নাগরিক মতামতশিরোনাম-২সাহিত্য ও সংস্কৃতি

গোপাল ভাঁড়ের খোঁজে

অর্ণব পাল সন্তু

 

ইদানিং গোপাল ভাঁড়কে নিয়ে নূতন ‘ঐতিহাসিক’ তথ্য ফেসবুকে ঘুরে বেড়াচ্ছে। যার কোন তথ্যসুত্র খুঁজে পাওয়া যায়নি।
নদীয়ার রাজা কৃষ্ণচন্দ্র (১৭১০-৮৩) ১৭৫৭-তে পলাশীর প্রেক্ষাপটে ইংরেজদের সঙ্গে হাত মিলিয়ে নবাব সিরাজউদ্দৌলাকে উৎখাতের দায়ে ইতিহাসে ‘বেইমান’ হিসেবে চিহ্নিত। গল্পগাছার শুরুটা কৃষ্ণচন্দ্রর রাজদরবার থেকেই। গোপাল নাকি তার বিদুষক ছিলেন।
মীর জাফর, ঘষেটি বেগম, জগৎ শেঠ, রায় দূর্লভ, উমিচাঁদরা নবাবকে সিংহাসনচ্যূত করার অপচেষ্টায় লিপ্ত। তারা প্রত্যেকেই তাদের হীনস্বার্থ হাসিলের উদ্দেশ্যে শর্তসাপেক্ষে ইংরেজ বণিকদের সাথে চুক্তিবদ্ধ হয়। ঠিক এই সময় কৃষ্ণনগরের রাজা কৃষ্ণচন্দ্র নবাব বিরোধী এই ভয়ঙ্কর বলয়ে যোগদান করেন। কৃষ্ণচন্দ্রের সকল সভাসদ তার যোগদানকে সমর্থন করলেও শুধু একজন ব্যক্তি সমর্থন করলেন না। আর সেই ব্যক্তিটি হল গোপাল ভাঁড়।
গোপাল কৃষ্ণচন্দ্রকে বোঝাতে লাগলেন। নিজ দেশের নবাবের বিরুদ্ধে গিয়ে ইংরেজদের সাহায্য করতে মানা করলেন। তিনি বললেন,”ইংরেজরা গায়ে সুচ হয়ে ঢুকে কুড়াল হয়ে বের হবে। তাদের স্বাঃর্থ-বিরোধী কাজ করলে আপনার সকল উপকারের কথা ভুলে আপনাকে শূলে চড়াতে পিছপা হবেনা।” সর্বোপরি, গোপাল বাংলা মায়ের এমন সর্বনাশ না করতে কৃষ্ণচন্দ্রকে বার বার অনুরোধ করলেন।
কিন্তু কৃষ্ণচন্দ্র তার কথায় কর্ণপাত করলেন না বরং তার সভাসদদের নিয়ে গোপালকে বিদ্রুপ করতে লাগলেন। কৃষ্ণচন্দ্র গোপালকে শর্ত দিলেন,”গোপাল, যদি তুমি নবাবকে মুখ ভেংচি দিয়ে আসতে পারো তবে আমি এমন সিদ্ধান্ত থেকে বিরত থাকবো।”
