নাগরিক মতামতশিরোনাম

বিষাক্ত বর্ণবাদ, গড়পড়তা আবেগ ও গন্তব্য

নূরুন্নবী সবুজ

৫ জানুয়ারী ২০২০ বিকাল ৫টার দিকে ঢাকার কুর্মিটোলার রাস্তা থেকে তুলে নিয়ে এক মেয়েকে ধর্ষণ করা হয়। ঘটনাটি দ্রুত জাতীয় গণমাধ্যমগুলোতে প্রচার হতে থাকে। প্রিন্ট বা ইলেকট্রনিক্স এই মাধ্যমগুলোর বাইরেও সামাজিক যোগযোগ মাধ্যমে চলতে থাকে সমালোচনা ও বিচারের দাবী। দেশজুড়ে মানববন্ধবসহ নানা মুখী প্রতিবাদ মূলক কর্মকান্ড করা হয় ধর্ষককে দ্রুত গ্রেফতার ও বিচার করার দাবীতে। অবশেষে ধর্ষককে গ্রেফতার করা হয় ও তাকে বিচারের আওতায় আনা হয়। অন্যায় অবিচারের প্রতি এমন প্রতিবাদ প্রতিরোধ যত বেশী হবে, ন্যায় বিচার যত দ্রুত নিশ্চিত করা সম্ভব হবে; তত দ্রুত সমাজের সকল মানুষের নিরাপত্তা ও শান্তি নিশ্চিত করা যাবে।

২০১৮ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর অভিযুক্ত বাচ্চু মিয়া (৫০) স্বপন মামার বাকপ্রতিবন্ধী ২০ বছরের মেয়েকে ধর্ষণ করে। ‘স্বপন মামা’ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসিতে প্রায় ৪০ বছর ধরে চা বিক্রি করে আসছেন। ধর্ষকের বিরুদ্ধে মামলা করে নিজেই তিনি আবার ধর্ষকের করা মামলায় আসামী হয়েছেন। স্বপন মামা একজন সহজ সরল মানুষ আইনের আশ্রয় পাবার অধিকার তার ও তার পরিবারেও আছে। দীর্ঘদিনে বিচার না পেয়ে উল্টো হয়রানির শিকার হবার পরেও তিনি ৫ জানুয়ারীতে ঢাবি শিক্ষার্থীর ধর্ষণের বিচার চেয়ে যখন কর্মসূচী পালন করা হয় তখন তিনি তার মেয়ে ধর্ষণের বিচার চেয়ে তাদের সাথে যুক্ত হোন। দীর্ঘদিনে বিচার না পেয়েও বাবা যখন তার মেয়ে ধর্ষণের বিচার চায় তখন তা যে কতটা মর্মান্তিক তা খুব বেশী মানুষকে হয়ত ভাবায় নি। ঢাবি’র শিক্ষার্থী বলে মেয়েটি যে পরিমাণ সাধারণের সহানুভূতি ( পাবলিক সিমপেথি ) অর্জন করেছে ততটা স্বপন মামার প্রতিবন্ধী মেয়ে পেড়েছে কি? না আমারা দেখিয়েছি।

প্রথম ধর্ষিতা মেয়েটি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে আর পরের বর্ণনা করা মেয়েটি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে চা বিক্রি করা এক বাবার প্রতিবন্ধি মেয়ে। প্রত্যেকটি মেয়ের সম্মান সমান গুরুত্বপূর্ণ। সামাজিক অসংগতিগুলোতে সবার স্বত:স্ফূর্ত এবং সমান্তরাল অংশগ্রহণ দরকার। সমমানের হবার পরেও যদি তার আকার ও প্রকার বিবেচনা করা হয়, অবস্থান বিবেচনা করে বিচার করা হয় তাও এক প্রকার বর্ণবাদ এবং তা বিষাক্ত বর্ণবাদ। এই বিষাক্ত বর্ণবাদ সমাজের অসংগতিকে প্রকট করছে, জাতীয় ঐক্য বা জাতীয় সমস্যাকে অনেকের কাছে ব্যাক্তিগত সমস্যা বলে তুলে ধরছে।

