অর্থ ও বাণিজ্যচাঁপাই নবাবগঞ্জশিরোনাম

চাঁপাইনবাবগঞ্জে আমের দাম কম লোকসানের মুখে ব্যবসায়ীরা

চাঁপাইনবাবগঞ্জ প্রতিনিধিঃ বছরের মে হতে আগস্ট মাস আম কেনাবেচার ভরা মৌসুম হলেও এবার চিত্রটা সম্পূর্ন উল্টো। জুন পেরিয়ে জুলাই’র প্রথম সপ্তাহ শেষ হতে চললেও এখনো জমে উঠেনি আমের রাজধানী খ্যাত উত্তর বঙ্গের বৃহত্তর চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার  কানসাট আম বাজার। আমের বাজার জমে না উঠায় এ জেলার প্রধান অর্থকারী ফসল আম চাষ করে প্রকৃত মূল্য না পাওয়ায় আম চাষি, ব্যবসায়ী ও শতাধিক  আম আড়তদার হতাশ হয়ে  পড়েছে। তবে কৃষি বিভাগ বলছে উৎপাদন বেশী হওয়ায় প্রথম দিকে আমের বাজার কিছুটা খারাপ হলেও ধীরে ধীরে চাঙ্গা হতে শুরু করেছে।

সরজমিনে আমের বৃহত্তম কানসাট বাজার সহ চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা সদর,গোমস্তাপুর, ভোলাহাট, রহনপুরসহ বিভিন্ন  আমের বাজার ঘুরে ও এসব অঞ্চলের আম চাষীদের সাথে আলাপ করে আম বাজার সম্পর্কে এক ভয়াবহ চিত্র পাওয়া গেছে। মঙ্গলবার কানসাট বাজারে আম বিক্রেতদের সাথে আলাপ করে জানা গেছে, ফজলী আম বিক্রী হচ্ছে প্রতি মণ ৮শ থেকে ৯শ টাকা, ল্যাংড়া আম ১২শ থেকে ২ হাজার টাকা, খীরসাপাত/ হিমসাগর আম ১৫শ থেকে ৩ হাজার টাকা,লখনা আম ৮শ থেকে ১১শ টাকা, গুঠি আম ৪শ থেকে ৫শ টাকা, বোম্বাই ১৩শ থেকে ১৫শ টাকা, বোগলা গুঠি আম ১৫ থেকে ২ হাজার টাকা এবং মোহনভোগ আম বিক্রী হচ্ছে  ৫শ থেকে ৬শ টাকা দরে।

কানসাট বাজারে আম বিক্রী করতে আসা শিবগঞ্জ উপজেলার মনাকষা ইউনিয়নাধীন চৌকা গ্রামের  আম ব্যবসায়ী শ্রী স্বাধীন কুমার সিংহ জানান, আমরা  ৪জন শেয়ারদার মিলে বিভিন্ন জাতের প্রায় ২ হাজার মণ (গাছে থাকা অবস্থায় অনুমানের ভিত্তিতে)কিনেছিলাম। তার মধ্যে প্রায় ১হাজার মণ বিক্রী করা হয়েছে। তাতে লোকসানের পাহাড় জমেছে। কারণ ভাটিতে ভারী বর্ষনের কারনে বড় বড় মোকামের মালিকরা আম না কেনায় এখন পর্যন্ত আমের দর বৃদ্ধি পাচ্ছে না। তিনি আরো জানান, বড় বড় আম বাগানে গুঠি অবস্থায় গাছ দেখে অনুমানের ভিত্তিতে যে পরিমান আম পাওয়া যাবে বলে ধারণা করেছিলাম তা কয়েক দফায় ঝড় ও শিলাবৃষ্টিতে ঝরে যাওয়ায় আশা অনুযায়ী আম পায়নি। তারপর যা ছিল সেগুলো স্প্রে, শ্রমিক ও জোগানদার(পাহারাদার)  খরচ  মিলে যে দাম পড়েছে তার থেকে অনেক কম দামে বিক্রি করতে হচ্ছে। তিনি আরো জানান আমার মত প্রায়  ৫ হাজারেরও বেশী আম ব্যবসায়ী মাথায় হাত।

