বাগমারাশিরোনাম-২

তাহেরপুর-পুঁঠিয়া সড়ক এখন মরণ ফাঁদ, জনদুর্ভোগ চরমে

সমিত রায়, বাগমারা: দীর্ঘদিন সংস্কার না করায় রাজশাহীর পুঠিয়া উপজেলা সদর থেকে বাগমারার তাহেরপুর সড়কের অধিকাংশ স্থান খানাখন্দে ভরে গেছে। এতে সড়কটি দিয়ে চলাচলকারী ১০টি ইউনিয়নের ১২০টি গ্রামের প্রায় ২ লক্ষ মানুষ ভোগান্তির শিকার হচ্ছে। এ দিকে যেন দেখার কেউ নেই। সড়ক ও জনপথ বিভাগ (সওজ) এর রাজশাহী জেলা কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, পুঁঠিয়া সদর-তাহেরপুর- ভবানীগঞ্জ সড়কটির দৈর্ঘ্য ২৭ কিলোমিটার। এলাকার বাণিজ্যেক রাজধানী খ্যাত তাহেরপুর থেকে পুঠিয়ার দুরত্ব ১৭ কিলোমিটার। ১৯৮৫ সালে পুঠিয়া-তাহেরপুর সড়কটি কার্পেটিং করা হয়। এর কয়েক বছর পর পথটি চলাচলের অযোগ্য হয়ে পড়ে। পরে ২০০৪ সালে নামমাত্র সংস্কার করা হয়। দুই বছর পরেই রাস্তার বিভিন্ন স্থানে খানাখন্দকে বেহাল হয়ে পড়ে।

২০০৭ সালে ৩০ লক্ষ টাকা ব্যয়ে পুনরায় রিপেয়ারিং করা হলেও সড়কটি অল্প দিনেই চলাচলের অনুপযোগী হয়ে যায়। সর্বশেষ ২০১৫ সালে পুঠিয়া- তাহেরপুর পর্যন্ত ১৭ কিলোমিটার কার্পেটিং করা হয়। কিন্তু বন্যার সময় বিল এলাকায় রাস্তাটি পানিতে ডুবে যাওয়ার কারণে ঐসব স্থানে খানাখন্দে পানি জমে ডোবায় পরিণত হয়। এসময় বাধ্য হয়ে মালবাহী বড় ট্রাকগুলি চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। ফলে বাগমারা সহ অত্র অঞ্চলের ঐতিহ্যবাহী তাহেরপুর হাটে অনেক ব্যবসায়ী ও কৃষকরা তাদের মালামাল আনা-নেওয়া করতে পারেনা। বর্ষা মৌসুমে এ সড়কে চলাচল দুর্গম হয়ে পড়ে।

এলাকার কয়েকজন বাসিন্দার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, দীর্ঘদিন ধরে সংস্কার না করায় সড়কটির অধিকাংশ স্থানে কার্পেটিং উঠে গিয়ে বড় বড় গর্তের সৃষ্টি হয়েছে। এ কারণে বাগমারার তাহেরপুর ও ভবানীগঞ্জ পৌরসভাসহ, শ্রীপুর, গোয়ালকান্দি, হামিরকুৎসা, মাড়িয়া, যাত্রাগাছি, বড় বিহানলী, গণিপুর এবং পুঠিয়া উপজেলার শীলমাড়িয়া ভাল্লুকগাছি,দুর্গাপুর কিশমত গণকৈড় ইউনিয়নের এক’শ বিশটি গ্রামের প্রায় দুই লক্ষাধিক মানুষ ভোগান্তির শিকার হচ্ছে।

সরেজমিন গিয়ে দেখা যায়, বিভিন্ন স্থানে সড়কের কার্পেটিং উঠে ইটের খোয়া বের হয়ে গেছে। কোথাও কোথাও বড় বড় গর্তের সৃষ্টি হয়েছে। সড়কে একটি গাড়ি আরেকটিকে অতিক্রম করতে পারছে না। বিভিন্ন স্থানে খানা-খন্দের সৃষ্টি হয়েছে। এ অবস্থায় ছোট-বড় মালবাহী গাড়ী উল্টে অহরহ ঘটছে দুর্ঘটনা। তাহেরপুর কলেজের সহকারি অধ্যাপক সত্যজিত রায় তোতা বলেন, তাহেরপুর-পুঠিয়া সড়কটি চলাচলের অযোগ্য হয়ে পড়েছে । প্রতিদিনই দুর্ঘটনার খবর পাওয়া যায়। মানুষ জীবনের ঝুকি নিয়ে এ পথ ব্যবহার করছে। তিনি দুঃখ প্রকাশ করে বলেন, এই রাস্তাটি তিনটি উপজেলার মধ্যে পড়েছে,তিনটি এলাকার সকল নেতাই সরকারী দলের হওয়া সর্ত্বেও অতীব গুরুত্বপূর্ণ সড়কটির কোনো উন্নয়ন না হওয়ায় তিনি বিস্ময় প্রকাশ করেন।

