শিরোনামসম্পাদকীয়-কলাম

আমরাই কেবল সংকীর্ণতায় ভুগছি

- এহসানুল আমিন ইমন

ভাস্কর্য, ছবি, মূর্তি থাকা নিয়ে যে বক্তব্য মওলানা সাহেবেরা হাজির করছেন তা আসলে মধ্যপ্রাচ্যের তৎকালীন কালচারের কথা বলা হয়েছে। পৌত্তলিকা পূজা হারাম – এইটি ধর্মের মৌল বিষয়। কিন্তু এর বাইরে যা বলা হচ্ছে তা ইসলাম ধর্মের মৌলিক কথা কি? না কি সেইটা ইতিহাস ও কালচার?

প্রথম কথা হচ্ছে দেশের কালচারটা নির্ভর করে সে দেশের মানুষ, সোসিও ডেমোগ্রাফিক ক্যারেক্টার, অর্থনৈতিক অবস্থা, ইতিহাস, ঐতিহ্য, প্রাকৃতিক পরিবেশ -এগুলোর উপরে। আমাদের দেশ মধ্যপ্রাচ্যের কালচারে যাবে কিনা ( যদিও সেটা সেখানেই এখন পরিত্যক্ত) সেইটা সিদ্ধান্তের বিষয়। এর সাথে ধর্মের মূল বিষয়বস্তুর সাথে দূরতম সম্পর্ক নেই। আমরা আমাদের লাইফস্টাইলে এই সংস্কৃতির খুব কম অংশই মেনে থাকি। কাজেই এখন ভাস্কর্যের বিরোধীতার নামে যা হচ্ছে তার নাম রাজনীতি।

তবে এটা হটাৎ করে উবে আসা বিষয় নয়। বিচ্ছিন্ন বিষয়ও নয়। প্রগতি বিরোধী এই কাজ অনেকদিন ধরেই হচ্ছে, আর আমরা পাশের বাড়ির সমস্যা মনে করে হাওয়া দিয়ে গিয়েছি। এই ভাস্কর্য ভাঙ্গার সংস্কৃতি পুরোনো। এর আগেও ধর্মের দোহায় দিয়ে এই অপকর্ম গুলো হয়েছে। আমরা শাসক দল, বিরোধীদল চোখ বন্ধ করে থেকেছি। মার খেয়েছে বাউলেরা, মূর্তি ভেঙ্গেছে লালনের। বাম দলগুলোর চিৎকার সরকার কর্ণপাত করেনি। ভোটের রাজনীতি এতটাই পাওয়ারফুল যে আদর্শ তার কাছে বার বার হার মানে। সুপ্রিমকোর্টের সামনে যে স্থাপত্য অপসারণ করা হলো সে দিনই সরকারের নৈতিক পরাজয় হয়েছে। আজকের ঘটনার প্লট সেদিন তৈরী হয়ে গেছে। এর বিরুদ্ধে গড়ে ওঠা আন্দোলনকে সেদিন পুলিশ পিটিয়ে রাস্তা ছাড়া করেছিল। ছাত্র ইউনিয়ন নেতা দিপকদের পিঠের দাগ মিলিয়ে যাবার আগেই বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য অপসারনের দাবী উঠলো। সরকার সমর্থিত অনেকেই এই বিষয়টি ভিন্ন আদলে ব্যাখ্যা দেবার চেষ্টা করছেন। আমার মনে হয় তারাও আসলে পক্ষান্তরে আজকে মৌলবাদীদের এই লড়াইয়ে সহায়ক হিসেবে কাজ করছেন, হয়তো না জেনেই।

খুব মনে পড়ছে বোমা হামলার ঘটনা গুলোর কথা। উদীচী, সিপিবি, ছায়ানটের ঘটনা গুলোর ধারাবাহিকতায় অনেক ঘটনা ঘটে গেছে। সেদিন সিপিবির হরতাল বিরোধী মিছিলে আওয়ামীলীগের হামলা, সিপিবি নেতা কমরেড মুজাহিদুল ইসলাম সেলিমের মাফলার ধরে টানছেন আরেক আওয়ামীলীগ জননেতা মোফাজ্জল হোসেন মায়া- এই সব অনাকাঙ্খিত দৃশ্যগুলো না থাকলে, সকলের আদর্শিক দৃঢ়তা থাকলে হয়তো বঙ্গবন্ধু এভিনিউ এর ঘটনা, সিরিজ বোমা হামলার মতো বেদনাদায়ক ঘটনা গুলো আটকানো যেতো, যদি আমরা দলকানা না হতাম। আমাদের বুঝতে বুঝতে এত সময় লাগে তখন অনেক অর্জন আমাদের হারাতে হয়।

আজকের প্রেক্ষাপট ভাস্কর্য থাকা বা না থাকা নয়, সেটা বঙ্গবন্ধুর না রাজু ভাস্কর্য-প্রশ্নটা আসলে সেটা নয়, প্রশ্নটা আদর্শের। একজন মৌলবাদী বক্তা যথার্থই বলেছেন, তারা বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য যেমন অপসারণ করতে চায়, তেমনি জিয়াউর রহমানের ভাস্কর্য থাকলে সেটাও তারা নিশ্চিহ্ন করতে চায়। বিষয়টাকে তার আদর্শের জায়গা থেকেই দেখছে। আমরাই কেবল সংকীর্ণতায় ভুগছি।

Close