শিবগঞ্জের বিশিষ্ট আম ব্যবসায়ী রুবেল জানান, ব্যবসার ক্ষেত্রে লাভ-লোকসান হয়। কিন্তু আমার  ব্যবসায়ী জীবনে এ বছরের মত আর কোন বছর এভাবে ক্ষতির সম্মুখীন হয়নি। তিনি আরো জানান, আমরা ৭জন শেয়ারদার মিলে প্রায় ১০ হাজার মণ আম কিনেছিলাম।প্রতিছর ভাগে প্রায় ৩লাখ টাকা করে লাভ পেতাম। এবার লাভ তো দুরের কথা নিজের জমিজমা বিক্রী করে বাগান ওয়ালাকে টাকা পরিশোধ করতে হবে। তিনি আরো জানান, যা অনুমান করেছিলাম তা থেকে মাত্র  ৪০% আম পেয়েছি এবং দর থেকে প্রতি মণে লোকসান হচ্ছে গড়ে প্রায় ৬-৭শ টাকা করে।

চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা সদরের মফস্বল এলাকার পুরোনো আম ব্যবসায়ী  সুকুমার,আব্দুস সামাদ ও সুবেদ আলি সহ কয়েকজন জানান, জুস তৈরীর আম ৪৮কেজিতে এক মণ আম বিক্রী হচ্ছে  ৪শ থেকে ৭শ টাকায়,পাকা গুঠি আম ৪৬কেজিতে এক হিসাবে বিক্রী হচ্ছে ৭শ টাকায়। আম ব্যবসায়ী ও আড়তদাররা জানান গত বছর এ সময় আমের দাম ছিল মণ প্রতি খীরসাপাত ২৮শ টাকা,গোপালভোগ ২৫শ টাকা, বোম্বাই ১হাজার টাকা, আম্রপলি ২৬শ টাকা, মল্লিকা ২৪শ

টাকা,ফজলী ১৬শ টাকা, সুরমা ফজলী ২হাজার টাকা, লখনা ২হাজার টাকা। তারা আরো জানান, ধীরে ধীরে আমের বাজার চাঙ্গা হতে শুরু করেছে। একই ধরনের চিত্র জেলার রহনপুর, গোমস্তাপুর, ভোলাহাটসহ অন্যান্য আম বাজারেও। কানসাট বাজারে আড়তদার সুমন জানান, গত বছর আমের আড়তদারী করে ৭জন শেয়ারদার মিলে ২৭ লাখ টাকা লাভ করেছিলাম। এবার মনে হচ্ছে ২৭লাখ টাকা লোকসান হবে। তিনি বলেন কানসাটে আমার মত প্রায় ৪শ আড়তের মাধ্যমে সহস্রাধীক আড়তদার আম কেনাবেচা করছে। আমার আড়ত থেকে এবার প্রতিদিন ২থেকে ৩ ট্রাক আম পাঠাচ্ছি। যা অন্যান্য বারের তুলনায় প্রায় অর্ধেক।

বড় বড় মোকাম ওয়ালারা দেশের দিনাজপুর, সাতক্ষীরা, রংপুর, মেহেরপুর,কুষ্টিয়া,যশোরসহ দেশের অন্যান্য জেলা থেকে প্রচুর আম কিনছে। ঐ সমস্ত জেলায় আম

কিনে তারা বেশী লাভবান হচ্ছে। তাছাড়া দেশের ভাটো দিকে ভারী বর্ষনের কারনে অনেক মোকামওয়ালা আম কিনা বন্ধ রেছেছে। তিনি আরো বলেন আমের বাজারে ধস নামার অন্যতম কারণ হলো জুস কোম্পনীর আম না কেনা। তারা প্রতিবছর প্রচুর আম কিনে। কিন্তু এবছর এখন পর্যন্ত কোন আম কিনছে না। তবে কয়েকদিনের মধ্যে আমের বাজার চাঙ্গা হতে পারে বলে আমরা আশাবাদী।  একই ধরনের কথা বললেন অন্যান্য উপজেলার আড়তদার মালিকাগণও। তবে  জেলার ৫টি উপজেলার বিভিন্ন অঞ্চলের ৩০/৪০জন জ্ঞানী গুনীদের অভিমত হলো,  চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলায়  আম একটি অর্থকারী ফসল। আমের বাজারে এভাবে ধস নামলে আম চাষী, আম ব্যবসায়ী ও আড়তদাররা হতাশ হয়ে নিজ নিজ অবস্থান থেকে সরে গেলে চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা অর্থনৈতিক দিক থেকে ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্থের মধ্যে পড়বে। তবে সরকারের সুদৃষ্টির মাধ্যমে যদি জেলায় আম থেকে বিভিন্ন ধরনের জুস তৈরীর কারখানা গড়ে তোলা হয়, তবে একদিকে যেমন আমের বাজার স্থায়ী ভাবে

