মহানগরশিরোনাম-২

রাষ্ট্রনায়ক দেশরত্ন শেখ হাসিনার সমীপে-আসাদুজ্জামান আসাদ

শ্রদ্ধেয় দেশরত্ন শেখ হাসিনা, আপনি বাংলাদেশের স্থপতি, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর কন্যা, আপনার হাত ধরে বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের বাংলাদেশ বিশ্ব দরবারে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়েছে। বিশ্বনেতৃবৃন্দ আজ দ্বিধাহীন চিত্তে স্বীকার করে অনেক উন্নত দেশের চাইতে শেখ হাসিনার বাংলাদেশ উন্নয়ন আর অর্জনের মহাসড়কে বিশ্বকে অবাক করে দিয়ে সামনের দিকে এগিয়ে চলেছে। আমরা যারা বঙ্গবন্ধুর আদর্শে মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ধারণ করে একবাক্যে মাথা উঁচু করে চিৎকার করে বলতে পারে এবং বলে রাষ্ট্রনায়ক শেখ হাসিনার সততা, যোগ্যতা, মেধা আর বিরামহীন অক্লান্ত পরিশ্রমে বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলাকে আর দেশের মানুষকে সম্মানিত করেছেন। অন্নহীন মানুষের মুখে অন্ন তুলে দিয়েছেন, নীড় হারা মানুষের নীড়ের ব্যবস্থা করছেন, বেকারত্ব আর দারিদ্রের হার কমিয়ে শিক্ষিতের হার বাড়িয়ে আত্মকর্মসংস্থান সৃষ্টি করেছেন। এক কথায় আপনার নেতৃত্বের গুনে আপনি যেমন অনন্য, আমরা তেমনি গর্বিত।

মাননীয় নেত্রী ভাষা আন্দোলন থেকে স্বাধীকার, গণঅভ্যূত্থান থেকে মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত অনেক রক্ত দিয়ে কেনা স্বাধীনতা অর্থাৎ বাংলা আর বাঙালির প্রত্যেকটি আন্দোলন সংগ্রাম অর্জনে আর বিজয়ের নেতৃত্বে বঙ্গবন্ধু আর আওয়ামী লীগ। ইতিহাসের পরতে পরতে বঙ্গবন্ধু আর আওয়ামী লীগের নাম জ্বল জ্বল করছে। রাজনীতির আকাশে উজ্জ্বল নক্ষত্র আওয়ামী লীগের উপর বিনা মেঘে বজ্রপাত ‘৭৫ এর ১৫ আগস্ট জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু সহ স্বপরিবারে নির্মম হত্যাকান্ড, দিশেহারা আওয়ামী লীগ। এর মাঝে জাতীয় চারনেতাকে জেলখানার অভ্যন্তরে ৩রা নভেমম্বর’৭৫ নির্মম হত্যার মধ্যে শত্রুপক্ষ মনে করলো বঙ্গবন্ধু ও জাতীয় চারনেতা বিহীন বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ নামক রাজনৈতিক সংগঠনটির অপমৃত্যু হলো, কিন্তু শত প্রতিকুলতাকে মোকাবেলা করে আওয়ামী লীগ ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করলো। বঙ্গবন্ধু ও তার পরিবারের রক্তস্রোত আর জেলহত্যার শিকার জাতীয় চারনেতার রক্তস্রোতের মিলিত ধারায় পোড়া মাটি আর ধ্বংসস্তুপের মধ্যে থেকে ফিনিক্স পাখির মত আওয়ামী লীগের পূর্ণজন্ম হলো। হত্যা, জেল-জুলুম, হামলা-মামলা আর হুলিয়া মাথায় নিয়ে বঙ্গবন্ধুর আদর্শের নেতাকর্মীরা মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে বুকে ধারণ করে গুটি গুটি পায়ে সামনের দিকে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা, কখনও সামনে যায়, কখনও পিছিয়ে এইভাবে চলতে চলতে ১৯৮১ সালের ১৭ মে আপনি প্রকৃতির প্রতিকুল অবস্থা আর রাজনৈতিক ঝড়ঝঞ্জা বিক্ষুব্ধ ময়দানে বঙ্গবন্ধু বিহীন বাংলাদেশে প্রায় ৬ বছরের নির্বাসিত জীবন শেষে আওয়ামী লীগের সভাপতি হয়ে ফিরে এলেন কোটি কোটি মানুষের ভালবাসা আর লক্ষ লক্ষ নেতার্মীর উপস্থিতিতে গগণবিদারী শ্লোগান “হাসিনা তোমার ভয় নাই- আমরা আছি লাখো ভাই, ঝড় বৃষ্টি আধার রাতে- আমরা আছি তোমার সাথে”- এই রকম হাজারও শ্লোগানের মাঝে নেত্রী আপনি শত দুঃখ, কষ্ট, যন্ত্রণা চেপে রেখে পিতার মত সাহসী উচ্চারণ করলেন- নিজের জীবনের বিনিময়ে হলেও বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলা আর গণমানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠিত করবই ইনশাল্লাহ। আপনি হয়ে উঠলেন মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী মানুষের আশা ভরসা আর অধিকার আদায়ের ঠিকানা। আপনাকে ঘিরে পাড়া থেকে গ্রাম, গঞ্জ থেকে বন্দর, শহর এক কথায় আওয়ামী লীগের তৃণমূল পর্যায়ের নেতাকর্মীরা যেমন প্রায় মরে যাওয়া গাছের গোড়াতে পানি দিলে সজিব ও সতেজ হয় তেমনি ভাবে গা ঝাড়া দিয়ে জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু, জয়তু শেখ হাসিনা শ্লোগানে শ্লোগানে বাংলার আকাশ বাতাস প্রকম্পিত করলো।

