জাতীয়শিরোনাম-২

আশরাফুল আলম খোকনকে জাতির কাছে ক্ষমা চাইবার দাবি জাবি ছাত্র ইউনিয়নের

 

সংবাদ বিজ্ঞপ্তি: জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ধর্ষণবিরোধী আন্দোলনের গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাসকে বিকৃতভাবে উপস্থাপনের চেষ্টাকারী আশরাফুল আলম খোকনকে আগামী ২৪ ঘন্টার মধ্যে জাতির কাছে ক্ষমা চাইবার দাবি জানিয়েছে ছাত্র ইউনিয়নের জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় শাখা।
ছাত্র ইউনিয়নের প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক ইমতিয়াজ অর্ণবে প্রেরিত এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে এ দাবী জানানো হয়।
এতে বলা হয়, গত ৭ অক্টোবর, ২০২০ তারিখে দৈনিক বাংলাদেশ প্রতিদিনের অনলাইন সংস্করণে প্রধানমন্ত্রীর উপ-প্রেস সচিব জনাব আশরাফুল আলম খোকনের “ধর্ষণের সেঞ্চুরি, একটি গুজবের আত্মকাহিনী!” শীর্ষক একটি লেখা আমাদের দৃষ্টিগোচর হয়েছে। উদ্দেশ্য প্রণোদিতভাবে মনগড়া, মিথ্যা, বানোয়াট ও বিভ্রান্তিকর তথ্যের উপর ভিত্তি করে ৬৭২ শব্দের এই লেখায় জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ধর্ষণবিরোধী আন্দোলনের গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাসকে জাতির সামনে বিকৃতভাবে উপস্থাপনের চেষ্টা করা হয়েছে।
এই ভূখণ্ডের নিপীড়নবিরোধী লড়াইয়ের গৌরবজনক অধ্যায় হিসেবে স্বীকৃত জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ধর্ষণবিরোধী আন্দোলনের ইতিহাস বিকৃতভাবে প্রচারের ঘটনাকে ষড়যন্ত্রমূলক আখ্যা দিয়ে ক্ষোভ ও ধিক্কার জানাচ্ছে বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়ন, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় সংসদ। এক যুক্ত বিবৃতিতে বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়ন, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় সংসদের সভাপতি মিখা পিরেগু ও সাধারণ সম্পাদক রাকিবুল হক বলেন, জনাব খোকন দাবি করেছেন, ১৯৯৯ সালের আগষ্ট মাসে মানবজমিন পত্রিকায় ধর্ষণের সংবাদ প্রথম প্রকাশিত হয়। কিন্তু প্রকৃত তথ্য হচ্ছে ঐ পত্রিকায় তিন ছাত্রী ধর্ষণের সংবাদটি প্রকাশিত হয় ১৭ আগষ্ট ১৯৯৮ সালে। এর তিন দিন পর একই খবর প্রকাশিত হয় ডেইলি স্টারে। একই মাসে ধারাবাহিকভাবে আরো বেশকিছু জাতীয় দৈনিকে এই ন্যাক্কারজনক ঘটনার অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। বিভিন্ন কল্পনাপ্রসূত গাল-গপ্প ফেড়ে জনাব খোকন প্রমাণ করার চেষ্টা করেছেন যে ধর্ষক জসিম উদ্দিন মানিক প্রকৃত ছাত্রলীগ কর্মী নন, এমনকি কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগ ধর্ষক মানিককে শাখা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে অফিসিয়ালি স্বীকৃতি দেয়নি। কিন্তু আমরা দেখি জনাব খোকন তার লেখায় আন্দোলনরত শিক্ষকদের সাথে ছাত্রলীগের “ত্যাগী” নেতা-কর্মীদের যোগসাজেশের কল্পিত বয়ান উপস্থাপন করলেও ধর্ষণবিরোধী আন্দোলন চলাকালীন অবস্থায় ১৯৯৮ সালের ২৩ আগষ্ট নৃবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক রেহনুমা আহমেদ ছাত্রলীগের নেতাকর্মী কর্তৃক বর্বোরোচিত হামলার শিকার হন। এই ন্যাক্কারজনক ঘটনার সাত দিন পর বাংলাদেশ ছাত্রলীগ, কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদ লিখিতভাবে জাবি শাখা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক জসিম উদ্দিন মানিক, সহ-সভাপতি হামিদুল হক, সাংগঠনিক সম্পাদক হাসিবুর রহমান বরকত ও মওলানা ভাসানী হল ছাত্রলীগের সভাপতি মাহমুদুল আলম বাবুকে লিখিতভাবে কারণ দর্শানো নোটিশ দেয় এবং অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় ১ সেপ্টেম্বর ১৯৯৮ সালে তাদেরকে বাংলাদেশ ছাত্রলীগ সংবাদ বিজ্ঞপ্তি দিয়ে বহিষ্কার করে।