গোপাল কৃষ্ণচন্দ্রের রাজদরবার থেকে বিদায় নিয়ে ছুটলেন মুর্শিদাবাদের দিকে। কিন্তু নবাবের হীরাঝিল প্রাসাদ(বর্তমানে নদীগর্ভে বিলীন) রক্ষিরা কিছুতেই ভিতরে প্রবেশ করতে দিচ্ছিলেন না। উপায় খুঁজে না পেয়ে গোপাল এক রক্ষির হাতে কামড় বসিয়ে দিলেন। ফলশ্রুতিতে, প্রাসাদ-রক্ষি গোপালকে ধরে নিয়ে নবাবের কাছে গেলেন। সব শুনে নবাব বললেন,”কে তুমি? কোথায় থেকে এসেছো? আমাকে কি প্রয়োজন?”।
গোপাল কোনো কথা না বলে নবাবকে মুখ ভেংচি দিলেন।
নবাব ভাবলেন, কি ব্যাপার??
গোপাল আবারও ভেংচি দিলেন।
নবাব গোপালকে আটক করলেন। বললেন, আগামীকাল তোমার বিচার হবে।
এরই মধ্যে গোপাল মীরজাফরকে বললেন, “আমি এসেছিলাম তোমাদের সকল ষড়যন্ত্র ফাঁস করে দিতে। কিন্তু আমি কিছু বলবোনা। কারণ এই ষড়যন্ত্রের কথা ফাঁস করে দিলে কৃষ্ণচন্দ্রও ফেঁসে যাবে। নবাব তাকে সরিয়ে অন্যজনকে ক্ষমতায় বসাবেন। আমি চাইনা কৃষ্ণচন্দ্র তার ক্ষমতা হারাক। কারণ তিনি যে আমার অন্নদাতা, পরমান্নদাতা”।
মীরজাফর তার এমন কথা শুনে রীতিমত ঘাবড়ে গেল। সে নবাবকে জানালো যে গোপাল তাকে শয়তান বলে গালি দিয়েছে। যত দ্রুত সম্ভব তার ফাঁসির ব্যবস্থা করা হোক।
পরদিন সকালে গোপালের ফাঁসির ব্যবস্থা করা হল। কিন্তু গোপালের মাঝে কোনও পরিবর্তন দেখা গেল না। নবাব গোপালের মুখের দিকে তাকাতেই গোপাল আবার ভেংচি দিলো। এবার নবাব রীতিমত ভাবনায় পরে গেল। নবাব ভাবলেন,’ এত দেখছি বড্ড পাগল। পাগলকে ফাঁসি দেওয়া ঠিক হবেনা।’ নবাব কবিরাজকে ডেকে বললেন,”দেখুন তো, এ পাগল কিনা?”।
কবিরাজ রায় দিল, এ এক উন্মাদ।
নবাব গোপালকে মুক্ত করে দিলেন।
দেশপ্রেমিক গোপাল ফিরে এলেন কৃষ্ণ নগরে। যখন জানতে পারলেন কৃষ্ণচন্দ্র তার সিদ্ধান্তে অটল গোপাল ঠিক করলেন কৃষ্ণচন্দ্রের সভায় আর যাবেন না। গোপাল এও ঠিক করলেন যে তিনি এই কৃষ্ণনগরে আর থাকবেন না। অত্যন্ত ব্যথিত মন নিয়ে কাউকে কিছু না বলে রাতের অন্ধকারে সপরিবারে রাজ্য ত্যাগ করলেন গোপাল ভাঁড়।এরপর থেকে সদাহাস্যময় গোপাল ভাঁড়কে বাংলায় আর দেখা মেলেনি।

