নাগরিক মতামতশিরোনাম

না ফেরার দেশে চলে গেলেন রাজশাহী জজকোর্টে পতাকা তোলা বীর মুক্তিযোদ্ধা আফজাল হোসেন ছবি

- নাদিম সিনা

৫ ডিসেম্বর সকালে ঢাকার স্কয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় না ফেরার দেশে চলে গেলেন বীর মুক্তিযোদ্ধা আফজাল হোসেন ছবি। তিনি ছিলেন রাজশাহীর হড়গ্রাম পাড়ার আব্দুল আজিজ ও আয়েশা বেগমের সাহসী সন্তান এবং রাজশাহী নিউ গভ. ডিগ্রী কলেজের সাবেক ছাত্রনেতা। মুক্তিযুদ্ধের তথ্য সংগ্রাহক ওয়ালিউর রহমান বাবুর সাথে আলাপচারিতায় জানলাম এই বীরযোদ্ধার ৭১সনের বিরত্বগাঁথা।
১৯৭১ সনের ১ মার্চ, তখন দুপুর ১টা। সংবাদের পরিবর্তে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান তার বেতার ভাষণে পার্লামেন্ট স্থগিত করলেন। তখনই প্রতিবাদের সিদ্ধান্ত নিয়ে রাজশাহী কলেজে অফিস ভবনের সামনের প্রতিবাদ সভার বৃহত্তর ঐক্য থেকে ঘোষণা করা হল “আর কোন দফা নয়, এক দফা স্বাধীনতা।” রাজশাহী কলেজ থেকে মিছিল বের হয়ে পশ্চিম দিকে যেতে থাকলে ছাত্র-জনতা, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা কর্মচারীরা এক হয়ে গেল। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের পাকিস্তানী পতাকায় আগুন দেয়া হতে থাকলো। রাজশাহী কলেজ থেকে বের হওয়া মিছিলে যোগ দিয়ে আফজাল হোসেন ছবি রাজপথ উত্তাল করে তুললেন।

কোর্ট চত্বরে জেলা প্রশাসকের অফিসের পাকিস্তানী পতাকা পোড়ানোর পর জজকোর্টের পতাকা নামানোর কাজটি ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠলে এ কাজটি করতে তিনি রাজশাহী কলেজের ছাত্র দরগাপাড়ার সাব্বির হোসেন মতিকে সহযোগিতা করলেন। পোড়া পতাকাটির কিছু অংশ লাঠির আগায় লাগিয়ে ছাত্রনেতা চৌধুরী খুরশিদ বিন আলমের নেতৃত্বে ছাত্র-জনতার মিছিলে অংশ নিয়ে বেতার কেন্দ্রের সামনে আসতেই বেতার কেন্দ্রের ভিতর থেকে এক সৈন্য অস্ত্র তাক করলে মিছিলটি থমকে যায়। অনেকে আশে পাশে আশ্রয় নিতে থাকলেন। এসময় সেনাবাহিনীর এক অফিসার অস্ত্র তাক করা সৈনিকটিকে নিবৃত করলেন। ছত্রভঙ্গ হয়ে যাওয়া ছাত্র-জনতা আবার মিছিল করে সিএন্ডবির মোড়ে আসতেই খবর পাওয়া গেল বর্ণালী সিনেমা হলে উর্দু ছবি “রোড টু সোয়াত” চলছে।

মিছিলকারীদের সাথে সেখানে গিয়ে তিনি সিনেমাটির প্রদর্শনী বন্ধ করে দিলেন। ‘‘জয় বাংলা’’ শ্লোগান দিয়ে মিছিলটি ভুবনমোহন পার্কে এলে প্রতিবাদ সভা শুরু হয়ে গেল। “তোমার আমার ঠিকানা, পদ্মা মেঘনা যমুনা” শ্লোগানে রাজশাহী জেলা সদর কেঁপে উঠলো। ৩ মার্চ হরতাল চলাকালে মিছিলটি রাজশাহী জেলা সদরের মালোপাড়া টেলিফোন অফিসের সামনে দিয়ে যাবার সময় সেখানে থাকা সেনাবাহিনী দেখে মিছিলে থাকা সকলে উত্তেজিত হয়ে উঠলেন। সেনাবাহিনীর ছোড়া গুলিতে সেখানে রাজশাহী লোকনাথ হাই স্কুলের ছাত্র সিদ্দিক, কলেজিয়েট স্কুলের ছাত্র আনোয়ার হোসেন, সিরোইল হাই স্কুলের নুরুল ইসলাম সহ অনেকে গুলিবিদ্ধ হলেন। মিছিলকারীরা আশে পাশের বাড়ি ঘরে আশ্রয় নিলেন। মালোপাড়া টেলিফোন অফিসের সামনের রাস্তাটি রক্তে লাল হয়ে গেল।