চাঙ্গা হবে, অন্যদিকে তেমনি  অনেকটা বেকার সমস্যার সমাধান হবে। কানসাট আম আড়তদার ব্যবসায়ী সমন্বয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক বলেন, দেশের অন্যান্য জেলায় ব্যাপক হারে আমের চাষ হওয়ায় এবং চাঁপাাইনবাবাগঞ্জ জেলার আমের জন্য আলাদা

ব্রান্ডিং ব্যবস্থা না থাকায় ও আম এক্সপোর্ট করতে না পারায় শুধু শিবগঞ্জ নয় পুরো চাঁপাইনবাবগঞ্জের আম চাষী, ব্যবসায়ী ও আড়তদারগণ চরমভাবে

ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে। এব্যাপারে তিনি সরকারের সুদৃষ্টি কামনা করেন। জেলা কৃষি সম্প্রসারন সূত্রে জানা গেছে জেলায় এবছর ৫টি উপজেলায় ২২লাখ ৬০ হাজার হেক্টর জমিতে  হেক্টর প্রতি ১০ মেট্রিক টন হিসেবে আমের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ২লাখ ৯৫ হাজার ১শ ৫০ মেট্রিক টন। উল্লেখ্য যে, গত বছর ৫টি উপজেলায় আম চাষ বৃদ্ধি পেয়েছে ২৯ হাজার ৫শ  হেক্টর জমিতে।

শিবগঞ্জ উপজেলা কৃষি অফিসার আমিনুজ্জামান বললেন ভিন্ন কথা। তিনি বলেন, আমের বাজারে ধস নামেনি। জেলার মোট আমের ৬৫%আম শুধু শিবগঞ্জেই উৎপাদন হয়। এবছর  আমের উৎপাদন বেশী হওয়ায় কয়েকদিন আগে সাময়িকভাবে আমের দর কিছুটা কম থাকলেও বর্তমানে আমের দাম বেশী হতে শুরু করেছে। তাছাড়া আগে শিবগঞ্জ তথা চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলাতে আমের আবাদ বেশী ছিল। কিন্তু বর্তমানে চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার মতই দেশের মেহেরপুর,দিনাজপুর, কুষ্টিয়া, রাজশাহী, নওগাঁ, সহ বিভিন্ন জেলায় ব্যাপক আম চাষ

হওয়ায় কিছুটা প্রভাব কানসাট আম বাজারে উপর পড়েছে। তিনি বলেন শিবগঞ্জে  ১৭ হাজার হেক্টর জমিতে  বিভিন্ন জাতের ৯লাখ ৯৪ হাজার ৫শ ৬৬টি আম গাছে আম উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে  ১লাখ ৬০ হাজার মেট্রিকটন। তার মধ্যে সাড়ে ৪হাজার হেক্টর জমিতে  ২লাখ ৬৬ হাজার ৫ শ ফজলী আম গাছ,পৌনে ৫ হাজার হেক্টর জমিতে  ৩লাখ ৬শ ৭২টি আশ্বিনা আম গাছ, ১৫শ ৭৫ হেক্টর জমিতে  ৭৮হাজার ২শ হিম সাগর আম গাছ, ১৭২৫ হেক্টর জমিতে  ৯৯ হাজার ৫০টি ল্যাংড়া আম গাছ, ৬২৫ হেক্টর জমিতে  ৪৫ হাজার ৩শ টি গোপালভোগ আম গাছ, ৪৭৫ হেক্টর জমিতে  ৩০  হাজার বোম্বাই গুঠি আম গাছ, ৯২৫ হেক্টর জমিতে ৩৬ হাজার

৯ শ লখনা আম গাছ, ২ হেক্টর জমিতে ৫শ আম্রপলি আম গাছ,  ১১শ ৫০ হেক্টর জমিতে  ৭০ হাজার ২শটি উন্নত গুঠি আম গাছ ১হাজার ৫০ হেক্টর জমিতে  ৫২হাজার ৩শ ৪০ টি গুঠি আম গাছ রয়েছে,যা প্রতি বছর বৃদ্ধি পাচ্ছে।

বরেন্দ্র বার্তা/তোআটি/হাপি

 

 

 

 

Close