গোপাল ভাড় নেই
কেউ বলেছেন, রক্তমাংসের মানুষ হিসেবে বাস্তবেই ছিলেন তিনি। কারও কারও কথা, গোপাল ভাঁড় নামে একক কোনো ব্যক্তির অস্তিত্ব খোঁজা বৃথা। কারণ, ইতিহাস তেমন সাক্ষ্য দেয় না।

এই কৃষ্ণচন্দ্রের সভার অনেক রত্নের এক রত্ন ছিলেন গোপাল ভাঁড়—এমন বক্তব্য পণ্ডিতদের। এ বিষয়ে তাঁরা স্থির সিদ্ধান্তে না এলেও এই মতের পক্ষেই রয়েছে অধিকাংশের সায়। যেমন বঙ্গসাহিত্যে হাস্যরসের ধারা বইয়ে অজিতকুমার ঘোষ লিখেছেন, ‘গোপাল রসিক-চূড়ামণি মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্র রায়ের রাজসভার ভাঁড় ছিলেন।’
তাহলে কৃষ্ণচন্দ্র ও গোপাল ভাঁড়ের সময় থেকে আমাদের এই সময়ের দূরত্ব ১৭০০ থেকে ২০০০—৩০০ বছরের। কিন্তু মাত্র ৩০০ বছরের আগেকার মানুষ গোপাল ভাঁড়কে নিয়ে এত ধোঁয়াশা থাকবে কেন, যেখানে তাঁর সমসাময়িক কৃষ্ণচন্দ্র, ভারতচন্দ্র সম্পর্কে সুনির্দিষ্ট তথ্যের অভাব নেই? এর কারণ, একেক মুনির একেক মত।
সুকুমার সেন, পরিমল গোস্বামী, অতুল সুর কি অজিতকৃষ্ণ বসু প্রমুখ পণ্ডিত গোপাল ভাঁড়ের বিভিন্ন প্রসঙ্গে যখন দ্বিধাবিভক্ত, তখন ১৯২৬-এ (১৩৩৩ বঙ্গাব্দ) বঙ্গভূমিতে মৃদু কম্পন জাগাল নবদ্বীপ কাহিনী বা মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্র ও গোপাল ভাঁড় নামের একটি পুস্তক। লেখক শ্রীনগেন্দ্রনাথ দাস। তিনি নিজেকে গোপাল ভাঁড়ের বংশধর দাবি করলেন। শুধু কি দাবি? তাঁর বক্তব্যে প্রথমবারের মতো সুনির্দিষ্ট একজন ব্যক্তি হিসেবে উপস্থিত হলেন গোপাল ভাঁড়। আগে কেউ কেউ গোপালের অস্তিত্ব স্বীকার করলেও তাঁর বংশের ঠিকুজি মেলে ধরতে পারেননি। নগেন্দ্রনাথের মতে, গোপালের প্রকৃত নাম গোপাল চন্দ্র নাই। তিনি ছিলেন রাজা কৃষ্ণচন্দ্রের রাজ অন্তঃপুরের ভান্ডারের তত্ত্বাবধায়ক। তাই গোপাল চন্দ্র নাই থেকে তাঁর পদবি হয়ে গেল ভান্ডারি। ভান্ডারি থেকে আরও পরে ভাঁড়। তাঁর বাবার নাম দুলাল চন্দ্র নাই। প্রপিতা আনন্দরাম নাই। জাতিতে তাঁরা নাপিত। তবে দুলাল চন্দ্র ছিলেন নবাব আলিবর্দী খাঁর শল্যচিকিৎসক বা বৈদ্য। ‘তৎকালে অস্ত্র-চিকিৎসা নাপিত জাতির অধিকৃত ছিল’ মন্তব্য করে নগেন্দ্রনাথ দাস নবদ্বীপ কাহিনীতে তথ্য দিয়েছেন, গোপালরা ছিলেন দুই ভাই। বড় ভাই কল্যাণ আর ছোট ভাই গোপাল। তাঁর জন্ম অষ্টাদশ শতকের মাঝামাঝি, মুর্শিদাবাদে। নগেন্দ্রনাথ আরও লিখেছেন, ‘মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্র রায় গোপালের গুণে মুগ্ধ হইয়া তাঁহাকে গোয়াড়ী কৃষ্ণনগরে লইয়া যান। গোপাল অতি সুপুরুষ ও বাল্যকাল হইতে সুচতুর ও হাস্যোদ্দীপক বাক্যাবলী প্রয়োগে বিশেষ পটু ছিলেন। মহারাজ বিক্রমাদিত্যের ন্যায় মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্রের একটি পঞ্চরত্নের সভা ছিল। মহারাজ কৃষ্ণ গোপালের প্রত্যুৎপন্নমতি ও বাকপটুতা দেখিয়া তাঁহাকে স্বীয় সভায় অন্যতম সদস্য পদে নিযুক্ত করেন।…গোপালের একটি পুত্র ও রাধারাণী নামে একটি কন্যা ছিল। রাধারাণীর দুই পুত্র রমেশ ও উমেশ। বহুদিন হলো সে বংশ লোপ পাইয়াছে।’
এসব বলে শেষে নরেন্দ্রনাথের ভাষ্য এমন: গোপালের বংশ লোপ পেলেও তিনি তাঁর ভাই কল্যাণের নবম অধস্তন পুরুষ।
গোপাল সম্বন্ধে এটুকু জানার মধ্য দিয়ে সব মিটমাট হয়ে গেলে এবং নরেন্দ্রনাথ মহাশয়কে এককথায় গোপালের বংশধর মেনে নিলে কথা ছিল না। কিন্তু খটকা পিছু ছাড়ল না পণ্ডিতদের। তাঁরা বললেন, কৃষ্ণচন্দ্র তাঁর সভাসদ কবি ভারতচন্দ্র ও সংগীতজ্ঞ রামপ্রসাদ দুজনকেই জমি দান করেছিলেন। গোপাল যদি কৃষ্ণচন্দ্রের প্রিয়পাত্র ও ওই আমলের লোক হবেন, তবে নদীয়া বা কৃষ্ণনগরে তাঁর কোনো ভূসম্পদ থাকার প্রমাণ নেই কেন? এমনকি কৃষ্ণনগর রাজবাড়ির মহাফেজখানায় গোপালের অস্তিত্ব বিষয়ে কোনো দালিলিক প্রমাণাদি নেই। তাঁর কোনো ছবিও নেই।
গোপালের অস্তিত্ব নিয়ে যাঁদের খটকা বেশি, তাঁরা আরও বেশি মাত্রায় যুক্তি খুঁজে পেয়েছেন ভারতচন্দ্রের কাছ থেকে। মধ্যযুগের বিশিষ্ট এই কবি অন্নদামঙ্গল কাব্যে রাজা কৃষ্ণচন্দ্র ও তাঁর সভাসদদের অনেকের সম্পর্কে লিখলেও লক্ষণীয়ভাবে এতে গোপাল ভাঁড় বিষয়ে টুঁ শব্দটিও নেই। গোপাল যদি তাঁর সমসাময়িক এবং একই সভার সদস্য হতেন, তবে ভারতচন্দ্রের লেখায় তাঁকে পাওয়া যেতই—এই তাঁদের ফয়সালা।
খটকা আরও আছে। গোপালের অনেক গল্পে তাঁর মা ও স্ত্রীর প্রসঙ্গ আছে। কিন্তু গোপালের মা আর বউ সম্পর্কে ইতিহাস বিস্ময়করভাবে নীরব। তাঁরা বেঁচে আছেন কেবল গল্পেই।
ফলে নগেন্দ্রনাথ দাসের লেখা নবদ্বীপ কাহিনী কিতাবটিকে গোপালের একক ব্যক্তি অস্তিত্বে সন্দিহান পণ্ডিতেরা এক ফুৎকারে উড়িয়ে দিতে চেয়েছেন। উপরন্তু প্রশ্ন তুলেছেন, গোপালের উত্তরাধিকারী বিষয়ে লেখকের দাবি নিয়েও: গোপালের বড় ভাই কল্যাণের বংশ-পদবি ‘নাই’ হলে তাঁর পরবর্তী প্রজন্ম নগেন্দ্রনাথের পদবি ‘দাস’ কেন?
