নাগরিক মতামতশিরোনাম-২

উপজেলায় আদালত, ন্যায় বিচার ও বাস্তবতা

নূরুন্নবী সবুজ

১৯৮২ সালে দেশে ৪৬০টি উপজেলায় ম্যাজিস্ট্রেট কোর্ট স্থাপন করা হয়। আর এই ব্যবস্থা মূলত নেয়া হয় এরশাদের আমলে । ক্ষমতায় আসার পর ১৯৯৩ সালে বিএনপি সরকার উপজেলা ম্যাজিস্ট্রেট কোর্ট জেলা সদরে স্থানান্তর করে এবং পরবর্তী সময়ে জেলা সদরে স্থানান্তরিত ‘উপজেলা ম্যাজিস্ট্রেট আদালত নামটি রহিত করেন। যদিও এরশাদ সরকার অসাংবিধানিক তবুও তার এ কাজটি বিচার বিভাগকে সাধারণ জনগণের জন্য সহজ লভ্য করে তোলে। এই ব্যবস্থাটিকে প্রয়োজনে সংশোধন করা যেত অধিকতর সুবিধা নিশ্চিত করার জন্য কিন্তু এই ব্যবস্থা রহিত করে যে সুবিধাটুকুও পাবার কথা ছিলো তাও বন্ধ করা হয়।

‘বিলম্ব ন্যায়বিচারকে বাধাগ্রস্থ করে’ ল্যাটিন এই ম্যাক্সিাটির সাথে বাংলাদেশের আইন ও বাস্তবতায় ‍কিছু কথা মনে আসে। জেলা পর্যায়ে আলাদত ব্যবস্থা কোন না কোন ভাবে মামলা বা মামলার গতিকে কমিয়ে দেয়। বৃদ্ধ, নারী সহ বিশেষ কিছু ব্যাক্তিকে আদালতে হাজির হওয়া থেকে মুক্তি দেয়া হয়েছে। বাংলাদেশের জনসংখ্যার তুলনায় যানবাহনের সংখ্যা কম হওয়ায় অনেকে সঠিক সময়ে আদালেতে পেীছতে পারেনা আবার অনেকে তাদের সাক্ষীকে আদালতে হাজির করতে গিয়ে সমস্যারও সম্মুখীন হয়।। তাদের আনা নেওয়ার খরচ আবার ফিরতি পথে গাড়ি ধরার ঝামেলা বা পরপর শুনানি থাকলে উপজেলা থেকে জেলা শহরে থাকার ঝামেলাও আছে। নতুন শহরে নতুন মানুষ এসে উপযুক্ত আইনজীবী নিয়োগ করা বা দালালের হাত থেকে বেচে সঠিক আইনের সেবা পাওয়াও কঠিন হয়ে যায়।

উপজেলা পর্যায়ে আদালত না থাকায় মামলা দায়ের করা নিয়েও সমস্যা তৈরী হয়। অনেকে দুরুত্ব, অজানা শহর ও আতঙ্কে মামলাও করতে চায় না। আইন ও আদালত সামাজিক অন্যায় গুলো ন্যায় বিচার দিয়ে নির্মূল করতে ভূমিকা রাখে। কিন্তু কোন কারনে যদি মামলা করা উচিত কিন্তু মামলাই না করা হয় তার দায়ভার আমরা অস্বিকার করতে পারিনা। ইচ্ছা থাকলেও অনেকেই যাতায়াতের হয়রানি, অর্থ ও সময়ের কারনে আদালতে না গিয়ে হয় মামলার বিষয়বস্তু পুষে রাখে নয়ত আইন ও আদালতে পরোক্ষভাবে অবমাননা করে স্থানীয় ভাবে ন্যায় অন্যায় যে কোন ভাবে মামলার নিষ্পত্তি করে থাকে।