হবিবরসহ চারজন কৃষক বলেন, তাদের উৎপাদিত বিভিন্ন কৃষিপণ্য বিক্রির জন্য এই অঞ্চলের বিখ্যাত হাট তাহেরপুরে নিতে হয়। কিন্তু এই ভাঙাচোরা সড়কের কারণে ভ্যান, পিকআপ যেতে চায়না। গেলেও এ জন্য অতিরিক্ত পরিবহন ভাড়া গুনতে হচ্ছে তাঁদের। দ্রুত সড়কটি সংস্কার করা দরকার।
হুজুর আলীসহ তিনজন ভ্যানচালক বলেন, ভাঙাচোরা রাস্তার জন্য বেশি মাল নেওয়া যায় না। এ ছাড়া ভ্যানও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। পেটের দায়ে বাধ্য হয়ে ভাঙাচোরা রাস্তায় চলাচল করতে হচ্ছে। তেবিলা গ্রামের কলেজ ছাত্র কামরুল বলেন, সড়কের বেহাল অবস্থার জন্য তাঁদের অনেক ভোগান্তির শিকার হতে হচ্ছে। যানবাহন বা ভ্যানে এ সড়ক দিয়ে চলাচল করলে কষ্ট হয়, সময়ও বেশি লাগে। গাড়ী ভাড়া বেশি দিতে হয়।

তাহেরপুর জনতা ব্যাংকের সাবেক ম্যানেজার ও পৌর আওয়ামীলীগ নেতা আব্দুস সাত্তার আক্ষেপ করে বলেন, রাস্তাটির কখনই ভালো মানের কাজ হয় নাই। যার ফলে সড়কটি চলাচলের অযোগ্য হয়ে পড়েছে। রাস্তার এমন পরিস্থিতি হয়েছে যে,অনেক সময় বাস থেকে নেমে পায়ে হেটে গন্তব্যে যেতে হচ্ছে। তিনি বরাদ্ধকৃত অর্থের সঠিক প্রয়োগ যেন হয় সেদিকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়ার জন্যে সংশ্লিষ্ঠ কতৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষন করেন।
বাগমারা আঞ্চলিক মাদক ও সন্ত্রাস প্রতিরোধ কমিটির আহবায়ক সামসুজ্জোহা মামুন জানান, এই রাস্তার কারণে অনেকেই ঐতিহ্যবাহী তাহেরপুর হাটে আসা বন্ধ করে দিয়েছেন। রাস্তার অচল অবস্থার কারণে সন্ধ্যার পর সব ধরনের যাত্রিবাহী যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। ফলে পুঠিয়া ও নাটোর থেকে যারা তাহেরপুর আসা-যাওয়া করেন তাদের চরম ভোগান্তি পোহাতে হয়। অতিরিক্ত ভাড়া দিয়েও কোন যানবাহন পাওয়া যায়না। তিনি কর্তৃপক্ষের প্রতি বরাদ্ধকৃত অর্থের সঠিক প্রয়োগে মান সম্পন্ন, টেকসই সড়ক নির্মাণের দাবী জানান। চেউখালী উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক বকুল খোরাদি সন্তোষ প্রকাশ করে বলেন, আমাদের এমপি এনামুল হক এর অনেক প্রচেষ্টার পর রাস্তাটির জন্যে এক’শ ত্রিশ কোটি টাকা বরাদ্দ হওয়ায় বাগমারা বাসীর পক্ষ থেকে তাঁকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন। তাহেরপুরের বিশিষ্ঠ সার ব্যবসায়ী আরঙ্গজেব ডাবলু বলেন ‘আমি ছোটকাল থেকেই রাস্তাটির দুর্দশা দেখে আসছি । সড়কটি কখনই দীর্ঘ সময় সচল ছিলোনা। তিনি সড়কটির এই অবস্থার জন্যে এলাকার রাজনৈতিক নেতাদের অবহেলাকে দায়ী করেন।
এ ব্যাপারে শীলমাড়িয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান সাজ্জাদ হোসেন মুকুল বলেন, এই সড়কে বাগমারা, দুর্গাপুর, পুঠিয়া, নাটোরের নলডাঙা ও নওগাঁ জেলার কয়েক লাখ মানুষ প্রতিদিন চলাচল করে। সড়কটি সংস্কারে অনিয়মের ব্যাপারে সংশিষ্ট দফতরে লিখিত ও মৌখিকভাবে অভিযোগ দিয়েছি। সড়ক ও জনপথের লোকজন ভাঙাচোরা দু-এক স্থানে নামমাত্র মেরামত করে চলে যায়।

তাহেরপুর পৌর মেয়র অধ্যক্ষ আবুল কালাম আজাদ বলেন, অত্যন্ত জনগুরুত্বপূর্ণ পুঠিয়া-তাহেরপুর সড়কের জন্য একশত ত্রিশ কোটি টাকা বরাদ্ধ হয়েছে বলে জেনেছি । আশা করছি অতি দ্রুত সময়ের মধ্যে রাস্তাটির কাজ শুরু হবে। ব্যস্ততম সড়কটির কাজ কবে নাগাদ শুরু হবে এমন এক প্রশ্নের জবাবে বাগামারা-৪ আসনের এমপি ইন্জিনিয়ার এনামুল হক খুব তাড়াতাড়ি কাজ শুরু হবে বলে জানিয়েছেন।

এ ব্যাপারে রাজশাহী জেলা সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের উপ-বিভাগীয় প্রকোশলী সানজিদা আফরিন ঝিনুক বলেন, সড়কটির জন্যে একনেকে ১৩০ কোটি টাকা নতুন বরাদ্ধ দেওয়া হয়েছে। কিছুদিন পূর্বে এর জিও পাস হয়েছে এবং পুঠিয়া থেকে বাগমারা উপজেলা সদর পর্যন্ত ২৭ কিলোমিটার রাস্তাটি ২৪ ফুট চওড়া করা হবে।
বরেন্দ্র বার্তা/ নাসি

Close