নাগরিক মতামতমহানগরশিরোনাম-২

ফেরদৌস জামিল টুটুল : তুমি চলে গেছ ফেলে গেছ স্মৃতির পাহাড়

রাগিব আহসান মুন্না

 

 

দীর্ঘ থেকে দীর্ঘ হচ্ছে মৃত্যুর তালিকা। প্রতিদিনই সহনাগরিকের মৃত্যুর ভীড়ে দেখি পরিচিত মুখ। স্বজনের নিথর শরীর ভেসে ওঠে কল্পনায়। আমি শ্বাস নিতে পারি না। আমি রুদ্ধ, বিহ্বল। বারবার মনে পড়ে সহযোদ্ধার মুখ। মনে পড়ে হাতে হাত রেখে মিছিলে হাঁটার মুহুর্তগুলো। মনে পড়ে গল্প গান আড্ডায় মেতে ওঠা সেইসব সুখকর স্মৃতি। তারুণ্যের উত্তাল প্রাণচঞ্চল দিনগুলো। মনে পড়ে লালিত স্বপ্ন আর সংগ্রামে এক অলিন্দ ভালোবাসা যারা ভাগাভাগি করেছিলাম, সেসব বন্ধুদের। মহামারীতে প্রতিটি মৃত্যুই এক একটা শোক, এক একটা হত্যাকাণ্ড।
গত ৭’ আগস্ট টুটুলের আকস্মিক মৃত্যু সংবাদ আমাকে চরম আঘাত দিয়েছে, হতাশ করেছে বেদনার সাগরে ডুবিয়ে দিয়েছে। এমন মৃত্যু মেনে নেওয়া বড়ই দুঃসাহসের ব্যপার। টুটুল আমার চাইতে বয়সে বেশ ছোট। তারপরও সে ছিল আমার রাজনৈতিক সাথী ও অনন্য সাধারণ বন্ধু। দেশপ্রেম, মানুষের প্রতি অকৃত্রিম ভালোবাসা আর ত্যাগের মহিমায় উজ্বল রাজনৈতিক জীবনের সবটুকুই ইতিহাস।
তিনি যে এলাকায় থাকতেন সেখানে বিরুদ্ধ রাজনীতির জোয়ার ছিল, তাঁর ব্যক্তিগত নিরাপত্তার বেশ অভাবও ছিল। তারপরও মাথা উঁচু করে মানবতা ও মানবিকতার আদর্শ মণ্ডিত ঝাণ্ডা উঁচিয়ে তিনি নিরন্তর পথ হেঁটেছেন।
স্বৈরাচারী এরশাদের শাসন বিরোধী আন্দোলনে রাজশাহী অঞ্চলের যে সকল সাহসী সৈনিক রাজপথে দুর্বার আন্দোলন গড়ে তুলেছিলেন, টুটুল ছিল তার মধ্যে অন্যতম একজন লড়াকু। স্বল্প ভাষী, আত্মবিশ্বাসী নির্ভীক এক যোদ্ধা ছিলেন টুটুল।
বাবা-মার আদরের সন্তান দুই ভাইয়ের ছোট ছিলেন তিনি। বাবা স্বনামধন্য আইনজীবী, মা স্নেহময়ী আদর্শ গৃহিনী। টুটুল ছিলেন মায়ের অতি আদরের। সব সময় মুক্ত পারিবারিক পরিবেশে বেড়ে উঠেছিলেন এক অসাধারণ মমতার ছায়ায়। আমরা বন্ধু সহযোদ্ধারাও ছিলাম সেই পরিবারের অবিচ্ছিন্ন অংশ।
রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক কাজে নিবেদিত প্রাণ ছিলেন টুটুল। তার কাজ শুরু হতো সকাল ১০ টায়, উদ্দেশ্য পূরণ না হওয়া পর্যন্ত ছিল না কোন অবকাশ। কর্মযজ্ঞ শেষ হতো সুচারুরূপে দায়িত্ব পালনের পর।
সারাক্ষণ কাজ করতেন পায়ে হেঁটে। গ্রীষ্মের প্রখর দুপুরের তীব্র রোদে তপ্ত পিচঢালা পথ ধরে তিনি হাঁটতেন, ঘাম ঝরতো স্রোতের মতো, তারপরও ক্লান্তি তাঁর চলার পথকে কখনোই থামিয়ে দিতে পারেনি।