এ সম্পর্কে নগেন্দ্রনাথ নিরুত্তর। তবে তাঁর বর্তমান প্রজন্ম—যাঁরা এখন বাস করছেন কলকাতার সুকিয়া স্ট্রিটের রাধাপ্রসাদ লেনে—তাঁদের বক্তব্য, ‘নরেন্দ্রনাথ নিজেই তাঁর পারিবারিক পদবি পরিবর্তন করেছিলেন।’
বছর চারেক আগে (২০১৪) গোপাল ভাঁড়ের সন্ধানে নামে সুজিত রায় প্রায় ৩০০ পৃষ্ঠার একটি বই লিখেছেন। নগেন্দ্রনাথ দাসের বর্তমান বংশধরদের বক্তব্য ওই বই থেকে উদ্ধৃত। গোপাল ভাঁড় প্রসঙ্গে বইটিতে সুজিতের অনুসন্ধান বিস্তর। বিভিন্নজনের বিচিত্র লেখাপত্রের সঙ্গে ইতিহাসকে মিলিয়ে তিনি গোটা পুস্তকে খুঁজেছেন হাস্যরসিক গোপাল ভাঁড়ের বাস্তব অস্তিত্ব। বলা ভালো, নানা রকম প্রশ্ন ও যুক্তি খণ্ডন করে গোপালকে নির্দিষ্ট ব্যক্তি হিসেবে উপস্থিত করার দিকেই তাঁর বেশি ঝোঁক। এ ক্ষেত্রে ওপরে লিপিবদ্ধ খটকাগুলোর জবাবও দিয়েছেন তিনি।
গোপালের ভূসম্পত্তির সন্ধান না পাওয়া বিষয়ে তাঁর সিদ্ধান্ত, ‘গোপাল সম্ভবত হাত পাততে জানতেন না। হয়তো সে কারণেই গোপাল মহারাজার দাক্ষিণ্য বঞ্চিত হয়েছেন।’ তা ছাড়া বলার মতো একটি তথ্য আছে বইয়ে: রমেশ-উমেশের মৃত্যুর মাধ্যমে যেহেতু ‘গোপালের প্রত্যক্ষ বংশধারা লুপ্ত হয়ে যায়। সুতরাং জমিজায়গার নথিপত্র তারপর কি হয়েছে কে বলতে পারে!’ একইভাবে ভারতচন্দ্রের লেখায় গোপালের উল্লেখ না থাকা নিয়ে তাঁর পাল্টা যুক্তি, ঈর্ষা আর ‘আত্মপ্রচারের বাগাড়ম্বরে তিনি (ভারতচন্দ্র) গোপাল ভাঁড়ের মতো বিরল প্রতিভাকে নিঃশব্দে বর্জন করেছেন।’
গোপাল ভাঁড়ের সন্ধান করতে গিয়ে সুজিত রায়ের কিছু কথায় যুক্তির জোর আছে সন্দেহ নেই; তবে গায়ের জোরও যে আছে!
শুধু তথ্যের পর তথ্য। কিন্তু মজার ব্যাপার হলো, গোপালের বিয়ে ও মৃত্যু নিয়ে ইতিহাস ভীষণ চুপচাপ। তো, বহুচর্চিত এই রসিক সম্বন্ধে ইতিহাসের অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম কী বলেছেন, এবার টুকে নেওয়া যাক সেটুকু, ‘কৃষ্ণচন্দ্র রায়ের দেহরক্ষক হিসেবে শঙ্কর তরঙ্গ নামে এক ব্যক্তির উল্লেখ পাওয়া যায়।…হয়তো তিনিই পরবর্তীকালে গোপাল ভাঁড় হিসেবে কল্পিত হয়েছেন।’ (বাংলাপিডিয়া)।
ধন্দের পর ধন্দ। মুশকিল আসানের কোনো বার্তা নেই।