নেতৃবৃন্দ আরো বলেন, ধর্ষক জসিম উদ্দিন মানিকের ভিন্ন রাজনৈতিক চরিত্রের অবতারণা করে আশরাফুল আলম খোকন আসলে চেষ্টা করেছেন এরূপ অপরাধের সাথে ক্ষমতার সম্পর্ককে অস্বীকার করতে। যখনই সরকারি দল কিংবা তার বিভিন্ন অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মী কর্তৃক একের পর এক অপরাধ সংঘটিত করবার অভিযোগ আসতে থাকে, তখনই এধরণের কুযুক্তির ফুলঝুরি ছুটাতে রাষ্ট্রের কর্তাব্যক্তি থেকে শুরু করে দলান্ধ চাটুকার ও নব্য দালাল সকলে ব্যস্ত হয়ে পড়েন। ধর্ষকের সর্বোচ্চ শাস্তির দাবিতে সারাদেশ যখন উত্তাল, তখন অতীতের ধর্ষণবিরোধী আন্দোলনের গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস নিয়ে মনগড়া তথ্য ছড়িয়ে চলমান আন্দোলনকে প্রশ্নবিদ্ধ করার অপচেষ্টা ছাড়া এই লেখা আর কিছুই নয়।
জনাব খোকন তার লেখায় মানিকের বিরুদ্ধে ধর্ষণের অভিযোগের ব্যাপারে উল্লেখ করেন, “সুনির্দিষ্ট কিছু না পেয়ে তদন্ত কমিটি সবকিছুই খারিজ করে দেয়।” কিন্তু ৩রা সেপ্টেম্বর ১৯৯৮ সালে অনুষ্ঠিত সিন্ডিকেট সভায় ধর্ষণ ও শিক্ষক লাঞ্ছনার ঘটনা প্রমাণিত হয় এবং ২২ সেপ্টেম্বর ১৯৯৮ সালে অনুষ্ঠিত সিন্ডিকেট সভায় ধর্ষক মানিকসহ ৯ জনকে ধর্ষণের ঘটনায় চিহ্নিত করা হয়। ২৮ সেপ্টেম্বর ১৯৯৮ সালে সিন্ডিকেট সভায় ধর্ষণের অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হওয়ায় ধর্ষক মানিককে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে চিরতরে বহিষ্কার করা হয়। জনাব খোকন আরো উল্লেখ করেন, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন অভিযোগ আহ্বান করলে শতাধিক ছাত্রী অভিযোগ দেয়। প্রকৃত তথ্য হচ্ছে সত্যতা যাচাই কমিটির কাছে চিঠি জমা পড়ে ৪৪৩টি। এরকম নানান অপরাধের অসংখ্য অভিযোগ এবং ২১৩ পৃষ্ঠার তদন্ত প্রতিবেদনের সার্বিক বিশ্লেষণ থেকে এটা দিবালোকের মত স্পষ্ট হয়ে উঠে যে শতাধিক ধর্ষণ এবং অগণিত নিপীড়নের ঘটনার সাথে ধর্ষক মানিক ও তার সহযোগীরা সম্পৃক্ত। তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনেই যখন ২০টি ধর্ষণ ও ৩০০’র অধিক নিপীড়নের প্রমাণ মিলে, তখন বাস্তবে সেই সংখ্যাটি যে আরো কয়েকগুণ বেশি, তা প্রশ্নাতীত। অথচ জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ধর্ষণবিরোধী আন্দোলনের গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস সম্পর্কে ন্যূনতম জ্ঞান না রাখা জনাব খোকন ধর্ষণের সেঞ্চুরিয়ান মানিকের ভয়ংকর ও কলঙ্কজনক ইতিহাসকে “গুজবের আত্মকাহিনী” হিসেবে প্রচার করে নতুন গুজবের অবতারণা করেছেন!
নেতৃবৃন্দ আরো বলেন, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ধর্ষণবিরোধী আন্দোলনের সুপারিশমালার প্রেক্ষিতে ২০০৯ সালের ১৫ মে মহামান্য হাইকোর্ট বাংলাদেশের সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও কর্মস্থলের জন্য যৌন নীপিড়নবিরোধী নীতিমালা প্রণয়ন করেন এবং অবিলম্বে বাধ্যতামূলকভাবে তা কার্যকর করার নির্দেশ দেন। অথচ জনগণের করের টাকায় যার বেতন হয়, বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর উপ-প্রেস সচিবের মত গুরুত্বপূর্ণ একটি দায়িত্ব যার কাঁধে, তিনি একটি সফল আন্দোলনের ইতিহাসকে জাতির সামনে বিকৃতভাবে উপস্থাপন করে চলমান ধর্ষণবিরোধী আন্দোলনকে প্রশ্নবিদ্ধ করবার অপচেষ্টা চালাচ্ছেন, যা তার চাটুকার মনোভাবের প্রকাশ। তাই জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ধর্ষণবিরোধী আন্দোলন নিয়ে বিভ্রান্তিকর ও বিকৃত তথ্য প্রচারের দায় স্বীকার করে আগামী ২৪ ঘন্টার মধ্যে প্রধানমন্ত্রীর উপ-প্রেস সচিব জনাব আশরাফুল আলম খোকনকে জাতির সামনে ক্ষমা প্রার্থনা করবার আহ্বান জানাচ্ছে বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়ন, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় সংসদ। অন্যথায় জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা দেশের জনগণকে সাথে নিয়ে ইতিহাস বিকৃতির এই অপচেষ্টার দাঁতভাঙা জবাব দিবে।
বরেন্দ্র বার্তা/অপস

Close