সাহিত্য ও সংস্কৃতি

অসহ্য প্রিয় মানুষ

সবনাজ মোস্তারী স্মৃতি

আজ আকাশে চাঁদ নেই।শিখা চুপচাপ বারান্দায় বসে আছে।সারাদিন অফিস করে রাতে বাড়ি ফিরে একা বারান্দায় বসে রাতের শহরটা দেখে। এটা তার প্রতি দিনের একটা অভ্যাস বলা যেতে পারে । কত তাড়াতাড়ি শহরটা বদলে গেলো ।অথচ শিখা বদলাতে পারেনি।তার একা থাকাটা যেনো এখন একটা নিয়মের মাঝে পরে গেছে।তার আর ভালো লাগে না এ শহর। মুক্তি পেতে ইচ্ছে করে এ শহর থেকে। তবে তার মুক্তি মেলে না।চলে যেতে ইচ্ছে করে পাহাড়ে। ইচ্ছে করে পাহাড়ের মানুষগুলোর সাথে তাদের মত করে বাচঁতে।রাশেদের সাথে তেমন করেই স্বপ্ন দেখেছিলো।রাশেদও ছিলো পাগল তাইতো শিখার এ আবদারগুলোকে সায় দিতো।
কিন্তু রাশেদ এখন আর শিখার কোনো কথায় শুনে না।অফিস আর টাকার পিছনে ছুটতে ব্যস্ত।শিখা নামের কাউকে হয়তো রাশেদ এখন চিনে না।কিন্তু‘ একটা সময় শিখা বলতে পাগল ছিলো রাশেদ।
সময় এমন একটা জিনিস যা খুব তাড়াতাড়ি সব কিছু পালটে দেয়।শুধু কিছু মানুষকে পালটাতে পারে না।তাদের মধ্যে শিখা একজন।সব কিছুই যেনো অসহ্য।একা থাকতে ভালো লাগে না।আশেপাশের মানুষ জন,পরিবেশ সব কিছু অসহ্য লাগে।তবে কিছু করার নেই শিখার।মাঝে মাঝে ইচ্ছে করে পছন্দের মানুষগুলোকে খুন করে ফেলতে।পছন্দের মানুষ না ভালোবাসলেও, একজন সুস্থ্য মস্তিকের মানুষ কখনো খুন করতে চাইবে না যতই প্রিয় মানুষটা কষ্ট দেক।তবে শিখার সব সময় মনে হয় তার প্রিয় মানুষগুলোকে খুন করে দিতে। যাতে করে অন্যকারো কাছে প্রিয় হতে না পারে।শিখার ইচ্ছেগুলো একদম আলাদা।
একটা ডাইরি নিয়ে শিখা তার বিছানায় শুয়ে পরলো। কারণ এখন তার রাদেশকে ভিষণ ভাবে মনে পড়ছে।ডাইরির পাতা খুলে একটা কালো টিপের উপর হাত বুলাচ্ছেছ শিখা। এই টিপটা রাশেদ শিখার কপালে পড়িয়ে দিয়েছিলো।শিখা কখনো টিপ পড়তো না ,পহেলা বৈশাখের মেলাতে রাশেদ শিখার কপালে এই টিপটা পড়িয়ে দিয়েছিলো।তাই খুব যত্নকরে টিপটা রেখে দিয়েছে শিখা তার ডাইরিতে।
এটা হয়তো রাশেদ জানে না।ফোনটা হাতে নিয়ে রাশেদকে ফোন দিবে কি না তাই ভেবে ফোনটা দিয়ে দিলো।অপর পাশ থেকে রাশেদ ফোনটা রিসিভ করে খুব স্বাভাবিক ভাবেই বলল কেমন আছো শিখা?
আজ কাল বড্ড তোমার কথা মনে পড়ে। তাই ভাবছিলাম শুক্রবার তোমার বাড়ির সামনে গিয়ে একে বারে সারপ্রাইজ দিবো।তার আগেই তুমি ফোন দিয়ে দিলে।