ক নামের কোন ব্যাক্তি তার ছেলের জন্য টাকা দিয়ে চাকুরীর পাক্কা বন্দোবস্ত করলো। তার দেখাদেখি খ নামের ব্যাক্তিও তার ছেলের  চাকুরীর জন্য টাকা দিলো কিন্তু দূর্ভাগ্যবশত তার ছেলের চাকুরী হলো না। ক নামের ব্যাক্তি যেখানে ‍অবৈধ সুবিধা পাবার কারনে সন্তুষ্ট থাকবে সেখানে খ নামের ব্যাক্তিটি সুবিধা না পাবার কারণে অসন্তুষ্ট থাকবে। ক নামের ব্যাক্তির কাছে টাকা দিয়ে চাকুরী নেয়া অপরাধ বলে মনে না হওয়া স্বাভাবিক কিন্তু খ নামের ব্যাক্তির কাছে অবশ্যই অপরাধ বলে গণ্য হবে। আবার যে ছেলে তার যোগ্যতার পরিচয় দিয়ে চাকুরী পেতে চায় তার কাছেও বিষয়টি খুবই হতাশার ও অক্ষেপের। আবার যখন যোগ্যাতার প্রমাণ দেবার পর কেউ চাকুরী পায় তার কাছে টাকা দিয়ে কার চাকুরী হলো বা না হলো সেটিও আর সমস্যা থাকে না কিন্তু যে যোগ্যতার প্রমাণ দিতে গিয়েও সফল হয়নি তার কাছে বিষয়টি অনেক বড় সমস্যা । যদিও চাকুরী পেলে অন্যান্য অবস্থার মত তার কাছে হয়ত সমস্যাটি আর সমস্যা বলে মনে হতো না। এভাবে জাতীয় সমস্যাকে ব্যাক্তিগত সমস্যা করে বা সম্প্রদায়গত সমস্যা হিসেবে দেখে যে সমস্যার জন্ম হচ্ছে তা খুবই ভয়ংকর।

নিজেদের মত করে করা পার্থক্য নানা ভাবে সমাজের সামাজিক ঐক্যকে দূর্বল করছে। সৎ, সততা ও দৃঢ়তার যে ভিত্তি দরকার তা গড়তে সাহায্য করছে না। বাহ্যিক ও শুধুমাত্র নিজের দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করার মাধ্যমে যে সমস্যা দৃশ্যমান হচ্ছে তার কুফল যে সবার উপর কোন না কোন ভাবে পড়ছে তা বোধগম্য করা একরকম অকল্পনীয় হয়ে পড়ছে দিন দিন। শুধু এন্টিবায়োটিক দিয়ে রোগ সারিয়ে দেহের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমার মত অবিবেচক কাজগুলো খারাপভাবে সমাজে প্রভাব ফেলছে, নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে পরিবার, সমাজ ও সভ্যতায়। এর থেকে বেরিয়ে আসার জন্য চিন্তার সার্বজনীনতা দরকার; দরকার বিষাক্ত বর্ণবাদকে বাদ দেয়া।

২০২০ সালের ২৫ মে জজ ফ্লয়েড নামে যুক্তরাষ্ট্রে এক নিগ্রোকে পুলিশ মেরে ফেলে ও সেই মেরে ফেলার ভিডিওটি ভাইরাল হয়ে যায়।  তারপর তাদের দেশে করোনার মহামারির সময়ও চলতে থাকে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রতিবাদের পাশাপাশি রাস্তায় বেড়িয়ে প্রতিবাদ। প্রতিবাদ চলতে থাকে বেশ জোরালো ভাবেই।  তাদের দেশের মত বাংলাদেশের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোতেও চলতে থাকে প্রতিবাদ ও সমালোচনার ঝড়।সে সময় এমন ফেসবুক ব্যবহারকারীর সংখ্যা বাংলাদেশে খুব কম হবে যারা জজ ফ্লয়েড হত্যার প্রতিবাদ পোষ্টের মাধ্যমে করেনি। বাংলাদেশীরা বাংলাদেশে থেকেও যুক্তরাষ্ট্রে ঘটে যাওয়া অন্যায়ের প্রতিবাদ করছে; কতটা সচেতন তারা ভাবতে ভালোই লাগছে।

