নাগরিক মতামতশিরোনাম-২শিশু বার্তা

ঐতিহাসিক কিশোর বিদ্রোহের দুইবছর

নাদিম সিনা

“সাবধান! রাষ্ট্র মেরামতের কাজ চলছে, সাময়িক অসুবিধার জন্য দুঃখিত।” বাংলাদেশ নামক একটি রাষ্ট্র। যা অর্জন করতে পাড়ি দিতে হয়েছে বহু পথ। জন্মলগ্ন থেকে এ পর্যন্ত এ রাষ্ট্রে বহুবার জং ধরেছে। ভোঁতা হয়েছে রাষ্ট্রকাঠামো। জং ধরা রাষ্ট্রব্যবস্থাকে চকচকে করতে বহুবার রাজপথে নামতে হয়েছে এদেশের ছাত্রসমাজকে। যার সর্বশেষ সংযোজন ছিলো নিরাপদ সড়ক আন্দোলন বা ঐতিহাসিক কিশোর বিদ্রোহ। হ্যাঁ, ঐতিহাসিক বৈকি! কেননা এদেশ তো বটেই, দুনিয়ায় আর কোনো দেশেই সড়ক নিরাপদ করার তাগাদায় কিশোরদের রাজপথে নামতে হয়নি। চরম দুঃসময়ে থাকা ভোঁতা সমাজকে শাণ দিতে রাজপথে নামতে হয়েছিল স্কুল-কলেজ পড়ুয়া শিক্ষার্থীদের। সহপাঠীদের হারানোর বেদনায় তাঁরা বোধ করেছিলো বিকল রাষ্ট্রকে মেরামত করার তাগিদ।

ঘটনার সুত্রপাত ঘটে ২০১৮ সনের ২৯ জুলাই। ঢাকার শহীদ রমিজউদ্দীন ক্যান্টনমেন্ট কলেজের শিক্ষার্থীরা কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালের সামনে বিমানবন্দর সড়কে বাসের জন্য অপেক্ষা করছিলো। একটি বাস পেলে তাঁরা সেটাতে ওঠার চেষ্টা করে। ঠিক সেসময় জাবালে নূর পরিবহনের একটি বাস একে অপরকে টেক্কা দিয়ে দানবের গতিতে এগিয়ে আসে। যার একটি বাস ফুটপাতে অপেক্ষারত শিক্ষার্থীদের উপর উঠে যায়। এতে শহীদ রমিজউদ্দীন ক্যান্টনমেন্ট কলেজের দ্বাদশ শ্রেণির ছাত্র আবদুল করিম রাজিব এবং একাদশ শ্রেণির ছাত্রী দিয়া খানম নিহত হয়। এছাড়াও এই দূর্ঘটনায় আরও দশজন ছাত্র-ছাত্রী আহত হয়।

কয়েকঘন্টা পর গণমাধ্যমকে দেওয়া প্রতিক্রিয়ায় নৌপরিবহন মন্ত্রী ও বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশনের সভাপতি শাহজাহান খান হাসি মুখে বলেন, “ভারতের মহারাষ্ট্রে গাড়ি দুর্ঘটনায় ৩৩ জন মারা গেছেন। এখন আমরা এখানে এগুলোকে নিয়ে যেভাবে কথা বলি, এগুলো কি সেখানে বলে? ”

শাজাহান খানের এই বক্তব্য যেন শিক্ষার্থীদের মনে জলন্ত আগুনে ঘি ঢেলে দেয়। এরপরই ওঠে শাজাহান খানের ক্ষমাপ্রার্থনা ও পদত্যাগের দাবী। আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের প্ল্যাকার্ডে ভেসে ওঠে “স্বার্থক জনম মাগো জন্মেছি এদেশে, গাড়ি চাপায় মানুষ মরে মন্ত্রী সাহেব হাসে..” প্রভৃতি সব স্লোগান। পরদিন ৩০ ও ৩১ জুলাই শিক্ষার্থীরা নৌমন্ত্রীর পদত্যাগ সহ ৯দফা দাবিতে ঢাকার বিভিন্ন সড়ক অবরোধ করে। যার ফলে ঢাকা থেকে সড়ক ও রেলযোগাযোগ বন্ধ হয়ে শহর অনেকটা স্থবির হয়ে পরে। শিক্ষার্থীদের ৯দফার উপর আন্দোলন ক্রমেই সারাদেশে ছড়িয়ে পড়ে। সারাদেশের অসংখ্য স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীরা মানববন্ধন, সড়ক অবরোধের মাধ্যমে বিক্ষোভ করতে থাকে। ২রা আগস্ট সরকার চাপের মুখে পড়ে সব স্কুল-কলেজ বন্ধ ঘোষণা করা স্বত্তেও সেদিন ঢাকা, চট্টগ্রাম, বরিশাল, খুলনা, সিলেট, রাজশাহী সহ দেশের ৪২টি জেলায় শিক্ষার্থীরা রাজপথে নেমে আসে। “উই ওয়ান্ট জাস্টিস”, “আমার ভাই কবরে, খুনী কেন বাইরে?/ আমার বোন কবরে, খুনী কেন বাইরে?” প্রভৃতি স্লোগান দিয়ে তাঁরা রাজপথ মুখরিত করে তোলে।

