জাতীয়শিরোনাম

করোনাভাইরাসের টিকা কার্যক্রম শুরু আজ, বিকালে উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী

বরেন্দ্র বার্তা ডেস্ক: দেশে আজ (২৭ জানুয়ারি) প্রাথমিকভাবে শুরু হচ্ছে কোভিড-১৯ তথা করোনাভাইরাসের টিকা কার্যক্রম। বিকাল সাড়ে ৩টায় রাজধানীর কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালে এটি উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এসময় গণভবন থেকে ভার্চুয়ালি যুক্ত হবেন তিনি। আজ শুধু কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালেই টিকা দেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক। বাকি চার হাসপাতালে বৃহস্পতিবার থেকে শুরু হবে প্রাথমিক পর্যায়ের টিকাদান কর্মসূচি।

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানায়, কুয়েত মৈত্রী হাসপাতাল, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় (বিএসএমএমইউ), ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল ও মুগদা হাসপাতালে ২৮ জানুয়ারি থেকে ভ্যাকসিন দেওয়া হবে। এসব হাসপাতালের ৪০০ থেকে ৫০০ স্বাস্থ্যকর্মী সবার আগে তা পাবেন বলে জানিয়েছেন স্বাস্থ্যসচিব আব্দুল মান্নান। তিনি বলেন, এরপর বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রটোকল অনুযায়ী তাদের মধ্যে কোনও পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হয় কিনা তা দেখা হবে।

পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা দিলে প্রতিটি হাসপাতালেই আলাদাভাবে চিকিৎসা সেবার ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে বলে স্বাস্থ্যমন্ত্রী জানান।

মন্ত্রী আরও বলেন, এ প্রক্রিয়ার সবই করা হচ্ছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্দেশনা অনুযায়ী। নির্দেশনায় আগে স্বাস্থ্যকর্মীদের টিকা দেওয়ার কথা বলা আছে। সময়মতো ভিআইপিসহ অন্যরাও পাবেন।

২০ জানুয়ারি ভারত সরকারের উপহার দেওয়া অক্সফোর্ড অ্যাস্ট্রাজেনেকার তৈরি কোভিশিল্ড দেশে পৌঁছায়। সোমবার (২১ জানুয়ারি) দেশে আসে সরকারের কিনে নেওয়া তিন কোটি ভ্যাকসিনের প্রথম ৫০ লাখ ডোজ। এর মধ্যে ৬০ লাখ দেওয়া হবে প্রথম মাসে, দ্বিতীয় মাসে ৫০ লাখ, তৃতীয় মাসে আবার ৬০ লাখ। প্রথম মাসে যারা পাবেন তাদের দ্বিতীয় ডোজ দেওয়া হবে তৃতীয় মাসে। চুক্তি অনুযায়ী বেক্সিমকো ফার্মাসিউটিক্যালস ঢাকা থেকে দেশের ৬৪ জেলার সিভিল সার্জনের কাছে সব টিকা পৌঁছে দেবে।

আসছে আরও

বাংলাদেশ সরকার, ভারতের সেরাম ইন্সটিটিউট এবং বাংলাদেশ বেক্সিমকো ফারমাসিউটিক্যাল-এর মধ্যে স্বাক্ষরিত ত্রিপক্ষীয় চুক্তি অনুযায়ী অ্যাস্ট্রাজেনেকার ৩ কোটি ডোজ টিকা কেনা হয়েছে। ভারতের উপহার হিসেবে এসেছে ২০ লাখ ডোজ। কোভ্যাক্সের কাছ থেকে বিশ্বের ৯২টি দেশের মতো বাংলাদেশও মোট জনসংখ্যার শতকরা ২০ ভাগ জনগোষ্ঠী অর্থাৎ ৩ কোটি ৪০ লাখ মানুষের জন্য ৬ কোটি ৮০ লাখ ডোজ ভ্যাকসিন পাবে।

ভ্যাকসিনেশন সেন্টার

উপজেলা স্বাস্থ্যকেন্দ্র, ইউনিয়ন পরিষদ, জেলা সদর হাসপাতাল, সরকারি-বেসরকারি মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল, বিশেষায়িত হাসপাতাল, পুলিশ-বিজিবি হাসপাতাল ও সিএমএইচ এবং বক্ষব্যাধি হাসপাতালে টিকা দেওয়া হবে। এর জন্য সাত হাজার ৩৪৪টি দল তৈরি করা হয়েছে। একটি দলে ছয়জন করে সদস্য- দু’জন টিকাদানকারী (নার্স, স্যাকমো, পরিবারকল্যাণ সহকারী) ও চারজন স্বেচ্ছাসেবক। টিকা রাখার জন্য ৬৪ জেলাতেই ইপিআই স্টোর রয়েছে।