২ জুন ২০২০ ইং তারিখে বাংলাদেশে নিখিল নামে এক কৃষকে হত্যা করা হয়। তাস খেলাকে কেন্দ্রকে আটক হওয়া কৃষক নিখিলকে পুলিশী নির্যাতনে হত্যার অভিযোগ দায়ের করেন তার ভাই। বাংলাদেশের একজন কৃষক মারা গেল সে বিষয়টি সে সময় যতটা না বেশী গুরুত্ব পেয়েছে তার চেয়ে বোধকরি বেশী গুরুত্বপূর্ণ ছিলো জজ ফ্লয়েড হত্যা সেটি সে সময়কার গণমাধ্যম বিশেষ করে সমাজিক যোগযোগ মাধ্যমে লক্ষ্য করলে দেখা যাবে। বাংলাদেশে ৫৪ ধারার মত ধারা নিয়ে বরাবর নানা কথা উঠে আসলেও তার সার্বিক সমাধান এখনো আসে নি। বাংলাদেশর একজন কৃষক পুলিশি নির্যাতনে মারা গেলে যদি তা মাথা ব্যাথার কারন না হয় তবে অন্য দেশে কেউ মারা গেলে তার প্রতিবাদ জানিয়ে নিজেকে আধুনিক বা প্রভৃতি প্রমাণ করে খুব বেশী ফয়দা নেই। নিজেদের ভেতরকার যে বর্ণবাদ যা সমাজের সমস্যাগুলোকে সমাধান না করে বাড়াতে সাহায্য করছে তার সমাধান করা দরকার। এমন করে পালিয়ে বেড়াতে বেড়াতে এমন একটা সময় আসবে যখন পালানোর জায়গাগুলোও থাকবে না সরাসরি সমস্যা জর্জরিত হয়ে পড়তে হবে যার থেকে বের হওয়া হবে খুব কঠিন।

ঢাকা শহরে রিক্সা তুলে দেবার জন্য ব্যবস্থা নেয়া হয়। বলা হয় যে জ্যাম তৈরী হবার জন্য এর প্রভাব প্রচন্ড নেতিবাচক। ঢাকার রাস্তায় এতো এতো প্রাইভেট কার বা যত্রতত্র বাস থামানো বা যাত্রি উঠানো নামনোর বিষয়ে কিন্তু সে রকম কার্যকরী কোন পদক্ষেপ নাই। আবার পরিবহন আইন, ২০১৮ সংশোধন করে ২০২০ সালে নতুন বিধান সংযোজন করা হলে ও তার বাস্তবায়নের জোর চেষ্টা চালালে পরিবহন ধর্মঘটের কারনে আইনের প্রয়োগ স্থগিত রাখা হয়। সার্বজনীনতার অভাব ও সমস্যার সার্বিক দিক বিচার না করায় এই সমস্যা গুলো কখনো না কখনো সমাজের প্রত্যেক ব্যাক্তিকে ভুগালেও একার মত কথা বলে, দোকানের চায়ের আড্ডায় হয়ত তার প্রতিবাদী মনের প্রকাশ ঘটায় কিন্তু কেউ যদি রাস্তায় দাড়াতে বলে বা দাড়ানোর জন্য লোকবল সংগ্রহ করতে যায় তখন কোন বিদ্রোহী মন ও মানুষ আর তাতে সাড়া দেয় না। এমন করে প্রতিবাদ প্রতিরোধগুলো হারিয়ে যায়, হারিয়ে যায় সমাজ ও সংস্কৃতির নিজস্বতা।