সড়কে বিক্ষোভের পাশাপাশি ট্রাফিক ব্যবস্থার নিয়ন্ত্রণ নিতে থাকে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা। তাঁরা অভিজ্ঞ ট্রাফিক পুলিশের মত যানচলাচলে শৃঙ্খলা ফিরিয়া আনা, ওভারটেক সংস্কৃতির অবসান ঘটানো, লাইসেন্স ছাড়া গাড়ি চলাচল, লক্কর ঝক্কর ফিটনেস বিহীন গাড়ি চলাচলে বাধা প্রদান করতে সক্ষম হয়। সরকারি বেসরকারি সব ধরনের গাড়ির লাইসেন্স পরীক্ষা করা এবং লাইসেন্স বিহীন গাড়িকে মামলা দিতে বাধ্য করে শিক্ষার্থীরা। তাঁদের তীক্ষ্ণ নজর থেকে বাদ যায়নি সরকারি আমলা থেকে কামলা, সিআইপি থেকে ভিআইপি, এমপি থেকে মন্ত্রী, পুলিশ, দারোগা এমনকি আর্মিও।

আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীরা পথচারীদের নিয়ম মানাতে নিজেরাই সড়ক পরিষ্কার ও ভাঙাচোরা জায়গার সংস্কার করতে থাকে। শিক্ষার্থীরা দুরদর্শিতার সাথে পৃথক পৃথক লেনে গাড়ি চলাচল করাতে থাকে। প্রাইভেটকার, রিক্সার জন্য পৃথক লেন এবং বাংলাদেশে প্রথমবারের মত অ্যাম্বুলেন্স ও ফায়ার সার্ভিসের গাড়ির জন্যে ইমারজেন্সী লেন তৈরি করে। তাঁরা বৃদ্ধ ও রোগীদের মাথা কুর্নিশ করে রাস্তা দেখাতে থাকে।

কি সৃজনশীল সব স্লোগানে শিক্ষার্থীরা মিছিল করতে থাকে! তাঁদের স্লোগান ছিলো একাধারে ঝাঁঝালো, চিত্তাকর্ষক ও মনোমুগ্ধকর। তাঁদের প্ল্যাকার্ডে শোভা পাচ্ছিল “যদি তুমি ভয় পাও তবে তুমি শেষ, যদি তুমি রুখে দাঁড়াও তবে তুমি বাংলাদেশ” যা দেশপ্রেম শেখায় ও তাগিদ দেয় অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াবার। কিংবা “টনক তুমি নড়বে কবে” আবার, “হয়নি বলে আর হবেনা, আমরা বলি বাদ দে/ লক্ষ তরুণ চেঁচিয়ে বলে, পাপ সরাবো হাত দে।” প্রভৃতি স্লোগান শিক্ষার্থীদের প্রতিবাদী মানসিকতার পরিচায়ক। তাঁদের প্ল্যাকার্ডে শোভা পায়, “বাচ্চারা সব রাজপথে, বুড়োরা যায় টকশোতে/ আদালতে কাঁদছে আইন, গনতন্ত্র বাক্সতে।” যা বহুদিন ধরে বিচারহীনতার চাপা ক্ষোভ প্রকাশ করে।

৪ঠা আগস্ট সরকার আন্দোলনকারীদের ৯দফা দাবি মেনে নিয়েছে জানিয়ে তাঁদের ফিরে যেতে বলে। কিন্তু শিক্ষার্থীরা দাবি বাস্তবায়ন না হওয়া পর্যন্ত রাজপথ ছাড়বেনা বলে পরিষ্কার জানিয়ে দেয়। “উই ওয়ান্ট জাস্টিস”, “আশ্বাস মানি না, বাস্তবায়ন করতে হবে”, “বিচার শুধু মুখে শুনেছি, এখন বাস্তবে দেখতে চাই” সহ নানান স্লোগান দিতে থাকে শিক্ষার্থীরা।