ছয় ধাপ

স্বাস্থ্য অধিদফতরের তথ্য অনুযায়ী ছয় ধাপে সম্পন্ন হবে টিকাদান প্রক্রিয়া। প্রথমে এনআইডি কার্ডের মাধ্যমে নিবন্ধনের পর অনলাইন পোর্টাল থেকে ভ্যাকসিন কার্ড সংগ্রহ করতে হবে। এরপর তারিখ ও অন্যান্য তথ্য পাঠানো হবে। ওই তারিখে প্রথম ডোজ দেওয়া হবে। দুই মাস পর নির্দিষ্ট তারিখে দেওয়া হবে দ্বিতীয় ডোজ। দুই ডোজ নেওয়ার পর সুরক্ষা প্ল্যাটফর্ম থেকে ভ্যাকসিন সনদ দেওয়া হবে।

নিবন্ধন

১৮ বছরের নিচে যারা, তারা নিবন্ধনের বাইরে থাকবে। বাকিদের প্রথমে www.surokkha.gov.bd ওয়েবসাইটে ঢুকতে হবে। নিবন্ধন ট্যাবে ক্লিক করলে পাওয়া যাবে পরিচয় যাচাইয়ের অ্যাপ্লিকেশনে ১৮টি শ্রেণি। এর একটি সিলেক্ট করার পর জাতীয় পরিচয়পত্রের নম্বর ও জন্ম তারিখ দিয়ে নিবন্ধন শুরু করতে হবে।

১৮টি শ্রেণির মধ্যে রয়েছে নাগরিক নিবন্ধন, সরকারি স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা বিভাগের কর্মকর্তা-কর্মচারী, অনুমোদিত সব বেসরকারি স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা-কর্মচারী, প্রত্যক্ষভাবে সম্পৃক্ত স্বাস্থ্যসেবা কর্মকর্তা-কর্মচারী, বীর মুক্তিযোদ্ধা ও বীরাঙ্গনা, সম্মুখসারির আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য, সামরিক ও আধা সামরিক প্রতিরক্ষা বাহিনী, সম্মুখসারির সংবাদকর্মী, প্রবাসী অদক্ষ শ্রমিক, নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি, ধর্মীয় প্রতিনিধি, সৎকার কাজে নিয়োজিত ব্যক্তি, ব্যাংক কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং রাষ্ট্র পরিচালনায় অপরিহার্য কার্যালয়ের কর্মীরা।

এ ছাড়া রয়েছেন সিটি করপোরেশন ও পৌরসভার সম্মুখসারির কর্মকর্তা-কর্মচারী, বিদ্যুৎ, পানি, গ্যাস, পয়ঃনিস্কাশন ও ফায়ার সার্ভিসের মতো জরুরি সেবার কর্মী, রেলস্টেশন, বিমানবন্দর ও নৌবন্দরের কর্মকর্তা-কর্মচারী, জেলা ও উপজেলায় জরুরি জনসেবায় সম্পৃক্ত সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী।

জাতীয় পরিচয়পত্রের নম্বর যাচাইয়ের পর স্ক্রিনে নিবন্ধনকারীর নাম দেখানো হবে। সেখানে একটি ঘরে মোবাইল নম্বর দিতে হবে। ওই নম্বরেই টিকাদান সংক্রান্ত তথ্য এসএমএস করা হবে। এরপর একটি ঘরে জানাতে হবে নিবন্ধনকারীর কোনও দীর্ঘমেয়াদী রোগ আছে কিনা। থাকলে তা কোন রোগ। আরেকটি ঘরে লিখতে হবে পেশা ও তিনি কোভিড-১৯ সংক্রান্ত কাজে সরাসরি জড়িত কিনা।

এরপর বর্তমান ঠিকানা ও কোন কেন্দ্র থেকে টিকা নিতে ইচ্ছুক তা নির্বাচন করতে হবে। সব শেষে তথ্য সংরক্ষণ করলে নিবন্ধনকারীর মোবাইল নম্বরে পাঠানো হবে ওয়ানটাইম পাসওয়ার্ড (ওটিপি)। সেই ওটিপি দিয়ে ‘স্ট্যাটাস যাচাই’ বাটনে ক্লিক করলে নিবন্ধনের কাজ শেষ হবে। নিবন্ধনে পর প্রথম ডোজের তারিখ ও কেন্দ্রের নাম এসএমএস করে জানিয়ে দেওয়া হবে।

