নাগরিক মতামতশিরোনাম-২সাহিত্য ও সংস্কৃতি

ঢাকার জন্মাষ্টমীর মিছিল

অর্ণব পাল সন্তু

খিষ্টের জন্মের আগেই ঢাকার অদূরে, উয়ারী বটেশ্বর, সাভার (সর্বেশ্বর), বিক্রমপুর ছিল প্রাচীন সমৃদ্ধ নগর। পরবর্তীতে সোণারগাঁও, আর ঢাকার মূল ভূখন্ডে বাংলার রাজধানী হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে মুঘল আমলে। পরবর্তীতে পরিত্যাক্ত হয়, এভাবে বারবার উত্থান পতনের মধ্য দিয়ে ঢাকা কখনো কখনো জেগে উঠেছে প্রবল বেগে কখনো হারিয়ে গেছে ।
কল্পনা করুন দেড়শো-দু‘শো বছর আগে পরিত্যাক্ত রাজধানী ঢাকা ছিল নিতান্তই অস্বাস্থ্যকর, অসুন্দর নোংরা শহর। তবুও প্রতিবছর বিশেষ বিশেষ সময়ের উৎসবে বদলে যেত ঢাকা শহরের চেহারা। এর মুলে ছিল জন্মাষ্টমী,মহররম,ঈদের মিছিলের উৎসব।
অনেককাল আগে থেকেই পুরান ঢাকাবাসী শোভাযাত্রা প্রিয়। জন্মাষ্টমী,মহহরমের মিছিল ছিল বিখ্যাত। এ গুলো ধর্মীয় উৎসব হলেও ধর্মবর্ণ নির্বিশেষে সবার অংশগ্রহনে ঢাকার পরিচিতির ভিন্ন মাত্রা যোগ করেছিল। পরবর্তীতে যুক্ত হয় ঈদের মিছিল। তবে ঈদের মিছিল ধর্মীয় গন্ডি ছাড়তে পারেনি। কালক্রমে এসব ঐতিহ্য বিলীন হয়ে যায়। গত শতকের নব্বইয়ের দশকে জন্মাষ্টমী , আরও পরে ঈদের মিছিল পুনরায় চালু করে সেই ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করা হয়। কিন্তু ঢাকার সেই পুরোনো আমেজ, জৌলুস আর ফেরেনি, তবে দেশব্যাপী ছড়িয়েছে। নব্বয়ের স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনে বাংলা নববর্ষ বরণকে কেন্দ্র করে মঙ্গল শোভাযাত্রার প্রচলন শুরু হয়। ধর্মীয় উৎসবের বাইরে সার্বজনীন উৎসব হিসেবে এটিই এখন সবচেয়ে বড়, জাঁকজমকপূর্ন এবং দেশব্যাপী প্রভাব বিস্তার করে। সবকিছু ফেরানোর চেষ্টা করা হলেও ফেরেনি মহররমের মিছিল।
উপমহাদেশের সব অঞ্চলেই কোন না কোন ভাবে জন্মাষ্টমী উদযাপিত হত ধর্মীয় ভাবে। দলিল দস্তাবেজে বাংলাদেশে জন্মাষ্টমী কিভাবে পালিত হত সে সম্পর্কে তেমন কোন হদিস না পাওয়া গেলেও অনেকেই উল্লেখ করেছেন শুধু জন্মাষ্টমীর মিছিলের কথা। সুতরাং এটা ধরে নেয়া যায় উপমহাদেশের বিভিন্ন জায়গায় জন্মাষ্টমী অন্যান্য ধর্মীয় তিথির মত সাধারণভাবে পালিত হলেও ঢাকায় জন্মাষ্টমীর মুল আকর্ষন ছিল ‘মিছিল’।
জন্মাষ্টমীর সময়ে ঢাকায় যে মিছিল বের হত তা বিখ্যাত ছিল সারা বাংলা তথা উপমহাদেশজুড়ে। শুধু শোভাযাত্রা দেখতেই নাকি উপমহাদেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে দর্শনার্থীরা আসত ঢাকায়।
ঢাকার আদি হিন্দুরা ছিল মুলত শাঁখারি আর বসাকরা। তার মুলত বৈষ্ণব । আর বৈষ্ণব হবার কারনেই বৈষ্ণব উৎসব জন্মাষ্টমীর পৃষ্ঠপোষক ছিলেন।