শিখা কোনো উত্তর না দিয়ে বলল রাশেদ বিয়ে করবে আমাই?তারপর দুজনে পাহাড়ে চলে যাবো।অপর পাশ থেকে রাশেদ হাসতে হাসতে বলল তোমার এখনো পাহাড়ে যাবার ইচ্ছাআছে?
শিখা বলল হুম খুব ইচ্ছে।
রাশেদ হাসছে। তাদেরকথা বলার ভাব ভঙ্গি দেখে মনে হচ্ছেছ না দীর্ঘ দিন তাদের কথা হয়নি। মনে হ”েছ গত কালকেই কথা হয়েছে।রাশেদ শিখাকে বলল কাল দেখা করি আামরা? শিখা জিজ্ঞেস করলো আমি কী কালো শাড়ি পড়বো রাশেদ?
রাশেদ বলল কালো পড়বে কেনো তুমি একটা লাল রং এর শাড়ি পড়ে এসো কেমন।শিখা আস্তে করেবলল লাল শাড়ি পড়লে যে আমার রক্ত নিয়ে খেলতে ইচ্ছে করে রাশেদ!
রাশেদ খুব অবাক হয়ে বলল কী সব বলছো শিখা তুমি কি পাগল হলে নাকি।
শিখা তাড়াতাড়ি কথা কাটিয়ে দিয়ে বলর তোমার সাথে মজা করলাম।কাল তাহলো বুড়িগঙ্গা নদীর তরী আমি তোমার জন্য অপেক্ষা করবো। তুমি চলে এসো বিকাল পাঁচটার দিক।রাশেদ বলল কাল আমি তোমার জন্য অপেক্ষা করবো, তুমি নয় শিখা। আমি তোমাকে অনেক অপক্ষো করিয়েছি আর নয় । এবার তোমার অপেক্ষার পালা শেষ হবে।
শিখা লাল শাড়ি পড়ে আয়নার সামনে দাড়িঁয়ে নিজেকে গভীর আগ্রহ নিয়ে দেখছে। নিজেকে মানুষ এই ভাবে দেখে আগে শিখার জানা ছিলো না,আজও নেই। কেনো নিজেকে এই ভাবে দেখছে তা জানে না ।
রাশেদ আর শিখা দুজনে চুপচাপ দাড়িঁযে আছে বুড়িগঙ্গা নদীর ধারে সন্ধের ফুরফুরে বাতাস তাদের গায়ে লাগছে। একটু শীত শীত ভাব।নভেম্বারের প্রখম দিক শীত শীত ভাবতো থাকবেই।শিখার দিকে তাকিয়ে রাশেদ বলল তুমি লার রং পছন্দ করো না অথচ তোমাকে লাল রং এর শাড়ি পড়ে কত সুন্দর লাগছে তুমি কি তা জানো?
না জানি না ।তবে তুমি যখন বললে তাহলে তা সত্যি। লাল রং এর শাড়ি পড়ে আমাকে খুব সুন্দরলাগছে।রাশেদ চলো আমরা বড় রাস্তায় হাটি।তুমি হাটতে এখনো ভালোবাসো শিখা?গত এক বছরে তোমার কোনো কিছু বদলাইনি।তুমি ঠিক আগের মতই আছো।আমি দুঃখিত শিখা এই এক বছর তোমার সাথে যোগাযোগ বন্ধ রাখার জন্য।
শিখা বলল চলো হাটি।রাশেদ আর শিখা দুজনে বড় রাস্তার ফুটপাত ধরে হাটছে।
হঠাৎ শিখা বলল জানো রাশেদ তোমাকে আমি খুব ভালোবাসি তবে তোমাকে আমার কেনো যেনোএখন খুব অসহ্য লাগছে । রাশেদ কিছু বলার আগেই চলন্ত ট্রাকের সামনে ধাক্কা দিয়ে রাশেদকে ফেলে দিলো শিখা।
রাশেদ রক্তাক্ত অব¯’ায় ছিটকে পড়লো রাস্তার পাশে।রাস্তার আশেপাশের মানুষজন রাশেদ কে ঘিরে দাড়াঁলো। ভীড় ঠেলে শিখা রাশেদের পাশে বসে মৃত দেহটা তার কোলের উপর তুলে কানে কানে বলল,বুঝছো রাশেদ প্রিয় মানুষও অসহ্য হয়।

Close