নাগরিক মতামতশিরোনাম

উইঘুর মুসলিমদের বোবাকান্না ও ইসলামি বিশ্বের স্বার্থপরতার রাজনীতি

আকতারুল ইসলাম

কথায় আছে, জোর যার মুল্লুক তার। অস্ত্র জোর কিংবা অর্থ জোর- দুটোর যেকোনটি থাকলেই তামাম দুনিয়ার বাদশাহী পাওয়া সহজ হয়ে যায়। যেমনটি ঘটেছে চীনের বেলায়। অর্থ ও অস্ত্রের জোরে গোটা পৃথিবীর এক অঘোষিত শাসন কর্তার আসন পেতে চলেছে এশিয়ার পরাশক্তি হিসেবে বিবেচিত মহাপ্রাচীরের এই দেশটি। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক দেউলিয়া দশা, ইউরোপীয় দেশগুলোর আমেরিকা মুখী রাজনীতির ব্যর্থতা ও বিশ্বব্যাপী স্বৈরতান্ত্রিক রাজনৈতিক বাস্তবতা, চীনকে হয়তোবা খুব শিগগিরই আমেরিকার স্থলাভিষিক্ত হতে সাহায্য করবে। চীনের বর্তমান অভিপ্রায় ও তৎপরতা এমনটাই ইঙ্গিত বহন করছে। অর্থবল ও অস্ত্রবলে বলিয়ান হয়ে দেশটি যেমনভাবে তৃতীয় বিশ্বের বিভিন্ন দেশের উপর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করা শুরু করেছে, ঠিক তেমনি ভাবে নিজ দেশের সংখ্যালঘু মুসলিম জাতিগোষ্ঠীর উপর নির্যাতন- নিপীড়নের স্টীম রোলার চালানো শুরু করেছে। চীনের কমিউনিস্ট সরকার কর্তৃক উইঘুরদের উপর পরিচালিত দমন নিপীড়নের ঘটনা কারো অজানা নয়। গুটিকয়েক ইউরোপীয় দেশ ও মানবাধিকার সংগঠনগুলোর মৃদু প্রতিবাদ ধ্বনি ছাড়া উইঘুর প্রশ্নে কোন দেশই টু শব্দটি পর্যন্ত করছে না। বিশেষকরে মুসলিম দেশগুলোর ভূমিকা বড়ই প্রহসনের এবং লজ্জার।