আফজাল হোসেন ছবি ঝুঁকি উপেক্ষা করে আহতদের মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠাতে থাকলেন। হাসপাতালের অপারেশন থিয়েটারে আহতদের জন্য রক্ত দিতে ভীড় বাড়তে লাগলো। আহত এক অজ্ঞাত তার শরীরের তাজা রক্ত দিয়ে গণকপাড়ার (সে সময়কার মুসলিম কর্মাশিয়াল ব্যাংক) রুপালী ব্যাংকের দেওয়ালে ‘বাংলা স্বাধীন কর’ রক্ত স্বাক্ষর লিখে সকলকে উজ্জীবিত করলেন, এই লিখাটি সবাইকে সাহসী করে তুললো।
৭ মার্চ বঙ্গবন্ধুর দিক নির্দেশনাটি শুনতে না পেয়ে আফজাল হোসেন ছবি প্রতিবাদী হয়ে উঠলেন। পরের দিন ৮ মার্চ বঙ্গবন্ধুর দিক নির্দেশনা শোনার পর অসহযোগ আন্দোলন-প্রতিরোধকে সফল করতে সকলকে উজ্জীবিত করতে থাকলেন। রাজশাহী সদরের মিয়াপাড়া পাবলিক লাইব্রেরীতে জামে উদ্দিন, রুহুল আমিন প্রামাণিক, আব্দুল মালেক, সেকেন্দার আবু জাফর, শফিকুর রহমান রাজা, মাহাতাব উদ্দিন, মোর্শেদ কোরাইশী স্বপন, সাইদুল ইসলাম প্রমুখের কাছে ট্রেনিং নিলেন। ধীরে ধীরে রাজশাহীর পরিস্থিতি পাল্টে যেতে লাগলো। তরুণ যুবকদের হাতে হাতে মার্কস, লেনিন, মাও সে তুং, চে গুয়েভারা, নেতাজী সুভাষ বোসের বিপ্লবী বই এসে গেল।

যোদ্ধারা তখন হাতের তৈরী বিস্ফোরক ফাটিয়ে পাকিস্তানী সৈন্যদের শক্তিশালি মনোবল দুর্বল করে দিতে থাকলেন। বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও রসায়নগার থেকে রাসায়নিক দ্রব্যাদি সংগ্রহ করা হলো। অস্ত্র সংগ্রহের চেষ্টা চলতে থাকলো, রাতের রাজশাহী গেরিলাদের হয়ে গেল। ২১মার্চ সন্ধ্যায় পর খবর পাওয়া গেল রাজশাহী জেলা সদরের ঘোড়ামারা বোয়ালিয়া থানার পাশে একটি বাড়িতে স্বাধীনতার ইশতেহার ও পতাকার নমুনা এসেছে। ২৩ মার্চ ছাত্র জনতার মিছিল রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব ও ছাত্র নেতাদের নেতৃত্বে কোর্ট চত্ত্বরে গেলে “জয় বাংলা”, “তোমার আমার ঠিকানা, পদ্মা মেঘনা যমুনা” শ্লোগানে কোর্ট চত্ত্বর উত্তাল হয়ে উঠলো।

এখানে থাকা সেনাবাহিনীর কড়া পাহারার মধ্যেই সিদ্ধান্ত হলো, যে করেই হোক কোর্ট চত্ত্বরে স্বাধীন বাংলার পতাকা তুলতে হবে। জজকোর্ট ভবনে পতাকা কে তুলবে, এ নিয়ে নেতারা কথা বলার মুহুর্তে বীর মুক্তিযোদ্ধা রুহুল আমিন প্রামাণিক আফজাল হোসেন ছবি’কে এ দায়িত্ব দিলেন। ছাত্র জনতার মিলিত ঐক্য তাঁকে দেশ প্রেমে উদ্ভুদ্ধ করে সাহসী করে তুললো। দেরী না করে তিনি দেশের স্বাধীনতার জন্য নিজেকে সঁপে দিয়ে দৌঁড়ে সিঁড়ি বেয়ে জজকোর্ট ভবনের ছাদে উঠে ফ্লাগষ্টান্ডে পতাকাটি উড়িয়ে দিলেন। মুহুর্তের মধ্যেই ‘‘জয় বাংলা’’ শ্লোগানে রাজশাহী কোর্ট চত্ত্বর ও আশেপাশের এলাকা উত্তাল হয়ে উঠলো। পরবর্তীতে তিনি প্রতিরোধ যুদ্ধ ও মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিলেন।

লেখক: সাংবাদিক, বরেন্দ্র বার্তা।

Close