নেত্রী আপনার নেতৃত্বে সমস্ত বাঁধাকে উপেক্ষা আর হাজার হাজার নেতাকর্মীর জীবন দান, লক্ষ লক্ষ নেতাকর্মী হামলা-মামলা, জেল-জুলুম, নির্যাতন হাসিমুখে বরণ করেছিলেন। জনগণের অধিকার আদায়ের সংগ্রামে আপনি বার বার ষড়যন্ত্রের জাল ছিন্ন করতে গিয়ে মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে জীবনের জয়গান গেয়েছেন, গ্রেফতার আর নির্যাতন আপনাকে দমাতে পারেনি। আপনার সাহসী নেতৃত্ব আর অগণতি তৃণমূলের ত্যাগী ও পরীক্ষিত নেতাকর্মী ছিল আপনার ভরসা, আর সেই ভরসা আর বিশ্বাসের উপর দাঁড়িয়ে হাজারও প্রতিকুল পরিবেশ আর প্রায় ৩১ বার মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে আপনি মানুষের শ্রদ্ধা আর ভালবাসায় শাসক নয় সেবক হিসাবে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা গ্রহণ করে দুঃখি মেহনতি মানুষের মুখে হাসি ফুটিয়েছেন, ঠিক তেমন নেতৃত্ব ‘৭১ আর ‘৭৫ এর খুনীদের বিচার করে বাংলা আর বাঙালিকে কলঙ্ক মুক্ত করেছেন। লিখার শুরুতে বলেছি মাননীয় নেত্রী আপনি আজ শুধু বাংলাদেশের মানুষের ভরসার স্থল নয়, বিশ্বের নির্যাতিত, বঞ্চিত মানুষের ভরসার স্থান, আপনি এখন বিশ্ব নেতৃত্বের অংশ, আপনার এই সোনালী অর্জনের কারিগর তৃণমূলের নেতাকর্মীরা আজ লাঞ্চিত, অপমানিত, নির্যাতনের শিকার হয়েছে এবং হচ্ছে। যারা আপনার শ্রদ্ধা, স্নেহ, ভালবাসা ও ভরসার তৃণমূলের জয় বাংলার মিছিলে লাঠি চালিয়েছে, যারা বঙ্গবন্ধুর ভাষণ বাজানোর অপরাধে মাইক ভেঙ্গে ক্ষান্ত হয় নাই, বাড়ি ঘরে আগুন দিয়েছে, যারা জাতীয় শোক দিবসের দোয়া মাহফিল করতে দেয় নাই, যারা ১৫ আগস্টের কাঙ্গালীভোজ আপনার তৃণমূলের কাছ থেকে কেড়ে নিয়ে কুকুর দিয়ে খাইয়েছে, তাদেরই একটা বড় অংশ আজ ইউনিয়ন, পৌর, উপজেলা, জেলাতে নেতা, উপনেতা, পাতিনেতা, কেউবা এমপি, মন্ত্রী হয়ে অথবা তাদের দালাল সেজে আপনার ভরসার ঠিকানা তৃণমূলকে শাসন আর শোষণ করছে।

গণমানুষের সংগঠন বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ গ্রাম, ওয়ার্ড, পৌর, উপজেলা ও জেলা কমিটির সাংগঠনিক কাঠামো গঠনতন্ত্র অনুযায়ী চলছে না। কোন নিয়ম নীতির তোয়াক্কা না করে কেন্দ্রের গুটি কয়েক নেতাকে ম্যানেজ করে জেলা বা মহানগরের নেতা, এমপি বা মন্ত্রীরা ইচ্ছা মত কমিটি করছে। কিন্তু প্রকৃত চিত্র আপনার সামনে উপস্থাপন করছে না। এই সব বিবেচনায় মনে হয় আপনার নেতৃত্বে বাংলাদেশ উন্নয়ন, সমৃদ্ধি, সম্মানে বিশ্বের সাথে তাল মিলিয়ে সাত সাগর পাড়ি দিয়েছে কিন্তু দুঃখের সঙ্গে বলতে বাধ্য হচ্ছি নেত্রী আওয়ামী লীগ সাগরের সৈকতে পড়ে আছে।