একপর্যায়ে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের বোঝাতে প্রধানমন্ত্রী ছাত্রলীগকে দায়িত্ব দেন। ২রা আগস্ট থেকেই শিক্ষার্থীদের উপর হেলমেটবাহিনীর নৃশংস নির্যাতন চলতে থাকে। অন্যদিকে আন্দোলন চলাকালীন সময়ে পুরো সময় জুড়েই পুলিশ সাঁজোয়া যান, জলকামান দিয়ে শিক্ষার্থীদের ধাওয়া, লাঠিপেটা এবং কাঁদানেগ্যাস, রাবার বুলেট ও ফাঁকা গুলি চালাতে থাকে। শিক্ষার্থীরা তখন স্লোগান দিতে থাকে “শিক্ষকের বেতের বারি নিষিদ্ধ যেই দেশে/ পুলিশের হাতে কেন লাঠি সেই দেশে?” তাঁদের প্ল্যাকার্ডে ভেসে ওঠে “পারলে মাথায় গুলি কর, তাহলে মেধা মারা যাবে, কিন্তু বুকে গুলি করিস না, এখানে বঙ্গবন্ধু ঘুমায়, বন্ধু জেগে গেলে সব ধবংস হয়ে যাবে” প্রভৃতি স্লোগান।

আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের সমর্থন জানিয়ে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে সাক্ষাৎকার দেওয়ায় আলোকচিত্রী শহিদুল আলমকে ৫৭ধারার আইনে গ্রেফতার করে সাদা পোশাকধারী পুলিশ।

সমকালীন সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম মুক্ত গণমাধ্যমের ভুমিকা পালন করছিলো। আন্দোলন চলাকালীন সময়ে ৪ঠা আগস্ট ২৪ ঘন্টার জন্য সরকার মোবাইল একসেস বন্ধ রাখে। আবার ৫ আগস্টও ৩জি, ৪জি নেটওয়ার্ক সাময়িক বন্ধ রাখে। ৬ আগস্ট মন্ত্রিসভায় নতুন ট্রাফিক আইনের খসড়া অনুমোদন করা হয়। যেটাতে মোটরযান দ্বারা ইচ্ছাকৃতভাবে মানুষ হত্যা করলে মৃত্যুদণ্ড ও বেপরোয়া ভাবে চালিয়ে হত্যা করলে ৫ বছর কারাদণ্ডের বিধান করা হয়। পরে ১৯ সেপ্টেম্বর আইনটি সংসদে পাস হয়।

ক্রমশই শিক্ষার্থীরা জনগণের সমর্থন লাভ করতে থাকে। অনেক অভিভাবক শিক্ষার্থীদের সাথে আন্দোলনে যোগ দেন। অনেক মা আন্দোলন চলাকালীন সময়ে তাঁদেরকে নিজের সন্তানের মতো খাবার খাইয়ে দিয়েছে। মায়েরা বলেছে “সময়মত না খেলে আন্দোলন করবা কিভাবে?” ক্ষমতাসীন দল ছাড়া অন্যান্য রাজনৈতিক দল গুলো নিরাপদ সড়ক আন্দোলনকে সমর্থন জানায়।

ইতিপূর্বে এদেশ বহু আন্দোলন হয়েছে। বাংলাদেশের সৃষ্টিইতো হয়েছিল এক মহান আন্দোলনের মাধ্যমে। এসব কথা শিক্ষার্থীরা প্রতিনিয়তই শুনে আসছিলো। সাম্প্রতিক সময়ে তাঁরা ‘কোটা সংস্কার’ আন্দোলনের মতো ঘটনার সাক্ষী ছিলো। যার ফলে নিজেদের সহপাঠী হারানো ও বহুকাল ধরে চলে আসা জং ধরা সড়ক ব্যবস্থাকে তাঁরা আর মেনে নিতে পারেনি। স্কুল-কলেজ পড়ুয়া ছেলে-মেয়েরা নিত্যদিনই বাসে চলাচলের মাধ্যমে সকল অনিয়মই প্রত্যক্ষ করে আসছিল। কাজেই নিরাপদ সড়ক আন্দোলনের মাধ্যমে তাঁরা বড়দের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিতে সক্ষম হয়েছিলো সড়ক ব্যবস্থার নৈরাজ্য। কিশোর বিদ্রোহ বড়দের নতুন পথে হাঁটতে শিখিয়েছিল। তাইতো এ রাষ্ট্র যতবার ভোঁতা হবে, নষ্ট হবে, ততবারই কিশোররা নামবে “রাষ্ট্র মেরামতের কাজে”।
লেখক: স্টাফ রিপোর্টার, বরেন্দ্র বার্তা

Close