গত ২১ জুলাই ২০২০ প্রথম আলোতে ‘ধর্ষণের শিকার ছাত্রীটির পরিবারকে উল্টো সোয়া লাখ টাকা জরিমানা’ শিরোনামে একটি সংবাদ প্রকাশ করে। এটি শুধু একমাত্র ঘটনা নয়। বিচার বিভাগের বাইরে প্রতিনিয়ত বিচারের ঘটনা ঘটছে যা অধিকাংশ ক্ষেত্রে বিচার বিভাগের মূলনীতি, মেীলিক মানবাধিকার বা সামাজিক ন্যায় বিচারের লঙ্ঘন। কিছুদিন আগে স্থানীয় প্রতিনিধির মা-মেয়েকে রশি বেধে টেনে নিয়ে যাওয়ায় সারা দেশে জুড়ে নিন্দা ও প্রতিবাদ উঠে । । বিচার বিভাগ যদি উপজেলা পর্যায়ে স্থাপন করা হয় তাহলে এই বিচারের নামে প্রহসন গুলো কমে যাবে ও ধীরে ধীরে আর থাকবেই না। আদালত দূরে হওয়ায় ও মামলা করার জন্য হয়রানী হবে ভেবে স্থানীয়ভাবে এমন ন্যায় বা অন্যায় ভাবে মামলা নিষ্পত্তি নিশ্চয়ই আইন ও আদালতের মর্যাদা বৃদ্ধি করে না।

গ্রাম আদালতে দেওয়ানী ও ফেীজদারী উভয় মামলার বিচার করা যায়। এখানে আপিল করার বিধান যেমন রাখা হয়েছে তেমন আবার আপিল না করার বিধানও রাখা হয়েছে। যেখনে নিয়মিত আদালত বিজ্ঞ বিচারকের রায়ের বিরুদ্ধে আপিল, রিভিউ, রিভিশন করার বিধান রেখেছে সেখানে গ্রাম আদালত যা আইনজ্ঞ ব্যাক্তিদের দ্বারা পরিচালিত না সেখানে কিছু কিছু ক্ষেত্রে আপিল না করার বিধান রাখা হয়েছে। গ্রাম আদালতের উদ্যোগ সত্যিই প্রশংসনীয় কিন্তু এটি আরো জনকল্যাণমূলক করার জন্য অবশ্যই কিছু পরিবর্তন আনতে হবে। গ্রাম আদালতেও আইনজ্ঞ লোক রাখতেই হবে, পর্যাপ্ত সাক্ষ্য-প্রমাণ ও যুক্তি-তর্ক-এর উপর গুরুত্ব দিতেই হবে।

আইনজীবীর সনদ পাবার জন্য দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষানবিশ আইনজীবীগণ আন্দোলন করে আসছে। নানা কারনে বার কাউন্সিল তাদের যে সময়ে পরীক্ষা নেবার কথা তা নিচ্ছে না। বছরে দু’বার তো দূরে থাক বছরে একটি এমন কি প্রায় ৩ বছরে একটি পরীক্ষা নেয়া হচ্ছে না। পড়াশুনা শেষ করে ইন্টিমেশন জমা দেবার পর ৬ মাস পরে পরীক্ষা দেয়া যায়। আবার কোন ভাবে যদি প্রথম বার পরীক্ষায় অকৃতকার্য তাহলে আরো ৩ বছর আর একবার করলে আরো ৩ বছর অপেক্ষা। এই প্রক্রিয়া মেধাবীদের আইনজীবী হতে বিশেষ বাধার সমস্যা করছে। যারা আইন পড়ছে ও আইনজীবী হতে চায় তাদের জন্য এটি চরম হতাশার । আইন জগতে লোকবলের দরকার আছে তা কেউ অস্বিকার করতে পারবে না। মামলা ও মামলা জট যে কি পরিমাণ তা কমবেশী সবার জানা।