কবে ,কখন, কত প্রাচীন এ মিছিল সে সম্পর্কে তেমন কিছু জানা যায় না, ঢাকার ইতিহাস প্রণেতা যতীন্দ্রমোহন ও ১৯১৭ সালে ঢাকা থেকে প্রকাশিত শ্রীভূবনমোহন বসাকের একটি পুস্তিকায় এর উদ্ভব সম্পর্কে বলেছেন , পুরান ঢাকার বংশালে এক সাধু ছিলেন। ১৫৫৫ সালে রাধাষ্টমী উপলক্ষে তিনি তার বালক ভক্তদের নিয়ে মিছিল বের করেছিলেন। পরবর্তীতে ১৫৬৫ সালে সেই সাধু ও বালকদের উৎসাহে জন্মাষ্টমী উপলক্ষে ব্যপক জাঁকজমকের সাথে মিছিল বের করেছিলেন। পরবর্তীতে নবাবপুরের ধনাঢ্য ব্যবসায়ী কৃষ্ণদাস বসাক পরিবারের হাতে এই মিছিলের কর্তৃত্ব ভার অর্পিত করা হয়েছিল, সেই থেকে শুরু। কালক্রমে সেই মিছিল সাংগাঠনিক রূপ লাভ করে । এবং প্রতিবছর জন্মাষ্টমীর উৎসবের নিয়মিত রেওয়াজ হয়ে দাড়ায় । উল্লেখ্য মুসলমানরা এ মিছিলের নাম করন করেছিরেন ‘বারো গোপালের মিছিল’ নামে।
যতীন্দ্রমোহন জানাচ্ছেন, পরবর্তীতে বসাক পরিবারের দেখাদেখি নবাবপুরের অনেক ধনাঢ্য ব্যাক্তি নিজ নিজ মিছিল বের করা শুরু করে। কালক্রমে নবাবপুরের বিভিন্ন মিছিলগুলি সমন্বিত করে একটি বিরাট মিছিলের রূপ দেয়া হয়। যা পরিচিত হয়ে উঠেছিল নবাবপুরের মিছিল নামে।
উনিশ শতকের মধ্যেই এ মিছিলের খ্যাতি দুরদুরান্তে ছড়িয়ে পড়েছিল।
জন্মাষ্টমীর মিছিল ঠিক কবে লুপ্ত হয়েছিল ,নির্দিষ্টভাবে সে সময়টাও অজানা। সম্ভবত গত শতাব্দির তৃতীয় দশক থেকে এটি লুপ্ত হয়ে যায় যায়। কারান ততদিনে গ্রাস করতে বসেছে ‘সাম্রদায়িকতা’। হামলা, পৃষ্ঠপোষকদের দেশত্যাগ এর অন্যতম মুল কারন।
পরবর্তীতে ১৯৮৯ সালে আবার জন্মাষ্টমীর মিছিল চালু করা হয় কিন্তু নেই সেই পুরোনো জৌলুষ।
স্বাভাবিকভাবেই কোন উৎসব সার্বজনীনতা পেলেই তার ধর্মীয় রূপটি ক্ষীন হয়ে যায়। মহররম, জন্মাষ্টমীর মিছিল পরিণত হয়েছিল সার্বজনীন উৎসবে। স্বীকৃতি পেয়েছিল পুরান ঢাকার ঐতিহ্য হিসেবে। এসব উৎসবে হিন্দু-মুসলিম নির্বিশেষে পরস্পরকে সহযোগিতাও করতেন।
এ সম্পর্কে একটি ঘটনার কথা বলি, ঢাকার জন্মাষ্টমীর মিছিলে ব্যবহার করা হত হাতি।
ব্রিটিশ যুগে এই হাতি ধার দিত সরকারের খেদা বিভাগ। পিলখানা ছিল হাতিদের আবাস।
সময়টা ১৮৯৬ সাল,
জন্মাষ্টমীর মিছিলে রাখা হত হাতি। হাতি সড়ক (এলিফেন্ট রোড),হাতির ঝিল,পিলখানা এখন রূপকথার মত মনে হতে পারে…
কিন্তু শত বছর আগে পিলখানায় ছিল হাতিশালা,হাতির ঝিল, আর এলিফেন্ট রোড ছিল হাতিদের জন্য স্পেশাল রাস্তা…
কিন্তু ১৮৯৬ সালে পিলখানার সামরিক সচিবের কড়া নির্দেশ নেটিভদের উৎসবে হাতি দেয়া হবে না।
হাতে সময় বেশি নেই, মিছিলের নেতাদের মাথায় হাত। উপায় এক্টাই।
ঢাকার নবাব আহসানুল্লাহ।
কি হাতি দেবে না? ইংরেজদের দোসর হয়েও নবাব রেগে উঠলেন….. হাতি থাক্তেই হবে।
নিজেই ছুটলেন হাতি আনতে। কিন্তু বাংলার গর্ভনর তখন শৈল নিবাসে।
নবাব কিচ্ছু শুনতে চাইলেন না, তার হাতি চাই।
শেষ পর্যন্ত খেদা বিভাগ হাতি দিতে বাধ্য হলো, সরকারকে পরে ব্যাখা দেয়া যাবে।
হ্যা শেষ পর্যন্ত হাতি নিয়েই মিছিল বের হলো। নবাবের দৌত্যে।

 

*তথ্যসুত্র: ঢাকা সমগ্র ১,২-মুনতাসীর মামুন, ছবি বাংলাদেশের দুস্প্রাপ্য ছবি সমগ্র
Close