মোহনপুরশিরোনাম

রাজশাহীতে জমজমাট মৃৎশিল্পের ব্যবসা

সবনাজ মোস্তারী স্মৃতি: বাংলাদেশ রূপবৈচিত্র্যের দেশ। এদেশে অতীতকাল থেকেই হাজার ধরনের সংস্কৃতি পালন করা হয়। যার একটি অন্যান্য নিদর্শন হলো, মৃৎশিল্প।

মৃৎ মানে মাটি, আর শিল্প মানে সুন্দর সৃষ্টিশীল বস্তু। তাই মাটি দিয়ে নিজ হাতে তৈরি শিল্পকর্মকে মৃৎশিল্প বলে। এই শিল্পটি হলো বাংলাদেশের সবচেয়ে প্রাচীন ও অন্যতম একটি শিল্প। মাটি দিয়ে তৈরি এই শিল্প কর্মের মধ্যে রয়েছে মাটির কলস, হাঁড়ি, সরা, বাসন, কোসন, পেয়ালা, সরাই মটকা, শালা, পিঠে তৈরির ছাঁচ ইত্যাদি। এই শিল্পের প্রধান উপকরণ হলো মাটি। আর এই শিল্পের প্রধান শিল্পী হলো আমাদের কুমার সম্প্রদায়। কুমার সম্প্রদায়ের হাতের নৈপুণ্য ও কারিগরি জ্ঞানে মাটি দিয়ে তৈরি শিল্পকর্মকে মাটির শিল্প বা মৃৎশিল্প বলা হয়।

আমাদের দেশেও আদি আমল থেকে মৃৎশিল্পের চলন চলে আসছে। পোড়ামাটির নানাবিধি কাজ, গৃহস্থালির নিত্যব্যবহার্য দ্রব্যাদি, পুতুল, খেলনা, প্রতিমা, প্রতিকৃতি, টব, শোপিসসহ অসংখ্য জিনিস আজও কুমারশালায় তৈরি হয়। আর ক্রেতাদের কাছে এখনও এর চাহিদা অনেক। এক সময় কাউকে মাটির তৈরি হাঁড়ি কিংবা গণেশের মূর্তি দিলে বিনিময়ে ওই পাত্রে বা মূর্তির পেটে যত চাল ধরে তত চাল দেয়া হতো শিল্পীকে। মাটির তৈরি বিভিন্ন রকমারি আসবাবপত্র চেয়ার, টেবিল ইত্যাদির চাহিদা এখনও লক্ষণীয়। প্রাচীনকাল থেকেই মৃৎশিল্প বিভিন্ন সভ্যতায় অনেক মর্যাদা লাভ করেছে।

এ নিয়ে রাজশাহী সাহেব বাজারের মৃৎশিল্প ব্যবসায় আব্দুল হান্নানের সাথে কথা বললে তিনি বলেন, এই মৃৎশিল্প ব্যবসা তার দাদা বাবারাও করতেন। সেই সূত্র ধরে তিনিও এই ব্যবসায়ের সাথে জরিত। প্রায় ৫৫ বছর থেকে তিনি এ ব্যবসা করে আসছেন। তিনি বলেন বর্তমানে মৃৎশিল্পের চাহিদা আগের থেকে অনেক বেশি। তার কারণ এখন এর কোয়ালিটি আগের থেকে অনেক ভালো। আগে এত রকম কোয়ালিটি ছিলো না। যার কারণে এখন অনেকে শখের বসে এই মৃৎশিল্প কিনে থাকেন এবং ঘর সাজাবার জন্য মৃৎশিল্প দারুন ভাবে ব্যবহার করে।।

তিনি আরো বলেন, এখন শীতকাল চলছে। এই শীতকালে সবচেয়ে বেশি বিক্রি হচ্ছে রুটি শেকা, চিতই পিঠা তৈরী করার খোলা এবং ভাপা পিঠা তৈরী করার হাঁড়ি। এছাড়াও ফুলদানি, শখের হাড়ি, মাটির কাপ, থালা ইত্যাদি আগের থেকে এখন অনেক বিক্রি হয়। এখন মানুষ সব ক্ষেত্রেই ডেকোরেশনের গুরুত্ব দেন বেশি, তাই এসব জিনিসের চাহিদাও বেশি।

এক একটা ফুলদানি সর্বনিম্ন ৮০ টাকা এবং সর্বোচ্চ ৭০০ টাকায় বিক্রি হয়। এছাড়াও মাটির তৈরী পানির ফিল্টারগুলোর দাম ৫৫০ থেকে ৭০০ টাকার মধ্যে। এই ফিল্টারে পানি ঠান্ডা থাকে। আর কাপ প্লেটগুলো এক পিস বিক্রি হয় ১২০ টাকা।

কেউ চাইলেই স্বল্প খরচে ডাইনিং বা ড্রইং রুমের সবকিছুই সাজাতে পারেন মাটির পণ্য দিয়ে। খাবার প্লেট থেকে চায়ের কাপ বা কোরমাদানি থেকে থেকে ভাতের হাঁড়িও পাওয়া যায় এই দোকানে। একদিকে নিজের সংস্কৃতি ও অন্যদিকে দাম অন্যান্য পণ্যের তুলনায় কিছুটা কম হওয়ায়ই মাটি শিল্পের দিন দিন কদরও বাড়ছে।

গহনার সঙ্গে বাঙালী নারীর সম্পর্ক যুগ-যুগান্তরের। বর্তমান যুগে তরুণীদের কাছে মাটির গহনার ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। যে কোন উৎসব যেমন- পহেলা বৈশাখ, পহেলা ফাল্গুন, ধর্মীয় অনুষ্ঠান ইত্যাদিতে মাটির গহনার চাহিদা বেশি দেখা যায়।

এসব উৎসব উপলক্ষে যে মেলা বসে সেখানে মাটির গহনার বিক্রির পরিমাণও বেশি দেখা যায়। বর্তমান সময়ে আঠালো মাটি দিয়ে এখন শুধু বাসন-কোসনই তৈরি হয় না। শিল্পের ছোঁয়ায় তৈরি হচ্ছে অলঙ্কার ও নানা রকমের দৃষ্টিনন্দন টেরাকোটা। পোড়ামাটির অলঙ্কার ও টেরাকোটা ইতোমধ্যে দেশে ব্যাপক পরিচিতি লাভ করেছে।

বরেন্দ্র বার্তা/ নাসি

Close