১৯আগষ্ট ২০২০ জাগোনিউজ২৪.কম পত্রিকায় ‘বাড়ছে মামলা, বিচারক বাড়েনি’ নামে একটি তথ্য ও বিশ্লেষণমূলক প্রতিবেদন বের হয়। সেখানে দেখানো হয়, আপিল বিভাগে বিচারকপ্রতি রয়েছে তিন হাজার ৯৩৬টি মামলা এবং হাইকোর্ট বিভাগে বিচারকপ্রতি রয়েছে পাঁচ হাজার ৪১টি মামলা। অধস্তন আদালতে বিচারকপ্রতি এক হাজার ৭৫০টি মামলা আছে। যদিও ২০১৪ সালে আইন কমিশন অধস্তন আদালতের জন্য তিন হাজার বিচারক নিয়োগের সুপারিশ করেছিলো কিন্তু তা আজো বাস্তবায়ন হয় নি। বিচার ও আইনজীবীর যে প্রয়োজনীয়তা আছে তা আমাদের স্বিকার করতেই হবে। আর উপজেলা পর্যায়ে আদালত স্থাপন করলে যে তা জনগণের জন্য কত সুফল আনবে তাও বলার অপেক্ষা রাখে না।

বর্তমানে আইন পড়ায় এমন সরকারী ও বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয়সহ ল’কলেজের সংখ্যা বাড়ছে সেই সাথে আইন পড়া ও জানা লোকের সংখ্যাও বাড়ছে। এখন তাদের যদি সঠিক ভাবে কাজে লাগনো না হয় তাহলে তারা একটা অতৃপ্তি নিয়ে অন্য পেশায় জড়িয়ে যাবে যা তাদের কর্মদক্ষতা কমাতে পারে; বাড়াতে পারে সামাজিক অস্তিরতা। অনেক আগ্রহ নিয়ে আইন পড়ে যদি হতাশা নিয়ে বের হতে হয় তা যে কোন সদ্য আইন শেষ করা মেধাবীর জন্য মানসিক ও শারীরিক সমস্যা তৈরী করতে পারে। আইন ও আদলতকে মানুষের কাছে সহজলভ্য করে ন্যায় বিচারকে আরো সহজ ও গতিশীল করার জন্য আমাদের বিচার বিভাগকে উপজেলা পর্যায়ে আনাই যায়।

সাম্প্রতিক সময়ে দিনাজপুরের ইউএনও-এর বাসায় ঢুকে হামলার পর তাদের নিরাপত্তার জন্য আনসার রাখার ঘোষণা দেয়া হয়। উপজেলা পর্যায়ে যখন প্রশাসনিক কাজ চালানো হয় তখন সমাজ সভত্যাতে নিরাপত্তা ও অপরাধ মন দূর করার অন্যতম প্রতিষ্ঠান বিচার বিভাগ কেন নয়? বিচরকদের নিরাপত্তার কথা যদি এখানে তোলা হয় তাহলে বলতে হয় সে ব্যবস্থা জেলা পর্যায়েও কি খুব উন্নত? বাংলাদেশে বিচারকদেরও মামলার পক্ষ বা তার সংশ্লিষ্ট দ্বারা আহত ও নিহত হবার ঘটনাও কম না। উপজেলা পর্যায়ে নিরাপত্তা দরকার হলে বা নতুন ভবন দরকার হলে গণতান্ত্রিক দেশ জনকল্যাণের জন্য তা করতেই পারে। সময়ের সাথে তাল মিলিয়ে সময়ের প্রয়োজনে বিচার বিভাগ উপজেলা পর্যায়ে আনার জন্য এখন ভাবতেই পারি।

সকাল বিকাল কোর্ট বসার ঝামেলা, বাদী-বিবাদীর হয়রানি, অর্থ ও সময়সহ নানা বিষয়ের অসুবিধাগুলো দূর করে সুবাধি যারা পাবার কথা তাদের কাছে সুবিধা আনার জন্য উপজেলা পর্যায়ে আদালত আনার প্রয়োজনীতায় প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেবার জন্য এখন আগ্রহটাই জরুরী। এমন পদক্ষেপ যদি নতুন করে নেওয়া হয় তা বিচার বিভাগের জন্য যেমন ইতিবাচক কাজ হবে তেমনি জীবন ও সমাজে ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে।
লেখক: আইন বিশ্লেষক ও কলামিষ্ট।

Close