বুঝে হোক বা না বুঝে হোক একটি সমাজে বসবাস করা সমস্যা একজনের হলেও তা সামষ্টিক। আজ কোন ব্যাক্তি যদি ন্যায় বিচার না পায়, সমাজ থেকে যে সাহায্য সহযোগিতা দরকার তা না আসে তাহলে সমস্যা গুলো একজন ‍দু’জন করে করে প্রভাব বিস্তার করতেই থাকবে। তখন ব্যাক্তি নিরাপত্তার অযুহাত সবার জন্য নিরাপত্তা ঝুকি তৈরী করবে। কতগুলো ব্যাক্তির সামনে যখন কতগুলো ছেলে জোর করে টাকা পয়সা ছিনিয়ে নিতে পারে তখন তাদের সে ছিনতাই করার বদ সাহস ও খারাপ কাজ করায় আনন্দ বৃদ্ধি পাবে। চোখের সামনে এমন অপরাধ হলেও তার প্রতিবাদ ও তা বন্ধ করতে সামষ্টিক উদ্যোগ না থাকলে কেউ কারো বিপদে এগিয়ে আসবে না। সবার সামনে সবাই অনিরাপদ হয়ে পড়বে, নিজেকে বিশ্বাস করতেও কষ্ট হবে।

বিষাক্ত বর্ণবাদ নিজের ভেতর ধারণ করে অভাবনীয় কোন পরিবর্তন আনা সম্ভব না। কৃষকের সমস্যায় যদি আপনি কথা বলতে না পারেন তাহলে ১০ টাকা কেজির পেয়াজ ৩০০ টাকা হলে শুধু কপাল চাপড়াবেন ও ফেসবুকে সমালোচনা করবেন। কেননা দাম বাড়ার পিছনে যারা দায়ী কোন না কোন ভাবে আপনিও তার একজন। খাবেন দাবেন আর ঘুমাবেন এমন করে পেট ভরবে কিন্তু মন ভরবে না। সমস্যাগুলো সমস্যা হিসেবে দেখিয়ে তার সমাধান করার জন্য চাপ না দিতে পারলে তা সমাধান হবে না। নিজেকে গুটিয়ে রাখলে গন্তব্য খুব সংকীর্ণ হবে ও ভোগান্তি বাড়বে।

যখন ঢাকা, রাজশাহী প্রভূতি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাথে সদ্য প্রতিষ্ঠিত কোন বিশ্ববিদ্যালয়ের মানে বা জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক শিক্ষার্থীর মান ও জ্ঞানের তারতম্য নিয়ে ভাবা হয় তখন শিক্ষার বৈষম্য প্রকট সেটি স্বিকার করে নেয়া হয় যা শিক্ষার মূল উদ্দেশ্যের জন্য ক্ষতিকর। বর্ণবাদ শুধু বর্ণ দিয়েই নয় কথায়, চিন্তায়, আচরণে ও অভ্যাসে এমন ভাবে আছে যা ভালোকে ভালো করতে দেয় না। মানুষে মানুষে চিন্তার বিস্তর ব্যবধান রেখে সবাইকে একত্র করা যায় না। এই বর্ণবাদ সাম্যের জন্য বৈষম্য করে না বরং বৈষম্য যেন বিস্তার লাভ করে তার জন্যই করা হয়। সাধারণ সমস্যা ও সাধারন চিন্তার জায়গা থেকেই সার্বজনীন সাফল্য আনা যাবে।  নিজের অবস্থান পরিস্কার না করে পরিবর্তনে শরীক হওয়া ও স্বত:স্ফূর্ততা ধরে রাখা কঠিন। বিষাক্ত বর্ণবাদ ও গড়পড়তা আবেগ রেখে নিজেকেও আলোকিত করতে হবে অন্যকেও দিতে হবে অংশ।

তথ্যসূত্র:

১. https://www.somoynews.tv/pages/details/191557

২. https://www.banglatribune.com/others/news/603109

https://bn.wikipedia.org/

https://www.banglatribune.com/country/news/627074

লেখক: আইন বিশ্লেষক ও কলামিস্ট।

 

Close