সম্মানিত নেত্রী আপনি মানবতার জননী আর বাংলাদেশের বাতিঘর বিশ্বদরবারে আলোকিত হয়েছেন, নেতা কর্মীদের প্রতি আপনার বিশ্বাস, শ্রদ্ধা, ভালবাসার কারণে আওয়ামী লীগের তৃণমূলে আপনি একমাত্র ভরসা, বিধায় সার্বিক দিক বিবেচনায় সংগঠনকে ঘোষণাপত্রের আলোকে গঠনতন্ত্র মোতাবেক তৃণমূলের আস্থাভাজন, ত্যাগী, পরীক্ষিত নেতৃত্বকে সামনে আনতে হবে।
এই বিষয়ে আমার ক্ষুদ্র অভিজ্ঞতার আলোকে আপনার সদয় বিবেচনার জন্য সাংগঠনিক বিষয়ে কিছু প্রস্তবনা উপস্থাপন করছি।

♦স্থানীয় সরকারের নির্বাচনে দলীয় বিবেচনায় প্রার্থীর বিষয়টি পূর্ণবিবেচনা করা দরকার। তবে কোন অবস্থাতে নৌকা প্রতিক ব্যবহার না করারই শ্রেয় হবে। যদি দলীয় প্রার্থী দিতেই হয় তাহলে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে অন্য প্রতিক বিবেচনা করার অনুরোধ করছি।
♦ সহযোগি ও ভ্রাতৃ প্রতিম সংগঠনের কেন্দ্রীয় কমিটির আকার ১০০/১৫০ জনের মধ্যে রাখতে হবে। সহযোগি ও ভ্রাতৃ প্রতিম সংগঠনের জেলা কমিটি ১০০ জনের অধিক হবে না। সহযোগি ও ভ্রাতৃ প্রতিম সংগঠনে সদস্য সংগ্রহ ও নবায়ন প্রথা পুনরায় চালু করা জরুরী।
♦ গঠনতন্ত্রের বিধান মোতাবেক সদস্য সংগ্রহ ও নবায়ন করতে হবে। তবে গঠনতন্ত্রে সদস্য সংগ্রহ ও নবায়নের কমপক্ষে সংখ্যা উল্লেখ আছে। কিন্তু সর্বোচ্চ সংখ্যা কত হবে তা গঠনতন্ত্রে উল্লেখ থাকা প্রয়োজন।
♦ সদস্য সংগ্রহ ও নবায়ন ছাড়া কোন স্তরে কমিটি গঠন করতে দেওয়া যাবে না। কমিটির নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সম্মেলন করতে হবে। এর ব্যতয় হলে কোন অবস্থায় কমিটির মেয়াদ বাড়ানো যাবে না।
♦ আওয়ামী লীগের যে কোন স্তরের সভাপতি/ সাধারণ সম্পাদক যারা হবেন তাদের পরিবার অবশ্যই আওয়ামী আদর্শের হতে হবে, ছাত্রলীগের কর্মকান্ডের সাথে কমপক্ষে চার বছর অথবা সহযোগি সংগঠনের সাথে পাঁচ বছরের দায়িত্বশীল নেতৃত্বের অভিজ্ঞতা থাকতে হবে।
♦ দলীয় এমপি, মন্ত্রী, মেয়রসহ জনপ্রতিনিধিগন কে ওয়ার্ড, ইউনিয়ন, থানা, উপজেলা, জেলা, মহানগর কমিটির নেতৃত্বে আসতে নিরুৎসাহিত করতে হবে।
♦ সংগঠনে যে কাউকে নিয়ম না মেনে যোগদান প্রক্রিয়া বন্ধ করা জরুরী …
মাননীয় সভানেত্রী আপনি বলেছেন, ত্যাগীরা বিশ্বাসঘাতক হয় না, অভিমানী হয়। উল্লেখিত প্রস্তাবনাগুলো আপনি সহানুভূতির সাথে বিবেচনা করলে আপনার ত্যাগীদের অভিমান ভাঙ্গবে এবং সংগঠনের পরীক্ষিত, কর্মঠ, বিশ্বস্ত নেতাকর্মীদের কর্মের মূল্যায়ন হবে ও সংগঠনে গতি ফিরে আসবে। জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু ।

লেখক: সাবেক সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ, রাজশাহী জেলা শাখা।

Close