার হওয়ার সম্ভাবনা ধূমপায়ীদের ক্ষেত্রে অধূমপায়ীদের তুলনায় ২-১৪ গুণ বেশি। ফলে দেখা গেছে, ধূমপায়ীদের আইসিইউয়ে ভর্তির দরকার পড়ে বেশি। ভেন্টিলেটরের প্রয়োজনও তাদের বেশি হয়, এমনকি তাদের মৃত্যুরহারও বেশি।
কী হয় ধূমপানের ফলে:
ধূমপানের ফলে ফুসফুস ও শ্বাসতন্ত্রের স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হয়;
শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যায়;
কোষে এমন কিছু পরিবর্তন হয় যার কারনে খুব সহজেই নতুন ভাইরাস শরীরে ঢুকে বংশবিস্তার করতে পারে এবং নিউমোনিয়ার মতো প্রদাহের মাত্রা বাড়িয়ে দিতে পারে;
যেসব ধূমপায়ীর ক্রনিক অবস্ট্রাকটিভ পালমোনারি ডিজিজ বা সিওপিডি আছে, কোভিড হলে যেমন তারা বেশি অসুস্থ হন। আর সেরে উঠলেও সিওপিডি-র প্রকোপ আগের তুলনায় অনেক বেড়ে যায়;
ধূমপানের ফলে হতে পারে শ্বাসকষ্ট, হৃদরোগ, ডায়াবেটিসের মতো দীর্ঘমেয়াদী রোগ, যার প্রতিটি রোগই কোভিড সংক্রমণকে নিয়ে যেতে পারে গুরুতর পর্যায়ে, এমনকি মৃত্যু পর্যন্ত।
তবে শুধু ধূমপানকারীদের ক্ষেত্রেই নয়, বরং যারা পরোক্ষ ধূমপানের শিকার হয়, তাদের ক্ষেত্রেও এই ঝুঁকিগুলো সমান। কারণ পরোক্ষ ধূমপান বা অন্যের ধূমপানের ধোঁয়া অধূমপায়ীদের সমান শারীরিক ক্ষতি করে। আর নতুন তথ্য হচ্ছে, করোনা আক্রান্ত ধূমপায়ীদের নির্গত ধোঁয়াতে করোনা ভাইরাস থাকতে পারে। ধূমপায়ী যদি সংক্রমিত হন, তিনি যখন ধোঁয়া ছাড়েন, সেই ধোঁয়ায় ভর করে ভাইরাসও ছড়িয়ে পড়ে চতুর্দিকে। কারণ, পূর্ববর্তী গবেষণা বলছে, বিড়ি-সিগারেটের ধোঁয়ায় ক্ষতিকর ৭ হাজারের বেশি রাসায়নিক কণা থাকে, যার মধ্যে অনেক ক্ষুদ্র কণার আকার ০.২ – ০.৫ মাইক্রো মিটার। আর করোনা ভাইরাসের আকার ০.১ মাইক্রো মিটার। ফলে স্বাভাবিকভাবেই করোনা ভাইরাস ধূমপানের ধোঁয়ায় ভেসে বেড়াতে পারবে এবং এসময় অন্যের শরীরে প্রবেশ করে তাকেও আক্রান্ত করতে পারবে।
ধূমপায়ীর নির্গত অ্যারোসল বা বাতাসবাহিত লালার কণায় ভাইরাস বেঁচে থাকতে পারে প্রায় ঘণ্টা তিনেক। কাজেই বদ্ধ ঘরে কাছাকাছি বসে বা দাঁড়িয়ে ধূমপান করলে খুব দ্রুত অন্যের মধ্যে ভাইরাস ছড়িয়ে পড়তে পারে, যাকে বলে ক্লাস্টার ইনফেকশন। এই বিপদ ঠেকাতে বাংলাদেশের মতো ঘনবসতিপূর্ণ দেশে পরোক্ষ ধূমপান বন্ধ করার কোনো বিকল্প নেই। এজন্য তামাক নিয়ন্ত্রণ আইন অনুসরণ করে গণপরিবহন ও সব পাবলিক প্লেসে ধূমপান নিষিদ্ধ করতে হবে। যদিও বিদ্যমান আইনে কিছু ক্ষেত্রে গণপরিবহন ও পাবলিক প্লেসে ধূমপানের সুযোগ রাখা হয়েছে। যেমন: চার দেয়ালে আবদ্ধ নয় এমন রেস্তোরাঁ ও ট্রেন, লঞ্চের মতো পরিবহনে ধূমপানের জন্য নির্ধারিত স্থান রাখা হয়েছে এবং অযান্ত্রিক যানবাহনে ধূমপান নিষিদ্ধই করা হয়নি।
জনস্বাস্থ্য রক্ষায় আইনের এই সূমাবদ্ধতাগুলো দূর করা দরকার। এজন্য আইনটি যুগোপযোগী করে সংশোধন করে সবধরনের পাবলিক প্লেস ও গণপরিবহনে তামাক ব্যবহার নিষিদ্ধ করা জরুরি। তা করা হলে করোনার মতো অন্য যেকোনো সংক্রামক রোগ প্রতিরোধ করা সহজ হবে।

Close