এরপর জাতীয় পরিচয়পত্রের নম্বর, জন্ম তারিখ দিয়ে লগ ইন করে প্রাপ্ত এসএমএস-এর মাধ্যমে পাওয়া ওটিপি কোড দিয়ে টিকা-কার্ড ডাউনলোড করতে হবে। এসএমএস-এ যে তারিখ দেওয়া হবে, সেই তারিখে টিকা কার্ড ও জাতীয় পরিচয়পত্র নিয়ে যেতে হবে নির্ধারিত টিকাদান কেন্দ্রে।

দুটি ডোজ শেষ হলে সুরক্ষা প্ল্যাটফর্মের ওয়েব অ্যাপ্লিকেশন থেকে ভ্যাকসিন প্রাপ্তির সনদ সংগ্রহ করা যাবে।

যারা টিকা পাবে না

যাদের শরীরে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা একেবারেই নেই, যাদের বলা হয় ইমিউন সাপ্রেসেজড গ্রুপ, তারা টিকা পাবেন না। এই তালিকায় আছেন ক্যানসার আক্রান্ত, ক্যানসারের জন্য টার্মিনাল কেয়ারে (শেষ ধাপে) আছেন এমন রোগী, অ্যান্টি-ক্যানসার ওষুধ সেবনকারী, যারা উচ্চমাত্রার স্টেরয়েড নিচ্ছেন, যাদের শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা প্রায় ভেঙে পড়েছে।

তাছাড়া দেশের ৩৭ শতাংশ মানুষের বয়স ১৮ বছরের নিচে, তারাও পাবে না। কারণ শিশুদের নিয়ে কোনও ট্রায়াল কোথাও হয়নি। একই কারণে গর্ভবতীরাও পাবে না। এদের সংখ্যাও প্রায় ৫০ লাখ। এ ছাড়া ৯০ বছরের বেশি বয়স্কদেরও দেওয়া হবে না। এক কোটি মানুষ যারা দেশের বাইরে আছে, তারাও টিকা পাচ্ছেন না। সব মিলিয়ে ভ্যাকসিন কার্যক্রমের বাইরে থাকবে প্রায় ৭ কোটি বাংলাদেশি।

প্রবাসীদের টিকা

প্রবাসী অদক্ষ শ্রমিকদের কেউ যদি ২ ডোজ ভ্যাকসিন নিতে চান তবে তাকে অবশ্যই প্রথম ডোজের পর ৮ সপ্তাহ দেশে থাকতে হবে। এক্ষেত্রে তাকে বৈধ কাগজপত্রও (পাসপোর্ট, ভিসা, ওয়ার্ক পারমিট ইত্যাদি) দাখিল করতে হবে।

পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া

স্বাস্থ্য অধিদফতর জানায়, টিকা দেওয়ার পর শরীর ব্যথা, কাশি ও মাথাব্যথা হলে তাদের ফলোআপে রাখা হবে। এর জন্য সরকারের যথাযথ নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। সাধারণ পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হিসেবে শরীর চুলকাতে পারে। টিকা দেওয়ার স্থান ফুলতে পারে, লাল হতে পারে, ব্যথাও হতে পারে, চামড়ায় কিছু পরিবর্তন আসতে পারে। অপরদিকে, গা গোলানো, বমি ভাব, মাথা ঘোরানো দেখা দিতে পারে। এ সবের চেয়ে বড় কোনও পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া এখনও অক্সফোর্ড অ্যাস্ট্রাজেনেকার ভ্যাকসিনে পাওয়া যায়নি।

স্বাস্থ্য অধিদফতরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল বাশার মোহাম্মদ খুরশিদ আলম বলেন, ‘এখানে চিন্তার কারণ একটাই, তা হলো অ্যানাফাইলেকটিক শক। এতে পুরো শরীরের সিস্টেম ধসে পড়ে। তবে আজ পর্যন্ত কোনও টিকায় তাৎক্ষণিক অ্যানাফাইলেকটিক শক হয়েছে বলে আমার জানা নেই।’
বরেন্দ্র বার্তা/অপস
সুত্র: বাংলা ট্রিবিউন

Close