গোপাল ভাঁড় আছেন

বাস্তব চরিত্রের শর্ত পূরণের ক্ষেত্রে গোপাল ভাঁড়ের আকারে-গড়নে বেশ খানিকটা খামতি হয়তো আছে, সে ক্ষেত্রে তিনি সামষ্টিক মানুষের কল্পিত কোনো অবয়ব, না বাস্তব একটি চরিত্র—এ বিতর্ক অনিঃশেষ। গোপাল ভাঁড় কোনো বই লেখেননি। তাঁর প্রতিটি গল্পই মানুষের মুখে মুখে ঘুরে জনপ্রিয় হয়েছে। তাই মৌখিক সাহিত্য যে প্রক্রিয়ায় বাহিত হয়—কোনো ব্যক্তি যখন চমকপ্রদ কোনো গল্প শোনেন, তাঁর মধ্যে সেই গল্পটি পুনরায় বলার ইচ্ছা তৈরি হয় এবং পুনঃকথনকালে তাঁর অজান্তেই গল্পটি কিছুটা বদলে যায়—এভাবেই কি গোপাল জনমানসে পৌঁছেছেন? অলোক কুমার চক্রবর্তী তো বলেছেনই, ‘নদীয়ার হাস্যরসিক মানুষই কাল্পনিক হাস্যরসিক গোপাল ভাঁড়ের সৃষ্টিকর্তা। হয়তো গোপাল ভাঁড়—এই ছদ্মনামের অন্তরালে তাঁরা তাঁদের হাস্যরস প্রকাশ করেছেন।’ (‘গোপাল ভাঁড়: কল্পনা বনাম বাস্তব’, দৈনিক বসুমতী, ১৯৮২) এই কথায় অতঃপর শান্তি আসে, ধড়ে পানি আসে। শেষ পর্যন্ত তাহলে গোপাল ভাঁড় আছেন। রয়েছেন নিম্নবর্গের বাঙালির প্রতিনিধি হয়ে, তাঁদের হাস্যরসে, দুঃখেও। এই বাংলার সামন্ততান্ত্রিক সমাজে একদা যখন ছিল নগরসভ্যতার উন্মেষকাল, তিনি ছিলেন সেই সমাজের রাজনৈতিক চেতনা। বিবেক। আর গোপালের রাজনৈতিক চেতনা পরিস্ফুটিত হয়েছিল ভাঁড়ামির ছদ্মবেশে। কিন্তু বিবেক গোপাল কি শুধুই ভাঁড়?

তাঁরই একটি গল্পের ভেতরে লুকিয়ে আছে প্রশ্নটির উত্তর।

কৃষ্ণচন্দ্র গোপালকে একবার বললেন, ‘আমি সত্য-মিথ্যার মধ্যে দূরত্ব অনুমান করতে পারছি না। এ ব্যাপারে তুমি আমাকে একটু সাহায্য করলে ভালো হয়।’

গোপাল বললেন, ‘এ আর এমন কী কঠিন সমস্যা, মহারাজ! চোখ আর কানের মধ্যে যতটা দূরত্ব, সত্য ও মিথ্যার মধ্যেও ততটা।’

গোপালের কথার মাজেজা বুঝলেন না কৃষ্ণচন্দ্র। বললেন, ‘বুঝিয়ে বলো। আমি তোমার কথার অর্থ বুঝতে পারলাম না।’

এবার গোপাল বললেন, ‘মহারাজ, যা শুনবেন, তা যদি চাক্ষুষ প্রমাণ করতে পারেন, তবে তা-ই হলো সত্যি। আর কানে শুনলেন, চোখে দেখলেন না, এটা কখনো সত্যি নয়। সে জন্যই সত্য-মিথ্যার সঙ্গে চোখ-কানের সম্পর্ক খুবই গভীর এবং চোখ-কানের মধ্যে দূরত্ব যতটা, সত্য-মিথ্যারও দূরত্ব ততটা।’

এরপর ভাঁড়ামি অর্থে গোপালকে শুধু ‘ভাঁড়’ বলে পার পেয়ে যাওয়া নিশ্চয়ই অপরাধ হবে!

সুত্র: গোপাল ভাঁড় কে ছিলেন ,প্রথম আলো , ১৩ এপ্রিল ২০১৮

Close