ক্লান্তিহীন পথপরিক্রমার এই অনন্ত যাত্রায় যারা সামিল ছিলেন, এই বেদনা বিধুর মুহুর্ত তাদের খুব করে মনে পড়ে মনে পড়ে সালাউদ্দিন বেবিকে যিনি টুটুলের সবচাইতে ঘনিষ্ঠজনদের একজন ছিলেন । মনে পড়ে জামিল আক্তার রতনকে, যিনি ঘাতক জামাত শিবিরের হাতে নির্মম ভাবে খুন হয়ে শহীদি মৃত্যু বরণ করেন। মনে পড়ে রবিউল আলম বাবুকে, মোমিনুল হক নান্টুকে, মমিনুল ইসলাম বাবুকে, চুন্না মোর্শেদ, সেলিম মনোয়ার, ফরহাদ রানা খান, সামাউন, রায়হান, ইয়ামিন সহ অসংখ্য তরুণ যারা স্বপ্ন দেখেছিল একটি মানবিক সমাজের। গড়ে তুলেছিলেন রাজশাহী অঞ্চলে প্রগতিশীল আন্দোলনের অপ্রতিরুদ্ধ জোয়ার। স্বপ্ন দেখিয়ে ছিলেন দেশের সুবিধা বঞ্চিত শ্রমজীবী মানুষকে।
যে বাড়িটা সবসময় এক ঝাঁক মানুষের কলতানে মুখরিত থাকতো সেটা এখন শুন্যতায় নিমজ্জিত। হাহাকার যেন নীরবতাকে আলিঙ্গন করে গুমরে কাঁদছে। টুটুলের বাবা-মা মারা গেছেন। টুটুলের এক ছেলে আর এক মেয়ে, জীবনসঙ্গী স্ত্রীও তাঁর মতো মৃদুভাষী। তিনিও করোনাক্রান্ত, সব যেন ভেঙ্গে চুরে চুরমার।
সাত মাস আগে নিউ মার্কেটে চশমার ফ্রেম কিনতে গেলে টুটুলের সঙ্গে দেখা। স্বভাবসুলভভাবে আমার কুশল জিজ্ঞেস করেন, আসার কারণ জানতে চাইলেন, আমি আমার উদ্দ্যেশ্য বললে তিনি আমার হাত ধরে পরিচিত একটি চশমার দোকানে নিয়ে গেলেন। আমি তাঁর বড় ভাই তাঁর অতি আপনজন এভাবেই তিনি দোকানের মালিকের সাথে আমার পরিচয় করিয়ে দিয়ে, সুন্দর করে আমার জন্য চশমা বানিয়ে দেওয়ার অনুরোধ করলেন। আমার সাথে তাঁর সেটাই শেষ দেখা। আদর্শবাদী, মানবপ্রেমিক, বন্ধুবৎসল টুটুলের মতো এক তারার পতন হয়েছে এমন এক সময়, যখন দেশ করোনা মহামারীর আক্রান্ত হয়ে ধুকছে। বন্যা- আর প্রাকৃতিক দুর্যোগে গৃহহারা মানুষের হাহাকার, রাজনীতি অন্ধকারের অতল গহ্বরে। আত্মকেন্দ্রিকতার রাজনীতি সুবিধাবাদের ধারাকে প্রশস্ত করে চলেছে। শাসকের বেপরোয়া লুটপাট আর দুর্নীতির কারণে জনগণ নিজ সম্পদের অধিকার থেকে বঞ্চিত। নৈতিকতা আর আদর্শিক রাজনীতির ঝাণ্ডা ধরে যারা জনগণের অধিকারের প্রশ্নে আপসহীন তাদেরও সীমাবদ্ধতার কারণে মানুষের মধ্যে হতাশা গেঁড়ে বসেছে।
টুটুলরা মৃত্যুহীন প্রাণ। সমাজের এই অন্ধকার দূর করতে টুটুলেরা ধংস্তপের ছায়-গাদার ভিতর থেকে ফিনিক্স পাখি হয়ে আবার জন্মলাভ করবে। সে দিকেই তাকিয়ে আছে পৃথিবী।
টুটুলের স্মৃতির প্রতি আমার বিনম্র শ্রদ্ধা।

Close