গত বছর জাতিসংঘের ৭৪ তম অধিবেশনে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী জনাব ইমরান খান কাশ্মীরে ভারতীয় আগ্ৰাসন , রোহিঙ্গা মুসলমানদের দুর্দশা ও পশ্চিমা বিশ্বের ইসলাম বিদ্বেষী মনোভাব নিয়ে বেশ চাঁচাছোলা বক্তব্য প্রদান করলেও উইঘুর সমস্যা নিয়ে একটা শব্দও উচ্চারণ করেননি। অপরদিকে মুসলিম বিশ্বের কাছে খলিফা বনে যাওয়া তুর্কি প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোগান ফিলিস্তিন সংকট, রোহিঙ্গা সমস্যাসহ কাশ্মীর ইস্যুতে সরব ভূমিকা রাখলেও উইঘুর মুসলিমদের ক্ষেত্রে নীরবতার নীতি গ্রহণ করেছেন। এদিকে আরব দুনিয়ার মিস্টার এভরিথিং খ্যাত সৌদি ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমান তো একপ্রকার ঢাক ঢোল পিটিয়ে উইঘুর মুসলিম নিপীড়নে চীন সরকারের ভূমিকার ভূয়সি প্রশংসা করেছেন। শুধু তাই নয় গত বছরের অক্টোবর মাসে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্সসহ ২৩ টি ইউরোপীয় দেশ যখন জাতিসংঘে উইঘুর মুসলিমদের উপর পরিচালিত চীন সরকারের দমন নিপীড়নের বিরুদ্ধে নিন্দা প্রস্তাব উত্থাপন করল, তখন ওআইসিভুক্ত ১৪টি মুসলিম রাষ্ট্র চীনের পক্ষে সাফাই গাইতে অতি তৎপর হয়ে উঠলো। সৌদি আরব,কাতার, পাকিস্তান, আলজেরিয়া ও মিসরের মতো দেশগুলোর নেতারা একপ্রকার রাখঢাক না রেখেই উইঘুর মুসলিমদের উপর চীনা বর্বরতাকে এখনো সমর্থন করে যাচ্ছেন। মিসরের প্রেসিডেন্ট আবদেল ফাত্তাহ আল সিসি তার দেশে অবস্থানরত অসহায় উইঘুর মুসলিমদের উপর তদন্ত পরিচালনা করার জন্য চীনা পুলিশকে মিসরে আসার আহবান জানিয়েছেন। সৌদি আরবসহ অন্যান্য আরব দেশগুলো তাদের দেশে আশ্রীত উইঘুরদের চীনে ফেরত পাঠানোর প্রক্রিয়া শুরু করেছে। অতীতে তুরস্ক উইঘুরদের বিষয়ে সহানুভূতি ও সমর্থন ব্যক্ত করলেও অতি সম্প্রতি তুর্কি প্রেসিডেন্ট চীনের সাথে বৃহৎ পরিসরে বানিজ্য চুক্তির পথে অগ্ৰসর হওয়ায় উইঘুর প্রশ্নে চুপ থাকার নীতি গ্রহণ করেছেন। ইরান যেহেতু যুক্তরাষ্ট্রকে মোকাবেলা করতে চীনা সমর্থন প্রত্যাশী কাজেই উইঘুর নিয়ে কথা বলে চীনকে চটানোর ঝুঁকি নিতে চায়না। কিন্তু যেসকল মুসলিম বিশ্বের নেতাগন সালমান রুশদির মত ইসলাম বিদ্বেষী বিতর্কিত লেখকের বিরুদ্ধে মৃত্যু পরোয়ানা জারি করতে পারেন, শার্লি এবদো পত্রিকায় নবীজীর কার্টুন ছাপালে ক্ষোভে ফেটে পড়েন, ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে ইসরাইলি দখলদার বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করতে পারেন, তারা আশ্চর্যজনকভাবে চীনের মুসলিম নির্যাতন -নিপীড়নের বিরুদ্ধে নীরব দর্শকের ভূমিকায় কেন? কারণটা আসলে স্বার্থ সংশ্লিষ্ট। চীনের মুসলিম দেশগুলোতে ক্রমবর্ধমান বিনিয়োগ, বেল্ট এন্ড রোড ইনিশিয়েটিভের আওতাভুক্ত করা এবং স্বৈরতান্ত্রিক একনায়ক ও রাজা বাদশাদের ক্ষমতার ভিতকে পাকাপোক্ত করতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পর চীনই একমাত্র আশ্রয়স্থল। কাজেই এমন এক দেশকে চটাতে নারাজ প্রতিটি মুসলিম শাসক। অন্যান্য দেশের মত তারাও চীনের অর্থ বৃত্তের কাছে মাথা নত করে বসে আছেন।

চীনের উইঘুর মুসলিমদের উপর কমিউনিস্ট সরকারের দমন নিপীড়নের ইতিহাস বেশ পুরোনো। ১৯৪৯ সালে গণ চীনের চেয়ারম্যান মাও সে তুংয়ের নেতৃত্বে চীনে সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠা পেলে ধর্মকে নিষিদ্ধ বিষয় হিসেবে পরিগণিত করা হয় এবং এর প্রভাব এসে পড়ে জিনজিয়াং প্রদেশে বসবাসরত শান্তিপ্রিয় ও অত্যান্ত ধর্মপ্রাণ উইঘুর মুসলিমদের উপর। ইসলাম ধর্ম ও মুসলিমদের নাম নিশানা চীন থেকে মুছে ফেলার দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা বাস্তবায়নে তৎপর হয়ে ওঠে চীনের কমিউনিস্ট পার্টি। বিবিসি সহ বেশকিছু পশ্চিমা গণমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী চীনা সরকার হাজার হাজার মসজিদ মাদ্রাসা ধ্বংস করেছে। উইঘুরদের নামাজ পড়া, রোজা রাখা ও হজ পালনে বাধা প্রদান করছে। মসজিদ ভেঙ্গে পাবলিক টয়লেট বানানো হচ্ছে। মুসলিম জনসংখ্যার বৃদ্ধি কমাতে উইঘুর নারীদের গর্ভপাত করতে বাধ্য করা হচ্ছে। এছাড়াও দশ লক্ষাধিক উইঘুর মুসলিমদের কনসেনট্রেশন ক্র্যাম্পে রেখে চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের প্রতি আনুগত্য প্রদর্শনে বল প্রয়োগ করা হচ্ছে এবং জোরপূর্বক ধর্মান্তরিত করার মতো ঘটনা ঘটছে।

চীনের অর্থ বৃত্তের কাছে নতজানু বিশ্ব মানবতা আজ বড়ই স্বার্থপর। স্বার্থের রাজনীতির কাছে উইঘুরদের বোবাকান্না বড়ই বেমানান ও উটকো ঝামেলার নামান্তর।

লেখক: লাইব্রেরী অফিসার, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়, রংপুর।

Close